Image default
ইরাকধর্মীয় স্থাপনাপর্যটন আকর্ষণ

আল-জাওয়াদাইন: বাগদাদের বুকে শান্তির এক পবিত্র নীড়

আল-জাওয়াদাইন ইসলাম ধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং পবিত্র একটি ঐতিহাসিক স্থান। প্রতিদিন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পুণ্যার্থী এই মাজার জিয়ারত করতে আসেন। এর চমৎকার স্থাপত্য এবং সুদৃশ্য সোনালী গম্বুজ দূর থেকেই মানুষের নজর কাড়ে। আধুনিক বাগদাদের ব্যস্ততার মাঝে এটি শান্তি ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য আশ্রয়স্থল। ইসলামি শিল্পকলা এবং সংস্কৃতির এক অসাধারণ নিদর্শন হিসেবে এটি সারা বিশ্বে সমাদৃত।

আল-জাওয়াদাইন মাজার– Image Source:tourhq.com

‘আল-জাওয়াদাইন’ কথার অর্থ হলো ‘দুই জাওয়াদ’ বা দুই মহান ব্যক্তিত্ব। শিয়া ইসলামের সপ্তম ইমাম হযরত মুসা আল-কাজিম (রহ.) এবং তাঁরই নাতি নবম ইমাম হযরত মুহাম্মদ আল-জাওয়াদ (রহ.) এই পবিত্র মাজারে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ইন্তেকাল করলেও এই একই মাটিতে তাঁদের দুজনকে দাফন করা হয়। আর তাঁদের নামানুসারেই এই পুরো মাজার কমপ্লেক্সের নাম রাখা হয়েছে আল-জাওয়াদাইন বা কাজেমিয়া মাজার।

যে পবিত্র ভূমির ওপর এই বিশাল মাজারটি গড়ে উঠেছে, সেটি প্রাচীন আব্বাসীয় খিলাফতের আমলে ‘কুরাইশ কবরস্থান’ নামে পরিচিত ছিল। অষ্টম শতাব্দীতে বাগদাদ শহর প্রতিষ্ঠারও বহু আগে থেকেই এই জায়গাটি একটি বিশেষ সমাধিস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীতে যখন এখানে মহান ইমামদের দাফন করা হয়, তখন এর পবিত্রতা ও গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। ইতিহাস এবং সময়ের পরিক্রমায় এই স্থানটি ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ শহরে রূপ নেয়।

আব্বাসীয় খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা খলিফা আল-মানসুর নিজের পরিবারের সদস্যদের দাফন করার জন্য এই কবরস্থানটি প্রথম নির্ধারণ করেছিলেন।

আব্বাসীয় খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা খলিফা আল-মানসুর– Image Source:economist.com

শুরুতে আল-জাওয়াদাইন মাজারের স্থানটি খুব সাধারণ অবস্থায় ছিল। পরবর্তীতে দশম শতাব্দীতে বুইয়িদ রাজবংশের শাসক মুইজ আদ-দাওলার সরাসরি নির্দেশেই এখানে প্রথম পাকা ইমারত ও গম্বুজ তৈরি করা হয়। তাঁরই আমলে এখানে প্রথম কাঠের তৈরি একটি বেষ্টনী এবং সুরক্ষামূলক প্রাচীর নির্মাণ করা হয়। বুইয়িদ শাসকরা এই মাজারের নিরাপত্তার জন্য সেকালেই বিশেষভাবে প্রহরী নিয়োগ করেছিলেন, যাতে পুণ্যার্থীরা নিরাপদে ইবাদত করতে পারেন।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন রাজবংশ এই মাজারটির সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে কাজ করেছে। ষোড়শ শতাব্দীতে সাফাভি শাসক শাহ ইসমাইল প্রথম বাগদাদ দখলের পর মাজারটি নতুনভাবে সাজান এবং এখানে বড় পরিসরে সংস্কার কাজ চালান। পরবর্তীতে উসমানীয় বা অটোমান সুলতানরাও এই পবিত্র স্থানের স্থাপত্যশৈলীতে মূল্যবান সংযোজন করেন। বিশেষ করে অটোমান ও পারস্য সংস্কৃতির চমৎকার মিশ্রণে এর ভেতরের কারুকাজ সম্পূর্ণ করা হয়েছিল।

বিখ্যাত উসমানীয় সুলতান সুলাইমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট বাগদাদ বিজয়ের পর ব্যক্তিগতভাবে এই মাজার জিয়ারত করতে এসেছিলেন এবং এর সৌন্দর্য বাড়াতে বিশেষ অনুদান দিয়েছিলেন।

আল-জাওয়াদাইন মাজারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এর জোড়া সোনালী গম্বুজ। আকাশচুম্বী মিনারগুলোর পাশেই গম্বুজ দুটি রোদের আলোয় ঝলমল করতে থাকে। নিখুঁত প্রকৌশল বিদ্যায় তৈরি এই গম্বুজগুলোর গঠনশৈলী দেখতে অত্যন্ত রাজকীয়। দূরদূরান্ত থেকে বাগদাদে প্রবেশ করার সময় কাজেমিয়ার আকাশে এই সোনালী গম্বুজের সৌন্দর্য যে কারো মন কেড়ে নেয়। এটি পুরো বাগদাদ শহরের অন্যতম প্রধান একটি ল্যান্ডমার্ক।

আল-জাওয়াদাইন মাজারের জোড়া সোনালী গম্বুজ– Image Source:tourhq.com

এই পবিত্র মাজারটির মূল সোনালী গম্বুজ এবং মিনারগুলো সাজাতে প্রায় ৯ হাজারেরও বেশি খাঁটি সোনার প্রলেপযুক্ত টাইলস ব্যবহার করা হয়েছে।

আল-জাওয়াদাইন মাজারের ভেতরে প্রবেশ করলে এর ভেতরের রূপ দেখে যে কেউ মুগ্ধ হবেন। এর দেয়াল এবং ছাদ জুড়ে ছোট ছোট রঙিন আয়নার টুকরো দিয়ে চমৎকার মোজাইক বা মিরর ওয়ার্ক করা হয়েছে। এছাড়া সুনিপুণ হাতে খোদাই করা কাঠের কাজ এবং দেওয়ালে ক্যালিগ্রাফি দিয়ে পবিত্র কোরআনের আয়াত লেখা রয়েছে। সিলিং থেকে ঝুলে থাকা বিশাল সব স্ফটিকের ঝাড়বাতি পুরো ভেতরের পরিবেশকে এক মায়াবী ও আধ্যাত্মিক আলোয় আলোকিত করে রাখে।

মাজারের ভেতরের দেয়ালে ব্যবহৃত লক্ষ লক্ষ ছোট আয়নার টুকরোগুলো এমনভাবে বসানো হয়েছে, যা সামান্য আলোতেই পুরো ঘরটিকে হিরের মতো উজ্জ্বল করে তোলে।

আল-জাওয়াদাইন মাজারের চারপাশের পবিত্র প্রাঙ্গণে ইসলামের আরও বেশ কয়েকজন বিশ্বখ্যাত মনীষী ও পন্ডিত শায়িত আছেন। ইতিহাসের প্রখ্যাত পন্ডিত শায়খ মুফিদ এবং বিখ্যাত গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী নাসিরুদ্দিন আল-তুসি এই পবিত্র মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। এছাড়া হযরত আলী (রা.)-এর অমূল্য ভাষণ ও চিঠিপত্রের বিখ্যাত সংকলন ‘নাহজুল বালাগা’-এর সংকলক শায়খ আশ-শরিফ আল-রাদি এবং তাঁর সুযোগ্য ভাই শায়খ আল-মুর্তজার মাজার এই পবিত্র কমপ্লেক্সের ঠিক পাশেই বা এর ঐতিহাসিক আওতাভুক্ত এলাকায় অবস্থিত। 

আল-জাওয়াদাইন মাজার কমপ্লেক্স– Image Source:iraqinews.com

আল-জাওয়াদাইন মাজার কমপ্লেক্সটি আয়তনে বেশ বিশাল এবং এর চারপাশে বেশ কয়েকটি বড় চত্বর বা সাহন রয়েছে। একসঙ্গে হাজার হাজার মানুষ এখানে বসে নামাজ পড়তে ও দোয়া করতে পারেন। প্রতি বছর আশুরা, আরাফার দিন কিংবা বিশেষ ধর্মীয় উৎসবগুলোতে কোটি কোটি মানুষের সমাগম ঘটে। ইরাক ছাড়াও ইরান, লেবানন, পাকিস্তান ও ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ধর্মপ্রাণ মানুষ এখানে ছুটে আসেন। তখন পুরো এলাকা এক বিশাল মিলনমেলায় পরিণত হয়।

মাজারের ঠিক বাইরেই রয়েছে কাজেমিয়া অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন বাজার। এই বাজারে গেলে খাঁটি আতর, জায়নামাজ, তসবির পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের নানা ঐতিহ্যবাহী জিনিসপত্র পাওয়া যায়। বিশেষ করে এখানে বিখ্যাত সোনা ও রূপার গহনার বাজার রয়েছে, যা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। পুরো এলাকা সবসময় গোলাপজল এবং সুগন্ধি ধূপের মিষ্টি গন্ধে মুখরিত থাকে, যা দর্শনার্থীদের মনে গভীর প্রশান্তি এনে দেয়।

Reference:

Related posts

ইস্তাম্বুলের গ্র্যান্ড বাজার: তুর্কি সংস্কৃতির জীবন্ত প্রতিচ্ছবি

ভিও লিয়ন: ফ্রান্সের বুকে রেনেসাঁস যুগের এক জীবন্ত জাদুঘর

ফাবিহা বিনতে হক

শিবুয়া ক্রসিং: জাপানের শৃঙ্খলা ও প্রযুক্তির অসাধারণ উদাহরণ

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More