ডগলাস সান্তোস হলেন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সেই নীরব যোদ্ধাদের একজন, যিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থেকেও বছরের পর বছর ধরে ইউরোপের মাটিতে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে গেছেন। ব্রাজিলিয়ান লেফট-ব্যাক মানেই যেখানে রবার্তো কার্লোস বা মার্সেলোর মতো আক্রমণাত্মক গ্ল্যামারের গল্প, সেখানে ডগলাস সান্তোস নিজের ধারাবাহিকতা, ঠান্ডা মাথার ডিফেন্স এবং ট্রফিজয়ী মানসিকতা দিয়ে আলাদা এক পরিচয় তৈরি করেছেন।
ডগলাস সান্তোস জুস্তিনো দে মেলো- এর ব্যক্তিগত তথ্য:
|
নামxa0 |
ডগলাস সান্তোস জুস্তিনো দে মেলো |
|
জন্ম xa0 |
২২ মার্চ ১৯৯৪ (বয়স ৩২) |
|
জন্মস্থানxa0 |
জোয়াও পেসোয়া , ব্রাজিল |
|
উচ্চতাxa0 |
১.৭৫ মিটার (৫ ফুট ৯ ইঞ্চি) |
|
পজিশনxa0 |
লেফট-ব্যাক |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
নাউটিকো,গ্রানাডা,উডিনেসে,উদিনেস,অ্যাটলেটিকো মিনেরো,হামবুর্গ এসভি এবং বর্তমানে জেনিত সেন্ট পিটার্সবার্গ ক্লাবের হয়ে খেলছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০১৬– ব্রাজিল |

১৯৯৪ সালের ২২ মার্চ ব্রাজিলের পারাইবা রাজ্যের জোয়াও পেসোয়ায় জন্মগ্রহণ করেন ডগলাস সান্তোস জুস্তিনো দে মেলো। ব্রাজিলের আর দশটা সাধারণ ছেলের মতো তাঁরও শৈশব কেটেছে চরম দারিদ্র্য আর ফুটবলের প্রতি তীব্র ভালোবাসার মধ্য দিয়ে। ডগলাসের ফুটবল যাত্রা শুরু হয় ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ক্লাব ‘নাউতিকো’র যুব একাডেমি থেকে।
২০১২ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে নাউতিকোর সিনিয়র দলের হয়ে তাঁর অভিষেক হয়। ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের যেখানে আক্রমণাত্মক হওয়ার সহজাত প্রবণতা থাকে, সেখানে ডগলাস ছোটবেলা থেকেই ডিফেন্স এবং অ্যাটাকের মধ্যে একটা সুন্দর ভারসাম্য বজায় রাখতে শিখেছিলেন।
২০১৩ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে ডগলাস স্প্যানিশ ক্লাব গ্রানাদায় যোগ দেন, তবে সেখান থেকে তাঁকে ইতালির উদিনেস-এ লোনে পাঠানো হয়। ইউরোপীয় ফুটবলের প্রথম ছোঁয়া পেলেও সেখানে মানিয়ে নেওয়া তাঁর জন্য কিছুটা কঠিন ছিল। ফলস্বরূপ, তিনি ২০১৪ সালে ব্রাজিলের অন্যতম শীর্ষ ক্লাব আতলেতিকো মিনেইরোতে ফিরে আসেন।xa0
আতলেতিকো মিনেইরোর হয়ে ২০১৪ সালে ‘কোপা দো ব্রাসিল’ জয় ছিল তাঁর ঘরোয়া ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য। এই টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফর্ম করে তিনি নিজেকে ব্রাজিলের ঘরোয়া ফুটবলের সেরা তরুণ লেফট-ব্যাক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর রাডারে পুনরায় চলে আসেন।

২০১৬ সালের আগস্টে জার্মানির বুন্দেসলিগার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব হামবুর্গ এসভি ডগলাস সান্তোসকে প্রায় ৭.৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে দলে ভেড়ায়। জার্মানির ফুটবল মানেই অতিরিক্ত ফিজিক্যাল, গতিময় এবং ট্যাকটিক্যালি নিখুঁত। ডগলাস বুন্দেসলিগার এই কঠিন পরিবেশের সাথে দ্রুতই নিজেকে মানিয়ে নেন। হামবুর্গের হয়ে তিনি তিন মৌসুমে ১০০-র বেশি ম্যাচ খেলেন।
২০১৯ সালের জুলাইয়ে ডগলাস সান্তোসের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় এবং সফল টার্নিং পয়েন্ট আসে। রাশিয়ান প্রিমিয়ার লিগের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ধনী ক্লাব জেনিত সেন্ট পিটার্সবার্গ তাঁকে ১০.৮ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে সাইন করায়। আর এই ক্লাবে এসেই ডগলাসের ক্যারিয়ার এক নতুন উচ্চতা লাভ করে।
জেনিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে ক্লাবটির রক্ষণভাগের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেন তিনি। তাঁর ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, ঠান্ডা মাথায় ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ এবং অসাধারণ লিডারশিপ কোয়ালিটির কারণে খুব দ্রুতই তিনি দলের অবিসংবাদিত নেতা হয়ে ওঠেন। ২০২২ সাল থেকে জেনিতের অফিসিয়াল অধিনায়কের দায়িত্ব পান তিনি। একজন বিদেশী খেলোয়াড় হিসেবে রাশিয়ান জায়ান্ট ক্লাবের আর্মব্যান্ড পাওয়া অত্যন্ত বিরল ঘটনা। জেনিতের হয়ে ডগলাস সান্তোস টানা ৫ বার রাশিয়ান প্রিমিয়ার লিগ, একাধিকবার রাশিয়ান কাপ এবং রাশিয়ান সুপার কাপ জেতার অনন্য কীর্তি গড়েন।xa0
ডগলাস সান্তোসের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে মধুর এবং ঐতিহাসিক অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ২০১৬ সালে, ব্রাজিলের মাটিতেই। ২০১৬ রিও অলিম্পিকে নেইমার জুনিয়রের নেতৃত্বে সোনা জয়ের মিশনে নেমেছিল ব্রাজিল। সেই অনূর্ধ্ব-২৩ দলের মূল লেফট-ব্যাক পজিশনে কোচের প্রথম পছন্দ ছিলেন ২২ বছর বয়সী ডগলাস সান্তোস।

পুরো টুর্নামেন্টে ব্রাজিলের রক্ষণভাগকে নিশ্ছিদ্র রাখতে তিনি অসামান্য অবদান রাখেন। গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে নকআউট পর্ব ডগলাসের উইং দিয়ে প্রতিপক্ষের কোনো আক্রমণই সফল হতে পারেনি। ফাইনালে বিখ্যাত মারাকানা স্টেডিয়ামে জার্মানিকে ট্রাইবেকারে হারিয়ে ব্রাজিলের ইতিহাসের প্রথম অলিম্পিক ফুটবল সোনা জয়ের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের অন্যতম নীরব নায়ক ছিলেন ডগলাস।
অলিম্পিকের এই চোখধাঁধানো সাফল্যের পর ব্রাজিলের জাতীয় দলেও তাঁর অভিষেক হয়। যদিও মার্সেলো, ফিলিপে লুইস এবং পরবর্তীতে অ্যালেক্স সান্দ্রোদের মতো তারকাদের তীব্র কম্পিটিশনের কারণে জাতীয় দলে তাঁর নিয়মিত হওয়া কঠিন ছিল, তবুও যখনই তিনি সুযোগ পেয়েছেন, নিজের সেরাটা দিয়েছেন।
আনচেলত্তি ড্রেসিংরুমে সবসময় শান্ত এবং অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের ওপর ভরসা করেন যারা তরুণদের গাইড করতে পারে। জেনিতের অধিনায়ক হিসেবে ডগলাস সান্তোসের যে অভিজ্ঞতা, তা বিশ্বকাপের ব্রাজিলের তরুণ ও ঝাঁঝালো স্কোয়াডকে পেছন থেকে শান্ত রাখতে এবং মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখতে দারুণ ভূমিকা রাখবে। ২০২৬ বিশ্বকাপের দীর্ঘ ও চাপযুক্ত জার্নিতে ডগলাস সান্তোসের মতো একজন ‘নীরব ট্রফি মেশিন’ দলের ডাগআউটে বা মাঠে থাকা যেকোনো কোচের জন্যই এক বিশাল প্লাস পয়েন্ট!
Reference:

