কুয়েত মানেই বিস্তীর্ণ সমতল মরুভূমি আর সমুদ্র এই চিরাচরিত ধারণাকে পুরোপুরি পালটে দেবে আল জাহরার ‘মুতলা রিজ’। সমতল ভূমির বুক চিরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই দীর্ঘ পাথুরে ঢালটি মরুভূমির রুক্ষতা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক জাদুকরী মিশ্রণ। পাহাড়বিহীন কুয়েতে রোমাঞ্চপিয়াসী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এটি যেন এক ব্যতিক্রমী স্বর্গরাজ্য, যা একঘেয়েমি কাটিয়ে এক দারুণ বৈচিত্র্যের স্বাদ দেয়।

মুতলা রিজ হলো কুয়েতের সবচেয়ে উঁচু ভৌগোলিক স্থান! সমতল ভূমি থেকে এর সর্বোচ্চ উচ্চতা প্রায় ১৪২ মিটার (৪৬৬ ফুট)। পাহাড়সমৃদ্ধ দেশের মানুষদের কাছে এটি খুব বেশি উঁচু মনে না হলেও, একটি সমতল মরুভূমির দেশে এটি রীতিমতো একটি আস্ত পাহাড়ের মতোই রোমাঞ্চকর!
ভৌগোলিক দিক থেকে মুতলা রিজের অবস্থান অত্যন্ত চমৎকার। এই উঁচু প্রান্তরটি যেন প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া একটি বিশাল ব্যালকনি বা বেলকনি, যেখান থেকে পুরো কুয়েত উপসাগর এবং এর আশেপাশের বিস্তীর্ণ সমতলভূমির এক অভূতপূর্ব প্যানোরামিক দৃশ্য উপভোগ করা যায়। বিশেষ করে যখন আকাশ পরিষ্কার থাকে, তখন এই রিজের চূড়ায় দাঁড়ালে বহুদূরের দৃশ্যপট চোখের সামনে ছবির মতো ভেসে ওঠে। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, হাজার হাজার বছর ধরে মরুভূমির প্রবল বাতাস এবং ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফলেই এই উঁচু পাথুরে রিজ বা ঢালটির সৃষ্টি হয়েছে।
মুতলা রিজের এই বিশেষ ভৌগোলিক গঠনের কারণে এটি পরিযায়ী পাখিদের জন্য একটি দারুণ বিশ্রামস্থল। শীতের শুরুতে যখন পাখিরা ইউরোপ থেকে উষ্ণ অঞ্চলের দিকে উড়ে যায়, তখন তারা পথ চেনার জন্য এই উঁচু রিজটিকে একটি প্রাকৃতিক ‘ল্যান্ডমার্ক’ হিসেবে ব্যবহার করে!

শীতকাল এলেই মুতলা রিজের আসল সৌন্দর্য এবং প্রাণচাঞ্চল্য চোখে পড়ে। কুয়েতের প্রচণ্ড গরমের পর নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত আবহাওয়া যখন বেশ ঠান্ডা ও মনোরম থাকে, তখন স্থানীয় কুয়েতিরা এখানে ছুটে আসেন তাদের ঐতিহ্যবাহী ক্যাম্পিং বা ‘কাশতা’ উপভোগ করতে। মরুভূমির বুকে তাঁবু খাঁটিয়ে, আগুন জ্বালিয়ে পরিবার ও বন্ধুদের সাথে সময় কাটানো কুয়েতি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। মুতলা রিজের উঁচু ভূমিতে বাতাস একটু বেশি ঠান্ডা থাকে, যা ক্যাম্পিংয়ের আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
যারা একটু বেশি রোমাঞ্চ বা অ্যাডভেঞ্চার ভালোবাসেন, তাদের জন্য মুতলা রিজ এক দারুণ খেলার মাঠ। এর উঁচু-নিচু পাথুরে ঢাল এবং বালুকাময় প্রান্তর অফ-রোডিং বা ফোর-হুইল ড্রাইভের জন্য বিখ্যাত। শীতের সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে এখানে গেলে দেখা যায় অসংখ্য তরুণ তাদের ল্যান্ড ক্রুজার, জিপ বা এটিভি নিয়ে মরুভূমির বুকে ধুলো উড়িয়ে রেসিং করছে। বালুর উঁচু ঢিবির ওপর দিয়ে তীব্র বেগে গাড়ি চালানোর যে রোমাঞ্চকর খেলা, যাকে ‘ডুন ব্যাশিং’ বলা হয়, তার জন্য মুতলা রিজের ভূপ্রকৃতি একদম নিখুঁত।
মুতলার বালুকাময় ঢালে গাড়ি চালানোর আগে চালকরা ইচ্ছা করেই তাদের গাড়ির চাকার বাতাস অনেকটা কমিয়ে দেন! চাকার হাওয়া কম থাকলে বালুর ওপর গাড়ির গ্রিপ বাড়ে এবং গাড়ি বালুতে দেবে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায়।

তবে মুতলা রিজের সাথে জড়িয়ে আছে একটি অত্যন্ত শোকাবহ এবং গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অধ্যায়। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় এই মুতলা রিজের ওপর দিয়ে যাওয়া ‘হাইওয়ে ৮০’ সারা বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছিল। যখন ইরাকি সামরিক বাহিনী কুয়েত ছেড়ে পিছু হটছিল, তখন এই হাইওয়েতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনীর ব্যাপক বিমান হামলার শিকার হয় তারা। হাজার হাজার সামরিক ও বেসামরিক গাড়ি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়, যার কারণে রাস্তাটি ইতিহাসে ‘হাইওয়ে অফ ডেথ’ বা ‘মৃত্যুর মহাসড়ক’ নামে কুখ্যাতি লাভ করে। আজ সেই রাস্তাটি সম্পূর্ণ নতুন করে আধুনিক হাইওয়েতে পরিণত হয়েছে, তবে ইতিহাসবিদদের কাছে জায়গাটির গুরুত্ব এখনো অমলিন।
যুদ্ধের পর মুতলা রিজের ওই এলাকায় ধ্বংস হওয়া গাড়িগুলোর এত বিশাল স্তূপ জমেছিল যে, সেগুলো পরিষ্কার করে স্ক্র্যাপ মেটাল বা লোহা হিসেবে বিক্রি করতে কুয়েত সরকারের কয়েক বছর সময় লেগেছিল!

শীতের শেষে যদি কুয়েতে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয়, তবে মুতলা রিজের পুরো চেহারা জাদুর মতো বদলে যায়। রুক্ষ পাথুরে ঢালগুলো হঠাৎ করেই ছোট ছোট সবুজ গুল্ম এবং বুনো ফুলে ঢেকে যায়। এই সময়টাতে পুরো এলাকা যেন এক নতুন জীবন ফিরে পায়। মরুভূমির কিছু বিরল প্রজাতির টিকটিকি, শিয়াল এবং ছোট ছোট পোকামাকড় এই সময়ে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রকৃতিপ্রেমী এবং ফটোগ্রাফাররা এই ক্ষণস্থায়ী বসন্তের সৌন্দর্য ক্যামেরাবন্দী করতে এই সময়ে মুতলা রিজে ভিড় জমান।
বসন্তের এই সময়ে মুতলা রিজে কুয়েতের জাতীয় ফুল ‘আরফাজ’ -এর দেখা মেলে। এই গাছের বীজগুলো বৃষ্টির আশায় বছরের পর বছর শুকনো বালুর নিচে ঘুমন্ত অবস্থায় বেঁচে থাকতে পারে এবং একটু পানির ছোঁয়া পেলেই জাদুর মতো ফুটে ওঠে!
বর্তমানে মুতলা রিজ এলাকাটি কুয়েতের ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনার এক বিশাল অংশ হয়ে উঠেছে। এই রিজের ঠিক পাশেই গড়ে উঠছে ‘সাউথ আল মুতলা’ নামের এক বিশাল মেগা সিটি প্রকল্প। আধুনিক কুয়েতের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বাসস্থানের চাহিদা মেটাতে মরুভূমির এই বিস্তীর্ণ প্রান্তরকে একটি অত্যাধুনিক শহরে পরিণত করার কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। যেখানে একসময় শুধু মরুভূমির বাতাস আর শিয়ালের ডাক শোনা যেত, সেখানে অচিরেই গড়ে উঠবে লাখ লাখ মানুষের এক নতুন ঠিকানা। এই প্রজেক্টটি কুয়েতের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আবাসন প্রকল্পগুলোর একটি।
সাউথ আল মুতলা সিটি প্রজেক্টটি এতটাই বিশাল যে, সম্পূর্ণ নির্মাণকাজ শেষ হলে এই নতুন শহরটিতে প্রায় ৪ লাখ মানুষের বাসস্থান হবে, যা কুয়েতের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ ধারণ করবে!
শহর থেকে দূরে হওয়ার কারণে মুতলা রিজে ‘লাইট পলিউশন’ বা আলোর দূষণ খুব কম থাকে। তাই রাতের বেলা পরিষ্কার আকাশে তারা দেখার বা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির ছবি তোলার জন্য কুয়েতের অ্যাস্ট্রো-ফটোগ্রাফারদের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা হলো এই মুতলা রিজ!
Reference:

