টাইব্রেকারের আগে পিকফোর্ড তার জলের বোতলের গায়ে প্রতিপক্ষের পেনাল্টি নেওয়ার অভ্যাসের একটি ‘গোপন চিরকুট’ লাগিয়ে নেন; আর শুট-আউটের মাঝে জল খাওয়ার বাহানায় সেই চিরকুট দেখেই তিনি ঠিক করেন ডানে নাকি বামে ঝাঁপ দেবেন!
ইংল্যান্ড দলের একটা চিরন্তন নিয়ম ছিল বিশ্বমঞ্চে পেনাল্টি শুট-আউট এলেই তারা ব্যাগ গুছিয়ে বাড়ির পথ ধরবে। ইংলিশ ফ্যানদের এই ‘পেনাল্টি আতঙ্কের’ ইতিহাস যিনি একা হাতে বদলে দিয়েছেন, তিনি জর্ডান পিকফোর্ড। নিজের জলের বোতলে প্রতিপক্ষের পেনাল্টি মারার অভ্যাসের চিরকুট লিখে রাখা আর মাইন্ড গেম খেলে টাইব্রেকারে ইংল্যান্ডকে জেতানো এই ‘পেনাল্টি কিলারের’ গল্প যেকোনো থ্রিলার সিনেমার চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়।
জর্ডান পিকফোর্ড’র ব্যক্তিগত তথ্য:
|
নাম |
জর্ডান লি পিকফোর্ড |
|
জন্ম |
৭ মার্চ ১৯৯৪ (বয়স ৩২) |
|
জন্মস্থান |
ওয়াশিংটন , টাইন অ্যান্ড ওয়্যার, ইংল্যান্ড |
|
উচ্চতা |
৬ ফুট ১ ইঞ্চি (১.৮৫ মিটার) |
|
পজিশন |
গোলরক্ষক |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
সান্ডারল্যান্ড, ডার্লিংটন, আলফ্রেটন টাউন, বার্টন অ্যালবিয়ন, কার্লাইল ইউনাইটেড, ব্র্যাডফোর্ড সিটি, প্রেস্টন নর্থ এন্ড এবং বর্তমানে এভারটন ক্লাবের হয়ে খেলছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০১৭– ইংল্যান্ড |

১৯৯৪ সালের ৭ মার্চ ইংল্যান্ডের ওয়াশিংটনে জন্মগ্রহণ করেন জর্ডান লি পিকফোর্ড। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন স্থানীয় ক্লাব সান্ডারল্যান্ডের ভক্ত। মাত্র আট বছর বয়সে ২০০২ সালে তিনি সান্ডারল্যান্ডের যুব একাডেমিতে যোগ দেন।
জর্ডান পিকফোর্ডের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, মূল স্পটলাইটে আসার আগে তাকে ইংলিশ ফুটবলের একদম নিচু স্তরের লিগগুলোতে খেলে খাঁটি হতে হয়েছে। ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে সান্ডারল্যান্ড কর্তৃপক্ষ তাকে অভিজ্ঞ করার জন্য মোট ৬টি ভিন্ন ভিন্ন ক্লাবে লোনে পাঠায়। এর মধ্যে ডার্লিংটন, আলফ্রেটন টাউন, বার্টন অ্যালবিওন, কার্লাইল ইউনাইটেড, ব্র্যাডফোর্ড সিটি এবং প্রিস্টন নর্থ এন্ডের মতো ক্লাব রয়েছে।

নিচু লিগের কাদা-মাটি মাখা মাঠ, প্রতিপক্ষের ফরোয়ার্ডদের আগ্রাসী ট্যাকল এবং কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েই পিকফোর্ডের ভেতরের সেই লড়াকু মানসিকতা তৈরি হয়েছিল। ২০১৬ সালে সান্ডারল্যান্ডের মূল দলে ফিরে এসে প্রিমিয়ার লিগে মাত্র এক মৌসুমেই নিজের জাত চেনান তিনি। দল রেলিগেটেড হলেও পিকফোর্ড পিএফএ তরুণ বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের তালিকায় মনোনীত হন।
২০১৭ সালের জুন মাসে রেকর্ড ৩০ মিলিয়ন পাউন্ড ট্রান্সফার ফি-র বিনিময়ে জর্ডান পিকফোর্ড এভারটনে যোগ দেন। সেই সময়ে এটিই ছিল কোনো ব্রিটিশ গোলকিপারের জন্য সর্বোচ্চ ট্রান্সফার ফির রেকর্ড।

এভারটনে আসার পর থেকে পিকফোর্ড দলটির এক নম্বর গোলকিপার এবং ড্রেসিংরুমের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তিতে পরিণত হন। ক্লাবের হয়ে গত কয়েক বছর ধরে তিনি প্রতি মৌসুমে অবিশ্বাস্য কিছু পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন।
গত কয়েক মৌসুমে এভারটন যখনই প্রিমিয়ার লিগ থেকে রেলিগেশনের চরম ঝুঁকিতে পড়েছে, পিকফোর্ড তখনই ত্রাতা হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। বিশেষ করে ২০২২ এবং ২০২৩ সালে লিগের শেষদিকের ম্যাচগুলোতে তার চিতা বাঘের মতো রিফ্লেক্স এবং ডাবল-সেভগুলো এভারটনকে প্রিমিয়ার লিগে টিকিয়ে রাখে।
সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ প্রিমিয়ার লিগ মৌসুমেও পিকফোর্ড তার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন। এভারটনের রক্ষণভাগের দুর্বলতা সত্ত্বেও তিনি পুরো মৌসুমে ১২টি ক্লিন শিট রেখেছেন এবং লিগে সর্বোচ্চ সেভ করা গোলকিপারদের তালিকায় শীর্ষ তিনে ছিলেন। বর্তমানে তিনি দলের অন্যতম প্রধান নেতা এবং অধিনায়কের দায়িত্বও পালন করছেন।

ক্লাব ফুটবলে জর্ডান পিকফোর্ডের পারফরম্যান্স নিয়ে মাঝে মাঝে সমালোচনা হলেও, ইংল্যান্ড জাতীয় দলের সাদা জার্সিতে তিনি সবসময়ই ‘অতিমানব’। গ্যারেথ সাউথগেটের অধীনে ২০১৭ সালে অভিষেকের পর থেকে ইংল্যান্ডের এক নম্বর পজিশনটি তিনি কারও জন্য ফাঁকা করেননি।
ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসে ‘পেনাল্টি শুট-আউট’ ছিল এক চিরন্তন আতঙ্কের নাম। বিশ্বমঞ্চে পেনাল্টি এলেই ইংল্যান্ড হেরে যাবে এটাই ছিল নিয়ম। কিন্তু ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে কলম্বিয়ার বিপক্ষে কার্লোস বাক্কার পেনাল্টি শটটি বাম দিকে ঝাঁপিয়ে এক হাতে আটকে দিয়ে পিকফোর্ড ইংল্যান্ডের সেই ‘পেনাল্টি ভূত’ তাড়িয়ে দেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেটিই ছিল পেনাল্টি শুট-আউটে ইংল্যান্ডের প্রথম জয়।

ইউরো ২০২০ টুর্নামেন্টটি ছিল জর্ডান পিকফোর্ডের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সেরা সময়। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি মাত্র ২টি গোল হজম করেছিলেন এবং ৫টি ক্লিন শিট রেখে টুর্নামেন্টের সেরা গোলকিপারের পুরস্কার জিতেন। ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে পেনাল্টি শুট-আউটে দুটি পেনাল্টি আটকে দিলেও ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ইংল্যান্ড ট্রফি জিততে পারেনি।
ইউরো ২০২৪-এর কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যানুয়েল আকাঞ্জির পেনাল্টি আটকে দিয়ে তিনি আবারও ইংল্যান্ডের সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেন।
২০২৬ সালের মেগা বিশ্বকাপেও ইংল্যান্ডের সাদা জার্সিতে গোলপোস্টের নিচে প্রধান ভরসা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন মার্সিসাইডের এই ড্রামা কিং। গ্যারেথ সাউথগেটের পর দলের নতুন কোচের অধীনেও জর্ডান পিকফোর্ডের এক নম্বর পজিশনটি কেউ নাড়াতে পারেনি।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপের মঞ্চে ইংল্যান্ড যখন বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখছে, তখন হ্যারি কেইনের গোলের মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ হবে গোলপোস্টের নিচে পিকফোর্ডের গ্লাভস জোড়া। নিচু লিগের কাদা মাখা মাঠ থেকে উঠে এসে বিশ্বমঞ্চ কাঁপানো জর্ডান পিকফোর্ড আসলেই ইংলিশ ফুটবলের এক অবিস্মরণীয় এবং রঙিন চরিত্র।
Reference:

