ফ্রান্সের লিয়ন শহরের বুক চিরে বয়ে চলা সোন নদীর ওপর অবস্থিত অন্যতম বিখ্যাত এবং দৃষ্টিনন্দন সেতু হলো পন্ট বোনাপার্ট। এটি লিয়নের দুটি প্রধান অংশ ঐতিহাসিক ‘ভিয়্যু লিয়ন’ বা পুরনো লিয়ন এবং প্রাণচঞ্চল ‘প্রেসকুইল’ বা উপদ্বীপ অঞ্চলকে সংযুক্ত করেছে। এর চমৎকার ভৌগোলিক অবস্থান এবং শহরের প্রধান কেন্দ্রগুলোর সাথে সরাসরি যোগাযোগের কারণে এটি লিয়নের সবচেয়ে ব্যস্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলোর একটি। শুধু দৈনন্দিন যাতায়াত নয়, লিয়নের ঐতিহাসিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য পর্যটকদের কাছে এটি একটি অতি জনপ্রিয় স্থান।

পন্ট বোনাপার্ট থেকে তাকালেই ফোরভিয়ার পাহাড় এবং এর চূড়ায় থাকা ‘ব্যাসিলিকা অফ নটর-ডেম ডি ফোরভিয়ার’-এর সবচেয়ে সুন্দর ও আইকনিক দৃশ্যটি দেখা যায়। ফটোগ্রাফারদের জন্য এটি লিয়নের অন্যতম সেরা স্পট!
এই সেতুটির নির্মাণ এবং নামকরণের ইতিহাস বেশ বৈচিত্র্যময় এবং উত্থান-পতনে ভরা। ১৬৩৪ সালে এই স্থানে সর্বপ্রথম একটি কাঠের সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল, যার নাম ছিল ‘পন্ট দে ল’আর্চেভেশে’ বা আর্চবিশপের সেতু। সময়ের সাথে সাথে লিয়ন শহরের বিস্তার এবং মানুষের যাতায়াত বাড়তে থাকায় এই কাঠের সেতুটি অপর্যাপ্ত হয়ে পড়ে। ফরাসি বিপ্লব এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের নানা অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে এই সেতুটি একাধিকবার পুনর্নির্মিত হয়েছে এবং এর নামও বেশ কয়েকবার পরিবর্তন করা হয়েছে।
বর্তমান নাম ‘পন্ট বোনাপার্ট’ পাওয়ার আগে এটি ‘পন্ট টিলসিট’ নামে পরিচিত ছিল, যা ১৮০৭ সালের বিখ্যাত টিলসিট চুক্তির স্মরণে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টের অসামান্য অবদানের প্রতি সম্মান জানিয়ে এর নতুন নামকরণ করা হয়।
উনিশ শতকে সেতুটির ওপর যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকলে স্থপতিরা এটিকে আরও প্রশস্ত ও মজবুত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। ১৮৬৩ সালের দিকে সেতুটিকে পাথরের সাহায্যে পুনরায় আধুনিকায়ন করা হয়, যাতে ঘোড়ার গাড়ি এবং পথচারীরা নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে। কিন্তু লিয়নের সোন নদী মাঝে মাঝেই ভয়ংকর রূপ ধারণ করত। নদীর প্রবল স্রোত এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সেতুটি বেশ কয়েকবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তবুও লিয়নবাসী বারবার তাদের এই প্রিয় সেতুটিকে মেরামত করে ব্যবহার উপযোগী করে তুলেছেন।

১৮৪০ সালের দিকে সোন নদীতে এক ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়, যা লিয়নের ইতিহাসে অন্যতম ধ্বংসাত্মক বন্যা হিসেবে পরিচিত। সেই প্রবল বন্যায় এই সেতুর একাংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং মেরামত করতে কয়েক বছর সময় লেগেছিল।
পন্ট বোনাপার্টের ইতিহাসের সবচেয়ে করুণ এবং ভয়াবহ অধ্যায়টি রচিত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যখন মিত্রবাহিনী লিয়ন শহরকে মুক্ত করার জন্য অগ্রসর হচ্ছিল, তখন পশ্চাদপসরণকারী জার্মান নাৎসি বাহিনী শহরের প্রধান সেতুগুলো ধ্বংস করে দেয়, যাতে মিত্রবাহিনীর অগ্রযাত্রা ব্যাহত হয়। সেই নির্মম ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয় পন্ট বোনাপার্টও। ডিনামাইট দিয়ে সেতুটিকে সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা লিয়নের সাধারণ মানুষের জন্য ছিল এক বিশাল মানসিক আঘাত।
জার্মান বাহিনী যখন সেতুটি ধ্বংস করে, তখন এর বিশাল পাথরের টুকরোগুলো সোন নদীর বুকে এমনভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল যে, বেশ কয়েকমাস ওই নদীপথে ছোট নৌকা বা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর লিয়ন শহরকে আবার নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে পন্ট বোনাপার্টকে বর্তমান রূপে পুনর্নির্মাণ করা হয়। নতুন এই সেতুটি আগের চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক, মজবুত এবং প্রশস্ত করে তৈরি করা হয়, যাতে এটি বিংশ শতাব্দীর ভারী মোটরযানের চাপ সামলাতে পারে। কংক্রিট এবং পাথরের চমৎকার সমন্বয়ে তৈরি বর্তমান সেতুটিতে তিনটি সুন্দর খিলান বা আর্চ রয়েছে, যা এর স্থাপত্যশৈলীকে একটি আধুনিক অথচ ক্লাসিক রূপ দিয়েছে।
আধুনিক এই সেতুটির নকশা এমনভাবে করা হয়েছে যাতে নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহে কোনো বাধা সৃষ্টি না হয়। এর তিনটি বিশাল খিলানের কারণে দূর থেকে এটিকে একটি ছিমছাম জলজ তোরণের মতো মনে হয়, যা শহরের নান্দনিকতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

স্থানীয় ফরাসিরা এবং অনেক রোমান্টিক জুটি সন্ধ্যার পর পন্ট বোনাপার্টতে হাঁটতে ভালোবাসেন। কারণ রাতের বেলা এখান থেকে নদীর জলে চারপাশের ঐতিহাসিক ভবন এবং ফোরভিয়ার পাহাড়ের যে প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে, তা লিয়নের সবচেয়ে রোমান্টিক দৃশ্যগুলোর একটি হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত।
লিয়নের বিশ্ববিখ্যাত ‘আলোর উৎসব’ চলাকালীন পন্ট বোনাপার্টকে অপূর্ব সুন্দর আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়। পর্যটকরা এখানে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের সময় লিয়ন শহরের সোনালী আভা উপভোগ করতে ভালোবাসেন। একদিকে নদীর শান্ত জলরাশি, অন্যদিকে পুরনো লিয়নের রেনেসাঁ আমলের লাল ছাদওয়ালা বাড়িগুলো সব মিলিয়ে পন্ট বোনাপার্ট এক জাদুকরী পরিবেশের সৃষ্টি করে।
Reference:

