আপনি যদি নিস শহরের কথা ভাবেন, তবে সবার আগে যে দৃশ্যটি আপনার চোখে ভাসবে তা হলো একপাশে দিগন্তবিস্তৃত নীল জলরাশি, অন্যপাশে পাম গাছের সারি আর মাঝখানে মসৃণ এক হাঁটার পথ। এটিই হলো প্রমোনেদ দেজ অ্যাংলেইস । প্রায় ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সমুদ্র উপকূলীয় পথটি কেবল ফ্রান্সের নয়, বরং সারা বিশ্বের অন্যতম আইকনিক এবং বিলাসবহুল পর্যটন কেন্দ্র।

নাম যখন ‘ইংরেজদের পথ’
এই বিখ্যাত পথের নামের পেছনে রয়েছে এক চমৎকার ইতিহাস। ১৮ শতকের শেষ দিকে ইংরেজ অভিজাত শ্রেণির মানুষেরা নিস শহরের মনোরম আবহাওয়া এবং নীল সাগরের প্রেমে পড়ে এখানে শীত কাটাতে আসতেন। কিন্তু সেই সময় সমুদ্রের পাড়টি ছিল পাথুরে এবং চলাচলের জন্য বেশ দুর্গম।
১৮২০ সালের দিকে স্থানীয়দের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এবং পর্যটকদের হাঁটার সুবিধার্থে ইংরেজ ধর্মযাজক লুইস ওয়ে -এর অর্থায়নে একটি ছোট পথ তৈরি করা হয়। স্থানীয়রা এই পথটিকে তাদের ভাষায় বলত কামিন দেই আংগ্লেস বা ইংরেজদের পথ। পরবর্তীতে ১৮২৩ সালে নিস শহর কর্তৃপক্ষ এটি বড় করে তৈরি করে এবং ফরাসি ভাষায় এর নাম রাখা হয় প্রমোনেদ দেজ অ্যাংলেইস। কালের বিবর্তনে এটি একটি সাধারণ হাঁটার পথ থেকে বিশ্বের অন্যতম দামি এবং আধুনিক পর্যটন স্পটে পরিণত হয়েছে।
স্থাপত্যের আভিজাত্য
প্রমোনেদ দেজ অ্যাংলেইস-এর একপাশে দাঁড়িয়ে আছে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের সব চমৎকার স্থাপত্যশৈলী। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো হোটেল নেগ্রেস্কো। ১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই হোটেলটি নিসের আভিজাত্যের প্রতীক। এর উজ্জ্বল গোলাপি গম্বুজটি স্থপতি গুস্তাভ আইফেলের তৈরি। হোটেলের ভেতরে রয়েছে দুর্লভ সব চিত্রকর্ম এবং জার দ্বিতীয় নিকোলাসের জন্য তৈরি করা বিশাল স্ফটিকের ঝাড়বাতি। এটি কেবল একটি হোটেল নয়, বরং একটি জীবন্ত মিউজিয়াম।

নীল চেয়ারের ঐতিহ্য
আপনি যখন প্রমোনেদ দিয়ে হাঁটবেন, আপনার চোখে পড়বে সারিবদ্ধভাবে রাখা নীল রঙের কিছু চেয়ার। ১৯৫০-এর দশকে চার্লস টরডিনারি নামক এক ব্যক্তি এই আরামদায়ক চেয়ারগুলো তৈরি করেছিলেন যাতে পর্যটকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সমুদ্রের নীল জলরাশি উপভোগ করতে পারেন। আজ এই চেয়ারগুলো নিসের একটি আইকনিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে, এমনকি স্যুভেনিয়ার হিসেবেও এর ছোট ছোট সংস্করণ বিক্রি হয়।

উৎসবের প্রাণকেন্দ্রxa0
নিস শহরের প্রাণস্পন্দন বলা হয় প্রমোনেদ দেজ অ্যাংলেইসকে। যখনই কোনো বড় আয়োজন আসে, এই পথটি যেন এক মায়াবী রূপ ধারণ করে। বিশেষ করেনিস কার্নিভালের সময় দেজ অ্যাংলেইস এক বিশাল জীবন্ত থিয়েটারে পরিণত হয়। কার্নিভালের সবচেয়ে জনপ্রিয় অংশ হলো এই ‘ফুলের লড়াই’। সমুদ্রের কোল ঘেঁষে সুসজ্জিত গাড়ি থেকে পর্যটকদের দিকে হাজার হাজার সতেজ মিমোসা, লিলি আর গোলাপ ছুড়ে দেওয়া হয়। এই প্রথাটি ১৮৭৬ সাল থেকে চলে আসছে এবং এটি দেখার জন্য সারা পৃথিবী থেকে মানুষ প্রমোনেদ-এর পাড়ে ভিড় জমায়।
১৪ই জুলাই ফ্রান্সের জাতীয় দিবস বা বাস্তিল দিবসে প্রমোনেদ দেজ অ্যাংলেইস এক আবেগপূর্ণ রূপ নেয়। দিনভর কুচকাওয়াজ শেষে রাতে ভূমধ্যসাগরের আকাশের ওপর চলে বিশাল আতশবাজির খেলা। সাগরের নীল জল যখন আতশবাজির রঙে ঝলমল করে ওঠে, তখন হাজার হাজার মানুষ প্রমোনেদ-এর নীল চেয়ারে বা সৈকতে বসে সেই সৌন্দর্য উপভোগ করে। এটি নিসের সবচেয়ে জাদুকরী রাতগুলোর একটি।
খেলাধুলার জগতেও এই পথের গুরুত্ব অপরিসীম। মসৃণ এবং দীর্ঘ হওয়ার কারণে এটি অ্যাথলেটদের জন্য এক আদর্শ ট্র্যাক। বিশ্বের অন্যতম কঠিন আয়রনম্যান ট্রায়াথলন প্রতিযোগিতার দৌড় এই প্রমোনেদ-এই অনুষ্ঠিত হয়। নীল সাগরের পাশ দিয়ে অ্যাথলেটদের এই লড়াই দেখার মতো হয়।
বিখ্যাত প্যারিস-নিস সাইকেল রেসটি প্রমোনেদ দেজ অ্যাংলেইস-এ এসেই শেষ হয়। গতির নেশায় বুদ হওয়া দর্শকদের চিৎকারে তখন পুরো এলাকা মুখরিত থাকে। এছাড়া প্রতি বছর আয়োজিত ‘ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরা ম্যারাথন’এই পথ থেকেই শুরু হয়।
গ্রীষ্মের মাসগুলোতে প্রমোনেদ-এর বিভিন্ন অংশে খোলা আকাশের নিচে গান আর নাচের আসর বসে। স্থানীয় জ্যাজ শিল্পী থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডগুলোও অনেক সময় এই সমুদ্র উপকূলে পারফর্ম করে থাকে।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভ্রমণ টিপস
- যেহেতু আপনাকে অনেকটা পথ হাঁটতে হবে, তাই আরামদায়ক স্নিকার্স পরুন।
- পর্যটন এলাকা হওয়ায় নিজের ব্যাগ এবং মোবাইল সম্পর্কে সচেতন থাকুন।
- ছবি তোলার জন্য হোটেল নেগ্রেস্কোর সামনের অংশ এবং ‘I Love Nice’ সাইনটি সবচেয়ে উপযুক্ত।
ট্র্যাজেডি থেকে উত্তরণ
২০১৬ সালের ১৪ই জুলাই এক মর্মান্তিক সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছিল এই প্রমোনেদ। সেই ঘটনায় অনেক মানুষ প্রাণ হারান। তবে নিস শহর এবং এর মানুষ অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে সেই শোক কাটিয়ে উঠেছেন। আজ সেই স্মৃতি স্মরণে সেখানে একটি মেমোরিয়াল রয়েছে, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবন থেমে থাকে না, এবং শান্তি সবসময় জয়ী হয়।
শেষ অংশxa0
প্রমোনেদ দেজ অ্যাংলেইস কেবল একটি রাস্তা নয়; এটি নিসের ঐতিহ্য, আভিজাত্য এবং প্রাণশক্তির সংমিশ্রণ। একপাশে আল্পস পর্বতমালার হালকা ছায়া আর অন্যপাশে ভূমধ্যসাগরের বিশালতা—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে প্রমোনেদ আপনাকে শেখাবে কীভাবে যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি ভুলে প্রকৃতির কোলে হারিয়ে যেতে হয়। আপনি যদি নিসে যান এবং এই পথে অন্তত একবার না হাঁটেন, তবে আপনার ফরাসি রিভিয়েরা ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
প্রমোনেদ দেজ অ্যাংলেইস সম্পর্কে কিছু মজার তথ্যxa0
- বিশ্বের প্রথম পেভমেন্ট: এটি ইউরোপের অন্যতম প্রথম সমুদ্র উপকূলীয় হাঁটার পথ যা পর্যটকদের জন্য পরিকল্পনা করে তৈরি করা হয়েছিল।
- পাম গাছের যত্ন: প্রমোনেদ বরাবর যে পাম গাছগুলো আপনি দেখেন, সেগুলো নিস মিউনিসিপ্যালিটি অত্যন্ত যত্নের সাথে রক্ষণাবেক্ষণ করে। প্রতিটি গাছের একটি নির্দিষ্ট নম্বর এবং হেলথ রেকর্ড থাকে!
- আই লাভ নিস সাইন: প্রমোনেদ-এর একদম শেষ প্রান্তে ক্যাসেল হিলের নিচে অবস্থিত বিশাল ‘I Love Nice’ সাইনটি পর্যটকদের কাছে সেলফি তোলার জন্য বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় স্পট।
- নীল আকাশ ও নীল জল: শিল্পী হেনরি মাতিস বলেছিলেন, “নিসের এই নীল আলোই আমার শিল্পকে বদলে দিয়েছে।” আর সেই আলোর শ্রেষ্ঠ প্রতিফলন দেখা যায় এই প্রমোনেদ থেকেই।
Reference:
- https://en.wikipedia.org/wiki/Promenade_des_Anglais
- https://frenchriviera.travel/promenade-des-anglais/
- https://www.explorenicecotedazur.com/en/webcam/webcam-promenade-des-anglais/
- https://travel.usnews.com/Nice_France/Things_To_Do/Promenade_des_Anglais_28253/
- https://generationvoyage.fr/activites/promenade-anglais-nice-a334009/

