টাইগ্রিস নদীর তীরে অবস্থিত বাগদাদী মিউজিয়াম একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী জাদুঘর। ১৯৭০ সালের দিকে এই ঐতিহ্যবাহী জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই জাদুঘরটিতে বাগদাদের সাধারণ মানুষের পুরোনো দিনের জীবনযাত্রা তুলে ধরা হয়েছে। প্রাচীন বাগদাদী সংস্কৃতি, পোশাক, উৎসব এবং মানুষের রীতিনীতিকে জীবন্তভাবে দেখার জন্য এটি এক দারুণ জায়গা। বাগদাদ শহরের পুরোনো ঐতিহ্যের সাথে নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দিতে এই জাদুঘরটি বড় ভূমিকা রাখছে।

বাগদাদী মিউজিয়ামটি যে ভবনে তৈরি করা হয়েছে, সেটি নিজেও একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। এটি টাইগ্রিস নদীর ঠিক পাশেই একটি প্রাচীন ভবনে অবস্থিত। একসময় এটি উসমানীয় সাম্রাজ্যের আমলে প্রশাসনিক কাজ বা বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। প্রাচীন বাগদাদী স্থাপত্যের নকশায় এই জাদুঘরটি তৈরি। ভবনের ভেতরের খোলা আঙিনা ও প্রাচীন ইট দিয়ে তৈরি দেয়ালগুলো মানুষকে শত বছর আগের বাগদাদ শহরে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
জাদুঘরের ভবনটির নকশা প্রাচীন উসমানীয় স্থাপত্যশৈলী মেনে তৈরি করা হয়েছে, যাতে প্রাকৃতিকভাবে আলো- বাতাস চলাচল করতে পারে এবং ভেতরে ঠান্ডা থাকে।
জাদুঘরটির ভেতরে ঢুকলেই মনে হবে আপনি সময় ভ্রমণ বা টাইম ট্রাভেল করে বহু বছর পেছনের বাগদাদে চলে গেছেন। এখানে পুরোনো আমলের নানা পেশার মানুষের কাজের দৃশ্য মোমের পুতুলের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। যেমন- দর্জিদের কাপড় সেলাই, তামার পাত্র তৈরি, রুটি বানানোর দৃশ্য এবং বাজারে কেনাকাটার চমৎকার চিত্র প্রদর্শন করা হয়েছে। প্রতিটি প্রদর্শনীতে ছোট ছোট খণ্ডচিত্র নিখুঁতভাবে তৈরি।

এই জাদুঘরটিতে বাগদাদের পুরোনো জীবনের শত শত বাস্তব আকারের মোমের ও মাটির পুতুল দিয়ে সাজানো নানা দৃশ্য তৈরি করা আছে, যা দেখলে মনে হয় যেন মানুষগুলো সত্যি বেঁচে আছে!
বাগদাদী মিউজিয়ামে অতীতকালের বাগদাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের এক বিশাল সংগ্রহ আছে। প্রাচীনকালে বাগদাদের পুরুষ ও নারীরা কী ধরণের পোশাক পরতেন, তা এখানে সরাসরি দেখা যায়। নারীদের রেশমি ও সুতি কাপড়ের তৈরি নানারকম উজ্জ্বল রঙের গাউন এবং বিশেষ ওড়না পরানো আছে। পুরুষদের পরনে তৎকালীন জনপ্রিয় আবায়া ও পাগড়ি রয়েছে। এসব পোশাকের মাধ্যমে তখনকার সামাজিক জীবনের এক সুন্দর ছবি ফুটে ওঠে।
পুরোনো বাগদাদের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল ‘কাহওয়া’ বা চা-খানা। জাদুঘরে অতীতকালের জনপ্রিয় চা-খানার দৃশ্য খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সেখানে কয়েকজন বৃদ্ধ মোমের মানুষ গোল হয়ে বসে ঐতিহ্যবাহী চা বা কফি খাচ্ছেন এবং তাস বা দাবা খেলছেন। তৎকালীন বাগদাদে কীভাবে মানুষ সারাদিনের কাজ শেষে আড্ডা দিত, তার এক জীবন্ত রূপ দেখা যায় এই প্রদর্শনীতে।
বাগদাদী চা-খানায় চা পরিবেশন করার জন্য ছোট বিশেষ কাঁচের কাপ ব্যবহার করা হতো, যার নাম ‘ইস্তিকান’। আজও বাগদাদে এই কাপে চা খাওয়া খুব জনপ্রিয়।

বাগদাদ শহরটি তামা, ব্রোঞ্জ ও সোনা-রুপার হস্তশিল্পের জন্য অনেক বিখ্যাত ছিল। এই জাদুঘরে প্রাচীন তামার কারিগররা কীভাবে হাতে পিটিয়ে নানারকম পাত্র, মগ ও থালা বাসন তৈরি করতেন, তা দেখানো হয়েছে। সেখানে কারিগরের হাতের কাজের সরঞ্জাম ও চুল্লি নিখুঁতভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। প্রাচীন বাগদাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল এই হস্তশিল্প, যা জাদুঘরটি চমৎকারভাবে ধরে রেখেছে।
সংগীত ও কবিতা বাগদাদী জীবনের খুব প্রিয় বিষয় ছিল। জাদুঘরে প্রাচীন ইরাকি সংগীতাশিল্পীদের গান গাওয়ার দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সেখানে উদ, কানুন ও সানতুর-এর মতো প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র বাজানোর ভঙ্গিতে পুতুল সাজানো আছে। বাগদাদে আগে যেকোনো মেলা বা পারিবারিক উৎসবে কীভাবে গানের আসর বসত, তা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
এই জাদুঘরে প্রদর্শিত সংগীতের দৃশ্যগুলোর সাথে সত্যি সত্যি ব্যাকগ্রাউন্ডে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ইরাকি ‘মাকাম’ সুরের হালকা গান বাজানো হয়।
বাগদাদের মানুষ কীভাবে বিয়ে ও বিভিন্ন উৎসব উদযাপন করত, তার পুরো দৃশ্য জাদুঘরে আলাদাভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কনের হাতে মেহেদি লাগানোর দৃশ্য, গায়ে হলুদের প্রস্তুতি এবং বরের বন্ধুদের নাচের উৎসব খুব সুন্দরভাবে মোমের পুতুলের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বিয়েতে তৎকালীন উপহার ও রান্নাবান্নার সরঞ্জামও এখানে সুন্দর করে সাজানো আছে।
প্রাচীন বাগদাদী বিয়েতে কনের জন্য বিশেষ নকশা করা কাঠের বিশাল সিন্দুক বা বাক্সে জামাকাপড় ও গহনা দেওয়া হতো, যা এখানে সশরীরে দেখা যায়।
বাগদাদের প্রাচীন খাবারের ঐতিহ্য ও রান্নাবান্নার ধরণ এখানে প্রদর্শিত হয়েছে। মাটির চুলা, কাঠের তৈরি হাঁড়ি-পাতিল এবং নারীদের রুটি বানানোর দৃশ্য মানুষকে অতীতের ঘরোয়া জীবনের স্বাদ দেয়। নদী থেকে পাওয়া বিখ্যাত ‘সমক মসগুফ’ (এক ধরণের পোড়া মাছ) কীভাবে তৈরি করা হতো, তাও দেখানো হয়েছে। এটি তৎকালীন পরিবারের খাবার টেবিলের চিত্র তৈরি করে।

বাগদাদের জাতীয় খাবার ‘মসগুফ’ মাছ প্রস্তুত করার প্রাচীন যে পদ্ধতি তা একদম সত্যি কাঠের আগুনের দৃশ্যসহ প্রদর্শনীতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
বাগদাদী মিউজিয়াম একটি গবেষণা কেন্দ্রও বটে। এখানে একটি সুন্দর লাইব্রেরি ও তথ্যকেন্দ্র আছে। ঐতিহাসিক, লেখক ও শিক্ষার্থীরা পুরোনো বাগদাদের পোশাক, রীতিনীতি ও লোকসংবাদ সম্পর্কে জানতে এখানে আসেন। ছবি তোলা ও ইতিহাস জানার জন্য স্থানীয় স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রায়ই এই জাদুঘরে শিক্ষা সফরে আসেন।
বর্তমানে বাগদাদী মিউজিয়াম ইরাকের পর্যটন শিল্পের অন্যতম বড় আকর্ষণ। যুদ্ধের সময় কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পরবর্তীকালে স্থানীয় সরকার ও সাধারণ মানুষের সহায়তায় এটি পুনরায় সুন্দর করে সাজানো হয়। বিদেশে বসবাসকারী ইরাকিরা বাগদাদে ফিরে এই জাদুঘরটি ঘুরে নিজেদের পুরোনো দিনের অনুভূতি ফিরে পান।
Reference:

