Image default
ক্রীড়াবিদজীবনীফুটবল

ফরাসি ফুটবলের নতুন সেনসেশন রবিন রিসার

২০২৫-২৬ সিজনে পিএসজির দোন্নারুম্মাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে লেন্সের এই পিচ্চি যেভাবে সেরা গোলকিপারের ট্রফিটা ছিনিয়ে নিলো, তা দেখে তো স্বয়ং পিএসজি মালিকও মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন! 

আধুনিক ফুটবলে গোলরক্ষকদের ভূমিকা কেবল গোললাইন পাহারা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; সেখানে চাই ক্ষিপ্রতা, নিখুঁত বল ডিস্ট্রিবিউশন এবং বরফশীতল মানসিকতা। ঠিক এই সব গুণের এক দুর্দান্ত সংমিশ্রণ নিয়ে ফরাসি ফুটবলের আঙিনায় হাজির হয়েছেন ২১ বছর বয়সী তরুণ গোলরক্ষক রবিন রিসার। আরসি লেন্সের হয়ে ঘরোয়া ফুটবলে অসাধারণ পারফরম্যান্স এবং ফ্রান্সের ২০২৬ বিশ্বকাপ স্কোয়াডে ডাক পাওয়া এই তরুণকে বলা হচ্ছে ইউরোপীয় ফুটবলের আগামী দিনের অন্যতম সেরা ‘সুইপার-কিপার’। 

রবিন রিসার- এর ব্যক্তিগত তথ্য:

নাম

রবিন ফ্রাঁসোয়া ফিলিপ রিসার

জন্ম

২ ডিসেম্বর ২০০৪ (বয়স ২১)

জন্মস্থান

কলমার , ফ্রান্স

উচ্চতা

১.৯২ মিটার (৬ ফুট ৪ ইঞ্চি)

পজিশন

গোলকিপার 

ক্লাব ক্যারিয়ার

স্ট্রাসবার্গ, ডিজন, রেড স্টার এবং বর্তমানে লেন্স ক্লাবের হয়ে খেলছেন।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

২০১৯–২০২০ ফ্রান্স অনূর্ধ্ব-১৬

২০২১-২০২২ ফ্রান্স অনূর্ধ্ব-১৮

২০২২-২০২৩ ফ্রান্স অনূর্ধ্ব-১৯

২০২৪ ফ্রান্স অনূর্ধ্ব-২০

২০২৫–২০২৬ ফ্রান্স অনূর্ধ্ব-২১

রবিন ফ্রাঁসোয়া ফিলিপ রিসার- Image Source: lequipe.fr

রবিন ফ্রাঁসোয়া ফিলিপ রিসার ২০০৪ সালের ২ ডিসেম্বর ফ্রান্সের কলমার শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি তার ছিল তীব্র ঝোঁক। বিশেষ করে গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে দলের শেষ প্রহরী হওয়ার রোমাঞ্চ তাকে দারুণভাবে আকর্ষণ করত।

তার প্রাথমিক ফুটবল পাঠ শুরু হয় স্থানীয় ক্লাব এফসি বেনউইহর-এ, যেখানে তিনি ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত খেলেন। এরপর ২০১৫ সালে তিনি যোগ দেন এসআর কলমার-এ। সেখানে তার পারফরম্যান্স ফরাসি স্কাউটদের নজরে আসে এবং ২০১৭ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি ফ্রান্সের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আরসি স্ট্রাসবার্গ-এর বিখ্যাত অ্যাকাডেমিতে যোগ দেন। স্ট্রাসবার্গের যুব অ্যাকাডেমিতেই তার প্রতিভার আসল বিকাশ ঘটে। দীর্ঘদেহী গড়ন ও বল গ্রিপিংয়ের সহজাত ক্ষমতার কারণে খুব দ্রুতই তিনি ক্লাবের যুব দলগুলোর প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক হয়ে ওঠেন।

২০২২-২৩ মৌসুমে স্ট্রাসবার্গ তাকে তাদের সিনিয়র দলে প্রমোট করে। তবে তৃতীয় পছন্দের গোলরক্ষক হওয়ায় মূল দলে খেলার সুযোগ পাচ্ছিলেন না তিনি। একজন তরুণ গোলরক্ষকের বিকাশের জন্য নিয়মিত ম্যাচ খেলা কতটা জরুরি, তা অনুধাবন করে ক্লাব তাকে লোনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

স্ট্রাসবার্গ-এর জার্সিতে রবিন রিসার- Image Source: sports.yahoo.com

২০২৩ সালের জুলাই মাসে তিনি ফরাসি থার্ড টায়ার বা ন্যাশনাল লিগের ক্লাব ডিজনে ধারে যোগ দেন। এই লোনটিই ছিল রিসারের ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। পুরো সিজনে তিনি ক্লাবের এক নম্বর গোলরক্ষক হিসেবে খেলেন। ১১ আগস্ট ২০২৩ তারিখে রুয়েনের বিরুদ্ধে ক্লিন শিট রেখে তার অভিষেক হয়। পুরো মৌসুমে ৩০টি ম্যাচ খেলে তিনি নিজের গোলকিপিং সামর্থ্যের প্রমাণ দেন।

ডিজনে সফল একটি মৌসুম কাটানোর পর, ২০২৪ সালের নভেম্বরে তিনি লিগ ২-এর ক্লাব রেড স্টারে ধারে যোগ দেন। সেখানে ১৯টি ম্যাচ খেলে লড়াকু ফুটবল উপহার দেন এবং ফরাসি ফুটবলের উচ্চস্তরের জন্য নিজেকে পুরোপুরি প্রস্তুত করে তোলেন।

২০২৫ সালের ৪ জুলাই রবিন রিসারের ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় মোড় আসে। ফরাসি লিগ ১-এর অন্যতম শীর্ষ দল আরসি লেন্স তাকে ৩.৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে স্ট্রাসবার্গ থেকে পাকাপাকিভাবে কিনে নেয় এবং ২০৩০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি স্বাক্ষর করে।

লেন্সের মূল গোলরক্ষক হিসেবে ২০২৫-২৬ মৌসুমে রিসার যা করে দেখিয়েছেন, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। তার অসাধারণ পারফরম্যান্সের ওপর ভর করে আরসি লেন্স ফরাসি লিগ ১-এ পিএসজির ঠিক পেছনে থেকে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে।

আরসি লেন্স এর জার্সিতে রবিন রিসার- Image Source: ligue1.com

এই মৌসুমে লেন্সের হয়ে লিগে ৩৩টি ম্যাচে মাঠে নামেন তিনি। যার মধ্যে ১১টি ম্যাচে ক্লিন শিট বজায় রাখেন এবং পুরো লিগে মোট ৭৮টি দুর্দান্ত সেভ করেন। তার এই অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের স্বীকৃতিস্বরূপ মে ২০২৬-এ তাকে দেওয়া হয় ফরাসি ফুটবলের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার বছরের সেরা গোলরক্ষক ও বছরের সেরা একাদশ। 

পাশাপাশি লেন্সের হয়ে ২০২৩-২৬ সালের ঘরোয়া কাপ টুর্নামেন্ট কুপ দে ফ্রান্স-এর ফাইনালে ওজিসি নিসের বিরুদ্ধে ৫টি দারুণ সেভ করে দলকে চ্যাম্পিয়ন করতে বড় ভূমিকা রাখেন।

রবিন রিসার ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-১৬, অনূর্ধ্ব-১৮, অনূর্ধ্ব-১৯ এবং অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে নিয়মিত খেলেছেন। ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকের দলেও তার ডাক পাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কনুইয়ের ইনজুরির কারণে শেষ মুহূর্তে তাকে স্কোয়াড থেকে ছিটকে যেতে হয়।

তবে সেই হতাশা কাটিয়ে তিনি আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসেন। লেন্সের হয়ে ঘরোয়া ফুটবলে তার চোখধাঁধাতো পারফরম্যান্স জাতীয় দলের কোচ দিদিয়ের দেশমের নজর এড়াতে পারেনি। ফলস্বরূপ ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের জন্য ঘোষিত ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত স্কোয়াডে জায়গা করে নেন। ২১ বছর বয়সেই বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে ফ্রান্সের জার্সি গায়ে জড়ানোর সুযোগ পাওয়া তার প্রতিভারই প্রমাণ দেয়।

এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্সের ড্রেসিংরুমে কিলিয়ান এমবাপ্পে বা থিও হার্নান্দেজের মতো বিশ্বমানের তারকাদের সাথে সময় কাটানো এবং বিশ্বকাপের মতো মেগা ইভেন্টের চাপ সামলানোর অভিজ্ঞতা রিসারকে মানসিকভাবে আরও পরিপক্ব করে তুলবে। রবিন রিসার কেবল বর্তমানের ব্যাক-আপ নন, বরং তিনিই ফ্রান্সের গোলপোস্টের ভবিষ্যৎ। ২০২৬ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে বিশ্বমঞ্চে তার নিজের নামকে বড় করে চেনানোর প্রথম আনুষ্ঠানিক ধাপ।

Reference:

Related posts

আলিসন বেকার: ড্রেসিংরুমের রকস্টার, মাঠের সুপারহিরো

যোগেন মন্ডল- রাজনীতির হারিয়ে যাওয়া নক্ষত্র

আলবার্তো আকোস্তা: আর্জেন্টিনার নীরব হিরোর গল্প

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More