রিভার প্লেটের ড্রেসিংরুমে বসে চিরশত্রু বোকা জুনিয়র্সের গুণগান গাওয়া আর বাঘের খাঁচায় ঢুকে বাঘকে বলা “ভাই, সিংহের গায়ের গন্ধ কিন্তু তোমার চেয়ে জোস!”—দুটো একদম একই কথা! নিজের ফ্যানদের ‘ফ্লপ’ আর শত্রুদের ‘হিট’ সার্টিফিকেট দিয়ে আহুমাডা রিভার প্লেটের গ্যালারিতে এমন এক আগুন জ্বালিয়েছিলেন, যেখানে ওভেন ছাড়াই তার নিজের ক্যারিয়ারের বার্বিকিউ হয়ে গিয়েছিল!
ফুটবল মাঠে একটা ভুল পাস বা একটা আত্মঘাতী গোল হয়তো আপনাকে একটা ম্যাচের জন্য খলনায়ক বানাবে। কিন্তু মুখ ফসকে বলা মাত্র দুটি শব্দ যে আপনার গোটা ক্যারিয়ারকে জীবন্ত নরক বানিয়ে দিতে পারে, তা অস্কার আহুমাডার চেয়ে ভালো আর কে জানে! ২০০৮ সালের এক অভিশপ্ত রাতে রিভার প্লেটের এই ঘরের ছেলে নিজের ক্লাবের সমর্থকদের এমন এক গালি দিয়েছিলেন, যার মাশুল তাকে দিতে হয়েছে ক্যারিয়ারের শেষ দিন পর্যন্ত। আজ আমরা শুনব ফুটবলের ইতিহাসের সেই সবচেয়ে সাহসী অথচ আত্মঘাতী ট্র্যাজেডির গল্প।xa0
অস্কার আদ্রিয়ান আহুমাডা- এর ব্যক্তিগত তথ্য:
| নামxa0 |
অস্কার আদ্রিয়ান আহুমাডা |
|
জন্ম xa0 |
৩১ আগস্ট ১৯৮২ (বয়স ৪৩) |
|
জন্মস্থানxa0 |
জারাতে , আর্জেন্টিনা |
|
উচ্চতাxa0 |
১.৭০ মিটার (৫ ফুট ৭ ইঞ্চি) |
|
পজিশনxa0 |
রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
রিভার প্লেট,ভিএফএল উলফসবার্গ,ভেরাক্রুজ,রোস্তভ এবং অল বয়েজ ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০১২- আর্জেন্টিনা |

১৯৮২ সালের ৩১ আগস্ট আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসের জারাতে জন্মগ্রহণ করেন অস্কার আদ্রিয়ান আহুমাডা। ছোটবেলা থেকেই তার ফুটবলের প্রতি ছিল দারুণ একাগ্রতা। একজন সেন্ট্রাল বা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে মাঠের মাঝখানে কঠোর পরিশ্রম করার মানসিকতা তার মধ্যে ছোটবেলা থেকেই স্পষ্ট ছিল।
খুব কম বয়সেই তিনি আর্জেন্টিনার অন্যতম সফল এবং বিশ্ববিখ্যাত যুব একাডেমি রিভার প্লেট-এ যোগ দেন। রিভার প্লেটের যুব দলগুলোর হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে তিনি ক্লাবের প্রতিটি ধাপ সফলভাবে পার করেন এবং ২০০২ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে ক্লাবের মূল দলে তার অভিষেক ঘটে। মাঝমাঠে বল কেড়ে নেওয়া, প্রতিপক্ষের আক্রমণ শুরুতেই ধ্বংস করে দেওয়া এবং সতীর্থ ডিফেন্ডারদের কভার দেওয়ার ক্ষমতাই তাকে রিভার প্লেটের মতো বড় ক্লাবের মূল একাদশের রেগুলার মুখ করে তোলে।
২০০২ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত রিভার প্লেটের মাঝমাঠের অন্যতম প্রধান ভরসা ছিলেন আহুমাডা। ক্লাবের হয়ে তিনি ২০০৩ এবং ২০০৪ সালে আর্জেন্টিনার প্রিমেরা বিভাগের ‘ক্লসুরা’ শিরোপা জয় করেন। ২০০৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য জার্মান ক্লাব ভলফসবুর্গ-এ যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু ইউরোপের পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে না পেরে মাত্র ১৭টি ম্যাচ খেলে ২০০৫ সালেই তিনি পুনরায় নিজের প্রিয় ক্লাব রিভার প্লেটে ফিরে আসেন।

ফিরে আসার পর তিনি রিভার প্লেটের তৎকালীন কোচ এবং আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি ডিয়েগো সিমিওনের অধীনে দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিতে পরিণত হন। ২০০৮ সালেও তিনি রিভার প্লেটের হয়ে আরেকটি ক্লসুরা শিরোপা জিতেন। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালেই ওত পেতে ছিল তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে অন্ধকার রাত।
২০০৮ সালের মে মাস। কোপা লিবার্তোদোরেসের রাউন্ড অব সিক্সটিনের দ্বিতীয় লেগের ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল দুই আর্জেন্টাইন জায়ান্ট—রিভার প্লেট এবং সান লোরেনজো। রিভার প্লেটের হোম গ্রাউন্ড ‘এল মনুমেন্টাল’ স্টেডিয়ামে ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হচ্ছিল।
ম্যাচের একপর্যায়ে সান লোরেনজোর দুজন খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। ১১ জনের রিভার প্লেট তখন খেলছিল ৯ জনের সান লোরেনজোর বিপক্ষে! শুধু তাই নয়, রিভার প্লেট ম্যাচে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল এবং দুই লেগ মিলিয়ে তাদের কোয়ালিফাই করা ছিল সময়ের ব্যাপার। কিন্তু এরপরই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন ঘটে। ৯ জনের সান লোরেনজো অবিশ্বাস্যভাবে দুটি গোল শোধ করে ম্যাচটি ২-২ সমতায় শেষ করে এবং রিভার প্লেটকে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দেয়।

ঘরের মাঠে এমন লড়াকু মানসিকতার অভাব দেখে মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামের হাজার হাজার রিভার প্লেট সমর্থক ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা নিজেদের খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্য করে ভুয়া ধ্বনি দিতে থাকেন এবং অপমানজনক স্লোগান দেন।
ম্যাচ শেষের কয়েকদিন পর এক রেডিও সাক্ষাৎকারে ক্ষুব্ধ ও হতাশ অস্কার আহুমাডা নিজের আবেগ ধরে রাখতে না পেরে সরাসরি রিভার প্লেটের সমর্থকদের আক্রমণ করে বসেন। তিনি বলেন:
“যখন সান লোরেনজো প্রথম গোলটা করল, তখন মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে এক তীব্র নীরবতা নেমে এসেছিল। গ্যালারি থেকে আমাদের সমর্থকরা কোনো চিৎকার বা উৎসাহ দিচ্ছিল না। অথচ আমি যখন বোকা জুনিয়র্সের মাঠ বোম্বোনেরাতে খেলেছি, তখন দেখেছি ওদের দল ২-০ তে পিছিয়ে থাকলেও সমর্থকরা গ্যালারি কাঁপিয়ে গান গায়। আমাদের সমর্থকরা সেটা পারেনি।”
এই একটি মন্তব্য রিভার প্লেটের সমর্থকদের এতটাই ক্ষুব্ধ করে যে, তারা আহুমাডাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। এরপর থেকে আহুমাডা যখনই মাঠে নামতেন, নিজের ক্লাবের সমর্থকরাই তাকে পুরো ৯০ মিনিট ধরে ভুয়া ধ্বনি দিত। রিভার প্লেটে তার থাকাটা মানসিকভাবে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
ক্লাব ফুটবলে এই বিতর্কের কারণে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আহুমাডা আর্জেন্টিনার অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে ২০০১ সালের ফিফা যুব বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিলেন, যেখানে তার সতীর্থ ছিলেন হ্যাভিয়ের সাভিওলা এবং আন্দ্রেস ডি’আলেসান্দ্রোর মতো তারকারা।
কিন্তু সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে তিনি মাত্র ১টি ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। ২০০৩ সালে লুইস অগাস্তো গালভানের অধীনে একটি প্রীতি ম্যাচে তার অভিষেক হয়েছিল। এরপর ঘরোয়া লিগে ভালো খেলা সত্ত্বেও সমর্থকদের তীব্র রোষানল এবং বিতর্কের কারণে জাতীয় দলের নির্বাচকরা তাকে আর দলে ডাকার সাহস করেননি।

সমর্থকদের তীব্র ঘৃণার মুখে টিকতে না পেরে ২০১০ সালে আহুমাডা রিভার প্লেট ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর তার ক্যারিয়ার ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামতে থাকে। ২০১০ সালে মেক্সিকান ক্লাব ভেরাক্রুজে যোগ দেন, কিন্তু সেখানে খুব বেশিদিন স্থায়ী হতে পারেননি। ২০১১ সালে তিনি রাশিয়ান লিগের ক্লাব রস্তভে যোগ দেন। সেখানে এক মৌসুমে ২০টি ম্যাচ খেলেন। ২০১২ সালে তিনি আবার আর্জেন্টিনায় ফিরে আসেন এবং অল বয়েজ ক্লাবে যোগ দেন। এখানে তিনি কিছুটা নিয়মিত খেলার সুযোগ পান এবং ৪১টি ম্যাচে অংশ নেন।
২০১৪ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে ইনজুরি এবং মানসিক ক্লান্তির কারণে ফুটবলকে চিরতরে বিদায় জানান অস্কার আহুমাডা। অবসরের পর তিনি ফুটবল জগত থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরে যান। তিনি ফুটবল কোচিং বা মিডিয়ার আলোয় আসেননি, বরং একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে অন্তরালে জীবনযাপন করছেন।
আহুমাডা পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছিলেন যে, সেই মন্তব্যটি করা তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল এবং আবেগতাড়িত হয়ে তিনি সেটি বলে ফেলেছিলেন। কিন্তু ফুটবল রোমান্টিকদের দেশ আর্জেন্টিনায় সমর্থকরা যে কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে, আহুমাডার ক্যারিয়ার তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
Reference:xa0

