কল্পনার জগত যেখানে বাস্তবের মাটিতে ধরা দেয়, তার নাম ইউনিভার্সাল স্টুডিওস জাপান। জাপানের ওসাকা শহরে অবস্থিত এই পার্কটি বিশ্বজুড়ে থিম পার্ক প্রেমীদের কাছে এক স্বপ্নের গন্তব্য। এখানে পা রাখলেই মনে হবে হলিউডের রূপালি পর্দা, জাপানের রঙিন পপ কালচার, জনপ্রিয় অ্যানিমে এবং ভিডিও গেমসের এক জাদুকরী দুনিয়া আপনার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ২০০১ সালে যাত্রা শুরু করা এই পার্কটির প্রতিটি কোণায় লুকিয়ে আছে বিস্ময়; এটি কেবল রোমাঞ্চকর রাইডের জন্যই নয়, বরং দর্শনার্থীদের এক মোহমায়ায় আচ্ছন্ন করা জাদুকরী পরিবেশের জন্য বিশ্বজোড়া খ্যাতি লাভ করেছে। চলুন জেনে নিই এই পার্কের প্রতিটি কর্নারের খুঁটিনাটি।

ইউনিভার্সাল স্টুডিওস জাপান হলো যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে তৈরি হওয়া ইউনিভার্সাল স্টুডিওসের প্রথম থিম পার্ক! বর্তমানে ইউএসজে-এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা হলো সুপার নিন্টেন্ডো ওয়ার্ল্ড। এখানে প্রবেশ করলেই মনে হবে আপনি বাস্তবের পৃথিবী ছেড়ে সুপার মারিওর ভিডিও গেমের ভেতরে ঢুকে পড়েছেন। মাশরুম কিংডম, প্রিন্সেস পিচের দুর্গ থেকে শুরু করে বাউজারের ক্যাসেল সবকিছুই একদম নিখুঁতভাবে তৈরি। আপনি চাইলে পার্ক থেকে একটি “পাওয়ার-আপ ব্যান্ড” কিনতে পারেন, যা আপনার স্মার্টফোনের ইউএসজে অ্যাপের সাথে যুক্ত থাকে। এটি হাতে পরে পার্কের বিভিন্ন ব্লকে ঘুষি মারলে গেমের মতোই ডিজিটাল কয়েন সংগ্রহ করা যায়!
হ্যারি পটার ভক্তদের জন্য এটি একটি জাদুর জগত। হগসমিড ভিলেজের বরফে ঢাকা ছাদ, হগওয়ার্টস এক্সপ্রেস এবং বিখ্যাত বাটারবিয়ার সবকিছুই পাবেন এখানে। তবে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো হগওয়ার্টস দুর্গের ভেতরে থাকা “হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ফরবিডেন জার্নি” রাইড। এটি একটি ফোর-ডি মোশন রাইড, যা আপনাকে হ্যারির সাথে ব্রুমস্টিকে উড়ে বেড়ানোর অনুভূতি দেবে। এখানকার হগওয়ার্টস দুর্গের ঠিক সামনে থাকা “কালো হ্রদ” অত্যন্ত বিশেষ একটি সংযোজন। হ্রদের পানিতে দুর্গের যে নিখুঁত প্রতিফলন দেখা যায়, তা অরল্যান্ডো বা হলিউডের ইউনিভার্সাল পার্কগুলোতে নেই!

পার্কের সবচেয়ে কিউট এবং কোলাহলপূর্ণ জায়গা হলো মিনিয়ন পার্ক। “ডেসপিকেবল মি” সিনেমার আদলে তৈরি এই এলাকায় মিনিয়নদের নানা পাগলামি দেখতে পাবেন। এখানকার মূল রাইড হলো “মিনিয়ন মেহেম”, যা একটি সিমুলেটর রাইড। ছোট-বড় সবার জন্যই এটি ভীষণ উপভোগ্য। পুরো পার্ক জুড়ে মিনিয়নদের থিমে তৈরি খাবার, পপকর্ন বাকেট এবং স্যুভেনিয়ার পাওয়া যায়। মিনিয়ন পার্কটি আগে “ব্যাক টু দ্য ফিউচার” রাইডের জায়গা ছিল। পুরানো সেই রাইডটি ভেঙে এই রঙিন মিনিয়ন জগত তৈরি করা হয়েছে, যা বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মিনিয়ন থিমড এরিয়া।
যারা একটু বেশি অ্যাডভেঞ্চার ও থ্রিল পছন্দ করেন, তাদের জন্য জুরাসিক পার্ক এরিয়া। এখানকার “দ্য ফ্লাইং ডাইনোসর” রোলার কোস্টারটি আপনাকে আক্ষরিক অর্থেই একটি টেরানোডন ডাইনোসরের থাবায় বন্দি হয়ে আকাশে ওড়ার অনুভূতি দেবে। এছাড়াও রয়েছে “জুরাসিক পার্ক – দ্য রাইড”, যা একটি ওয়াটার বোট রাইড এবং এর শেষে রয়েছে বিশাল টি-রেক্সের সামনে থেকে খাড়া পতন!

ইউএসজে-তে প্রবেশের জন্য এন্ট্রি টিকিট কিনতে হয়। তবে শুধু এন্ট্রি টিকিট থাকলে সুপার নিন্টেন্ডো ওয়ার্ল্ডের মতো জনপ্রিয় জায়গায় প্রবেশ নাও করতে পারতে পারেন। ভিড় এড়ানোর জন্য “ইউনিভার্সাল এক্সপ্রেস পাস” কেনা বুদ্ধিমানের কাজ, যা দিয়ে লম্বা লাইন এড়িয়ে রাইডে ওঠা যায়। এছাড়া ইউএসজে অ্যাপ ব্যবহার করে বিনামূল্যে “এরিয়া টাইমড এন্ট্রি টিকিট” সংগ্রহ করা যায়, যা নির্দিষ্ট সময়ে নিন্টেন্ডো বা হ্যারি পটার এরিয়ায় প্রবেশের সুযোগ দেয়।
ইউনিভার্সাল স্টুডিওস জাপানে টিকিটের দাম ফিক্সড নয়। এরা “ডায়নামিক প্রাইসিং” ব্যবহার করে, অর্থাৎ যেদিন ভিড় বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে (যেমন ছুটির দিন), সেদিন টিকিটের দাম বেশি থাকে এবং সাধারণ দিনে দাম তুলনামূলক কম হয়।
ওসাকা স্টেশন থেকে ট্রেনে খুব সহজেই ইউএসজে-তে পৌঁছানো যায়। “ইউনিভার্সাল সিটি স্টেশন”-এ নেমে মাত্র কয়েক মিনিট হাঁটলেই পার্কের গেট। পার্কে যাওয়ার সেরা সময় হলো বসন্ত (মার্চ-মে) এবং শরৎকাল (সেপ্টেম্বর-নভেম্বর)। এছাড়া হ্যালোইন বা বড়দিনের সময় পার্কে বিশেষ ইভেন্ট ও ডেকোরেশন থাকে।
হ্যালোইনের সময় ইউএসজে-তে “হ্যালোইন হরর নাইটস” পালিত হয়। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই পার্কের রাস্তাগুলোতে শত শত “জম্বি” ঘুরে বেড়ায়, যা সাধারণ একটি থিম পার্ককে মুহূর্তের মধ্যে ভৌতিক সিনেমায় পরিণত করে!

Reference:

