২০২১ কোপা আমেরিকা ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে মন্তিয়েল এক অনন্য আত্মত্যাগ দেখান। প্রথমার্ধে ফ্রেডের ট্যাকলে তার গোড়ালি কেটে মোজা রক্তে লাল হয়ে গেলেও তিনি মাঠ ছাড়েননি। সেই রক্তমাখা পা নিয়েই পুরো ৯০ মিনিট দুর্দান্ত ডিফেন্ডিং করে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জিতিয়ে তবেই মাঠ ছাড়েন।
গঞ্জালো মন্তিয়েল বিশ্ব ফুটবলের এমন এক নাম, যা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালের সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। আর্জেন্টিনার ৩৬ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে যিনি টাইব্রেকারে জয়সূচক পেনাল্টিটি জালে জড়িয়েছিলেন, তিনি হলেন এই মন্তিয়েল। একজন রাইট-ব্যাক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করলেও, অসীম সাহসিকতা এবং চরম চাপের মুখে নিজেকে শান্ত রাখার অবিশ্বাস্য ক্ষমতার জন্য তিনি আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন।
গঞ্জালো মন্তিয়েল-এর ব্যক্তিগত তথ্য:
|
নাম |
গঞ্জালো আরিয়েল মন্তিয়েল |
|
জন্ম |
১ জানুয়ারি ১৯৯৭ (বয়স ২৯) |
| জন্মস্থান |
গনজালেজ ক্যাটান , বুয়েনস আইরেস , আর্জেন্টিনা |
|
উচ্চতা |
১.৭৫ মিটার (৫ ফুট ৯ ইঞ্চি) |
|
পজিশন |
রাইট-ব্যাক |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
সেভিয়া,নটিংহাম ফরেস্ট এবং বর্তমানে রিভার প্লেট ক্লাবের হয়ে খেলছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০১৯– আর্জেন্টিনা |

১৯৯৭ সালের ১ জানুয়ারি আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেস প্রদেশের গঞ্জালেস কাতানের এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মন্তিয়েল। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি তার ছিল তীব্র আকর্ষণ। তার অসামান্য প্রতিভা খুব দ্রুতই আর্জেন্টিনার বিখ্যাত ক্লাব রিভার প্লেটের স্কাউটদের নজরে আসে। রিভার প্লেটের একাডেমিতে যোগ দেওয়ার পর মন্তিয়েল নিজেকে একজন সুদক্ষ ডিফেন্ডার হিসেবে গড়ে তুলতে শুরু করেন। সতীর্থ ও ভক্তদের কাছে তার জনপ্রিয় ডাকনাম “ক্যাচেতে”, যার অর্থ ‘গাল’।
২০১৬ সালে রিভার প্লেটের মূল দলে গঞ্জালো মন্তিয়েলের অভিষেক হয়। নিজের প্রথম মেয়াদে রিভার প্লেটের হয়ে তিনি ১৪০টি ম্যাচ খেলেছেন এবং বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিরোপা জিতেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ২০১৮ সালের কোপা লিবার্তোদোরেস, যেখানে ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বোকা জুনিয়র্সকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল রিভার প্লেট। এছাড়া ২০২১ সালে তিনি আর্জেন্টাইন প্রাইমেরা ডিভিশনও জেতেন।
২০২১ সালে প্রায় ১১ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে স্প্যানিশ ক্লাব সেভিয়াতে যোগ দেন মন্তিয়েল। সেভিয়ার হয়ে তিনি ৫২টি ম্যাচ খেলেন। তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মুহূর্ত আসে ২০২২-২৩ মৌসুমের উয়েফা ইউরোপা লিগ ফাইনালে। রোমার বিপক্ষে পেনাল্টি শুটআউটে জয়সূচক গোলটি করে তিনি সেভিয়াকে তাদের সপ্তম ইউরোপা লিগ শিরোপা এনে দেন।

পরবর্তীতে ২০২৩-২৪ মৌসুমে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দল নটিংহাম ফরেস্টে ধারে খেলতে যান মন্তিয়েল। সেখানে তিনি ১৪টি ম্যাচ খেলে ইংল্যান্ডের শীর্ষ লিগের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
ইউরোপে কয়েক বছর কাটানোর পর, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রায় ৪.৫ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে মন্তিয়েল তার পুরনো ক্লাব রিভার প্লেটে ফিরে আসেন। তিনি আবারও নিজেকে দলের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং ২০২৮ সাল পর্যন্ত ক্লাবের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। ২০২৫ এবং ২০২৬ মৌসুমেও তিনি রিভার প্লেটের রক্ষণভাগের অন্যতম প্রধান ভরসা।
২০১৯ সালের মার্চ মাসে ভেনিজুয়েলার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে মন্তিয়েলের অভিষেক হয়। কোচ লিওনেল স্কালোনি তার ওপর অগাধ আস্থা রেখেছিলেন, যার প্রতিদান মন্তিয়েল প্রতিটি ম্যাচেই দিয়েছেন।
২০২১ সালের কোপা আমেরিকায় মন্তিয়েল ছিলেন স্কালোনির অন্যতম প্রধান অস্ত্র। ব্রাজিলের ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়ামে ফাইনালে তিনি দুর্দান্ত পারফর্ম করেন। প্রথমার্ধে ফ্রেডের একটি মারাত্মক ট্যাকলে তার গোড়ালি থেকে রক্ত ঝরলেও, তিনি দমে যাননি। রক্তমাখা পায়ে পুরো ম্যাচ খেলে আর্জেন্টিনাকে ২৮ বছর পর শিরোপা জেতাতে সাহায্য করেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা জয়ী দলেরও তিনি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপ গঞ্জালো মন্তিয়েলকে অমরত্ব এনে দেয়। ১৮ ডিসেম্বর ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে তিনি মাঠে নামেন। যদিও তার একটি হ্যান্ডবলের কারণে ফ্রান্স পেনাল্টি পেয়ে সমতায় ফেরে, কিন্তু টাইব্রেকারে তিনি হয়ে ওঠেন পুরো জাতির ত্রাতা। শুটআউটে আর্জেন্টিনার হয়ে চতুর্থ এবং জয়সূচক পেনাল্টিটি নিতে আসেন মন্তিয়েল। ফরাসি গোলরক্ষক হুগো লরিসকে পরাস্ত করে তিনি বল জালে জড়াতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে পুরো আর্জেন্টিনা। এটি ছিল তার ক্যারিয়ারের এবং আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।

গঞ্জালো মন্তিয়েল মূলত একজন রাইট-ব্যাক হিসেবে খেললেও তার আক্রমণাত্মক মনোভাব, গতি এবং নিখুঁত ক্রস করার ক্ষমতা তাকে বিশেষত্ব দিয়েছে। তবে তার সবচেয়ে বড় গুণ হলো মানসিক দৃঢ়তা। বড় ম্যাচের প্রচণ্ড চাপের মুখেও তিনি বরফের মতো শান্ত থাকতে পারেন, যার প্রমাণ তিনি বিশ্বকাপ এবং ইউরোপা লিগের ফাইনালে পেনাল্টি শুটআউটে দিয়েছেন। রক্ষণে তার ট্যাকলিং এবং পজিশনিং অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
বর্তমানে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিচ্ছে আর্জেন্টিনা। তবে সম্প্রতি চোটের কারণে মন্তিয়েলের অংশগ্রহণ নিয়ে কিছুটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কোচ স্কালোনি তার শারীরিক অবস্থার দিকে কড়া নজর রাখছেন, কারণ দলে রাইট-ব্যাক পজিশনে তিনি এবং নাহুয়েল মোলিনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রিভার প্লেটে ফিরে আসার পর তিনি নিয়মিত খেললেও, বিশ্বকাপের আগে নিজেকে পুরোপুরি ফিট প্রমাণ করা তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

গঞ্জালো মন্তিয়েল অত্যন্ত সাধারণ ও পরিশ্রমী পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। তার বাবা টিটো মন্তিয়েল এবং মা মারিসা মন্তিয়েল তাকে ফুটবলার বানানোর জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। শৈশবে রিভার প্লেটে অনুশীলনে যাওয়ার জন্য তাকে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা যাতায়াত করতে হতো, আর তার মা সবসময় তার পাশে থাকতেন। তার এক বোন রয়েছে যার নাম জ্যাকেলিন।
গঞ্জালো মন্তিয়েলের স্ত্রীর নাম কারিনা নাকিলা। তাদের ভালোবাসার গল্পটি বেশ দীর্ঘ। ২০১৯ সাল থেকে তারা একে অপরের সাথে প্রেম করছেন। যখন মন্তিয়েল আর্জেন্টিনার ক্লাব রিভার প্লেটে খেলতেন, তখন থেকেই কারিনা তার প্রতিটি পদক্ষেপে সঙ্গী হিসেবে ছিলেন। মন্তিয়েল যখন ইউরোপে খেলতে যান, কারিনাও তার সাথে সেখানে পাড়ি জমান।

দীর্ঘ কয়েক বছর প্রেমের পর, ২০২৪ সালে তারা পারিবারিকভাবে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন। বর্তমানে কারিনা এবং গঞ্জালো সুখি দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করছেন। ২০২৫ সালে মন্তিয়েল পুনরায় তার পুরনো ক্লাব রিভার প্লেটে ফিরে আসায় তারা এখন নিজ দেশ আর্জেন্টিনাতেই বসবাস করছেন। কারিনা প্রায়ই গ্যালারিতে উপস্থিত থেকে মন্তিয়েলকে উৎসাহ দিতে দেখা যায়।
Reference:

