এক বাটি রামেনেই পেট ভড়লে বাকি দোকানগুলোর কী হবে? পেটুকদের এই মহা-সংকট কাটাতে মিউজিয়ামে আছে কিউট সাইজের ‘মিনি রামেন’, যাতে এক লাইনেই ৩-৪ বাটি সাবাড় করে আপনি ডায়েটের বারোটা বাজাতে পারেন!
আপনি কি ভাবছেন এটা আর দশটা বোরিং জাদুঘরের মতো, যেখানে শুধু কাচের ওপারে জিনিসপত্র দেখতে হয়? একদমই না! এটা হলো দুনিয়ার প্রথম রামেন স্বর্গ বা ফুড থিম পার্ক, যেখানে পা রাখলেই আপনি ১৯৫৮ সালের টোকিও শহরে টাইম ট্রাভেল করবেন। চলুন ঘুরে আসি এক বাটি ধোঁয়া ওঠা গরম সুপ আর নুডলসের স্বর্গরাজ্য শিন-ইয়োকোহামা রামেন মিউজিয়াম থেকে!

শিন-ইয়োকোহামা রামেন মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল জাপানের বিভিন্ন অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় রামেন সংস্কৃতিকে এক ছাদের নিচে আনা এবং এর ইতিহাসকে সংরক্ষণ করা। রামেন মূলত চীন থেকে জাপানে এসেছিল, কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে জাপানিরা এটিকে সম্পূর্ণ নিজেদের মতো করে রূপান্তর করে।
রামেন কেবল একটি সস্তা খাবার নয়, এটি যুদ্ধোত্তর জাপানের অর্থনৈতিক পুনরুত্থান এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই এই খাবারের বিবর্তনকে উদযাপন করতে এবং জাপানের দূর-দূরান্তের বিখ্যাত সব রামেন শপগুলোকে টোকিওর কাছাকাছি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতেই এই মিউজিয়ামটি তৈরি করা হয়। গত তিন দশকে এটি দেশী-বিদেশী কোটি কোটি পর্যটকের অন্যতম প্রিয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।

শিন-ইয়োকোহামা রামেন মিউজিয়ামের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর প্রবেশদ্বার পার হওয়ার পরের দৃশ্যপট। মিউজিয়ামটির আন্ডারগ্রাউন্ড বা ভূগর্ভস্থ অংশটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যা আপনাকে এক পলকেই নিয়ে যাবে ১৯৫৮ সালের জাপানে।
১৯৫৮ সালটি জাপানি রামেনের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। এই বছরেই জাপানের বিখ্যাত ব্যবসায়ী মোমোফুকু আন্দো বিশ্বের প্রথম ইনস্ট্যান্ট রামেন আবিষ্কার করেছিলেন, যা বিশ্বজুড়ে খাদ্য বিপ্লব ঘটিয়েছিল।
মিউজিয়ামের ভেতরে পা রাখতেই আপনার মনে হবে আপনি কোনো সায়েন্স ফিকশন সিনেমার মতো টাইম ট্রাভেল করে অতীতে চলে গেছেন। এখানকার কৃত্রিম আকাশ সবসময় গোধূলি বা সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে ঘেরা থাকে। চারপাশের সরু গলি, কাঠের তৈরি পুরনো বাড়ি, চিলিং সিনেমা হলের পোস্টার, পুরনো ধাঁচের টেলিফোন বুথ, সাইকেল এবং ধোঁয়া ওঠা রামেনের দোকানগুলো ১৯৫৮ সালের টোকিওর এক নিখুঁত পরিবেশ তৈরি করে। এই নস্টালজিক আবহাওয়া দর্শনার্থীদের মাঝে এক জাদুকরী অনুভূতির সৃষ্টি করে।

শিন-ইয়োকোহামা রামেন মিউজিয়ামটি মূলত তিনটি প্রধান স্তরে বা তলায় বিভক্ত। নিচ তলায় প্রবেশ করতেই আপনি রামেনের উৎপত্তি ও বিবর্তনের এক বিস্তারিত গ্যালারি দেখতে পাবেন। চীনের ‘লামিয়ান’ কীভাবে জাপানের ‘রামেন’ হয়ে উঠল, তা বিভিন্ন ছবি, দেয়ালচিত্র এবং থ্রি-ডি মডেলের মাধ্যমে প্রদর্শন করা হয়েছে। এছাড়া রামেন তৈরির বিভিন্ন প্রাচীন ও আধুনিক পাত্র এখানে সুন্দরভাবে সাজানো রয়েছে। এই তলাতেই রয়েছে একটি বিশাল গিফট শপ, যেখান থেকে দর্শনার্থীরা রামেন তৈরির সরঞ্জাম, বিশেষ বাটি এবং স্মারক উপহার কিনতে পারেন।
প্রকৃত জাদু শুরু হয় থম ও দ্বিতীয় ভূগর্ভস্থ তলাগুলোতে। ১৯৫৮ সালের নস্টালজিক টোকিও শহরের আদলে তৈরি এই অংশে রয়েছে জাপানের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বেছে নেওয়া ৫ থেকে ৯টি বিখ্যাত রামেন দোকান । এই দোকানগুলো কিন্তু স্থায়ী নয়; মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ নিয়মিত বিরতিতে বিভিন্ন অঞ্চলের সেরা সেরা এবং ঐতিহ্যবাহী দোকানগুলোকে এখানে আমন্ত্রণ জানায়, যাতে দর্শনার্থীরা প্রতিবার এসে নতুন নতুন স্বাদ পেতে পারেন। এখানে হোক্কাইডোর বরফশীতল অঞ্চলের রিচ ‘মিসো রামেন’ থেকে শুরু করে কিউশুর বিখ্যাত থিক ‘তোনকোতসু রামেন’সবই পাওয়া যায়।

দর্শনার্থীদের জন্য কিছু জরুরি তথ্য
- এটি জেআর শিন-ইয়োকোহামা স্টেশন থেকে মাত্র ৫ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে অবস্থিত। টোকিও স্টেশন থেকে শিনকানসেন বা লোকাল ট্রেনে এখানে আসতে মাত্র ৩০-৪৫ মিনিট সময় লাগে।
- মিউজিয়ামে প্রবেশের জন্য একটি সামান্য প্রবেশমূল্য দিতে হয় (প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রায় ৪০০-৫০০ ইয়েন)। তবে মনে রাখবেন, ভেতরের রামেন কেনার জন্য প্রতিটি দোকানের বাইরে থাকা ভেন্ডিং মেশিন থেকে আলাদা টিকিট কাটতে হয়।
- ছুটির দিনে এবং দুপুরের খাবারের সময় এখানে প্রচণ্ড ভিড় হয়। একেকটি রামেন দোকানের সামনে ৩০ থেকে ১ ঘণ্টার লাইন পড়ে যেতে পারে। তাই শান্তিতে ঘুরতে চাইলে সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে বিকালের দিকে যাওয়া সবচেয়ে ভালো
Reference:

