কুয়েত সিটির গরমে গাছদের অবস্থা এতোটাই নাজেহাল যে, বেচারাদের শান্ত রাখতে রাস্তার পাশেই চলে তাদের জন্য স্পেশাল ‘ওয়াটার শাওয়ার’ আর এসির বিলাসিতা!
কুয়েত সিটি কেবল কুয়েতের রাজধানীই নয়, এটি আরব উপদ্বীপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক কেন্দ্র। পারস্য উপসাগরের তীরে অবস্থিত এই শহরটি একদিকে যেমন তার ঐতিহ্যের শেকড়কে আঁকড়ে ধরে রেখেছে, অন্যদিকে তেমনি আধুনিক স্থাপত্য এবং প্রযুক্তিতে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু
কুয়েত সিটি পারস্য উপসাগরের উত্তর-পশ্চিম উপকূলে কুয়েত উপসাগরের দক্ষিণ তীরে অবস্থিত। এর ভৌগোলিক অবস্থান শহরটিকে প্রাচীনকাল থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে পরিণত করেছে।
কুয়েত সিটির জলবায়ু চরমভাবাপন্ন। গ্রীষ্মকালে এখানে তাপমাত্রা অত্যন্ত বৃদ্ধি পায়, যা অনেক সময় ৫০°C ছাড়িয়ে যায়। শীতকাল তুলনামূলক আরামদায়ক হলেও বেশ সংক্ষিপ্ত। ধূলিঝড় বা ‘শামাল’ এই অঞ্চলের একটি সাধারণ প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য।

ঐতিহাসিক পটভূমি
১৮শ শতাব্দীর শুরুর দিকে, আরবের কেন্দ্রীয় অঞ্চল নজদ (বর্তমান সৌদি আরব) এক ভয়াবহ খরার কবলে পড়ে। খাদ্যাভাব ও প্রতিকূল জলবায়ুর হাত থেকে বাঁচতে বনী উতবা গোত্র তাদের আদি নিবাস ছেড়ে পূর্ব উপকূলের দিকে যাত্রা শুরু করে।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তারা পারস্য উপসাগরের তীরে পৌঁছায়। সেখানে তারা একটি ছোট ‘কুতো’ বা সুরক্ষিত দুর্গের সন্ধান পায়, যা স্থানীয় জেলেরা ব্যবহার করত। আরবি শব্দ ‘কুত’ থেকেই মূলত ‘কুয়েত’ নামের উৎপত্তি, যার অর্থ ‘ছোট দুর্গ’। ১৭৫২ সালের দিকে এই অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে ওঠে এবং গোত্র প্রধানরা মিলে শায়খ সাবাহ বিন জাবেরকে তাদের নেতা বা প্রথম শাসক হিসেবে নির্বাচিত করেন।
মরুভূমি থেকে আসা এই যাযাবর জাতি খুব দ্রুত নিজেদের সামুদ্রিক জাতি হিসেবে গড়ে তোলে। কৃষি কাজের সুযোগ না থাকায় তারা সমুদ্রকে কেন্দ্র করে তাদের জীবিকা সাজায়। তেল আবিষ্কারের আগে কুয়েতের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি ছিল সমুদ্র থেকে মুক্তা সংগ্রহ এবং সামুদ্রিক বাণিজ্য। কুয়েতি নাভিকরা তাদের কাঠের তৈরি ‘ধো’ নৌকায় করে ভারত ও পূর্ব আফ্রিকা পর্যন্ত যাতায়াত করত।
কুয়েত সিটির ভৌগোলিক অবস্থান একে ভারত, পারস্য এবং আরব উপদ্বীপের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সেতু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
স্থাপত্য ও দর্শনীয় স্থান
কুয়েত সিটির নগর-কাঠামোদেখলে মনে হয় যেন ক্যানভাসে আঁকা কোনো এক জাদুকরী শহর। এখানে একদিকে যেমন গগনচুম্বী অট্টালিকা রয়েছে, অন্যদিকে ইসলামিক স্থাপত্যের সূক্ষ্ম কারুকাজ শহরটিকে দিয়েছে এক অনন্য রাজকীয় রূপ।
কুয়েত টাওয়ারস
কুয়েত টাওয়ারস শহরের সবচেয়ে আইকনিক ল্যান্ডমার্ক। তিনটি সুউচ্চ টাওয়ারের সমন্বয়ে গঠিত এই স্থাপত্যটি ১৯৭৯ সালে উদ্বোধন করা হয়। এই তিনটি টাওয়ারের গায়ে বসানো হয়েছে প্রায় ৮২,০০০ রঙিন এনামেলড স্টিল ডিস্ক, যা সূর্যের আলোয় সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো নীল-সবুজ আভা ছড়ায়। এর প্রধান টাওয়ারের ১৮৭ মিটার উচ্চতায় রয়েছে একটি ঘূর্ণায়মান গোলক, যা প্রতি ৩০ মিনিটে একবার পুরো ঘুরে আসে। এখান থেকে এক কাপ কফি হাতে পুরো কুয়েত সিটি এবং পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশির প্যানোরামিক ভিউ নেওয়া পর্যটকদের কাছে এক দারুণ অভিজ্ঞতা।

লিবারেশন টাওয়ার
লিবারেশন টাওয়ার কুয়েতের স্বাধীনতার প্রতীক। ৩৭২ মিটার উচ্চতার এই টেলিযোগাযোগ টাওয়ারটি বিশ্বের অন্যতম উঁচু ভবন। ১৯৯০ সালে ইরাকি আক্রমণের সময় এর নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ১৯৯১ সালে কুয়েত স্বাধীন হওয়ার পর এর কাজ শেষ হয় এবং স্বাধীনতার স্মরণে এর নামকরণ করা হয় ‘লিবারেশন টাওয়ার’। এর কাঠামোর উপরের অংশে সিরামিক টাইলস এবং সামনের দিকে স্বচ্ছ কাঁচের ব্যবহার একে আধুনিক ও উজ্জ্বল রূপ দিয়েছে।
গ্র্যান্ড মসজিদ
ইসলামিক স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন গ্র্যান্ড মসজিদ। ৪৫,০০০ বর্গমিটার আয়তনের এই মসজিদে একসাথে প্রায় ১০,০০০ পুরুষ এবং আলাদাভাবে ছোট হলে প্রায় ১,০০০ নারী নামাজ আদায় করতে পারেন। এর মূল গম্বুজটি ২৬ মিটার ব্যাসের এবং এতে আল্লাহর ৯৯টি নাম অত্যন্ত সুন্দর ক্যালিগ্রাফিতে খোদাই করা আছে। মসজিদের ভেতরে ঢুকলে সিলিংয়ের ঝাড়বাতি এবং মেঝেতে বিছানো হাতে বোনা কার্পেট এক শান্ত ও গম্ভীর পরিবেশ তৈরি করে। অমুসলিম পর্যটকদের জন্যও এটি পরিদর্শনের সুযোগ রয়েছে, যা কুয়েতের উদার সংস্কৃতির পরিচয় দেয়।
আল হামরা টাওয়ার
কুয়েত সিটির সবচেয়ে আধুনিক এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধক স্থাপত্য হলো আল হামরা টাওয়ার। ৪১৪ মিটার উচ্চতার এই অট্টালিকাটি কুয়েতের সর্বোচ্চ এবং বিশ্বের অন্যতম উচ্চতম ‘বাঁকানো’ কংক্রিট স্কাইস্ক্র্যাপার হিসেবে স্বীকৃত। ২০১১ সালে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার পর থেকেই এটি আধুনিক প্রকৌশলবিদ্যার এক বিস্ময় হিসেবে সমাদৃত। কুয়েতের প্রচণ্ড গরম থেকে সুরক্ষার জন্য এর দক্ষিণ দিকের দেয়ালে চুনাপাথরের আস্তরণ ব্যবহার করা হয়েছে। এটি ভবনের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখে শক্তি সাশ্রয় করতে সাহায্য করে।

মিরর হাউস
কুয়েত সিটির সাধারণ এক আবাসিক এলাকায় লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত সুন্দর বিস্ময়, যার নাম মিরর হাউস। এটি বিশ্বের একমাত্র বাড়ি যার প্রতিটি দেয়াল এবং মেঝে ভেতর-বাইরে সম্পূর্ণভাবে কাঁচের মোজাইক দিয়ে তৈরি। এই ব্যক্তিগত জাদুঘরটি ইতালীয় বংশোদ্ভূত কুয়েতি শিল্পী লিডিয়া আল-কাত্তান-এর এক বিশাল জীবনব্যাপী সাধনার ফসল।
১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে লিডিয়া নিজের ঘরকে সুন্দর করার জন্য আয়নার টুকরো দিয়ে কাজ শুরু করেন। কয়েক দশক পর এটি এখন কয়েক টন আয়নার টুকরোয় সজ্জিত এক জাদুকরী প্রাসাদে পরিণত হয়েছে। মীরর হাউসের প্রতিটি কক্ষের একটি আলাদা অর্থ বা থিম রয়েছে। এখানে যেমন মহাকাশ এবং গ্রহ-নক্ষত্রের থিম আছে, তেমনি আছে সমুদ্রের তলদেশ কিংবা আধ্যাত্মিক দর্শনের প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি কক্ষে কাঁচের প্রতিফলন আপনাকে এক মোহাবিষ্ট জগতের অনুভূতি দেবে।
দ্য অ্যাভিনিউস মল
কুয়েত সিটির আধুনিকতার চূড়ান্ত নিদর্শন হলো দ্য অ্যাভিনিউস মল । এটি কেবল কুয়েতের বৃহত্তম শপিং মল নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্য তথা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এবং আধুনিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র। ২০১২ সালে যাত্রা শুরু করার পর থেকে এটি কুয়েতের প্রধান পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
এর স্থাপত্যশৈলী এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন মনে হয় আপনি কোনো ইউরোপীয় শহরের রাস্তা বা আধুনিক হাই-স্ট্রিটের ভেতর দিয়ে হাঁটছেন। এখানে বিশ্বের নামী-দামী সব ব্র্যান্ড, লাক্সারি শপ এবং ফ্যাশন হাউসের আউটলেট রয়েছে। কেনাকাটা করার জন্য এটি এক সত্যিকারের স্বর্গ।

সুক আল-মুবারাকিয়া
আধুনিক কাঁচ আর কংক্রিটের দালানের ভিড়ে কুয়েত সিটির যে স্থানটি আপনাকে অতীতের দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, তা হলো সুক আল-মুবারাকিয়া। এটি কুয়েতের সবচেয়ে পুরনো এবং ঐতিহাসিক বাজার, যা ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশটির সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে টিকে আছে। বাজারের সরু গলি, কাঠের তৈরি ছাদ এবং প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী পর্যটকদের এক মায়াবী পরিবেশে নিয়ে যায়। এখানে হাঁটলে মনে হবে যেন আপনি কয়েক দশক পিছিয়ে গেছেন।
এখানে পাওয়া যায় খাঁটি আরবীয় সুগন্ধি, পারস্যের গালিচা, হস্তশিল্প, ঐতিহ্যবাহী কুয়েতি পোশাক এবং বিভিন্ন ধরনের মসলা। এছাড়া খেজুর এবং কস্তুরীর জন্য এই বাজারটি বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত।
আল শহীদ পার্ক
কুয়েত সিটির প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত আল শহীদ পার্ক। এটি আধুনিক কুয়েতের পরিবেশগত সচেতনতা এবং সমৃদ্ধ ইতিহাসের প্রতীক। প্রায় ২০০ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই পার্কটিকে বলা হয় ‘শহরের ফুসফুস’। ধূসর মরুভূমি আর আকাশচুম্বী দালানের মাঝে এই সবুজ অরণ্যটি নাগরিক জীবনে প্রশান্তি নিয়ে আসে।
ফাইলাকা দ্বীপ
কুয়েত সিটির আধুনিক আকাশচুম্বী দালানকোঠা থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশির মাঝে জেগে আছে এক ঐতিহাসিক ভূখণ্ড ফাইলাকা দ্বীপ। ২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপটি প্রায় ৪,০০০ বছরের পুরনো। এখানে প্রাচীন দিলমুন সভ্যতার অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে। এছাড়াও, খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দীতে মহান আলেকজান্ডারের বাহিনী এখানে বসতি স্থাপন করেছিল এবং দ্বীপটির নাম দিয়েছিল ‘ইকারোস’। ফলে গ্রিক ও স্থানীয় সংস্কৃতি ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে এই দ্বীপে।

১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় এই দ্বীপটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বাসিন্দারা মূল ভূখণ্ডে চলে আসে। যুদ্ধের পর পরিত্যক্ত হওয়া বাড়িঘর এবং সামরিক যানগুলো আজও সেখানে রয়ে গেছে, যা পর্যটকদের যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দেয়।
সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা
কুয়েতি সংস্কৃতি মূলত আরবীয় আতিথেয়তা, ইসলামি মূল্যবোধ এবং গভীর পারিবারিক বন্ধনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বছরের পর বছর ধরে আধুনিকতা শহরটিতে জায়গা করে নিলেও কুয়েতিরা তাদের সাংস্কৃতিক শেকড়কে অত্যন্ত গর্বের সাথে ধরে রেখেছে।
দিওয়ানিয়া
কুয়েতি জীবনযাত্রার সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো ‘দিওয়ানিয়া‘। এটি মূলত পুরুষদের জন্য নির্ধারিত একটি আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক সামাজিক মিলনস্থল। এখানে বসে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ রাজনীতি, ব্যবসা, খেলাধুলা এবং সমসাময়িক জাতীয় ইস্যু নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন।
দিওয়ানিয়াকে কুয়েতের প্রাথমিক পর্যায়ের সংসদ বা গণতান্ত্রিক কাঠামোর সূতিকাগার বলা হয়। অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত বা সামাজিক পরিবর্তনের আভাস এই দিওয়ানিয়া থেকেই শুরু হয়। এটি কুয়েতিদের মধ্যে সামাজিক সংহতি বজায় রাখার প্রধান হাতিয়ার।

পোশাক-আশাক
কুয়েতিদের পোশাকে একদিকে যেমন আভিজাত্য ফুটে ওঠে, তেমনি তা মরুভূমির জলবায়ুর সাথেও মানানসই। কুয়েতি পুরুষরা সাধারণত ‘ডিশদাশা’ (সাদা বা হালকা রঙের লম্বা ঢিলেঢালা পোশাক) পরিধান করেন। এর সাথে মাথায় পরেন ‘গুত্রা’ এবং তা ধরে রাখার জন্য কালো রঙের ‘ইকাল’। এটি তাদের জাতীয় ও সাংস্কৃতিক গর্বের প্রতীক।
কুয়েতি মহিলারা ঐতিহ্যের সাথে আধুনিকতার চমৎকার সমন্বয় ঘটান। অনেকেই ‘আবায়া’ এবং হিজাব পরিধান করেন। তবে আধুনিক কুয়েত সিটিতে মহিলারা পশ্চিমা ফ্যাশনেবল পোশাকেও সমানভাবে অভ্যস্ত, যা তাদের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেয়।
খাদ্য সংস্কৃতি
কুয়েতি রন্ধনশৈলী অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এতে পারস্য, ভারত এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মশলা ও রন্ধন পদ্ধতির এক অপূর্ব মিশ্রণ দেখা যায়।
কুয়েতের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার হলো ‘মাচবুস’। এটি সাধারণত ভেড়া বা মুরগি মাংস এবং বিশেষ সুগন্ধি চাল দিয়ে তৈরি এক ধরনের পোলাও, যাতে জাফরান এবং বিভিন্ন আরব্য মশলা ব্যবহার করা হয়।সমুদ্রের তীরে অবস্থিত হওয়ায় কুয়েতিদের খাদ্যতালিকায় সামুদ্রিক মাছের প্রাধান্য লক্ষণীয়। কুয়েতি আতিথেয়তা অসম্পূর্ণ থেকে যায় তাদের ঐতিহ্যবাহী ‘গাওয়া’ (আরবীয় কফি) এবং উন্নত মানের খেজুর ছাড়া। অতিথিদের কফি পরিবেশন করা কুয়েতি সংস্কৃতির একটি আবশ্যিক শিষ্টাচার।
উৎসব ও উদযাপন
কুয়েত সিটির উৎসবগুলো কেবল নিছক আনন্দ নয়, বরং এগুলো তাদের জাতীয় বীরত্ব, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং ঐতিহ্যের প্রতিফলন। ফেব্রুয়ারি মাসকে কুয়েতের ‘উৎসবের মাস’ বলা হয়। ২৫শে ফেব্রুয়ারি জাতীয় দিবস এবং ২৬শে ফেব্রুয়ারি মুক্তি দিবস পালিত হয়। এই দুই দিন পুরো কুয়েত সিটি লাল-সবুজ-সাদা-কালো জাতীয় পতাকায় ছেয়ে যায়। রাস্তার ধারের পাম গাছ থেকে শুরু করে আকাশচুম্বী অট্টালিকাগুলো আলোকসজ্জায় ঝলমল করে ওঠে।

কুয়েত টাওয়ারস ও গালফ রোডে বিশাল আতশবাজি প্রদর্শনী হয়। মানুষ রাস্তায় নেমে ঐতিহ্যবাহী নাচ-গান এবং কুচকাওয়াজে অংশ নেয়। এটি কুয়েতিদের দেশপ্রেম প্রদর্শনের সবচেয়ে বড় মঞ্চ।
রমজান মাসের মাঝামাঝি সময়ে (১৪ বা ১৫ রমজানে) গেরগিয়ান নামক একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসবটি পালিত হয়। এটি অনেকটা পশ্চিমা ‘হ্যালোউইন’-এর মতো কিন্তু ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আবহে। শিশুরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায় এবং বিশেষ গান গেয়ে বড়দের কাছ থেকে ক্যান্ডি, বাদাম বা চকোলেট সংগ্রহ করে। এটি নতুন প্রজন্মের কাছে কুয়েতি ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়ার একটি সুন্দর মাধ্যম।
অর্থনীতি ও বাণিজ্য
কুয়েত সিটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক হাব। বিশ্বের মোট তেলের মজুতের একটি বিশাল অংশ কুয়েতে অবস্থিত। দেশটির জিডিপির প্রায় অর্ধেক এবং রপ্তানি আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই আসে তেল রপ্তানি থেকে। কুয়েত সিটিতে অবস্থিত বড় বড় সরকারি ও বেসরকারি তেল সংস্থাগুলো এই উৎপাদন ও বিপণন নিয়ন্ত্রণ করে, যা শহরটিকে বিশ্বের অন্যতম ধনী শহরে রূপান্তরিত করেছে।
আর্থিক খাতের কথা বলতে গেলে কুয়েত স্টক এক্সচেঞ্জ বা ‘বোরসা কুয়েত’-এর নাম সবার আগে আসে। এটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ শেয়ার বাজার। ১৯৭৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই বাজারটি এই অঞ্চলের আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বড় ভূমিকা পালন করে।
কুয়েত সিটির অর্থনীতির একটি বিশাল অংশ দখল করে আছে এর অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও পর্যটন। কেনাকাটার জন্য এই শহরটি সারা বিশ্বে সুপরিচিত। কুয়েত সিটির শপিং মলগুলো কেবল কেনাকাটার জায়গা নয়, এগুলো বড় বড় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ক্ষেত্র এবং হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য
একটি দেশের প্রকৃত সমৃদ্ধি নির্ভর করে তার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর। কুয়েত সিটি এই দুটি ক্ষেত্রেই অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশটির উচ্চশিক্ষার প্রধান স্তম্ভ। এখানে বিজ্ঞান, কলা, প্রকৌশল এবং চিকিৎসা শাস্ত্রের ওপর আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও গবেষণা পরিচালিত হয়। এটি কুয়েতের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এবং পেশাদার জনশক্তি তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
কুয়েত সিটিতে বিশ্বের বিভিন্ন খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা এবং প্রচুর আন্তর্জাতিক স্কুল রয়েছে। এর ফলে শহরটির প্রবাসী এবং স্থানীয় শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানের শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
কুয়েতের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম আধুনিক এবং ব্যয়সাশ্রয়ী হিসেবে পরিচিত। কুয়েত সরকার তার নাগরিকদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে অত্যাধুনিক চিকিৎসা নিশ্চিত করে। শহরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ‘পাবলিক ক্লিনিক’ এবং বিশাল সরকারি হাসপাতালগুলো উন্নত প্রযুক্তিতে সুসজ্জিত।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
কুয়েত সিটি এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তেল-নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি বহুমুখী, টেকসই এবং অত্যাধুনিক অর্থনৈতিক হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার লক্ষ্যে কুয়েত সরকার গ্রহণ করেছে মহাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা ‘ভিশন ২০৩৫’, যা মূলত ‘নিউ কুয়েত’ নামে পরিচিত। ভিশন ২০৩৫-এর মাধ্যমে কুয়েত সিটি নিজেকে আর্থিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রে রূপান্তরিত করতে চায়, যেখানে বেসরকারি খাতের ভূমিকা হবে প্রধান। জ্ঞানভিত্তিক শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি এবং লজিস্টিকস খাতে বিশাল বিনিয়োগের মাধ্যমে শহরটিকে নতুন রূপ দেওয়া হচ্ছে।
উপসংহার
কুয়েত সিটি কেবল কংক্রিটের জঙ্গল নয়, এটি একটি জাতির সংগ্রাম, ঐতিহ্য এবং সমৃদ্ধির গল্প বলে। বালুকাময় মরুভূমি আর নীল সমুদ্রের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এই শহরটি আরব আতিথেয়তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আপনি যদি ইতিহাসপ্রেমী হন কিংবা আধুনিক নাগরিক জীবনের ভক্ত কুয়েত সিটি আপনাকে নিরাশ করবে না।
কুয়েত সিটি সম্পর্কে কিছু চমৎকার তথ্য
- বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মুদ্রা: কুয়েত সিটি যে দেশের রাজধানী, সেই কুয়েতের মুদ্রা ‘কুয়েতি দিনার’ বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সর্বোচ্চ মূল্যের মুদ্রা।
- গাছেদের জন্য এসি! কুয়েত সিটির প্রচণ্ড তাপমাত্রা (যা অনেক সময় ৫০°C ছাড়িয়ে যায়) থেকে বাঁচতে এবং শহরকে সবুজ রাখতে এখানকার অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় এবং পার্কে বিশেষ পদ্ধতিতে গাছেদের জন্য পানির কুয়াশা তৈরি করা হয়, যা অনেকটা প্রাকৃতিক এসির মতো কাজ করে।
- বিনা ট্যাক্সের জীবন: কুয়েত সিটির নাগরিকদের কোনো ব্যক্তিগত আয়কর দিতে হয় না। এটি বিশ্বের অন্যতম ট্যাক্স-ফ্রি শহর হিসেবে পরিচিত।
- গাড়িপ্রেমীদের শহর: এই শহরে জনসংখ্যা অনুযায়ী গাড়ির সংখ্যা বিশ্বে অন্যতম সর্বোচ্চ। এখানে গণপরিবহনের চেয়ে ব্যক্তিগত বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহারের প্রবণতা অনেক বেশি।
- ইউনেস্কো স্বীকৃতি: কুয়েত টাওয়ারস তার অনন্য স্থাপত্যের জন্য ‘আগ খান স্থাপত্য পুরস্কার’ লাভ করেছিল এবং এটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পাওয়ার জন্য মনোনীত হয়েছে।
- বিশাল পপকর্ন প্রেম: কুয়েতিরা পপকর্ন এবং সিনেমা দেখতে খুব পছন্দ করে। জানলে অবাক হবেন, কুয়েতে বিশ্বের অন্যতম সেরা সিনেমা হলের অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন স্বাদের পপকর্নের বিশাল বাজার রয়েছে।
- পাখি শিকারের ঐতিহ্য: কুয়েত সিটির আকাশে শীতকালে প্রচুর পরিযায়ী পাখি দেখা যায়। বাজপাখি (Falcon) পালন এবং তা দিয়ে শিকার করা এখানকার পুরুষদের একটি অত্যন্ত সম্মানজনক ও প্রাচীন শখ।
- অ্যালকোহল মুক্ত শহর: কুয়েত সিটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান শহর যেখানে অ্যালকোহল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এটি শহরের সামাজিক পরিবেশে একটি শান্ত ও পারিবারিক আমেজ বজায় রাখে।
Reference:

