Image default
ক্রীড়াবিদজীবনীফুটবল

দ্য ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ফ্যাবিনহো!

স্বামীর ফুটবল ক্যারিয়ারের জন্য নিজের বুটজোড়া তুলে রেখে, রেবেকা তাভারেস স্পেনের মাঠ কাঁপানো ফুটবলার থেকে এক নিমেষেই অ্যানফিল্ডের গ্যালারি কাঁপানো লিভারপুলের সবচেয়ে বড় ‘ফ্যান গার্ল’ হয়ে উঠেছিলেন! 

মাঝমাঠের যেকোনো আলগা বল বা প্রতিপক্ষের আক্রমণ একাই শুষে নেওয়ার ক্ষমতার কারণে ইয়ুর্গেন ক্লপ তাকে ডাকতেন ‘ডাইসন ভ্যাকুয়াম ক্লিনার’। বলছিলাম ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ড জেনারেল ফ্যাবিনহোর কথা। রাইট-ব্যাক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করলেও এএস মোনাকো এবং পরবর্তীতে লিভারপুলের হয়ে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে নিজেকে বিশ্বসেরাদের কাতারে নিয়ে যান। চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ও প্রিমিয়ার লীগ জয়ী এই তারকা বর্তমানে লাতিন ঘরানার ফুটবল শৈলী ছড়াচ্ছেন সৌদি প্রফেশনাল লীগে। 

ফ্যাবিনহো- এর ব্যক্তিগত তথ্য:

নাম

ফ্যাবিও হেনরিকে তাভারেস

জন্ম

২৩ অক্টোবর ১৯৯৩ (বয়স ৩২)

জন্মস্থান

ক্যাম্পিনাস , ব্রাজিল

উচ্চতা

১.৮৮ মিটার (৬ ফুট ২ ইঞ্চি)

পজিশন

রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার / সেন্টার-ব্যাক

ক্লাব ক্যারিয়ার

ফ্লুমিনেন্স,রিও অ্যাভিনিউ,রিয়াল মাদ্রিদ কাস্তিয়া,রিয়াল মাদ্রিদ,মোনাকো,লিভারপুল এবং বর্তমানে আল-ইত্তিহাদ ক্লাবের হয়ে খেলছেন।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

২০১৫– ব্রাজিল

ফ্যাবিনহো – Image Source: www.skysports.com

১৯৯৩ সালের ২৩ অক্টোবর ব্রাজিলের সাও পাওলোর ক্যাম্পিনাসে জন্মগ্রহণ করেন ফ্যাবিও হেনরিকে তাভারেস, ফুটবল বিশ্ব যাকে একনামে ‘ফ্যাবিনহো’ বলে চেনে। ব্রাজিলের আর দশটা সাধারণ ছেলের মতোই তার শৈশব কেটেছে বল পায়ে গলির ফুটবলে। তবে তার প্রতিভা ছিল চোখে পড়ার মতো।

২০০৬ সালে তিনি ব্রাজিলের ফ্লুমিনেন্সে ক্লাবের যুব একাডেমিতে যোগ দেন। ফ্লুমিনেন্সের একাডেমি ডিফেন্ডার তৈরির জন্য বিখ্যাত হলেও ফ্যাবিনহো সেখানে মূলত রাইট-ব্যাক হিসেবে খেলা শুরু করেন। ক্লাবের বয়সভিত্তিক দলগুলোতে তার শারীরিক গঠন এবং মাঝমাঠ ও ডিফেন্সের যেকোনো পজিশনে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা দেখে স্কাউটরা তার মধ্যে বড় তারকার আভাস পান। তবে ব্রাজিলের মূল দলে খেলার আগেই মাত্র ১৮ বছর বয়সে ইউরোপের দরজায় কড়া নাড়েন এই প্রতিভাবান ফুটবলার।

২০১২ সালের জুনে ফ্যাবিনহো পর্তুগিজ ক্লাব রিউ অ্যাভের সাথে ৬ বছরের চুক্তি করেন। তবে রিউ অ্যাভের হয়ে একটি ম্যাচও না খেলে তিনি ধারে যোগ দেন স্পেনের পরাশক্তি রিয়াল মাদ্রিদের রিজার্ভ টিম ‘রিয়াল মাদ্রিদ কাস্তিয়া’-তে। কাস্তিয়ার হয়ে তিনি দুর্দান্ত এক মৌসুম কাটান এবং ৩০টি ম্যাচ খেলেন।

তার এই পারফরম্যান্স তৎকালীন রিয়াল মাদ্রিদ মূল দলের কোচ জোসে মরিনহোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ২০১৩ সালের ৮ মে মালাগার বিরুদ্ধে ম্যাচে রিয়াল মাদ্রিদের মূল দলের হয়ে ফ্যাবিনহোর অভিষেক হয়। সেই ম্যাচে তিনি আনহেল ডি মারিয়ার একটি গোলে অ্যাসিস্টও করেছিলেন। তবে রিয়াল মাদ্রিদের তারকাখচিত স্কোয়াডে রাইট-ব্যাক পজিশনে তখন আলভারো আরবেলোয়া এবং সার্জিও রামোসের মতো খেলোয়াড়দের ভিড়ে নিয়মিত সুযোগ পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। ফলে ফ্যাবিনহো তার ক্যারিয়ারের পরবর্তী এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁকটি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

২০১৩ সালের জুলাই মাসে ফ্যাবিনহো ফরাসি ক্লাব এএস মোনাকোতে ধারে যোগ দেন। মোনাকোতে প্রথম দুই মৌসুম তিনি মূলত রাইট-ব্যাক হিসেবেই খেলেন এবং তার রক্ষণাত্মক দক্ষতার প্রমাণ দেন। ২০১৫ সালে মোনাকো তাকে স্থায়ীভাবে কিনে নেয়।

কোচ লিওনার্দো জারদিম– Image Source: onefootball.com

তবে ফ্যাবিনহোর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মোড়টি আসে যখন মোনাকোর কোচ লিওনার্দো জারদিম তাকে রাইট-ব্যাক পজিশন থেকে সরিয়ে সেন্ট্রাল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে খেলানো শুরু করেন। এই পজিশন পরিবর্তনের সিদ্ধান্তটি ফ্যাবিনহোর ভেতরের আসল দানবটিকে জাগিয়ে তোলে। লম্বা শারীরিক গঠন এবং দীর্ঘ পায়ের কারণে তিনি মাঝমাঠে প্রতিপক্ষের যেকোনো আক্রমণ অনায়াসে রুখে দিতে শুরু করেন।

২০১৬-১৭ মৌসুমটি ছিল মোনাকো এবং ফ্যাবিনহোর জন্য রূপকথার মতো। কিলিয়ান এমবাপ্পে, বার্নার্দো সিলভা, রাদামেল ফ্যালকাও এবং ফ্যাবিনহোর সমন্বয়ে গড়া সেই তরুণ মোনাকো দলটি পিএসজিকে পেছনে ফেলে ফরাসি লিগ ওয়ান চ্যাম্পিয়ন হয়। একই সাথে তারা উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগের সেমিফাইনালে পৌঁছে ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেয়। মোনাকোর হয়ে ফ্যাবিনহো সব মিলিয়ে ২৩৩টি ম্যাচ খেলেন এবং ৩১টি গোল করেন, যার মধ্যে তার নিখুঁত পেনাল্টি শ্যুটআউটের রেকর্ড ছিল অন্যতম আলোচনার বিষয়।

মোনাকোর হয়ে ইউরোপ কাঁপানোর পর ২০১৮ সালের জুলাইয়ে ৩৯ মিলিয়ন পাউন্ডের ট্রান্সফার ফিতে ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব লিভারপুলে যোগ দেন ফ্যাবিনহো। অ্যানফিল্ডে প্রথম কয়েক মাস ইংলিশ ফুটবলের তীব্র গতি এবং ফিজিক্যালিটির সাথে মানিয়ে নিতে তার কিছুটা সময় লেগেছিল। কিন্তু একবার যখন তিনি ইয়ুর্গেন ক্লপের ট্যাকটিক্স বুঝে গেলেন, তারপর তিনি হয়ে উঠলেন লিভারপুল মিডফিল্ডের অবিসংবাদিত রাজা।

লিভারপুলের হয়ে প্রথম মৌসুমেই তিনি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জয় করেন। বিশেষ করে সেমিফাইনালে বার্সেলোনার বিপক্ষে অ্যানফিল্ডের সেই ঐতিহাসিক ৪-০ ব্যবধানের জয়ে লিওনেল মেসিকে বোতলবন্দী করে রাখার প্রধান দায়িত্বটি পালন করেছিলেন ফ্যাবিনহো।

লিভারপুলের জার্সিতে ফ্যাবিনহো – Image Source: en.as.com

লিভারপুলের দীর্ঘ তিন দশকের প্রিমিয়ার লীগ শিরোপার খরা কাটানোর নেপথ্য কারিগর ছিলেন তিনি। বিশেষ করে ক্রিস্টাল প্যালেস আর ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে দূরপাল্লার শটে ফ্যাবিনহোর নেওয়া সেই অবিশ্বাস্য রকেট গতির গোলগুলো অ্যানফিল্ডের ভক্তদের হৃদয়ে আজীবন রূপকথা হয়ে থাকবে। 

লিভারপুলের হয়ে ৫ মৌসুমে ২১৯টি ম্যাচ খেলে তিনি নিজেকে প্রিমিয়ার লীগের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

২০২৩ সালের জুলাই মাসে ইউরোপীয় ফুটবলের পাট চুকিয়ে ৪০ মিলিয়ন পাউন্ডের চুক্তিতে সৌদি প্রফেশনাল লীগের ক্লাব আল-ইত্তিহাদে যোগ দেন ফ্যাবিনহো। সৌদি আরবের ফুটবলের জোয়ারে করিম বেনজেমা এবং এনগোলো কান্তের মতো বিশ্বসেরা তারকাদের সতীর্থ হিসেবে মাঝমাঠের দায়িত্ব নেন তিনি। আল-ইত্তিহাদের হয়ে এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স লীগ এবং ঘরোয়া লীগে নিজের চেনা রূপেই দেখা গেছে তাকে। কান্তের সাথে তার মিডফিল্ড জুটি এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী মিডফিল্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।

২০১৫ সালে ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে ফ্যাবিনহোর অভিষেক হয়। তবে ক্লাবের হয়ে যতটা আকাশচুম্বী সাফল্য তিনি পেয়েছেন, জাতীয় দলের ক্ষেত্রে কিছুটা দুর্ভাগ্যই বলতে হবে। কারণ ব্রাজিলের মাঝমাঠে একই পজিশনে খেলতেন রিয়াল মাদ্রিদের কিংবদন্তি ক্যাসেমিরো। ফলে অনেক ম্যাচেই ফ্যাবিনহোকে সাইডবেঞ্চে বা বিকল্প খেলোয়াড় হিসেবে থাকতে হয়েছে।

তা সত্ত্বেও তিনি ব্রাজিলের হয়ে ২০২১ কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ স্কোয়াডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। ব্রাজিলের হয়ে এ পর্যন্ত তিনি ৩০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন এবং যখনই সুযোগ পেয়েছেন, নিজের শতভাগ উজাড় করে দিয়েছেন।

ব্রাজিল দলের হেক্সা জয়ের মিশনে তরুণদের ক্ষিপ্রতার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ঠাণ্ডা মাথার একজন অভিজ্ঞ মিডফিল্ডারের, যিনি কঠিন মুহূর্তে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতে পারেন। ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকার বিশ্বমঞ্চে ব্রাজিলের মাঝমাঠের সেই ‘অভিজ্ঞতার নোঙর’ হতে যাচ্ছেন ফ্যাবিনহো। 

রেবেকা তাভারেস– Image Source: in.pinterest.com

মাঠের বাইরে ফ্যাবিনহো একজন অত্যন্ত পারিবারিক এবং নম্র মানুষ। ২০১৩ সালে তিনি রেবেকা তাভারেসের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, যিনি নিজেই একজন প্রাক্তন ফুটবলার এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিভারপুল ভক্তদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। ফ্যাবিনহোর শান্ত স্বভাব এবং সহ খেলোয়াড়দের প্রতি সম্মানজনক আচরণ তাকে ড্রেসিংরুমের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।

Reference:

Related posts

মার্কোস আকুনা: কেন সবাই তাকে “ডিম” বলে ডাকে?

রায়হান রাফি – বাংলা চলচ্চিত্রের তরুণ নির্মাতা

লিও পেরেইরা: প্রেমের শক্তিতেই কি এখন বিশ্বের সেরা ডিফেন্ডার?

আশা রহমান

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More