ফ্রান্সের লিয়ন শহরের ঠিক সর্বদক্ষিণে, যেখানে প্রাচীন ইতিহাসের সীমানা পেরিয়ে আধুনিকতার শুরু, ঠিক সেখানেই দিগন্ত ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে একবিংশ শতাব্দীর এক জাদুকরী স্থাপত্য মিউজিয়াম অফ কনফ্লুয়েন্সেস। প্রাচীন লিয়নের রেনেসাঁস আর ধ্রুপদী ইমারতগুলোর বিপরীতে এই অত্যাধুনিক, ভবিষ্যৎবাদী কাঠামোটি যেন সময়ের সীমানা পেরিয়ে আসা এক পরম বিস্ময়। এটি নিছক কোনো জাদুঘর নয়, বরং বিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান এবং মানব সভ্যতার আদিম ইতিহাসের এক বিশাল ও জীবন্ত মহাকাব্য। খুব অল্প সময়েই আধুনিক লিয়নের এই নতুন মুকুট বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের মুগ্ধ করেছে এবং প্রাচীন শহরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ক্যানভাসে এঁকে দিয়েছে এক অনন্য ও শ্বাসরুদ্ধকর নতুন মাত্রা।

মিউজিয়ামটির নাম ‘কনফ্লুয়েন্সেস’ রাখার পেছনের কারণ হলো এর ভৌগোলিক অবস্থান। এটি লিয়নের বিখ্যাত রোন এবং সোন নদীর ঠিক মিলনস্থলে অবস্থিত।
মিউজিয়াম অফ কনফ্লুয়েন্সেস-এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর চমকপ্রদ এবং অদ্ভুত স্থাপত্যশৈলী। ভবনটির মূলত দুটি প্রধান অংশ রয়েছে একটি হলো ‘ক্রিস্টাল’ যা কাচ এবং স্টিলের তৈরি এবং এটি আলো ও দর্শনার্থীদের প্রবেশের পথ হিসেবে কাজ করে; অন্যটি হলো ‘ক্লাউড’ যা স্টেইনলেস স্টিল দিয়ে মোড়ানো এবং যেখানে মূল প্রদর্শনীগুলো রাখা হয়েছে। এর বাইরের রূপ দেখে মনে হয় যেন ভিনগ্রহের কোনো মহাকাশযান নদীর তীরে অবতরণ করেছে!
স্থানীয় লিয়নবাসীরা এর অদ্ভুত এবং অতিকায় ধাতব মেঘের মতো আকৃতির কারণে একে আদর করে ‘দ্য ক্রিস্টাল ক্লাউড’ বা স্ফটিক মেঘ বলে ডাকে।
ভবনটির নির্মাণ কাজ মোটেও সহজ ছিল না। এটি লিয়নের যে উপদ্বীপে নির্মিত হয়েছে, নদীর মোহনা হওয়ায় সেখানকার মাটি ছিল বেশ নরম এবং পলিযুক্ত। এরকম একটি বিশাল এবং ভারী ধাতব স্থাপনাকে নরম মাটির ওপর দাঁড় করিয়ে রাখা ছিল প্রকৌশলীদের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ সময় ধরে এর ভিত্তিকে মজবুত করার কাজ চলে এবং বেশ কয়েকবার এর নকশা ও বাজেট পরিবর্তন করতে হয়। ২০০১ সালে এর পরিকল্পনা শুরু হলেও, নানা বাধা ও জটিলতা কাটিয়ে এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয় ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে।
নরম মাটির ওপর এই সুবিশাল এবং ভারী কাঠামোটিকে সুরক্ষিতভাবে দাঁড় করিয়ে রাখার জন্য মাটির অনেক গভীরে প্রায় ৫০০টিরও বেশি বিশাল কংক্রিটের পিলার বা খুঁটি পোঁতা হয়েছিল!

মিউজিয়াম অফ কনফ্লুয়েন্সেস গতানুগতিক কোনো শিল্প বা ইতিহাসের জাদুঘর নয়, বরং এটি মানব জীবনের উৎপত্তি এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের রহস্য নিয়ে কথা বলে। এর প্রদর্শনীগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যা দর্শকদের মহাবিশ্বের সৃষ্টি থেকে শুরু করে মানুষের বিবর্তন পর্যন্ত এক দীর্ঘ যাত্রায় নিয়ে যায়। এখানে প্রাচীন জীবাশ্ম, উল্কাপিণ্ড থেকে শুরু করে নানা প্রাণী ও উদ্ভিদের বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। বিজ্ঞান, ইতিহাস এবং দর্শনের এক চমৎকার মেলবন্ধন ঘটানো হয়েছে এর প্রতিটি সুবিশাল গ্যালারিতে।
এই মিউজিয়ামের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো একটি ১৫৫ মিলিয়ন বছরের পুরনো ডাইনোসরের কঙ্কাল, যা প্রায় সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল এবং এর কঙ্কালটি প্রায় ৮৪% আসল হাড় দিয়ে গঠিত!

জাদুঘরটিতে মূলত চারটি স্থায়ী প্রদর্শনী রয়েছে। এগুলো হলো ‘অরিজিনস’ বা মহাবিশ্ব ও প্রাণের সৃষ্টি, ‘স্পিসিস’ বা প্রাণীজগতের বিবর্তন ও মানুষের সাথে তাদের সম্পর্ক, ‘সোসাইটিজ’ বা মানব সভ্যতার বিকাশ ও সমাজ ব্যবস্থা, এবং ‘ইটারনিটিজ’ বা মৃত্যু ও পরকালের ধারণা। প্রতিটি প্রদর্শনী অত্যন্ত ইন্টারঅ্যাকটিভ এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সাজানো হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা, বিশেষ করে শিশুরা খুব সহজেই জটিল বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক বিষয়গুলো বুঝতে পারে।
‘ইটারনিটিজ’ গ্যালারিতে মিশরীয় আসল মমি থেকে শুরু করে পেরুর প্রাচীন মমি এবং বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও পরকাল নিয়ে মানুষের প্রাচীন বিশ্বাসের এক শিহরণ জাগানো সংগ্রহ রয়েছে।
জাদুঘর ভবনের ভেতরটা যেমন জ্ঞান ও বিজ্ঞানের এক বিশাল ভাণ্ডার, তেমনি এর বাইরের অংশটাও এক চমৎকার উন্মুক্ত স্থান। ভবনের ঠিক নিচে একটি বিশাল পাবলিক পার্ক এবং বাগান রয়েছে, যেখানে মানুষ অবসরে সময় কাটাতে পারে। এই বাগানের একেবারে শেষ প্রান্তে গেলে দেখা যায় সেই বিখ্যাত বিন্দুটি, যেখানে রোন এবং সোন নদী এসে মিশেছে। প্রকৃতির এই অপূর্ব মিলনস্থলটি লিয়নের অন্যতম শান্ত এবং সুন্দর একটি জায়গা হিসেবে পরিচিত। নদীর হিমশীতল বাতাস এবং চমৎকার ল্যান্ডস্কেপ পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
জাদুঘরের ছাদের ওপর একটি চমৎকার প্যানোরামিক টেরেস রয়েছে। সেখান থেকে পরিষ্কার দেখা যায় কীভাবে সোন নদীর শান্ত সবুজ জলরাশি রোন নদীর খরস্রোতা নীল জলের সাথে মিশে এক হয়ে যাচ্ছে!

মিউজিয়াম অফ কনফ্লুয়েন্সেস শুধুমাত্র প্রাচীন ইতিহাস সংরক্ষণ করে না, বরং আধুনিক প্রযুক্তি এবং স্থাপত্যের মাধ্যমে ভবিষ্যতের দিকেও নির্দেশ করে। নির্মাণের সময় অতিরিক্ত বাজেট (প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ইউরো) এবং সময়ক্ষেপণের কারণে এটি নিয়ে অনেক সমালোচনা হলেও, উদ্বোধনের পর এটি লিয়নের অন্যতম সফল পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়। জ্ঞানপিপাসু মানুষ এবং আধুনিক স্থাপত্যপ্রেমীদের জন্য এটি এক অবশ্য গন্তব্য।
সমস্ত সমালোচনা ও বিতর্ককে পেছনে ফেলে উদ্বোধনের মাত্র এক বছরের মধ্যেই এই জাদুঘরটি প্রায় দশ লক্ষেরও বেশি দর্শনার্থী আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়, যা ফ্রান্সে সাম্প্রতিককালের অন্যতম সফল মিউজিয়াম উদ্বোধনের রেকর্ড!
Reference:
- https://en.wikipedia.org/wiki/Mus%C3%A9e_des_Confluences
- https://museedesconfluences.fr/en/welcome-museum
- https://www.tripadvisor.com/Attraction_Review-g187265-d7360243-Reviews-Musee_Des_Confluences-Lyon_Rhone_Auvergne_Rhone_Alpes.html
- https://www.expedia.com/Musee-Des-Confluences-La-Presquile.d553248621573985828.Vacation-Attraction
- https://en.visiterlyon.com/discover/heritage-unesco/contemporary/musee-des-confluences
- https://artsandculture.google.com/partner/mus%C3%A9e-des-confluences

