Image default
ক্রীড়াবিদজীবনীফুটবল

জন স্টোনস: নামে ডিফেন্ডার, কামে মিডফিল্ডার!

২০২২ কাতার বিশ্বকাপে হোটেলের এক গৃহহীন বিড়ালকে ভালোবেসে জন স্টোনস ও কাইল ওয়াকার নাম দেন ‘ডেভ’। পরে আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে তারা বিড়ালটিকে কাতার থেকে ইংল্যান্ডে নিজেদের বাসায় নিয়ে আসেন। 

জন স্টোনস ক্যারিয়ারের শুরুতে যাকে ‘অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়া ডিফেন্ডার’ বলে তীব্র সমালোচনা করা হতো, ভুল করে গোল হজম করার পর যাকে নিয়ে ট্রোল হতো নিয়তি মেনে, তিনিই আজ বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার। তার গল্পটা চোট আর ফর্মহীনতার অন্ধকার টানেল পেরিয়ে ফিনিক্স পাখির মতো ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে ঐতিহাসিক ট্রেবল জয় থেকে শুরু করে থ্রি লায়ন্সদের রক্ষণভাগের বিশ্বস্ত সেনানী হয়ে ওঠার সেই রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের রোমাঞ্চকর মহাকাব্যে আপনাকে স্বাগত। 

জন স্টোনস’র ব্যক্তিগত তথ্য:

নাম

জন স্টোনস

জন্ম

২৮ মে ১৯৯৪ (বয়স ৩২)

জন্মস্থান

বার্নসলি , ইংল্যান্ড

উচ্চতা

৬ ফুট ২ ইঞ্চি (১.৮৮ মিটার)

পজিশন

সেন্টার-ব্যাক / রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার

ক্লাব ক্যারিয়ার

বার্নসলি, এভারটন এবং বর্তমানে ম্যানচেস্টার সিটি ক্লাবের হয়ে খেলছেন।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

২০১৪– ইংল্যান্ড

ফুটবলের অন্যতম সেরা সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার জন স্টোনস- Image Source: mancity.com

১৯৯৪ সালের ২৮ মে ইংল্যান্ডের বার্নসলেতে জন্মগ্রহণ করেন জন স্টোনস। মাত্র ৭ বছর বয়সে তিনি স্থানীয় ক্লাব বার্নসলের যুব একাডেমিতে যোগ দেন। ২০১২ সালে বার্নসলে সিনিয়র দলে অভিষেকের মাত্র এক বছরের মাথায় তার প্রতিভা নজরে আসে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব এভারটনের।

এভারটনে রবার্তো মার্তিনেজের অধীনে স্টোনস একজন ‘বল-প্লেয়িং সেন্টার-ব্যাক’ হিসেবে নিজেকে চেনাতে শুরু করেন। সাধারণ ডিফেন্ডারদের মতো বল পেলেই তা দূরে উড়িয়ে না দিয়ে, ঠাণ্ডা মাথায় পাস খেলে আক্রমণ গড়ার যে সহজাত প্রবণতা তার ছিল, তা তখনকার ইংলিশ ফুটবলে বেশ বিরল ছিল। তবে এই স্টাইলের কারণে মাঝে মাঝে ভুল করে গোল হজম করায় তাকে কঠোর সমালোচনার মুখোমুখিও হতে হয়েছিল।

এভারটনে রবার্তো মার্তিনেজের অধীনে জন স্টোনস- Image Source: irishtimes.com

২০১৬ সালের আগস্টে প্রায় ৪৭.৫ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশাল ট্রান্সফার ফির বিনিময়ে জন স্টোনসকে ইতিহাদ স্টেডিয়ামে নিয়ে আসেন ম্যানচেস্টার সিটির নতুন গুরু পেপ গার্দিওলা। সিটিতে প্রথম কয়েক বছর চোট আর ফর্মহীনতার কারণে স্টোনসের ক্যারিয়ার কিছুটা থমকে গিয়েছিল। কিন্তু ২০২১ সালের পর থেকে তিনি যে প্রত্যাবর্তন দেখান, তা রূপকথাকেও হার মানায়।

৪৭.৫ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশাল ট্রান্সফার ফির বিনিময়ে জন স্টোনস ইতিহাদ স্টেডিয়ামে – Image Source: e0.365dm.com

২০২২-২৩ মৌসুমে পেপ গার্দিওলা স্টোনসকে নিয়ে ফুটবলের এক নতুন ট্যাকটিকস উদ্ভাবন করেন, যা ফুটবল বিশ্বে এখন ‘জন স্টোনস রোল’ নামে পরিচিত। এই কৌশলে দল যখন ডিফেন্স করে, তখন স্টোনস একজন সাধারণ সেন্টার-ব্যাক। কিন্তু দল যখন বল পজেশন পায়, তখন তিনি ডিফেন্স লাইন ছেড়ে উপরে উঠে আসেন এবং সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে খেলা নিয়ন্ত্রণ করেন।

ইন্টার মিলানের বিপক্ষে ২০২৩ উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে স্টোনস মিডফিল্ডে এতটাই অবিশ্বাস্য খেলেন যে, তিনি একাই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেন। সেই মৌসুমে সিটির ঐতিহাসিক ট্রেবল জয়ের পেছনে তিনি ছিলেন সবচেয়ে বড় এক্স-ফ্যাক্টর। নীল জার্সি গায়ে জড়িয়ে স্টোনস ইতিমধ্যেই ৬টি প্রিমিয়ার লিগ, ১টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, এবং ২টি এফএ কাপসহ অসংখ্য ট্রফি জিতেছেন। 

ইন্টার মিলানের বিপক্ষে ২০২৩ উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে স্টোনস – Image Source: e0.365dm.com

ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে জন স্টোনস গত এক দশক ধরে রক্ষণের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০১৮ বিশ্বকাপ, ইউরো ২০২০, এবং ইউরো ২০২৪ প্রতিটি বড় টুর্নামেন্টে ইংল্যান্ডের ডিফেন্স লাইনের মূল নেতা ছিলেন তিনি।

বর্তমান ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে ৩২ বছর বয়সী জন স্টোনস ইংল্যান্ড স্কোয়াডের সবচেয়ে অভিজ্ঞ এবং নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার। এজরি কোনসা বা জ্যারেল কুয়ানসার মতো তরুণ ডিফেন্ডারদের পাশে থেকে তিনি কেবল রক্ষণভাগকে আগলে রাখছেন না, বরং নিচ থেকে খেলা তৈরি করে ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগকে শাণিত করছেন। চাপের মুখে মাথা ঠাণ্ডা রেখে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার এই ক্ষমতা তাকে থ্রি লায়ন্সদের ড্রেসিংরুমের অন্যতম বড় মেন্টর করে তুলেছে।

থ্রি লায়ন্সদের ড্রেসিংরুমের অন্যতম বড় মেন্টর জন স্টোনস – Image Source: ichef.bbci.co.uk

জন স্টোনস বর্তমানে তার দীর্ঘদিনের পার্টনার এবং দুই সন্তানকে নিয়ে সুখী জীবন কাটাচ্ছেন। ২০১৯ সাল থেকে জন স্টোনস বিখ্যাত বিউটি এন্টারপ্রেনার ও কসমেটিক এক্সপার্ট অলিভিয়া নেইলরের সাথে রিলেশনশিপে আছেন। ম্যানচেস্টারের বিভিন্ন ক্লাব ইভেন্ট ও প্রিমিয়ার লিগের ট্রফি উদযাপনের সময় অলিভিয়াকে প্রায়ই স্টোনসের সাথে দেখা যায়।

২০২৩ সালের শুরুর দিকে জন স্টোনস ও অলিভিয়ার ঘরে একটি ফুটফুটে পুত্র সন্তান জন্ম নেয়। এর আগে তার সাবেক দীর্ঘদিনের পার্টনার মিলি স্যাভেজের সাথে সম্পর্কের সূত্রে জনের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। দুই সন্তানকেই স্টোনস খুব ভালোবাসেন এবং লাইমলাইট থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেন।

জন স্টোনস এবং তার পরিবার – Image Source: i2-prod.irishmirror.ie

কাতার বিশ্বকাপ থেকে আনা সেই গৃহহীন বিড়াল ‘ডেভ’-এর কথা না বললেই নয়। স্টোনস নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ডেভ এখন তাদের পরিবারের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং ঘরের অন্য সদস্যদের মতোই রাজকীয় হালে তার দিন কাটে!

Reference:

Related posts

জুলাই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড মাহফুজ আলম: এক রহস্যময় নেতৃত্বের উত্থান

ডেকলান রাইস: আয়ারল্যান্ডের প্রাক্তন, ইংল্যান্ডের বর্তমান!

মাইকেল ওলিসে: বাইরে সাধু, মাঠে কসাই!

আশা রহমান

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More