Image default
ক্রীড়াবিদজীবনীফুটবল

এডসন আলভারেজ: ঘরের মাঠে বিশ্বকাপের বাঘ

২০১৯ সালে ডাচ ক্লাব আয়াক্স যখন এডসন আলভারেজকে দলে ভেড়ায়, তখন একটি নতুন ইতিহাস তৈরি হয়। আয়াক্সের ১১৯ বছরের সুদীর্ঘ ইতিহাসে তিনিই ছিলেন প্রথম মেক্সিকান ফুটবলার। 

মেক্সিকান ফুটবলের হৃদস্পন্দন এবং মাঝমাঠের অতন্দ্র প্রহরী এডসন আলভারেজ। ভক্তদের কাছে যিনি ‘এল মাচিন’ বা ‘দ্য মেশিন’ নামে পরিচিত। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেডের হয়ে খেলা এই তারকা শুধু একজন রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডারই নন, তিনি মাঠে মেক্সিকানদের অদম্য লড়াইয়ের প্রতীক। প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখে দেওয়া থেকে শুরু করে রক্ষণের সামনে মানব দেয়াল হয়ে দাঁড়ানো সবখানেই আলভারেজ এক আস্থার নাম। 

এডসন আলভারেজ-এর ব্যক্তিগত তথ্য:

নাম

এডসন ওমার আলভারেজ ভেলাস্কেজ

জন্ম

২৪ অক্টোবর ১৯৯৭ (বয়স ২৮)

জন্মস্থান

ত্লালনেপান্তলা , মেক্সিকো

উচ্চতা

১.৮৭ মিটার (৬ ফুট ২ ইঞ্চি)

পজিশন

এটাকিং মিডফিল্ডার / সেন্টার-ব্যাক

ক্লাব ক্যারিয়ার

আমেরিকা,আয়াক্স,ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেড এবং বর্তমানে ফেনারবাহচে এসকে ক্লাবের হয়ে খেলছেন।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

২০১৭– মেক্সিকো

এডসন আলভারেজ– Image Source: en.wikipedia.org

এডসন ওমার আলভারেজ ভেলাস্কেজ ১৯৯৭ সালের ২৪ অক্টোবর মেক্সিকোর স্টেট অফ মেক্সিকোর ‘তলালনেপান্তলা দে বাজ’ নামক একটি মধ্যবিত্ত এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব আর দশটা মেক্সিকান শিশুর মতোই ফুটবলের প্রতি তীব্র ভালোবাসায় ঘেরা ছিল।

তার পরিবার ফুটবলের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। তাদের একটি ছোট পারিবারিক ব্যবসা ছিল, যেখানে তারা স্থানীয় ফুটবল দলগুলোর জন্য জার্সি বা কিট তৈরি করতেন। এডসনের বাবা আদ্রিয়ানা ভেলাস্কেজ এবং মা এডসন ওমার সিনিয়র দুজনেই ছেলেকে ফুটবলের প্রতি উৎসাহিত করতেন। 

১৪ বছর বয়সে এডসন আলভারেজ মেক্সিকোর অন্যতম সফল এবং জনপ্রিয় ক্লাব সিডি আমেরিকার যুব অ্যাকাডেমিতে ট্রায়াল দেন। কিন্তু ক্লাবের অ্যাকাডেমি তার বাসা থেকে বেশ দূরে ছিল। প্রতিদিন অনুশীলনে যাওয়ার জন্য এডসনকে প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা গণপরিবহনে ভ্রমণ করতে হতো। অনেক সময় যাতায়াত খরচের টাকা জোগাতেও তার পরিবারকে হিমশিম খেতে হতো। কিন্তু ফুটবলের প্রতি তীব্র জেদ এবং পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থন তাকে থামতে দেয়নি। যুব দলেই তিনি তার কঠোর পরিশ্রমী স্বভাবের কারণে কোচদের নজর কাড়েন এবং সেখান থেকেই তার ডাকনাম হয়ে যায় ‘এল মাচিন’, যা মাঠে তার অক্লান্ত পরিশ্রমের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

যুব দলের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ২০১৬ সালে এডসন আলভারেজের জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগটি আসে। ক্লাবের তৎকালীন কোচ রিকার্দো লা ভোল্পে মাত্র ১৮ বছর বয়সী এই তরুণকে মূল দলে সুযোগ দেন। ২০১৬ সালের অক্টোবরে সান্তোস লাগুনার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ক্লাব আমেরিকার হয়ে তার পেশাদার অভিষেক ঘটে।

ক্লাব আমেরিকার হয়ে এডসন আলভারেজের অভিষেক ম্যাচ– Image Source: nytimes.com

ক্লাব আমেরিকার হয়ে এডসন আলভারেজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত আসে ২০১৮ সালের আপারতুরা ফাইনালে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রুজ আজুলের বিপক্ষে ফাইনালের দ্বিতীয় লেগে এডসন এক অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স উপহার দেন। মূলত একজন রক্ষণাত্মক খেলোয়াড় হওয়া সত্ত্বেও সেই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে তিনি জোড়া গোল করেন। তার এই জাদুকরী পারফরম্যান্সে ভর করে ক্লাব আমেরিকা ২-০ গোলে ম্যাচ জিতে লিগা এমএক্স চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। এই ম্যাচটি এডসনকে রাতারাতি মেক্সিকান ফুটবলের পোস্টার বয়ে পরিণত করে এবং ইউরোপের বড় বড় ক্লাবের স্কাউটদের নজর তার দিকে পড়ে।

২০১৯ সালের জুলাই মাসে মেক্সিকান ফুটবল ভক্তদের আনন্দ দিয়ে এডসন আলভারেজ ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী এবং প্রতিভাবান ফুটবলার তৈরির কারখানা খ্যাত ডাচ ক্লাব আয়াক্স-এ যোগ দেন। এডসনকে প্রায় ১৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে দলে ভেড়ায়। আইয়াক্সের ইতিহাসে তিনিই ছিলেন প্রথম মেক্সিকান খেলোয়াড়।

ইউরোপের ফুটবলের ধরন মেক্সিকোর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আয়াক্সের বিখ্যাত ‘টোটাল ফুটবল’ এবং দ্রুত পাসিং শৈলীর সাথে খাপ খাইয়ে নিতে এডসনের প্রথম মৌসুমটা বেশ কঠিন ছিল। তৎকালীন ডাচ মিডিয়া এবং অনেক বিশ্লেষক তার পাসিং দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। একই সাথে নতুন দেশ, নতুন ভাষা এবং করোনা মহামারীর কারণে পরিবার থেকে দূরে থাকা তাকে মানসিকভাবে কিছুটা পিছিয়ে দিয়েছিল।

কোচ এরিক টেন হাগ এডসনের ভেতরের লড়াকু মানসিকতা বুঝতে পারেন। টেন হাগ তাকে সেন্ট্রাল ডিফেন্স থেকে সরিয়ে পাকাপাকিভাবে রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার হিসেবে খেলাতে শুরু করেন।

এডসন আলভারেজ আয়াক্সের মাঝমাঠের অবিচ্ছেদ্য অংশ-– Image Source: allaboutajax.com

২০২০-২১ মৌসুম থেকে এডসন আলভারেজ আয়াক্সের মাঝমাঠের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হন। রায়ান গ্রাভেনবার্ক এবং ডেভি ক্লাসেনদের মতো আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডারদের পেছনে থেকে তিনি পুরো ডিফেন্সকে সুরক্ষা দিতেন। প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখে দেওয়া, ট্যাকল করা এবং ইন্টারসেপশনে তিনি ডাচ লিগের সেরাদের একজন হয়ে ওঠেন।

আয়াক্সের হয়ে তিনি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগেও নিয়মিত খেলেন এবং ইউরোপের অন্যতম সেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে নিজের নাম প্রতিষ্ঠিত করেন। ডাচ জায়ান্টদের হয়ে তিনি সব মিলিয়ে 

২০২৩ সালের আগস্ট মাসে এডসন আলভারেজের ক্যারিয়ারে আরও একটি বড় লাফ আসে। প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেড তাদের দীর্ঘদিনের অধিনায়ক এবং তারকা মিডফিল্ডার ডেকলান রাইসকে আর্সেনালের কাছে বিক্রি করার পর, তার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে এডসনকে বেছে নেয়। প্রায় ৩৮ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে পাঁচ বছরের চুক্তিতে লন্ডনে পাড়ি জমান এই মেক্সিকান তারকা।

বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন এবং শারীরিক শক্তিনির্ভর লিগ হিসেবে পরিচিত ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ। অনেকেই ভেবেছিলেন ডেকলান রাইসের মতো ইংলিশ তারকার অভাব পূরণ করা আলভারেজের জন্য অসম্ভব হবে। কিন্তু লন্ডনের ক্লাবটির জার্সি গায়ে প্রথম ম্যাচ থেকেই এডসন ভক্তদের মন জয় করে নেন।

ওয়েস্ট হ্যামের তৎকালীন কোচ ডেভিড ময়েসের রক্ষণাত্মক ও কাউন্টার-অ্যাটাকিং কৌশলে এডসন ছিলেন পারফেক্ট ফিট। মাঠের প্রতিটি কোনায় ছুটে বেড়ানো, প্রতিপক্ষের আক্রমণভাগের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়া এবং রক্ষণের চার ব্যাকের সামনে ‘হিউম্যান শিল্ড’ বা মানব দেয়াল হিসেবে দাঁড়িয়ে যাওয়া সবকিছুতেই তিনি দারুণ দক্ষতা দেখান। ওয়েস্ট হ্যাম ভক্তরা তাকে ভালোবেসে মাঠের নতুন ‘জেনারেল’ হিসেবে উপাধি দেয়। ইউরোপা লিগ এবং প্রিমিয়ার লিগে ওয়েস্ট হ্যামের বড় বড় জয়ে তার অবদান ছিল চোখে পড়ার মতো।

জাতীয় দলের জার্সিতে এডসন আলভারেজের যাত্রা শুরু হয় ২০১৭ সালে, মাত্র ১৯ বছর বয়সে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে। এরপর থেকে তিনি মেক্সিকো জাতীয় দলের রক্ষণভাগ ও মাঝমাঠের অন্যতম প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়েছেন।

জাতীয় দলের জার্সিতে এডসন আলভারেজ– Image Source: latintimes.com

মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের মেক্সিকো স্কোয়াডে ডাক পান। জার্মানির বিপক্ষে মেক্সিকোর ঐতিহাসিক ১-০ গোলের জয়ের ম্যাচে তিনি বদলি হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে তার বিশ্বকাপে মূল একাদশে অভিষেক হয়। সুইডেনের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে দুর্ভাগ্যবশত একটি আত্মঘাতী গোল করে বসলেও, পুরো টুর্নামেন্টে তার পারফরম্যান্স প্রশংসিত হয়েছিল।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে এডসন আলভারেজ ছিলেন মেক্সিকোর মাঝমাঠের প্রধান চালিকাশক্তি। পোল্যান্ড এবং সৌদি আরবের বিপক্ষে ম্যাচে তিনি দুর্দান্ত খেলেন। যদিও মেক্সিকো গোল ব্যবধানের কারণে সেবার গ্রুপ পর্ব থেকেই অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিদায় নেয়, তবে এডসনের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ছিল বিশ্বমানের।

জাতীয় দলের হয়ে এডসনের সবচেয়ে বড় ট্রফি জয় আসে ২০১৯ এবং ২০২৩ সালের কনকাকাফ গোল্ড কাপে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের গোল্ড কাপে তিনি পুরো টুর্নামেন্টে অসাধারণ নেতৃত্ব দেন এবং ফাইনালে পানামাকে হারিয়ে মেক্সিকোকে চ্যাম্পিয়ন করতে বড় ভূমিকা রাখেন। বর্তমানে আন্দ্রেস গুয়ারদাদো এবং গিয়ের্মো ওচোয়ার মতো সিনিয়রদের পর এডসন আলভারেজকেই মেক্সিকো দলের ভবিষ্যৎ স্থায়ী অধিনায়ক এবং নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

২০২৬ বিশ্বকাপে মেক্সিকোর যদি কোনো ‘মেশিন’ থাকে যা পুরো দলকে সচল রাখবে, তবে সেই মেশিনের নাম এডসন আলভারেজ। মেক্সিকান ভক্তরা প্রার্থনা করছেন, এই ‘এল মাচিন’ যেন আজ থেকে শুরু হওয়া এই আসরে দেশকে প্রথমবারের মতো সেমিফাইনালের স্বাদ দেয়! 

মাঠে এডসন আলভারেজ যেমন এক আগ্রাসী যোদ্ধা, মাঠের বাইরের ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ঠিক ততটাই শান্ত এবং পরিবারকেন্দ্রিক একজন মানুষ। এডসন আলভারেজের দীর্ঘদিনের প্রেমিকা এবং বর্তমান জীবনসঙ্গীর নাম সোফিয়া তোয়াচে। সোফিয়া তোয়াচে একজন মেক্সিকান মডেল এবং সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার। মেক্সিকোতে খেলার সময় থেকেই তাদের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সোফিয়া সবসময় এডসনের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সমর্থক হিসেবে পাশে থেকেছেন।

Reference:

Related posts

মরগান রজার্স: মাঠে ফুটবলার নাকি হাইওয়ের বুলডোজার?

রায়হান রাফি – বাংলা চলচ্চিত্রের তরুণ নির্মাতা

রক্ষণভাগ থেকে আক্রমণ: যেভাবে খেলেন লুকাস দিনিয়ে

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More