ফুটবল দুনিয়ায় একটা জোক প্রচলিত আছে নটিংহাম ফরেস্ট নাকি দলবদলের বাজারে আলু-পটলের মতো পাইকারি দরে প্লেয়ার কেনে! প্রতি উইন্ডোতে ৩০-৪০ জন প্লেয়ার কেনা যাদের অভ্যাস, তারা যে ২০২৪ সালে ভুল করে হোক বা হিসাব কষে, একদম খাঁটি একটা জিনিস কিনে ফেলেছে তার নাম এলিয়ট অ্যান্ডারসন। ৩৫ মিলিয়ন পাউন্ডে কেনা এই ছেলেটি এখন ফরেস্টের মাঝমাঠের এমন চালিকাশক্তি, যাকে ছাড়া স্কোয়াডই অচল।
এলিয়ট অ্যান্ডারসন’র ব্যক্তিগত তথ্য:
| নাম |
এলিয়ট জুনিয়র অ্যান্ডারসন |
|
জন্ম |
৬ নভেম্বর ২০০২ (বয়স ২৩) |
|
জন্মস্থান |
হুইটলি বে , ইংল্যান্ড |
|
উচ্চতা |
৫ ফুট ১০ ইঞ্চি (১.৭৯ মিটার) |
|
পজিশন |
মিডফিল্ডার |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
নিউক্যাসল ইউনাইটেড, ব্রিস্টল রোভার্স এবং বর্তমানে নটিংহাম ফরেস্ট ক্লাবের হয়ে খেলছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০২৫– ইংল্যান্ড |

২০০২ সালের ৬ই নভেম্বর ইংল্যান্ডের হোয়াইটলি বে-তে জন্মগ্রহণ করেন এলিয়ট অ্যান্ডারসন। তাঁর বেড়ে ওঠা এবং ফুটবলের প্রতি টান মূলত তাঁর পারিবারিক পরিবেশ থেকেই আসা। তাঁর দাদা জিওফ অ্যালেন ছিলেন ১৯৬০-এর দশকে নিউক্যাসল ইউনাইটেডের একজন উইঙ্গার। ফলে অ্যান্ডারসনের রক্তেই ছিল ফুটবল এবং নিউক্যাসলের ঐতিহ্য।
মাত্র আট বছর বয়সে তিনি নিউক্যাসল ইউনাইটেডের বিখ্যাত যুব একাডেমিতে যোগ দেন। একাডেমির প্রতিটি স্তরে অ্যান্ডারসন তাঁর অসাধারণ ড্রিবলিং স্কিল এবং বল নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার জন্য কোচেদের বিশেষ নজর কাড়েন। তিনি মূলত একজন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে খেলা শুরু করলেও, তাঁর মধ্যে উইঙ্গার বা প্রথাগত সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে খেলারও দারুণ ট্যাকটিক্যাল পরিপক্বতা ছিল।
নিউক্যাসলের মূল দলে নিয়মিত হওয়ার আগে এলিয়ট অ্যান্ডারসনের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল ২০২১-২২ মৌসুমের দ্বিতীয়ার্ধে ব্রিস্টল রোভার্সে ধারে খেলতে যাওয়া। লিগ টু-র এই ক্লাবে যোগ দিয়ে অ্যান্ডারসন যা করেছিলেন, তা ইংলিশ লোয়ার লিগের ইতিহাসে রূপকথা হয়ে থাকবে।

ব্রিস্টল রোভার্সের হয়ে মাত্র ২১ ম্যাচে তিনি ৭টি গোল করেন এবং ৬টি অ্যাসিস্ট করেন। মাঠের ডান-বাম সব প্রান্তে একাই আক্রমণ সামলানোর কারণে ক্লাবের তৎকালীন ম্যানেজার এবং কিংবদন্তি ফুটবলার জোয়ি বার্টন তাঁর খেলার ধরনের সাথে ডিয়েগো ম্যারাডোনার মিল খুঁজে পান।
মৌসুমের শেষ ম্যাচে ব্রিস্টল রোভার্সের সরাসরি লিগ ওয়ানে প্রমোশন পাওয়ার জন্য অন্তত ৭-০ গোলের ব্যবধানে জিততে হতো। এলিয়ট অ্যান্ডারসন সেই ম্যাচে এক অবিশ্বাস্য পারফর্ম করেন এবং ম্যাচের ৮৫ মিনিটে দলের সপ্তম এবং ঐতিহাসিক গোলটি করে দলকে সরাসরি প্রমোশন এনে দেন। এই এক ম্যাচ অ্যান্ডারসনকে রাতারাতি পুরো ইংল্যান্ডের ফুটবল মহলে লাইমলাইটে নিয়ে আসে।

ব্রিস্টল রোভার্সের সেই স্বপ্নের মৌসুমের পর নিউক্যাসলের তৎকালীন এবং বর্তমান কোচ এডি হাও অ্যান্ডারসনকে ক্লাবের মূল স্কোয়াডের অংশ হিসেবে রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২০২২-২৩ এবং ২০২৩-২৪ মৌসুমে নিউক্যাসল যখন প্রিমিয়ার লিগের শীর্ষ চারে থাকার লড়াই করছিল এবং উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে জায়গা করে নিয়েছিল, তখন অ্যান্ডারসন ছিলেন দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘ইমপ্যাক্ট সাব’ এবং ট্যাকটিক্যাল অস্ত্র।
তবে নিউক্যাসলের মতো তারকাবহুল স্কোয়াডে ব্রুনো গিমারায়েস, জোয়েলিন্টন এবং স্যান্ড্রো টোনালির মতো বিশ্বমানের মিডফিল্ডারদের উপস্থিতির কারণে এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে প্রায়ই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডের পাশাপাশি লেফট-উইং পজিশনেও খেলতে হতো। কিন্তু যখনই সুযোগ পেয়েছেন, নিজের চেনা গতি আর ড্রিবলিং দিয়ে সেন্ট জেমস পার্কের দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন এই লোকাল বয়।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ইংলিশ ফুটবলের ট্রান্সফার মার্কেটে অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল এলিয়ট অ্যান্ডারসনের নিউক্যাসল ছেড়ে নটিংহাম ফরেস্টে যোগ দেওয়া। নিউক্যাসল ফ্যানদের জন্য এটি ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক একটি সিদ্ধান্ত। সেন্ট জেমস পার্ক ছাড়ার সময় অ্যান্ডারসন এবং সমর্থক উভয়ের জন্যই এটি আবেগময় মুহূর্ত হলেও, ট্যাকটিক্যালি এটি এলিয়ট অ্যান্ডারসনের ক্যারিয়ারের জন্য এক আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়। নটিংহাম ফরেস্টে এসে তিনি এমন এক প্ল্যাটফর্ম পান যেখানে তিনি নিয়মিত শুরুর একাদশে খেলার সুযোগ পান।

নটিংহাম ফরেস্টে যোগ দেওয়ার পর থেকে অ্যান্ডারসন তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা সময় পার করছেন। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ফরেস্টের প্রিমিয়ার লিগের টেবিলে চমৎকার অবস্থানের পেছনে অ্যান্ডারসনের অ্যাসিস্ট এবং মাঝমাঠের ওয়ার্ক-রেট ছিল প্রশংসনীয়।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে এলিয়ট অ্যান্ডারসনের গল্পটা বেশ আকর্ষণীয়। ইংল্যান্ডে জন্ম ও বেড়ে উঠলেও তাঁর দিদিমা স্কটিশ হওয়ার কারণে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলে আয়ারল্যান্ড বা স্কটল্যান্ডের হয়ে খেলার যোগ্যতা রাখতেন। তিনি অনূর্ধ্ব-১৬ পর্যায়ে ইংল্যান্ডের হয়ে খেললেও পরবর্তীতে অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-১৮ এবং অনূর্ধ্ব-২১ পর্যায়ে স্কটল্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করেন।
যদিও এলিয়ট অ্যান্ডারসন অনূর্ধ্ব-২১ পর্যায় পর্যন্ত স্কটল্যান্ডের হয়ে খেলেছিলেন এবং ২০২৩ সালে স্কটল্যান্ডের সিনিয়র দলেও ডাক পেয়েছিলেন, তবে তিনি কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর জন্মভূমি ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়েই খেলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।
নটিংহাম ফরেস্টের হয়ে প্রিমিয়ার লিগে তাঁর চোখধাঁধানো পারফরম্যান্সের সুবাদে ২০২৪ সালের শেষদিকে ইংল্যান্ডের তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন কোচ লি কার্সলি তাঁকে থ্রি-লায়ন্সদের সিনিয়র স্কোয়াডে প্রথমবার ডাকেন এবং ইংল্যান্ডের জার্সিতে তাঁর ডেবিউ হয়।
২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে এলিয়ট অ্যান্ডারসন ফুটবলপ্রেমীদের জন্য অন্যতম এক বড় চমক। জুড বেলিংহ্যাম, ডেক্লান রাইস বা ফিল ফোডেনের মতো প্রতিষ্ঠিত তারকাদের কারণে অ্যান্ডারসনকে হয়তো সব ম্যাচে শুরুর একাদশে দেখা যায় না, তবে দ্বিতীয়ার্ধে প্রতিপক্ষের ক্লান্ত ডিফেন্স লাইনের ওপর চড়াও হতে ‘ইমপ্যাক্ট সাব’ হিসেবে তাঁর জুড়ি মেলা ভার।
স্কটল্যান্ড বনাম ইংল্যান্ডের আন্তর্জাতিক টানাটানি পেছনে ফেলে থ্রি-লায়ন্সদের সাদা জার্সিতে বিশ্বমঞ্চ মাতানো অ্যান্ডারসনের ক্যারিয়ারের জন্য এক বিশাল মাইলফলক।
Reference:

