Image default
তুরষ্কপর্যটন আকর্ষণ

আনিতকাবির: আধুনিক তুরস্কের রূপকারের শেষ ঠিকানা

আনিতকাবির তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অবস্থিত একটি বিশাল ও চমৎকার স্মৃতিসৌধ। এটি আধুনিক তুরস্কের রূপকার এবং প্রথম রাষ্ট্রপতি মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের সমাধিস্থল। তুর্কি ভাষায় ‘আনিতকাবির’ শব্দের অর্থ হলো ‘স্মৃতিস্তম্ভের সমাধি’। দেশ-বিদেশের লাখ লাখ মানুষ প্রতিদিন এই মহান নেতাকে সম্মান জানাতে এখানে আসেন। আধুনিক তুরস্কের ইতিহাসে এই জায়গাটির গুরুত্ব অপরিসীম।

আনিতকাবির – Image Source: en.wikipedia.org

আনিতকাবির নির্মাণের জন্য তুরস্ক সরকার একটি আন্তর্জাতিক নকশা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল। সেখানে প্রায় ৪৯টি নকশা জমা পড়েছিল এবং সেখান থেকে এমিন ওনাত ও ওরহান আরদার দেওয়া নকশাটি জয়ী হয়।

আনিতকাবির স্মৃতিসৌধটি তৈরি করতে অনেক শ্রম ও সময় লেগেছিল। ১৯৪৪ সালে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। পুরো কাজটি নিখুঁতভাবে শেষ হতে প্রায় নয় বছর সময় লাগে। অবশেষে ১৯৫৩ সালে এটি জনসাধারণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হয়। ভবনটির নকশায় প্রাচীন ও আধুনিক স্থাপত্যের এক চমৎকার মিলন দেখা যায়।

এই স্মৃতিসৌধটি নির্মাণ করতে তুরস্কের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চার রকমের ভিন্ন রঙের মার্বেল পাথর আনা হয়েছিল, যা তুরস্কের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে।

আনিতকাবির স্মৃতিসৌধ – Image Source: housearch.com

আনিতকাবিরে ঢোকার মূল রাস্তার নাম ‘আসলানলি ইওল’ বা সিংহের রাস্তা। এই রাস্তাটি হাঁটার জন্য তৈরি এবং এটি প্রায় ২৬২ মিটার লম্বা। রাস্তার দুই পাশে সারি করে মোট ২৪টি সিংহের মূর্তি বসানো আছে। এই মূর্তিগুলো তুরস্কের মানুষের শক্তি, সাহস ও শান্তির প্রতীক। রাস্তাটি এমনভাবে অমসৃণ পাথর দিয়ে তৈরি করা হয়েছে যেন হাঁটার সময় দর্শনার্থীদের মাথা একটু নিচু থাকে। এটি মহান নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটি সূক্ষ্ম উপায়।

সিংহের রাস্তা পার হলেই একটি বিশাল খোলা চত্বর দেখা যায়। একে বলা হয় আনুষ্ঠানিক চত্বর বা ‘সেরিমোনিয়াল প্লাজা’। এই চত্বরটি এতই বড় যে, এখানে একসাথে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ খুব সহজেই দাঁড়াতে পারে। তুরস্কের জাতীয় দিবসগুলোতে এখানে বড় বড় অনুষ্ঠান এবং কুচকাওয়াজ আয়োজন করা হয়। চত্বরের মেঝে সুন্দর রঙিন পাথর দিয়ে জ্যামিতিক নকশায় সাজানো হয়েছে। খোলা আকাশের নিচে এই চত্বরটি দেখতে দারুণ লাগে।

এই বিশাল চত্বরের মেঝের রঙিন পাথরগুলো এমনভাবে বসানো হয়েছে, যা উপর থেকে দেখলে তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী সুন্দর কার্পেটের মতো মনে হয়।

সেরিমোনিয়াল প্লাজা – Image Source: en.wikipedia.org

চত্বরের ঠিক সামনেই রয়েছে মূল সমাধি ভবন, যাকে ‘হল অফ অনার’ বা সম্মাননা কক্ষ বলা হয়। এখানেই মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের প্রতীকী সমাধিটি সবার দেখার জন্য রাখা আছে। এটি একটি বিশাল লাল রঙের মার্বেল পাথরের তৈরি ব্লক, যার ওজন প্রায় ৪০ টন। তবে তাঁর আসল কবরটি এই ভবনের ঠিক নিচে একটি বিশেষ গোপন কক্ষে রয়েছে। সেই কক্ষটি অত্যন্ত সুন্দর এবং পবিত্রভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে।

আতাতুর্কের আসল কবরের চারপাশে তুরস্কের সব কটি প্রদেশ এবং উত্তর সাইপ্রাস থেকে আনা মাটি রাখা আছে, যা পুরো জাতির ঐক্যের প্রতীক।

আনিতকাবিরের চারপাশের বিশাল সবুজ এলাকাকে ‘পিস পার্ক’ বা শান্তি পার্ক বলা হয়। আতাতুর্কের একটি বিখ্যাত উক্তি আছে, “দেশে শান্তি, বিশ্বে শান্তি”। এই কথার উপর ভিত্তি করেই পার্কটি তৈরি করা হয়েছে। এই পার্কে দেশ-বিদেশের নানা জাতের হাজার হাজার গাছপালা রয়েছে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে পুরো এলাকাটি খুবই শান্ত, স্নিগ্ধ এবং কোলাহলমুক্ত। পর্যটকরা এখানে বসে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। এই শান্তি পার্কে বিশ্বের প্রায় ২৫টি দেশ থেকে পাঠানো প্রায় ৫০ হাজার গাছ ও চারা রোপণ করা হয়েছে।

আনিতকাবির পিস পার্ক – Image Source: www.turkeytourorganizer.com

আনিতকাবিরের চত্বরের নিচে একটি বিশাল জাদুঘরও রয়েছে। এর নাম ‘আতাতুর্ক এবং স্বাধীনতা যুদ্ধ জাদুঘর’। এখানে আতাতুর্কের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত জিনিসপত্র, নানা ধরনের পোশাক, মেডেল এবং বই খুব যত্ন করে রাখা আছে। এছাড়া তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধের নানা ইতিহাস ও ছবি এখানে খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। দর্শনার্থীরা এখানে এসে আধুনিক তুরস্কের জন্মের ইতিহাস সম্পর্কে অনেক নতুন কিছু জানতে পারেন।

জাদুঘরের ভেতরে আতাতুর্কের বেশ কয়েকটি মোমের মূর্তি রয়েছে, যেগুলো দেখতে একদম আসল ও জীবন্ত মানুষের মতো মনে হয়।

আনিতকাবির মোমের মূর্তি – Image Source: commons.wikimedia.org

আনিতকাবিরে আরও একটি দারুণ এবং আকর্ষণীয় ব্যাপার হলো প্রহরীদের ডিউটি বদলের দৃশ্য। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে এখানকার প্রহরীরা খুব সুন্দরভাবে মার্চ করে তাদের জায়গা বদল করেন। এই রাজকীয় দৃশ্য দেখতে দর্শনার্থীরা অনেক ভিড় করেন। আনিতকাবির শুধু একটি সমাধি নয়, এটি তুরস্কের স্বাধীনতা, ঐক্য ও সাহসিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। তুরস্ক ভ্রমণে গেলে আঙ্কারা শহরের এই ঐতিহাসিক জায়গাটি সবারই দেখা উচিত।

Reference:

 

Related posts

প্লেস মাসেনা: নিস শহরের রঙিন হৃদপিণ্ড ও স্থাপত্যের বিস্ময়

ইস্তাম্বুল: দুই মহাদেশের মিলনস্থল

কুয়েতের অদ্ভুত সুন্দর ‘মিরর হাউস’ ও এক ইতালীয় শিল্পীর গল্প

আশা রহমান

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More