Image default
ক্রীড়াবিদজীবনীফুটবল

দুর্ঘটনা থেকে রূপকথা: কার্লোস অ্যাসেভেদো

মাত্র ১৫ বছর বয়সে শারীরিক গঠন ও উচ্চতা কম থাকায় কার্লোস অ্যাসেভেদোকে একাডেমি থেকে বাদ দেওয়া হয়। হতাশ হয়ে তিনি ফুটবল ছেড়েই দিচ্ছিলেন। কিন্তু ২০১৩ সালে সান্তোস লাগুনার মূল দলের বাস এক মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হলে ক্লাবের যুব দলের গোলরক্ষকরা আহত হন। তখন অনূর্ধ্ব-১৭ দলের জন্য জরুরি ভিত্তিতে বাধ্য হয়ে অ্যাসেভেদোকে আবার ডেকে পাঠায় ক্লাব কর্তৃপক্ষ। আর এই এক দুর্ঘটনাই তার ফুটবল ক্যারিয়ারের মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে দেয়।

কার্লোস আসেভেদো মেক্সিকান ফুটবলের বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম প্রতিভাবান, রোমাঞ্চকর এবং জনপ্রিয় গোলরক্ষক। মেক্সিকান ক্লাব সান্তোস লাগুনার অধিনায়ক এই ফুটবলার তার দীর্ঘ কোঁকড়ানো চুল, মাথায় আইকনিক ব্যান্ড এবং গোলপোস্টের নিচে বিদ্যুতগতির রিফ্লেক্সের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। মাঠের ভেতরে অ্যাক্রোবেটিক সেভ এবং নিখুঁত পেনাল্টি আটকানোর দক্ষতার কারণে তাকে মেক্সিকোর কিংবদন্তি কিপার গুইলার্মো ওচোয়ার যোগ্য উত্তরসূরি বা “দ্য নেক্সট ওচোয়া” বলে গণ্য করা হয়। 

কার্লোস আসেভেদো- এর ব্যক্তিগত তথ্য:

নাম

কার্লোস অ্যাসেভেদো লোপেজ

জন্ম

১৯ এপ্রিল ১৯৯৬ (বয়স ৩০)

জন্মস্থান

টরিওন , মেক্সিকো

উচ্চতা

১.৮৪ মিটার (৬ ফুট ০ ইঞ্চি)

পজিশন

গোলরক্ষক

ক্লাব ক্যারিয়ার

সান্তোস লাগুনা

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

২০২১– মেক্সিকো

কার্লোস অ্যাসেভেদো – Image Source:sportal365images.com

মেক্সিকান ফুটবলে বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম প্রতিভাবান, রোমাঞ্চকর এবং জনপ্রিয় গোলরক্ষক হলেন কার্লোস অ্যাসেভেদো লোপেজ  ১৯৯৬ সালের ১৯ এপ্রিল মেক্সিকোর কোয়াহুইলার তোরিওনে জন্মগ্রহণ করেন। তার ফুটবলার হয়ে ওঠার গল্পটা রূপকথার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তিনি শৈশব থেকেই তার স্থানীয় ক্লাব সান্তোস লাগুনার অন্ধ ভক্ত ছিলেন এবং মাত্র ১০ বছর বয়সে ক্লাবটির যুব একাডেমিতে যোগ দেন। তবে ১৫ বছর বয়সে সান্তোস লাগুনার অনূর্ধ্ব-১৭ দল থেকে “উচ্চতা কম” এবং “শারীরিক সক্ষমতা পর্যাপ্ত নয়” এই অজুহাতে একাডেমি থেকে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।

ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার চরম হতাশাজনক মুহূর্তে অ্যাসেভেদোর জীবনে একটি নাটকীয় মোড় আসে। ২০১৩ সালে সান্তোস লাগুনার মূল দলের খেলোয়াড়দের বহনকারী একটি বাস মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়। এতে ক্লাবের যুব দলের বেশ কয়েকজন গোলরক্ষক আহত হন। হুট করেই অনূর্ধ্ব-১৭ দলের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একজন গোলরক্ষকের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ক্লাব কর্তৃপক্ষ তখন বাধ্য হয়ে অ্যাসেভেদোকে আবার ডেকে পাঠায়। এই সুযোগটি অ্যাসেভেদো দুই হাতে লুফে নেন এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করেন।

কার্লোস অ্যাসেভেদোর দুর্দান্ত পারফরম্যান্স – Image Source:a.espncdn.com

যুব দলগুলোতে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ২০১৬ সালের ২০ আগস্ট ক্রুজ আজুলের বিপক্ষে ম্যাচে সান্তোস লাগুনার মূল দলের হয়ে অ্যাসেভেদোর অভিষেক হয়। তবে ক্লাবের তৎকালীন প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক এবং মেক্সিকান কিংবদন্তি জোনাথান ওরোজকোর উপস্থিতির কারণে তাকে দীর্ঘদিন ব্যাক-আপ কিপার হিসেবে অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

২০২০ সালে জোনাথান ওরোজকো ক্লাব ছাড়লে কার্লোস অ্যাসেভেদো সান্তোস লাগুনার এক নম্বর গোলরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পান। নতুন দায়িত্ব পেয়েই তিনি নিজের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। ২০২০ গার্দিয়ানেস টুর্নামেন্টে তার অবিশ্বাস্য কিছু সেভের ওপর ভর করে সান্তোস লাগুনা লিগের অন্যতম সেরা ডিফেন্সিভ দলে পরিণত হয়। ২০২১ সালে ক্লাবের তৎকালীন কোচ গুইলার্মো আলমাদা অ্যাসেভেদোর নেতৃত্বগুণ দেখে মাত্র ২৫ বছর বয়সে তাকে দলের অধিনায়ক হিসেবে ঘোষণা করেন। অ্যাসেভেদোর নেতৃত্বে সান্তোস লাগুনা ২০২১ ক্লাউসুরা টুর্নামেন্টের ফাইনালে ওঠে, যদিও তারা ক্রুজ আজুলের কাছে অল্পের জন্য হেরে রানার্স-আপ হয়।

কার্লোস অ্যাসেভেদো সান্তোস লাগুনায়- Image Source:sdpnoticias.com

লিগ ফুটবলে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে চিলির বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে মেক্সিকো জাতীয় দলের হয়ে কার্লোস অ্যাসেভেদোর অভিষেক হয়। ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হলেও অ্যাসেভেদো বেশ কয়েকটি চমৎকার সেভ করে জাতীয় দলের কোচদের নজর কাড়েন।

কার্লোস অ্যাসেভেদোর ক্যারিয়ারে বড় একটি ধাক্কা আসে ২০২২ সালে। কাতার বিশ্বকাপের ঠিক আগে তিনি কাঁধের মারাত্মক ইনজুরিতে পড়েন, যার কারণে তৎকালীন কোচ জেরার্ডো মার্তিনো তাকে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত স্কোয়াডে রাখতে পারেননি। তবে ইনজুরি কাটিয়ে ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে তিনি আবারও সান্তোস লাগুনার হয়ে চেনা ফর্মে ফেরেন এবং জাতীয় দলে নিজের জায়গা পুনরুদ্ধার করেন।

চেনা ফর্মে কার্লোস অ্যাসেভেদো – Image Source:a.espncdn.com

২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে মেক্সিকো যখন আমেরিকার ও কানাডার সাথে যৌথ আয়োজক, তখন অ্যাসেভেদোর স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। বর্তমান কোচ হাভিয়ের আগুইরে অভিজ্ঞ গুইলার্মো ওচোয়া এবং উদীয়মান রাউল রাঞ্জেলের পাশাপাশি কার্লোস অ্যাসেভেদোকে মেক্সিকোর বিশ্বকাপ স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। যদিও এই মুহূর্তে চিবাসের রাউল রাঞ্জেল চমৎকার ফর্মে থাকার কারণে শুরুর একাদশে এগিয়ে আছেন, তবুও অ্যাসেভেদোর উপস্থিতি মেক্সিকোর গোলপোস্টের গভীরতা এবং শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

২০২৬ বিশ্বকাপে কার্লোস অ্যাসেভেদো – Image Source:cdn2.mediotiempo.com

মেক্সিকান মিডিয়া ও ভক্তদের মাঝে অ্যাসেভেদোকে প্রায়শই “পরবর্তী ওচোয়া” বলে ডাকা হয়। এর পেছনে প্রধান কারণ তাদের বাহ্যিক মিল দুজনেরই লম্বা কোঁকড়ানো চুল এবং হেয়ারব্যান্ড পরার অভ্যাস রয়েছে। টেকনিক্যাল দিক থেকেও ওচোয়ার মতো অ্যাসেভেদোরও মূল শক্তি লাইন-সেভিং বা রিফ্লেক্স।

তবে অ্যাসেভেদো এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “ওচোয়া মেক্সিকোর একজন জীবন্ত কিংবদন্তি এবং তার সাথে তুলনা হওয়াটা গর্বের। কিন্তু আমি মাঠে নিজের একটা আলাদা পরিচয় তৈরি করতে চাই। আমি চাই মানুষ আমাকে কার্লোস অ্যাসেভেদো হিসেবেই মনে রাখুক।” ওচোয়ার চেয়ে অ্যাসেভেদোর একটি প্লাস পয়েন্ট হলো, বক্সের বাইরে এসে বল ক্লিয়ার করার ক্ষেত্রে তিনি ওচোয়ার চেয়ে কিছুটা বেশি সাহসী।

Reference:

Related posts

হুয়ান মুসো: গোলবারের নিচে আর্জেন্টিনার এক বিশ্বস্ত প্রাচীর

আশা রহমান

এডসন আলভারেজ: ঘরের মাঠে বিশ্বকাপের বাঘ

উসমান দেম্বেলে: দুই পায়ের খ্যাপাটে জাদুকর

আশা রহমান

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More