টাইব্রেকার যখন ১০-১০, তখন রুলি নিজেই বল নিয়ে ম্যানচেস্টারের গোলকিপার ডেভিড ডি গিয়াকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গোল করলেন, আর ঠিক পরের সেকেন্ডেই বাঘের মতো ডাইভ দিয়ে ডি গিয়ার শটটাই আটকে ট্রফি ছিনিয়ে নিয়ে বললেন “অনেক তো লাফালাফি করলি, এবার ট্রফিটা আমাদের হাতে দে আর চুপচাপ বাড়ি যা!”
হেরোনিমো রুলি বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা ও ইউরোপা লিগ জয়ী একজন তারকা গোলরক্ষক। দারুণ রিফ্লেক্স এবং চাপের মুখে শান্ত থাকার ক্ষমতার জন্য তিনি সুপরিচিত। রিয়াল সোসিয়েদাদ ও ভিয়ারিয়ালের মতো ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোতেও তিনি নিজেকে এক নির্ভরযোগ্য প্রহরী হিসেবে প্রমাণ করেছেন।
হেরোনিমো রুলি- এর ব্যক্তিগত তথ্য
|
নাম |
হেরোনিমো রুলি |
|
জন্ম |
২০ মে ১৯৯২ |
|
জন্মস্থান |
লা প্লাটা , আর্জেন্টিনা |
|
উচ্চতা |
১.৮৯ মিটার (৬ ফুট ২ ইঞ্চি) |
|
পজিশন |
গোলকিপার |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
এস্টুডিয়েন্টস,দেপোর্টিভো মালডোনাডো,রিয়েল সোসিয়েদাদ,ম্যানচেস্টার সিটি,মন্টপেলিয়ার,ভিলারিয়াল,আয়াক্স,জং আয়াক্স এবং বর্তমানে মার্সেই ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০১৮– আর্জেন্টিনা |

১৯৯২ সালের ২০ মে আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেস প্রদেশের লা প্লাতা শহরে হেরোনিমো রুলির জন্ম। আর দশটা আর্জেন্টাইন শিশুর মতোই রুলির শৈশব কেটেছে ফুটবলের উন্মাদনায়। তবে মাঠের অন্য পজিশনে খেলার চেয়ে গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে বল আটকে দেওয়ার মধ্যেই তিনি অন্যরকম আনন্দ খুঁজে পেতেন।
শৈশবেই তার এই প্রতিভাকে চিহ্নিত করে আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব এস্তুদিয়ান্তেস। তাদের বিখ্যাত যুব একাডেমিতে রুলির ফুটবল ক্যারিয়ারের হাতেখড়ি হয়। একাডেমির বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলে খেলার সময়ই তিনি তার অসাধারণ পজিশনিং সেন্স এবং শট ঠেকানোর দক্ষতার জন্য কোচদের নজর কাড়েন।
দীর্ঘদিন যুব একাডেমিতে কঠোর পরিশ্রমের পর ২০১৩ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে এস্তুদিয়ান্তেসের মূল দলে অভিষেক হয় হেরোনিমো রুলির। একজন তরুণ গোলরক্ষকের জন্য আর্জেন্টিনার শীর্ষ লিগে খেলাটা ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং, কিন্তু রুলি প্রথম ম্যাচ থেকেই দেখিয়েছিলেন অসামান্য পরিপক্কতা।

২০১৩-১৪ মৌসুমে তিনি এস্তুদিয়ান্তেসের মূল গোলরক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। সেবার টানা ৫৮৮ মিনিট গোল হজম না করে তিনি ক্লাবের ইতিহাসে অনন্য এক রেকর্ড গড়েন। ক্লাবের হয়ে ৭৪ ম্যাচে তার অসাধারণ পারফরম্যান্স ও ধারাবাহিক ক্লিন শিট দ্রুতই ইউরোপিয়ান স্কাউটদের নজর কাড়ে, যার ফলে খুব সহজেই তার সামনে ইউরোপের দরজা খুলে যায়।
২০১৪ সালে লাতিন আমেরিকা ছেড়ে স্প্যানিশ লা লিগার বিখ্যাত ক্লাব রিয়াল সোসিয়েদাদে যোগ দেন হেরোনিমো রুলি। লাতিন খেলোয়াড়দের জন্য ইউরোপিয়ান ফুটবলে মানিয়ে নেওয়া কঠিন হলেও, স্পেনে পা রেখেই রুলি নিজের চমৎকার রিফ্লেক্সের প্রমাণ দেন। ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি ক্লাবটির প্রধান গোলরক্ষক ছিলেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি রিয়াল সোসিয়েদাদের হয়ে ১৭০টিরও বেশি ম্যাচ খেলেন।
তার এই ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের কারণে ইউরোপের বড় বড় ক্লাব তাকে দলে নেওয়ার জন্য আগ্রহ দেখাতে শুরু করে। ২০১৯ সালে তিনি ধারে ফরাসি ক্লাব মঁপেলিয়েতে যোগ দেন এবং সেখানেও ফ্রেঞ্চ লিগে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেন।
হেরোনিমো রুলির ফুটবল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে নাটকীয়, রোমাঞ্চকর এবং স্মরণীয় মুহূর্তটি আসে ২০২১ সালের মে মাসে। তখন তিনি স্প্যানিশ ক্লাব ভিয়ারেয়ালের গোলপোস্ট সামলাচ্ছেন, যার কোচ ছিলেন উনাই এমেরি।
২০২০-২১ মৌসুমের উয়েফা ইউরোপা লিগের ফাইনালে ভিয়ারেয়ালের মুখোমুখি হয় ইংলিশ জায়ান্ট ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। নির্ধারিত ৯০ মিনিট এবং অতিরিক্ত সময়ের খেলা ১-১ গোলে ড্র হওয়ার পর ম্যাচ গড়ায় পেনাল্টি শুটআউটে। এই টাইব্রেকারটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এবং দীর্ঘতম টাইব্রেকার হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
দুই দলের মাঠের খেলোয়াড়দের প্রথম ১০টি শটের সবকটিই গোল হয়। স্কোরলাইন যখন ১০-১০, তখন নিয়ম অনুযায়ী শট নেওয়ার পালা আসে দুই দলের গোলরক্ষকদের। প্রথমে পেনাল্টি কিক নিতে আসেন হেরোনিমো রুলি। তিনি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিশ্বসেরা গোলরক্ষক ডেভিড ডি গিয়াকে পরাস্ত করে বল জালে জড়িয়ে দেন। এর ঠিক পরের মুহূর্তেই তাকে দাঁড়াতে হয় গোললাইনে। এবার শট নেওয়ার পালা ডি গিয়ার। ডি গিয়া যখন জোরালো শট নেন, রুলি তার ডান দিকে চমত্কার ডাইভ দিয়ে বলটি আটকে দেন।

রুলির এই অবিশ্বাস্য ‘ডাবল হিরোইজম’ এর ওপর ভর করে ভিয়ারেয়াল ১১-১০ ব্যবধানে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে হারিয়ে তাদের ইতিহাসের প্রথম কোনো প্রধান ইউরোপীয় ট্রফি জয়ের গৌরব অর্জন করে। এই ম্যাচের পর রুলি রাতারাতি ভিয়ারেয়ালের নায়কে পরিণত হন।
জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়ানো যেকোনো আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের জন্যই পরম আরাধ্য। রুলির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু হয় অনূর্ধ্ব-২৩ দলের হয়ে ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে খেলার মাধ্যমে। এরপর ২০১৮ সালে গুয়াতেমালার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে তার অভিষেক হয়।
আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে হেরোনিমো রুলির অবস্থানটা ছিল একটু অন্যরকম। ২০২১ সালের পর থেকে ইমিলিয়ানো মার্টিনেজ আর্জেন্টিনা দলের এক নম্বর গোলরক্ষক হিসেবে নিজের জায়গা পাকা করে নেন। মার্টিনেজের অতিমানবীয় পারফরম্যান্স এবং আগ্রাসী চরিত্রের কারণে রুলিকে মূলত দ্বিতীয় বা ব্যাক-আপ গোলরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে মার্টিনেজ সব ম্যাচে খেলায় রুলির মাঠে নামার সুযোগ হয়নি। কিন্তু মাঠের বাইরে রুলির অবদান ছিল অপরিসীম। দলের অনুশীলনে স্ট্রাইকারদের শট অনুশীলনে সাহায্য করা এবং বেঞ্চে বসে দলের সতীর্থদের মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখার কাজটি তিনি দারুণভাবে করেছেন। ১৮ ডিসেম্বর লুসাইল স্টেডিয়ামে ফ্রান্সকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা যখন ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ জিতে নেয়, তখন রুলিও মেডেল গলায় জড়িয়ে বিশ্বজয়ের আনন্দে মেতে ওঠেন। তিনি মাঠে না নেমেও ছিলেন দলের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বিশ্বকাপ জয়ের পর ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে হেরোনিমো রুলি হল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আয়াক্সে যোগ দেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের দিকে তিনি ফরাসি ক্লাব অলিম্পিক মার্শেইতে পাড়ি জমান। ফ্রেঞ্চ লিগে মার্শেইর হয়ে তিনি এখনো তার অভিজ্ঞতার আলো ছড়াচ্ছেন এবং দলের রক্ষণভাগকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের জন্য ঘোষিত আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে ডাক পেয়েছেন অভিজ্ঞ গোলরক্ষক হেরোনিমো রুলি। আর্জেন্টিনা দলে বরাবরের মতোই প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক হিসেবে পোস্ট সামলাচ্ছেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ । রুলি এবং হুয়ান মুসসো ব্যাক-আপ গোলরক্ষক হিসেবে স্কোয়াডে আছেন, যা আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুম ও বেঞ্চকে দারুণ শক্তিশালী করেছে।
আর্জেন্টিনার গোলবারের নিচে হয়তো দিবু মার্তিনেসই মূল ভরসা, তবে যেকোনো জরুরি বা সংকটময় মুহূর্তে হেরোনিমো রুলির মতো একজন পেনাল্টি স্পেশালিস্ট ও চমত্কার রিফ্লেক্সের গোলরক্ষক বেঞ্চে থাকা লিওনেল স্কালোনির দলের জন্য অনেক বড় স্বস্তির বিষয়।
ফুটবল দুনিয়া প্রায়শই যারা স্পটলাইটে থাকে বা যারা গোল করে তাদের মনে রাখে। কিন্তু হেরোনিমো রুলির মতো খেলোয়াড়রা প্রমাণ করেন যে, স্পটলাইটের বাইরে থেকেও একটি দলের সাফল্যে সমান অংশীদার হওয়া যায়। ক্লাব ফুটবলে ইউরোপা লিগ জয়ের নায়ক হওয়া কিংবা জাতীয় দলের বেঞ্চে বসেও দলের প্রতি শতভাগ নিবেদিত থাকা—রুলির পেশাদারিত্ব সবসময়ই প্রশংসনীয়।
আর্জেন্টিনার কাতার বিশ্বকাপ জয়ী দলের গোল্ডেন মেডেল জয়ী এই গোলরক্ষক আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের পাতায় একজন বিশ্বস্ত, শান্ত এবং নির্ভরযোগ্য ‘নীরব যোদ্ধা’ হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
Reference:

