Image default
ক্রীড়াবিদজীবনীফুটবল

৩৮ বছর বয়সেও ব্রাজিলের ভরসা ওয়েভের্তোন!

৩৮ বছর বয়সে যেখানে বাকিরা পিঠের ব্যথার মলম খোঁজে, সেখানে ওয়েভের্তোন আনচেলত্তিকে টাস্কি খাইয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট পকেটে পুরেছেন! বাঘা বাঘা স্ট্রাইকারদের পেনাল্টি চিবিয়ে খাওয়া এই ‘বুড়ো হাড়ের ভেলকি’র ড্রেসিংরুমের লিডারশিপ ছাড়া সেলেসাওদের হেক্সা মিশন জমবেই না।

২০১৬ সালের সেই ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়াম; জার্মানির বিপক্ষে টাইব্রেকারে নিলস পিটারসেনের পেনাল্টি শটটি যখন এক অখ্যাত গোলকিপারের গ্লাভসে আটকে গেল, সেদিনই ব্রাজিল পেয়েছিল অলিম্পিক ইতিহাসের প্রথম সোনা আর এক নতুন নায়ক ওয়েভের্তোন। ইউরোপের আলো-ঝলমলে লিগে না খেলেও শুধু লাতিন আমেরিকার কঠিন ও শারীরিক ফুটবল দিয়ে যে বিশ্বমানের হওয়া যায়, তিনি তার জীবন্ত প্রমাণ। ২০২৬ বিশ্বকাপের ব্রাজিল স্কোয়াডে তাঁর অন্তর্ভুক্তি কেবল একাদশের ব্যাক-আপ হিসেবে নয়, বরং ড্রেসিংরুমের লিডারশিপ আর হেক্সা মিশনের এক অভিজ্ঞ সেনাপতি হিসেবে।

ওয়েভের্তোন পেরেইরা দা সিলভা- এর ব্যক্তিগত তথ্য:

নাম

ওয়েভের্তোন পেরেইরা দা সিলভা

জন্ম

১৩ ডিসেম্বর ১৯৮৭ (বয়স ৩৮)

জন্মস্থান

রিও ব্রাঙ্কো , একর, ব্রাজিল

উচ্চতা

১.৮৯ মিটার (৬ ফুট ২ ইঞ্চি)

পজিশন

গোলকিপার

ক্লাব ক্যারিয়ার

করিন্থীয়দের,রেমো,বোটাফোগো-এসপি,পর্তুগিজ,অ্যাটলেটিকো পারানায়েন্সে,পালমেইরাস এবং বর্তমানে গ্রেমিও ক্লাবের হয়ে খেলছেন।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

২০১৭– ব্রাজিল

ওয়েভের্তোন পেরেইরা দা সিলভা – Image Source: s2-ge.glbimg.com

ওয়েভের্তোন পেরেইরা দা সিলভা ১৯৮৭ সালের ১৩ই ডিসেম্বর ব্রাজিলের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য আক্রের রিও ব্রাঙ্কোতে জন্মগ্রহণ করেন। ব্রাজিলের আর দশটা সাধারণ পরিবারের মতোই অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে বড় হতে হয়েছে তাঁকে। শৈশবে ফরোয়ার্ড হিসেবে ফুটবল খেলা শুরু করলেও, তাঁর উচ্চতা এবং রিফ্লেক্স দেখে কোচেরা তাঁকে গোলপোস্টের নিচে দাঁড় করিয়ে দেন। আর সেটাই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট।

২০০৬ সালে ব্রাজিলের বিখ্যাত ক্লাব করিন্থিয়ান্স-এর যুব একাডেমিতে সুযোগ পান তিনি। তবে মূল দলে জায়গা করে নেওয়া তাঁর জন্য সহজ ছিল না। করিন্থিয়ান্সের মূল দলে থাকা অবস্থায় তাঁকে বেশ কয়েকটি ক্লাবে ধারে খেলতে হয়। ক্যারিয়ারের শুরুর এই কঠিন সময়টাই তাঁকে মানসিকভাবে আরও শক্তিশালী করে তোলে। ২০১০ সালে তিনি পোর্তুগিজা ক্লাবে যোগ দেন, যেখানে তিনি তাঁর প্রতিভার আসল ঝলক দেখাতে শুরু করেন এবং ক্লাবটিকে সিরি-বি চ্যাম্পিয়ন করতে বড় ভূমিকা রাখেন।

২০১২ সালে ওয়েভের্তোন ব্রাজিলের শীর্ষ স্তরের ক্লাব অ্যাথলেটিকো পারানায়েন্সেতে যোগ দেন। এই ক্লাবেই তিনি নিজেকে ব্রাজিলের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই ক্লাবের এক নম্বর গোলকিপার এবং পরবর্তীতে অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন।

ক্লাব অ্যাথলেটিকো পারানায়েন্স এর জার্সিতে ওয়েভের্তোন – Image Source: p2.trrsf.com

পারানায়েন্সের হয়ে তিনি ৩০০-এর বেশি ম্যাচ খেলেন। ২০১৬ সালে তাঁর দুর্দান্ত কিপিংয়ের ওপর ভর করে ক্লাবটি ‘চ্যাম্পিয়েনাতো পারানায়েন্সে’ শিরোপা জয় করে। এই ক্লাবে খেলার সময়ই তিনি তৎকালীন ব্রাজিল জাতীয় দলের কোচ তিতের নজরে আসেন।

২০১৮ সালে ওয়েভের্তোন ব্রাজিলের অন্যতম সফল এবং ঐতিহ্যবাহী ক্লাব পালমেইরাস-এ যোগ দেন। পালমেইরাসে আসার পর তাঁর ক্যারিয়ার এক নতুন উচ্চতা লাভ করে। ইউরোপের বড় বড় ক্লাবের লোভনীয় প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও তিনি দেশের মাটিতেই রাজত্ব করার সিদ্ধান্ত নেন এবং পালমেইরাসের ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক বনে যান।

পালমেইরাসের হয়ে তিনি প্রায় সব ধরনের ট্রফি জিতেছেন। তাঁর অবিশ্বাস্য সেভ এবং পেনাল্টি ঠেকানোর দক্ষতার কারণে পালমেইরাস লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্ট কোপা লিবের্তাদোরেস টানা দুইবার (২০২০ ও ২০২১) জয় করে।

ফ্লামেঙ্গোর বিপক্ষে প্রেস বিজ্ঞপ্তি – Image Source: opopular.com.br

পালমেইরাসের রক্ষণভাগের শেষ প্রহরী হিসেবে তিনি ৪৫০-এর কাছাকাছি ম্যাচ খেলেন। ব্রাজিলের ঘরোয়া ফুটবল লিগে বছরের পর বছর ধরে তিনি গোল্ডেন গ্লাভস এবং সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার নিজের করে রেখেছিলেন।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে ওয়েভের্তোনের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকের জন্য। নেইমারের নেতৃত্বে ব্রাজিল অলিম্পিক দল যখন ঘরের মাঠে সোনার খোঁজে খেলছিল, তখন টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে মূল গোলরক্ষক ফার্নান্দো প্রাস ইনজুরিতে পড়েন। তাঁর পরিবর্তে দলে ডাক পান ওয়েভের্তোন।

পুরো টুর্নামেন্টে তিনি মাত্র ১টি গোল হজম করেছিলেন। মারাকানা স্টেডিয়ামে জার্মানির বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়ালে, ওয়েভের্তোন জার্মানির নিলস পিটারসেনের পেনাল্টি শটটি দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন। এরপর নেইমারের শেষ পেনাল্টি গোলে ব্রাজিল অলিম্পিক ইতিহাসের প্রথম সোনা জয় করে। সেই রাতে রাতারাতি পুরো ব্রাজিলের জাতীয় বীরে পরিণত হন ওয়েভের্তোন।

অলিম্পিকের এই সাফল্যের পর ২০১৭ সালে ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে তাঁর অভিষেক হয়। তবে ব্রাজিলের মূল দলে একাদশে সুযোগ পাওয়াটা তাঁর জন্য এভারেস্ট জয়ের মতোই কঠিন ছিল। কারণ একই যুগে ব্রাজিলের ড্রেসিংরুম শেয়ার করছিলেন লিভারপুলের আলিসন বেকার এবং ম্যানচেস্টার সিটির এদেরসন মোরায়েস।

তা সত্ত্বেও, ওয়েভের্তোন তাঁর ধারাবাহিকতা এবং অভিজ্ঞতার কারণে সবসময়ই ব্রাজিলের স্কোয়াডে নিজের জায়গা ধরে রেখেছেন। তিনি ২০২১ কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ব্রাজিল স্কোয়াডে ছিলেন। কাতার বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে মাঠে নেমে তিনি বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্নও পূরণ করেন।

নেইমার জুনিয়র এর সাথে ওয়েভের্তোন এর উল্লাস – Image Source: i0.wp.com

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ওয়েভের্তোন তাঁর দীর্ঘদিনের প্রিয় ক্লাব পালমেইরাস ছেড়ে ফ্রি ট্রান্সফারে ব্রাজিলের আরেক পরাশক্তি ক্লাব গ্রেমিওতে যোগ দেন। গ্রেমিওতে যোগ দিয়েই তিনি ক্লাবটিকে ‘কাম্পেওনাতো গাউচো শিরোপা জেতাতে সাহায্য করেন। বর্তমানে ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও, তিনি গ্রেমিওর এক নম্বর জার্সি গায়ে কোপা সুদামেরিকানা এবং ব্রাজিলিয়ান সিরি-আ-তে দুর্দান্ত পারফর্ম করছেন।

৩৮ বছর বয়সে এসেও তাঁর ফর্ম এতটাই দুর্দান্ত যে, ব্রাজিল জাতীয় দলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য ব্রাজিলের ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত স্কোয়াডে ওয়েভের্তোনকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন! আলিসন এবং এদেরসনের পাশাপাশি এই অভিজ্ঞ গোলকিপারকে দলে রাখা হয়েছে মূলত তাঁর বিশাল অভিজ্ঞতা, পেনাল্টি শুট-আউটের দক্ষতা এবং ড্রেসিংরুমের লিডারশিপের কারণে। এটি তাঁর ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ আসর হতে যাচ্ছে।

২০২৬ বিশ্বকাপে বাকিদের জন্য বয়সটা কেবলই একটা সংখ্যা হতে পারে, কিন্তু পেনাল্টি স্পেশালিস্ট ওয়েভের্তোনের জন্য এটা স্রেফ একটা ‘উইংস’—যার ওপর ভর করে এই বুড়ো হাড়ের ভেলকি সেলেসাওদের হেক্সা মিশনের আসল ডানা হতে প্রস্তুত!

Reference:

Related posts

ব্রাজিলের রক্ষণের ‘লড়াকু সৈনিক’ রজার ইবানেজ

মার্কুইনহোস: ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্সের অতন্দ্র প্রহরী

সার্জিও আগুয়েরো: ম্যারাডোনার রেকর্ড ভাঙা কিংবদন্তি স্ট্রাইকার

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More