দ্য অ্যাভিনিউস মল -১২ লক্ষ স্কয়ার মিটারের এই বিশাল মলে ১,১০০টি দোকান ঘুরে দেখতে ৩৬ ঘণ্টার বেশি লেগে যাবে বলে এখানে শপিং করতে পায়ে হেঁটে নয়, সরাসরি ‘গলফ কার্ট’ গাড়ি নিয়ে নামতে হয়!
কুয়েত নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত মরুভূমি, তেলের খনি আর ঐতিহ্যবাহী আরব সংস্কৃতির ছবি। কিন্তু এই চেনা মরুভূমির বুকেই গড়ে উঠেছে আধুনিক স্থাপত্য আর বিলাসিতার এমন এক অবিশ্বাস্য নিদর্শন, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্য তো বটেই, গোটা বিশ্বের পর্যটকদের তাক লাগিয়ে দেয়। আমরা কথা বলছি কুয়েতের রাই এলাকায় অবস্থিত ‘দ্য অ্যাভিনিউস মল’ নিয়ে। প্রায় ১২ লক্ষ স্কয়ার মিটারেরও বেশি বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই মলটি পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ শপিং মল।
এক নজরে দ্য অ্যাভিনিউস মলের কিছু রোমাঞ্চকর তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| মোট আয়তন | ১২,০০,০০০+ স্কয়ার মিটার (বিশাল আকৃতি) |
| দোকানের সংখ্যা | ১,১০০-এর বেশি আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় ব্র্যান্ডের শোরুম |
| পার্কিং সুবিধা | প্রায় ১৩,০০০ গাড়ি একসাথে পার্ক করার সুবিশাল ব্যবস্থা |
| স্থাপত্যের পুরস্কার | ২০১৩ সালে ইন্টারন্যাশনাল প্রোপার্টি অ্যাওয়ার্ডস-এ সেরা শপিং মলের পুরস্কার লাভ |

দূরদর্শী পরিকল্পনা
২০০৭ সালের এপ্রিল মাসে কুয়েতের বিখ্যাত আলঘানিম ইন্ডাস্ট্রিজের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘মাবানি’-র হাত ধরে দ্য অ্যাভিনিউস মলের প্রথম ফেইজ চালু হয়। সে সময় কুয়েতে এত বড় শপিং মলের ধারণা ছিল সম্পূর্ণ নতুন। কিন্তু মাবানি কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা ছিল আরও সুদূরপ্রসারী। তারা কুয়েতকে কেবল তেলনির্ভর দেশ হিসেবে না রেখে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান পর্যটন ও বাণিজ্যিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিল।
পরবর্তীতে চাহিদা এবং জনপ্রিয়তার কথা মাথায় রেখে মোট ৪টি ফেইজে মলের পরিধি বাড়ানো হয়। ২০১৮ সালে এর চতুর্থ ও শেষ ফেইজের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর এটি বর্তমানের এই বিশাল ও রাজকীয় রূপ ধারণ করে। আজ এটি কুয়েতের স্থানীয় নাগরিকদের অবসরের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু এবং কুয়েতে আসা যেকোনো বিদেশি পর্যটকের জন্য এক নম্বর দর্শনীয় স্থান।
একটি মলের ভেতর পুরো বিশ্ব
দ্য অ্যাভিনিউস মলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ডিজাইন বা নকশা। পুরো মলটিকে কোনো সাধারণ চার দেয়ালের শপিং কমপ্লেক্সের মতো বানানো হয়নি। এটিকে সাজানো হয়েছে মোট ১২টি ভিন্ন ভিন্ন ‘ডিস্ট্রিক্ট’ বা জোনে, যার প্রতিটি জোনের স্থাপত্যশৈলী এবং পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা। মলের ভেতর হাঁটলে মনে হবে আপনি এক শহর থেকে অন্য শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

গ্র্যান্ড অ্যাভিনিউ
এটি মলের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং আকর্ষণীয় জোন। এই জোনে হাঁটলে আপনার মনে হবে আপনি প্যারিস বা লন্ডনের কোনো অভিজাত শপিং স্ট্রিট বা রাস্তার ওপর দিয়ে হাঁটছেন। রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধ গাছ, চমৎকার ল্যাম্পপোস্ট এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের শোরুম। সবচেয়ে জাদুকরী বিষয় হলো এর ছাদ। এর ছাদটি তৈরি করা হয়েছে বিশেষ এক ধরনের স্বচ্ছ প্লাস্টিক দিয়ে, যার ফলে ভেতরের আলো সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক মনে হয় এবং তীব্র গরমেও বাইরের নীল আকাশ দেখা যায়।
দ্য ফোরাম
লন্ডনের বিখ্যাত পিকাডিলি সার্কাসের আদলে তৈরি এই জোনটি আধুনিক স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। এর বিশাল গম্বুজ আকৃতির ছাদ এবং চারপাশের আলোকসজ্জা দর্শকদের মুগ্ধ করে। এখানে মূলত বিশ্বের নামী-দামী ফ্যাশন ব্র্যান্ডের কালেকশন পাওয়া যায়।
সুক
আপনি যদি আধুনিকতার ভিড়ে কুয়েতের ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন আরব্য সংস্কৃতির ছোঁয়া পেতে চান, তবে ‘সুক’ জোনটি আপনার জন্য। ঐতিহ্যবাহী কুয়েতি বাজারের আদলে এই জোনটি ডিজাইন করা হয়েছে। সরু গলি, মাটির রঙের দেয়াল, কাঠের কাজ এবং আরব্য সুগন্ধি (উদ ও আতর), মসলা এবং ঐতিহ্যবাহী পোশাকের দোকানগুলো আপনাকে কয়েক শতাব্দী পিছিয়ে নিয়ে যাবে।
প্রেস্টিজ
বিলাসিতা বা লাক্সারির শেষ কথা হলো প্রেস্টিজ জোন। আপনি যদি শ্যানেল, গুচ্চি , প্রাডা , বা লুই ভিটনের মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ডিজাইনার ব্র্যান্ডের কেনাকাটা করতে চান, তবে এই জোনটি আপনার স্বর্গ। এর মেঝেতে ব্যবহার করা হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে দামি মার্বেল এবং এর লাইটিং ও ডিজাইন অত্যন্ত রাজকীয়।
ইলেক্ট্রা
হংকং বা টোকিওর নিয়ন আলো ঝলমলে ডিজিটাল দুনিয়ার ফিল দিতে তৈরি করা হয়েছে ইলেক্ট্রা জোন। এটি মূলত গ্যাজেট এবং প্রযুক্তির দুনিয়া। বিশ্বের যেকোনো নতুন ফোন, ল্যাপটপ বা ইলেকট্রনিক সামগ্রী সবার আগে এই জোনে পাওয়া যায়। এর ইন্টারেক্টিভ স্ক্রিন ও লাইটিং তরুণদের দারুণ আকর্ষণ করে।

বিনোদন ও খাবারের এক মহা-উৎসব
দ্য অ্যাভিনিউস মল কেবল জামাকাপড় কেনার জায়গা নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ লাইফস্টাইল সেন্টার। এখানে বিনোদন এবং খাবারের এত বিশাল আয়োজন রয়েছে যে, পুরো মলটি ভালোভাবে ঘুরে দেখতে একজন মানুষের অন্তত দুই থেকে তিন দিন সময় লেগে যাবে।
- মলের ভেতরে রয়েছে কুয়েতের অন্যতম আধুনিক সিনেমা থিয়েটার কমপ্লেক্স। যেখানে আইম্যাক্স এবং ফোর-ডি প্রযুক্তিতে বিশ্বের যেকোনো নতুন সিনেমা উপভোগ করা যায়।
- শিশুদের বিনোদনের জন্য রয়েছে আন্তর্জাতিক থিম পার্ক ‘কিডজানিয়া’ এবং ‘টেকজোন’। যেখানে বাচ্চারা খেলার ছলে বিভিন্ন পেশা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারে।
- মলে রয়েছে প্রায় তিন শতাধিক ফুড আউটলেট, ক্যাফে এবং রেস্তোরাঁ। আমেরিকার বিখ্যাত ফাস্ট ফুড চেইন থেকে শুরু করে ইতালিয়ান পাস্তা, জাপানিজ সুশি, টার্কিশ কাবাব কিংবা ঐতিহ্যবাহী কুয়েতি খাবার—পৃথিবীর এমন কোনো বিখ্যাত কুজিন বা খাবার নেই যা এখানে পাওয়া যায় না। মলের ক্যাফেগুলোতে বসে কফি পানের কালচার কুয়েতিদের লাইফস্টাইলের একটি বড় অংশ।
বিলাসিতার নতুন ঠিকানা
দ্য অ্যাভিনিউস মলের ফেইজ ৪-এর অংশ হিসেবে এর ভেতরেই গড়ে তোলা হয়েছে দুটি আন্তর্জাতিক মানের বিলাসবহুল হোটেল ‘হিলটন গার্ডেন ইন’ এবং ‘ওয়ালডর্ফ অ্যাস্টোরিয়া ’। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ধনী ব্যবসায়ী এবং পর্যটকরা সরাসরি হোটেলের রুম থেকে বের হয়েই মলের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন। মলের সাথে হোটেলের এই সংযোগ এর গুরুত্ব ও বিলাসিতাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

কুয়েতের অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে এর প্রভাব
কুয়েতের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণ তেলনির্ভর। কিন্তু বর্তমান যুগে তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে পর্যটন ও বাণিজ্য খাতের উন্নয়নে দ্য অ্যাভিনিউস মল এক বিশাল ভূমিকা রাখছে। এই মলের কারণে কুয়েতের হাজার হাজার স্থানীয় নাগরিক এবং প্রবাসী মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কুয়েতের তীব্র গরমে (যখন তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়) বাইরের পার্ক বা সৈকতে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখন এই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশাল মলটিই হয়ে ওঠে কুয়েতের সাধারণ মানুষের প্রধান সামাজিক মিলনমেলা। এখানে এসে মানুষ হাঁটে, আড্ডা দেয় এবং নিজেদের সময় কাটায়।
সমাপ্তি
দ্য অ্যাভিনিউস মল কেবল কংক্রিট, কাচ আর স্টিলের তৈরি কোনো সাধারণ শপিং মল নয় এটি হলো কুয়েতের স্বপ্ন, আধুনিকতা এবং আতিথেয়তার এক জ্বলন্ত রূপ। ঐতিহ্যবাহী আরব্য সংস্কৃতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে পশ্চিমা আধুনিকতাকে আপন করে নেওয়া যায়, তার নিখুঁত উদাহরণ এই মলটি।
কুয়েতের ‘দ্য অ্যাভিনিউস মল’নিয়ে কিছু অদ্ভুত এবং তথ্য
- মলের ‘গ্র্যান্ড অ্যাভিনিউ’ জোনের ছাদটি কোনো কংক্রিট বা সাধারণ কাচ দিয়ে তৈরি নয়। এটি তৈরি করা হয়েছে ETFE (Ethylene Tetrafluoroethylene) নামের এক বিশেষ ধরনের স্বচ্ছ প্লাস্টিক দিয়ে। এটি ওজনে কাচের চেয়ে অনেক হালকা কিন্তু অত্যন্ত মজবুত। এই ছাদের কারণে দিনের বেলা মলের ভেতরে শতভাগ প্রাকৃতিক সূর্যের আলো আসে এবং তীব্র গরমেও মনে হয় আপনি ইউরোপের কোনো খোলা রাস্তার ওপর দিয়ে হাঁটছেন। এটি ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মিও আটকে দেয়।
- বিশাল এই মলে একসঙ্গে প্রায় ১৩,০০০ গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে! শপিং মলের ক্ষেত্রে এটি পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ পার্কিং লট। কাতার বা দুবাইয়ের মতো কুয়েতেও গাড়ি ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনেক বেশি, তাই দর্শনার্থীরা যাতে পার্কিং নিয়ে কোনো সমস্যায় না পড়েন, সেজন্যই এই রাজকীয় ব্যবস্থা।
- গ্রীষ্মকালে কুয়েতের তাপমাত্রা যখন ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়, তখন বাইরে হাঁটা বা জগিং করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর ঠিক তখনই কুয়েতিরা এই মলটিকে পার্ক হিসেবে ব্যবহার করেন! প্রতিদিন সকালবেলা মল খোলার পর হাজার হাজার স্থানীয় নাগরিক স্পোর্টস গিয়ার এবং কেডস পরে মলের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মাইলের পর মাইল হাঁটেন এবং শরীরচর্চা করেন। তীব্র গরমে এটিই কুয়েতের সবচেয়ে বড় ‘শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পাবলিক পার্ক’।
- দ্য অ্যাভিনিউস মলের মোট আয়তন প্রায় ১২ লক্ষ স্কয়ার মিটার, যেখানে ১,১০০-এরও বেশি দোকান রয়েছে। আপনি যদি প্রতিটি দোকানে মাত্র ২ মিনিট করেও সময় দেন, তবে পুরো মলটি একবার হেঁটে দেখে শেষ করতে আপনার ৩৬ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগবে! এই কারণে মলের ভেতরে যাতায়াতের জন্য বিশেষ ‘গলফ কার্ট’ বা ছোট গাড়ির সুবিধা রয়েছে।
- এই মলের ভেতরে শিশুদের জন্য রয়েছে বিখ্যাত ‘কিডজানিয়া’ থিম পার্ক। এটি মূলত একটি ছোট শহর, যেখানে শিশুরা বড়দের মতো বিভিন্ন পেশা (যেমন: ডাক্তার, পাইলট, ফায়ার ফাইটার, সাংবাদিক) বেছে নিয়ে কাজ করতে পারে এবং তার বিনিময়ে ‘কিডজোস’ নামের কৃত্রিম কারেন্সি বা টাকা আয় করতে পারে। শিশুদের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা দেওয়ার জন্য এটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সেরা স্পট।
Reference:
- https://en.wikipedia.org/wiki/The_Avenues_(Kuwait)
- https://kids.kiddle.co/The_Avenues_(shopping_mall)

