Image default
কুয়েতপর্যটন আকর্ষণ

কাসর আল-আহমার: আল জাহরার ঐতিহাসিক লাল দুর্গ

কুয়েতের আল জাহরা শহরের ঠিক কেন্দ্রস্থলে, মরুভূমির বিস্তীর্ণ প্রান্তরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ‘কাসর আল-আহমার’ বা লাল দুর্গ। আধুনিক কুয়েতের আকাশচুম্বী দালানকোঠা আর চাকচিক্যের ভিড়ে এই প্রাচীন দুর্গটি যেন এক টুকরো জীবন্ত ইতিহাস। এটি কেবল ইট-পাথরের একটি প্রাচীন স্থাপনা নয়, বরং এটি কুয়েতিদের দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতা রক্ষার এক অবিস্মরণীয় স্মারক। আল জাহরা একসময় ছিল কুয়েতের একটি উর্বর মরূদ্যান, যেখানে বণিক এবং বেদুইনরা যাত্রাপথে বিশ্রাম নিতেন। ঠিক এমন একটি কৌশলগত স্থানে এই দুর্গটি নির্মাণ করা হয়েছিল, যা পুরো এলাকার প্রতিরক্ষার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। আজও দেশ-বিদেশের হাজারো পর্যটক এই দুর্গের সামনে এসে দাঁড়ালে প্রাচীন আরবের সেই রোমাঞ্চকর দিনগুলোর কথা কল্পনা করতে পারেন।

কাসর আল-আহমার বা লাল দুর্গ – Image Source: commons.wikimedia.org

‘কাসর আল-আহমার’ শব্দটির আরবি অর্থ হলো ‘লাল দুর্গ’। মরুভূমির বিশেষ একধরনের লাল কাদা ও খড়ের মিশ্রণ দিয়ে এটি তৈরি করা হয়েছিল বলেই এর দেয়ালের রং লালচে, আর সেখান থেকেই এর এমন চমৎকার নামকরণ!

কাসর আল-আহমার বা লাল দুর্গের নির্মাণের ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে, আনুমানিক ১৮৯৫ থেকে ১৮৯৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে কুয়েতের তৎকালীন শাসক শেখ মুবারক আল-সাবাহ এই দুর্গটি নির্মাণ করেন। সেই সময়ে মরুভূমিতে বিভিন্ন যাযাবর উপজাতি ও দস্যুদের আক্রমণের ভয় ছিল প্রবল। আল জাহরার কৃষিজমি, কূপের পানি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই শেখ মুবারক একটি শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটির প্রয়োজন অনুভব করেন। প্রাচীন কুয়েতি স্থাপত্যশৈলী অনুসরণ করে সম্পূর্ণ স্থানীয় কাঁচামাল দিয়ে এই দুর্গটি গড়ে তোলা হয়, যা মরুভূমির চরম রুক্ষ আবহাওয়ার সাথে নিখুঁতভাবে মানানসই ছিল।

এই দুর্গ তৈরিতে ব্যবহৃত কাদা ও খড়ের মিশ্রণ প্রাকৃতিক ইনসুলেটর হিসেবে কাজ করে। ফলে মরুভূমির বাইরে যখন চামড়া ঝলসানো রোদ ও গরম, দুর্গের ভেতরের পরিবেশ তখনো থাকে তুলনামূলকভাবে বেশ ঠান্ডা ও আরামদায়ক!

কাসর আল-আহমার বাইরের দৃশ্য – Image Source: commons.wikimedia.org

এই ঐতিহাসিক দুর্গটির স্থাপত্যশৈলী ও বিশালতা যে কাউকে অবাক করবে। প্রায় ৩৩ হাজার বর্গমিটার বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই দুর্গটিতে রয়েছে মোট চারটি সুউচ্চ নজরদারি টাওয়ার, যেগুলোকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘বারাজিল’। এর প্রতিটি কোণে থাকা এই টাওয়ারগুলো থেকে বহুদূর পর্যন্ত মরুভূমির বুকে নজর রাখা যেত। দুর্গের ভেতরে রয়েছে একটি প্রশস্ত খোলা উঠান, যেখানে যোদ্ধারা জড়ো হতেন। এছাড়া এখানে রয়েছে অস্ত্রাগার, সৈন্যদের থাকার জন্য ছোট ছোট কক্ষ, ঘোড়া ও উট রাখার আস্তাবল এবং রসদ সংরক্ষণের জন্য বিশেষ গুদাম। দুর্গের প্রধান প্রবেশদ্বারগুলো তৈরি হয়েছিল অত্যন্ত মজবুত কাঠ দিয়ে, যা সহজে ভাঙা সম্ভব ছিল না।

এই মাটির দুর্গের দেয়ালগুলো প্রায় আধা মিটার পুরু! তীব্র আক্রমণ প্রতিহত করতে দেয়ালের গায়ে ছোট ছোট ছিদ্র রাখা হয়েছিল, যেখান দিয়ে যোদ্ধারা নিরাপদে লুকিয়ে থেকে বাইরের শত্রুর দিকে বন্দুকের গুলি ছুঁড়তে পারতেন।

এই দুর্গটি কুয়েতের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে আছে ১৯২০ সালের ঐতিহাসিক ও রক্তক্ষয়ী ‘জাহরার যুদ্ধ’-এর কারণে। সেসময় ফয়সাল আল-দুয়াইশের নেতৃত্বাধীন ইখওয়ান বাহিনীর এক বিশাল সৈন্যদল আল জাহরা আক্রমণ করে। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে কুয়েতের তৎকালীন শাসক শেখ সালেম আল-মুবারক আল-সাবাহ তাঁর বাহিনী নিয়ে আল জাহরায় উপস্থিত হন। কিন্তু শত্রুপক্ষের বিশাল সৈন্যসংখ্যার সামনে কুয়েতি বাহিনী ছিল বেশ ছোট। পিছু হটতে বাধ্য হয়ে শেখ সালেম তার যোদ্ধাদের নিয়ে এই কাসর আল-আহমারে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে মাতৃভূমি রক্ষার শপথ নেন।

ইতিহাসবিদদের মতে, ইখওয়ান বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৪,০০০ এর বেশি, যেখানে কাসর আল-আহমারে আশ্রয় নেওয়া কুয়েতি যোদ্ধাদের সংখ্যা ছিল মাত্র ১,৫০০ এর কাছাকাছি। এই অসম যুদ্ধে দুর্গটিই ছিল তাদের একমাত্র ভরসা!

লাল দুর্গ কুয়েতের ঐতিহাসিক নিদর্শন – Image Source: en.wikipedia.org

অবরোধ চলাকালীন দুর্গের ভেতরের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ ও কষ্টদায়ক। ইখওয়ান বাহিনী চারপাশ থেকে দুর্গটি ঘিরে রাখে এবং অনবরত গুলিবর্ষণ করতে থাকে। দুর্গের ভেতরে অবরুদ্ধ কুয়েতি যোদ্ধাদের খাবার ও পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দেয়। প্রচণ্ড গরম, যুদ্ধাহত সঙ্গীদের আর্তনাদ এবং শত্রুর ক্রমাগত আক্রমণের মুখেও তারা হার মানেননি। দেয়ালের ছিদ্র দিয়ে তারা পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে যান এবং শত্রুদের দুর্গের ভেতরে প্রবেশ করতে দেননি। এই অবিশ্বাস্য প্রতিরোধ কুয়েতের ইতিহাসে এক বীরত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে লেখা রয়েছে।

অবরুদ্ধ থাকার সময় দুর্গের ভেতরে থাকা একটি মাত্র কূপই ছিল যোদ্ধাদের জীবন বাঁচানোর একমাত্র উপায়। অবাক করা বিষয় হলো, সেই কূপের পানি ছিল অত্যন্ত লবণাক্ত এবং কাদাযুক্ত, কিন্তু বেঁচে থাকার তীব্র লড়াইয়ে ওই পানি পান করেই তারা যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিলেন!

যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায় যখন কুয়েত সিটি থেকে নৌপথে সাহায্য এসে পৌঁছায়। শেখ সালেম আল-মুবারক আগেই কুয়েত সিটিতে সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। সেই খবর পেয়ে কুয়েতের সাধারণ মানুষ, জেলে ও বণিকরা নিজেদের উদ্যোগে অস্ত্র ও রসদ জোগাড় করে নৌকায় করে সমুদ্রপথে আল জাহরার দিকে ছুটে আসেন। নতুন এই বাহিনী এসে পৌঁছালে ইখওয়ান বাহিনী বুঝতে পারে যে দুর্গ দখল করা অসম্ভব। শেষ পর্যন্ত একটি চুক্তির মাধ্যমে ইখওয়ানরা পিছু হটে এবং কুয়েত তার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ধরে রাখতে সক্ষম হয়।

সাহায্য পাঠানোর এই প্রক্রিয়ায় কুয়েতি নারীরাও অসামান্য ভূমিকা রেখেছিলেন। তারা রাত জেগে রুটি বানিয়ে, পানি ও প্রয়োজনীয় খাবার প্রস্তুত করে নৌকায় তুলে দিয়েছিলেন যোদ্ধাদের শক্তি জোগানোর জন্য।

যুদ্ধের পর কুয়েতের সীমানা যখন ধীরে ধীরে সুরক্ষিত হতে শুরু করে, তখন এই সামরিক দুর্গের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়। একটা দীর্ঘ সময় ধরে কাসর আল-আহমারকে আর সামরিক কাজে ব্যবহার করা হয়নি। শান্তিকালীন সময়ে দুর্গটির বিশাল প্রাঙ্গণ ব্যবহার করা হতো কৃষিকাজের জন্য। এর আশেপাশে প্রচুর খেজুর গাছ লাগানো হয় এবং গবাদি পশু চরানোর কাজে ব্যবহৃত হতে থাকে। এক পর্যায়ে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে রোদ, বৃষ্টি আর মরুঝড়ে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে বসেছিল।

চরম সামরিক প্রয়োজনে তৈরি হলেও, ১৯৩০ এর দশকের পর কাসর আল-আহমার আক্ষরিক অর্থেই একটি বিশাল কৃষি খামারে পরিণত হয়েছিল, যেখানে খেজুর আর স্থানীয় ফলমূলের চাষ হতো!

আধুনিক যুগে এসে কুয়েত সরকার এই ঐতিহাসিক রত্নটির গুরুত্ব অনুধাবন করে। কুয়েতের ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর কালচার, আর্টস অ্যান্ড লেটারস’ এর দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং ব্যাপক সংস্কার কাজের উদ্যোগ নেয়। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপার হলো, সংস্কারের সময় কোনো আধুনিক সিমেন্ট বা ইট ব্যবহার করা হয়নি; বরং প্রাচীন কারিগরদের সাহায্যে সেই ঐতিহ্যবাহী কাদা ও খড় দিয়েই দুর্গের দেয়ালগুলো ঠিক করা হয়। বর্তমানে এটি একটি চমৎকার জাদুঘর, যেখানে ১৯২০ সালের যুদ্ধের অস্ত্র, প্রাচীন পোশাক, কৃষি সরঞ্জাম এবং সেকালের কুয়েতি জীবনযাত্রার নানা নিদর্শন সাজিয়ে রাখা হয়েছে।

কাসর আল-আহমার এখন সবুজের সমারোহ – Image Source: kuna.net.kw

একটি মাটির দুর্গ কীভাবে এতদিন ধরে টিকে আছে তা ভেবে অনেকেই অবাক হন! আধুনিক কুয়েত সরকার এই মাটির দুর্গটিকে রোদ ও বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচাতে এর বাইরের অংশে বিশেষ স্বচ্ছ রাসায়নিক প্রলেপ ব্যবহার করেছে, যাতে এর আসল রূপ একটুও নষ্ট না হয়।

আজ কাসর আল-আহমার কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি কুয়েতের জাতীয় আত্মপরিচয় ও গৌরবের প্রতীক। প্রতি বছর হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক আল জাহরায় আসেন এই দুর্গটি দেখতে। আধুনিক কুয়েতের দ্রুত নগরায়ন এবং প্রযুক্তির বিকাশের মাঝেও লাল দুর্গটি শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তাদের পূর্বপুরুষদের ত্যাগের গল্প স্মরণ করিয়ে দেয়। আল জাহরা শহরের আধুনিক রাস্তাঘাট আর শপিং মলের ঠিক পাশেই এই প্রাচীন মাটির দুর্গের উপস্থিতি এক অদ্ভুত সুন্দর বৈপরীত্য তৈরি করে, যা কুয়েতের ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনেরই প্রতিচ্ছবি।

কুয়েতের জাতীয় দিবস এবং স্বাধীনতা দিবসের সময় এই কাসর আল-আহমার প্রাঙ্গণে বিশেষ উৎসবের আয়োজন করা হয়, যেখানে কুয়েতের ঐতিহ্যবাহী তলোয়ার নৃত্য ‘আরদাহ’ পরিবেশন করে মাতৃভূমির জন্য প্রাণ দেওয়া সেই বীর শহীদদের প্রতি সম্মান জানানো হয়!

Reference:

Related posts

কুয়েতের ‘ফাইলাকা দ্বীপ’: যেখানে কোনো মানুষ থাকে না

প্যারিসের বিজ্ঞান জাদুঘর প্যালাইস দে লা ডেকোভার্তে

সিন নদী: প্যারিস শহরের নীল আয়না

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More