Image default
পর্যটন আকর্ষণফ্রান্স

প্লেস বেলেক্যুর: রাজা চতুর্দশ লুই থেকে লিটল প্রিন্সের স্মৃতিবিজড়িত চত্বর

ফ্রান্সের লিয়ন শহরের ঠিক হৃদপিণ্ডে স্পন্দিত হচ্ছে প্লেস বেলেক্যুর শহরটির অন্যতম আইকনিক এবং প্রাণবন্ত এক উন্মুক্ত প্রান্তর। রোন এবং সোন নদীর মায়াবী জলরাশির ঠিক মাঝখানে, ঐতিহাসিক ‘প্রেসকুইল’ বা উপদ্বীপ অঞ্চলে সগর্বে শায়িত আছে এই সুবিশাল চত্বরটি। এটি কেবল একটি সাধারণ স্থান নয়, বরং লিয়নবাসীর আনন্দ-উচ্ছ্বাস, উৎসবের উন্মাদনা আর মিলনমেলার এক বিশাল ক্যানভাস। পর্যটকদের কাছে এটি এক জাদুকরী গন্তব্য, যেখানে দাঁড়ালেই শহরের প্রাচীন স্থাপত্য, সবুজ পাহাড় আর নদীর অবিরাম বয়ে চলার দৃশ্য এক ফ্রেমে ধরা দেয়। শহুরে কোলাহলের মাঝেও এর দিগন্তজোড়া প্রশস্ত প্রান্তর যেন লিয়নের বুকে এক গভীর, প্রশান্তির নিশ্বাস। 

প্লেস বেলেক্যুর – Image Source:globeetcecilhotel.com

প্লেস বেলেক্যুর হলো ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ ‘বাধাহীন চত্বর’। অর্থাৎ এর বিশাল সীমানার ভেতরে কোনো বড় গাছপালা বা দালানকোঠা নেই, পুরো জায়গাটাই একদম খোলা এবং আকাশমুখী!

৬২,০০০ বর্গমিটার আয়তনের এই সুবিশাল চত্বরটি ফ্রান্সের তৃতীয় বৃহত্তম এবং ইউরোপের বৃহত্তম পথচারী চত্বরগুলোর একটি। এর সবচেয়ে নজরকাড়া বৈশিষ্ট্য হলো এর মেঝে, যা লাল রঙের মাটি বা নুড়িপাথর দিয়ে ঢাকা। দূর থেকে দেখলে বা ওপর থেকে নজর বুলালে পুরো চত্বরটিকে একটি বিশাল লাল গালিচার মতো মনে হয়। এই খোলা প্রান্তরটি লিয়নবাসীদের প্রাত্যহিক হাঁটাচলা, আড্ডা এবং অবসরের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। নাগরিক কোলাহলের মাঝেও এই বিশাল লাল প্রান্তর এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেয়।

এই চত্বরের নজরকাড়া লাল নুড়িপাথরগুলো আশেপাশের কোনো পাহাড় থেকে আসেনি, বরং এগুলো আনা হয়েছে ফ্রান্সের বিউজোলেস নামক বিখ্যাত ওয়াইন উৎপাদনকারী অঞ্চল থেকে।

প্লেস বেলেক্যুরের ঠিক মাঝখানে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে ফ্রান্সের বিখ্যাত রাজা চতুর্দশ লুইয়ের একটি বিশাল ব্রোঞ্জের অশ্বারোহী ভাস্কর্য। ১৮২৫ সালে ফরাসি ভাস্কর ফ্রাঁসোয়া-ফ্রেডেরিক লেমট এই অসাধারণ শিল্পকর্মটি নির্মাণ করেন। ভাস্কর্যটিতে রাজাকে রোমান সম্রাটের পোশাকে, কোনো জিন বা রেকাব ছাড়াই ঘোড়ার পিঠে বীরদর্পে বসে থাকতে দেখা যায়, যা তার বিপুল ক্ষমতা এবং রাজকীয় আভিজাত্যের প্রতীক। এই ভাস্কর্যটি লিয়নের অন্যতম পরিচিত একটি ল্যান্ডমার্ক।

অশ্বারোহী ভাস্কর্য – Image Source:media.francerent.com

লিয়নের স্থানীয়দের মাঝে একটি বহুল প্রচলিত কৌতুক বা মিথ রয়েছে যে, ভাস্কর লেমট ঘোড়ার রেকাব বানাতে ভুলে গিয়েছিলেন এবং এই হতাশা থেকে তিনি নাকি আত্মহত্যা করেছিলেন! যদিও বাস্তবে এটি সম্পূর্ণ ভুল, তিনি স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

প্লেস বেলেক্যুরের ইতিহাস অত্যন্ত ঘটনাবহুল। দ্বাদশ শতাব্দীতে এই পুরো এলাকাটি ছিল মূলত একটি আর্দ্র জলাভূমি। পরবর্তীতে সতেরো শতকে এটিকে একটি রাজকীয় চত্বর হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফরাসি বিপ্লব এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে এই চত্বরটির নামও বহুবার পরিবর্তিত হয়েছে। কখনো এর নাম ছিল ‘প্লেস রয়্যাল’, কখনো ‘প্লেস দে লা ফেডারেশন’, আবার কখনো সম্রাট নেপোলিয়নের সম্মানে ‘প্লেস বোনাপার্ট’। অবশেষে ১৮৫২ সালে এর বর্তমান নাম ‘প্লেস বেলেক্যুর’ স্থায়ী হয়।

১৭৯৩ সালে ফরাসি বিপ্লবের সময় রাজতন্ত্রের প্রতি ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে বিপ্লবীরা চত্বরে থাকা রাজা চতুর্দশ লুইয়ের আদি ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলেছিল এবং সেই ব্রোঞ্জ গলিয়ে যুদ্ধের জন্য কামান তৈরি করেছিল! বর্তমান ভাস্কর্যটি পরবর্তীতে নতুন করে বানানো হয়েছে।

চত্বরের পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে আরেকটি অত্যন্ত বিখ্যাত এবং আবেগপূর্ণ ভাস্কর্য, যা বিশ্ববিখ্যাত ফরাসি লেখক ও বৈমানিক অঁতোয়ান দ্যঁ সেন্ট-এক্সুপেরি এবং তার অমর সৃষ্টি ‘দ্য লিটল প্রিন্স’ বা ছোট রাজকুমারকে উৎসর্গ করে তৈরি। সেন্ট-এক্সুপেরির জন্ম এই লিয়নে, তাই লিয়নবাসীর কাছে তিনি অত্যন্ত গর্বের একটি নাম। ভাস্কর্যটিতে দেখা যায় লেখক একটি কলামের ওপর বসে আছেন এবং তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে সেই রূপকথার প্রিয় ছোট রাজকুমার।

দ্য লিটল প্রিন্স – Image Source:media.lyon-france.com

‘দ্য লিটল প্রিন্স’ বইটি বিশ্বের অন্যতম সর্বাধিক পঠিত এবং অনূদিত বই, যা ২৫০টিরও বেশি ভাষা ও উপভাষায় অনূদিত হয়েছে। লিয়ন শহরের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটির নামকরণও করা হয়েছে এই মহান লেখকের সম্মানার্থে।

লিয়ন শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রধান স্নায়ুকেন্দ্র হলো এই প্লেস বেলেক্যুর। এটি লিয়নের “জিরো পয়েন্ট” হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ লিয়ন থেকে ফ্রান্সের অন্যান্য শহরের দূরত্ব মাপা হয় ঠিক এই চত্বরটি থেকে শুরু করে। এছাড়া, এর ঠিক নিচেই রয়েছে লিয়নের সবচেয়ে বড় এবং ব্যস্ত পাতালরেল বা মেট্রো স্টেশন, যেখানে শহরের প্রধান দুটি মেট্রো লাইন এসে মিলিত হয়েছে, যা প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রীর গন্তব্য।

লিয়ন শহরের বাসিন্দারা যখন একে অপরের সাথে দেখা করার পরিকল্পনা করেন, তখন তাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় বাক্যটি হলো “Meet me under the horse’s tail” অর্থাৎ ঘোড়ার লেজের নিচে দেখা করো! তারা মূলত চতুর্দশ লুইয়ের ঘোড়ার ভাস্কর্যটিকে শহরের সবচেয়ে সহজ ও পরিচিত মিটিং পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করেন।

বর্তমানে প্লেস বেলেক্যুর সারা বছর ধরেই নানা উৎসব, কনসার্ট এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুখর থাকে। শীতকালে এখানে একটি বিশাল নাগরদোলা এবং আইস স্কেটিং রিংক বসানো হয়, যা উৎসবের আমেজকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে বিখ্যাত ‘আলোর উৎসব”-এর সময় এই পুরো চত্বরটি অত্যাধুনিক লাইট শো এবং নান্দনিক শিল্পকর্মের এক বিশাল ক্যানভাসে পরিণত হয়। লিয়ন শহরের আসল প্রাণস্পন্দনকে অনুভব করতে চাইলে প্লেস বেলেক্যুর এক অদ্বিতীয় এবং অপরিহার্য স্থান।

Reference:

Related posts

ব্লু মসজিদ: ইস্তাম্বুলের নীল সৌন্দর্যের প্রতীক

আশা রহমান

কুয়েত টাওয়ার: মরুর মাঝে নীল-সবুজ স্বপ্ন

কুর সলেয়া: নিস শহরের রঙের হাট ও সুগন্ধের মহাকাব্য

আশা রহমান

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More