ওসাকাকে বলা হয় জাপানের কমেডি বা হাসির রাজধানী। জাপানি স্ট্যান্ড-আপ কমেডির সবচেয়ে জনপ্রিয় ধরন ‘মাঞ্জাই’-এর জন্ম ও বিকাশ এই শহরেই।
সূর্যোদয়ের দেশ জাপানের কথা উঠলেই আমাদের চোখের সামনে হয়তো ভেসে ওঠে টোকিওর সেই চিরচেনা ব্যস্ততা কিংবা কিয়োটোর শান্ত মন্দিরগুলো। কিন্তু জাপানের আসল স্পন্দন, প্রাণখোলা হাসি আর ভোজনরসিকদের স্বর্গরাজ্য কোথায় লুকিয়ে আছে জানেন? সেই জাদুকরী শহরটির নাম হলো ওসাকা।
টোকিওর পর জাপানের দ্বিতীয় বৃহত্তম মেট্রোপলিটন এলাকা হওয়া সত্ত্বেও, ওসাকার নিজস্ব এক আলাদা আবেদন রয়েছে। একদিকে যেমন আকাশচুম্বী দালান আর নিয়ন আলোয় ঝলমলে আধুনিক রাতের জীবন, অন্যদিকে ঠিক তেমনি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক দুর্গ সব মিলিয়ে ওসাকা যেন প্রাচীন ঐতিহ্য আর চরম আধুনিকতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন। এখানকার মানুষের আন্তরিকতা এবং খাবারের প্রতি পাগলামি শহরটিকে পুরো জাপান থেকে একেবারেই আলাদা করে তুলেছে।

ভৌগোলিক অবস্থান
জাপানের মূল ভূখণ্ড ‘হোনশু’ দ্বীপের কানসাই অঞ্চলে এক অপূর্ব নৈসর্গিক আবহে গড়ে উঠেছে ওসাকা। ইয়োদো নদীর মোহনা এবং ওসাকা উপসাগরের স্নিগ্ধ জলরাশির কোল ঘেঁষে বেড়ে ওঠা এই শহরটি প্রাচীনকাল থেকেই একটি প্রাণবন্ত ও সমৃদ্ধ বন্দর নগরী হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
তবে ওসাকার সবচেয়ে মনোহর রূপটি লুকিয়ে আছে এর জলপথের জাদুতে। শহরের বুক চিরে বয়ে চলা অসংখ্য নদী এবং সুনিপুণ জালের মতো ছড়িয়ে থাকা অগণিত খালের এক অপূর্ব নেটওয়ার্কের কারণে, সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ওসাকাকে ভালোবেসে ডাকা হয় “জাপানের ভেনিস”!
আয়তন
ভৌগোলিক পরিমাপের দিক থেকে ওসাকা প্রদেশ মোট আয়তন প্রায় ১,৯০৫ বর্গকিলোমিটার হলেও, মূল ওসাকা শহরটির ব্যাপ্তি মাত্র ২২৫ বর্গকিলোমিটারের কাছাকাছি। বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়ানো-ছিটানো না হলেও, আধুনিকতার ছোঁয়ায় গড়ে ওঠা এই ছোট শহরটি অত্যন্ত সুসংগঠিত ও ঘনবসতিপূর্ণ।
জাপানের ৪৭টি প্রশাসনিক এলাকার মধ্যে আয়তনের দিক থেকে ওসাকা হলো দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম। তবে আয়তনে ছোট হলেও এর সামর্থ্য কিন্তু কোনো অংশে কম নয়! বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই এক চিলতে ভূখণ্ডটিই আজ পুরো জাপানের শক্তিশালী অর্থনীতির অন্যতম প্রধান প্রাণকেন্দ্র ও চালিকাশক্তি।
জনসংখ্যা
মূল ওসাকা শহরের সীমানায় বাস করেন প্রায় ২৭ লাখ মানুষ। তবে ওসাকাকে কেন্দ্র করে কিয়োটো ও কোবের মতো শহরগুলো নিয়ে যে সুবিশাল ‘কানসাই মেট্রোপলিটন এলাকা’ গড়ে উঠেছে, তা প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষের এক বিশাল জনসমুদ্র।
জানলে অবাক হবেন, রাতের শান্ত ওসাকার তুলনায় দিনের আলো ফুটতেই এই শহরের জনসংখ্যা জাদুকরীভাবে প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়ে যায়! এর কারণ হলো, প্রতিদিন সকালে আশেপাশের শহরগুলো থেকে জীবনজীবিকা আর কাজের তাগিদে লক্ষ লক্ষ মানুষ একযোগে ছুটে আসেন এই কর্মমুখর নগরীতে।

ইতিহাস
প্রাচীনকাল থেকেই জাপানের ইতিহাসে ওসাকার এক রাজকীয় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রাচীন যুগে এই শহরের নাম ছিল ‘নানিওয়া’। নদী ও সমুদ্রপথের এক চমৎকার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায়, এটি খুব দ্রুতই জাপানের অন্যতম প্রধান বন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। শুধু তা-ই নয়, প্রাচীনকালে এশিয়া মহাদেশের অন্যান্য অংশের বিশেষ করে চীন ও কোরিয়া সাথে জাপানের সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং বাণিজ্যিক আদান-প্রদানের মূল প্রবেশদ্বার ছিল এই নানিওয়া।
ষোড়শ শতাব্দীতে বিখ্যাত সামুরাই যোদ্ধা ও সেনাপতি তোয়োতোমি হিদেয়োশি এখানে সুবিশাল ‘ওসাকা ক্যাসেল’ বা ওসাকা দুর্গ নির্মাণ করেন। এই দুর্গটি ওসাকাকে একটি অজেয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দেয়। পরবর্তীতে এডো যুগে (১৬০৩-১৮৬৭) দেশের শাসনকেন্দ্র টোকিওতে স্থানান্তরিত হলেও, ওসাকা জাপানের প্রধান বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবেই নিজের আধিপত্য ধরে রাখে। সমৃদ্ধ ব্যবসায়ী শ্রেণির উত্থান এবং শিল্পের প্রসারের কারণে বিংশ শতাব্দীতে ওসাকাকে “প্রাচ্যের ম্যানচেস্টার” বলেও আখ্যায়িত করা হতো।

অনেকেই মনে করেন কিয়োটো, নারা বা টোকিও বুঝি জাপানের প্রথম রাজধানী। কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে এক চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসে! ৫ম শতাব্দীতে ওসাকাই তৎকালীন নানিওয়া আসলে সম্রাট কোতোকু-এর শাসনামলে জাপানের প্রথম আনুষ্ঠানিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যদিও পরে রাজধানী বিভিন্ন শহরে স্থানান্তরিত হয়েছে, তবে জাপানের প্রথম প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র হওয়ার গৌরব ওসাকারই!
দর্শনীয় স্থান
ওসাকায় পর্যটকদের জন্য রয়েছে প্রাচীন ঐতিহ্য আর আধুনিক বিনোদনের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। প্রাচীন দুর্গ থেকে শুরু করে চোখ ধাঁধানো থিম পার্ক সব মিলিয়ে ওসাকা যেন এক জাদুকরী পর্যটন কেন্দ্র।
ওসাকা ক্যাসেল
জাপানের ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের অন্যতম উজ্জ্বল এক রত্ন হলো ওসাকা ক্যাসেল। ষোড়শ শতাব্দীতে জাপানের বিখ্যাত সামুরাই এবং সেনাপতি তোয়োতোমি হিদেয়োশি এই সুবিশাল দুর্গটি নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল এই দুর্গটিকে কেন্দ্র করে একটি ঐক্যবদ্ধ এবং শক্তিশালী জাপান গড়ে তোলা।
সবুজ ছাদ, খাঁটি সোনায় মোড়ানো কারুকাজ এবং শ্বেতপাথরের মতো শুভ্র দেয়াল সব মিলিয়ে এই দুর্গটি যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠা এক ঐতিহাসিক ক্যানভাস। দুর্গের চারপাশ ঘিরে রয়েছে গভীর জলপূর্ণ পরিখা এবং দানবীয় সব পাথরের দেয়াল, যা একে একসময় শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করত। বিশেষ করে বসন্তকালে যখন এর চারপাশের সুবিশাল পার্কে থাকা হাজার হাজার সাকুরা বা চেরি ফুল একসাথে ফুটে ওঠে, তখন পুরো ক্যাসেল এলাকাটি এক জাদুকরী স্বপ্নপুরীতে পরিণত হয়।
তোয়োতোমি হিদেয়োশি তার অগাধ সম্পদ ও ক্ষমতা জাহির করতে বেশ পছন্দ করতেন। তাই তিনি ক্যাসেলের ছাদের টাইলস এবং বাঘ ও মাছের সংমিশ্রণে তৈরি পৌরাণিক মূর্তিগুলোতে খাঁটি সোনার প্রলেপ ব্যবহার করেছিলেন, যা আজও সূর্যের আলোতে ঝলমল করে ওঠে।

দোতোনবোওরি
সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথেই ওসাকার যে জায়গাটি জাদুকরীভাবে সবচেয়ে বেশি প্রাণবন্ত আর রঙিন হয়ে ওঠে, তার নাম দোতোনবোওরি। শহরের বুক চিরে বয়ে চলা দোতোনবোওরি খালের দুই তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই এলাকাটি যেন এক অফুরন্ত উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু।
বিশাল সব নিয়ন সাইনবোর্ডের ঝলকানি, খালের জলে তাদের রঙিন প্রতিবিম্ব, আর চারদিক থেকে ভেসে আসা সুস্বাদু স্ট্রিট ফুডের মৌ মৌ গন্ধে দোতোনবোওরি এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে। এখানকার রেস্তোরাঁগুলোর সামনে ঝুলতে থাকা বিশাল আকৃতির জীবন্ত কাঁকড়া, অক্টোপাস কিংবা ড্রাগনের থ্রিডি সাইনবোর্ডগুলো দেখলে মনে হবে যেন কোনো ফ্যান্টাসি মুভির সেটে চলে এসেছেন। পর্যটকদের কোলাহল, গানের সুর আর স্থানীয়দের আড্ডায় মুখর এই জায়গাটিতে এলে ওসাকার আসল প্রাণশক্তি অনুভব করা যায়।
দোতোনবোওরির সবচেয়ে আইকনিক সাইনবোর্ড হলো নীল ট্র্যাকে দুই হাত তুলে দৌড়াতে থাকা এই ‘গ্লিকো ম্যান’। ১৯৩৫ সালে প্রথম এই সাইনবোর্ডটি স্থাপন করা হয়েছিল। এটি মূলত একটি জাপানি ক্যান্ডি ও স্ন্যাকস কোম্পানির বিজ্ঞাপন হলেও, যুগের পর যুগ ধরে এটি ওসাকার অনানুষ্ঠানিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এর সামনে দাঁড়িয়ে একই পোজ দিয়ে একটি ছবি না তুললে পর্যটকদের ওসাকা ভ্রমণই যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়!

ইউনিভার্সাল স্টুডিওস জাপান
হলিউড সিনেমার শ্বাসরুদ্ধকর অ্যাকশন আর জাপানি পপ-কালচারের রঙিন দুনিয়ার যদি কোথাও সরাসরি দেখা মেলে, তবে তার নাম ইউনিভার্সাল স্টুডিওস জাপান। ওসাকা উপসাগরের তীরে অবস্থিত এই সুবিশাল থিম পার্কটি কেবল জাপানের নয়, বরং পুরো এশিয়ার অন্যতম সেরা এবং রোমাঞ্চকর এক বিনোদন কেন্দ্র।
পার্কের সুবিশাল গেট দিয়ে ভেতরে পা রাখলেই মনে হবে আপনি যেন বাস্তব পৃথিবী ছেড়ে কোনো জাদুকরী রূপকথার পাতা কিংবা প্রিয় কোনো ব্লকবাস্টার সিনেমার সেটে ঢুকে পড়েছেন! ‘দ্য উইজার্ডিং ওয়ার্ল্ড অফ হ্যারি পটার’-এ জাদুদণ্ড হাতে হগওয়ার্টস দুর্গে ঘুরে বেড়ানো, কিংবা ‘জুরাসিক পার্ক’-এর ভয়ংকর ডাইনোসরদের কাছ থেকে একটুর জন্য বেঁচে ফেরা ইউনিভার্সাল স্টুডিওস জাপানের প্রতিটি কোণায় লুকিয়ে আছে চরম উত্তেজনা। এছাড়া মিনিয়নদের সাথে দুষ্টুমি করা থেকে শুরু করে চোখ ধাঁধানো লাইভ শো ও প্যারেডগুলো দর্শনার্থীদের সারাদিন এক অন্যরকম ঘোরের মধ্যে রাখে।

শিনসেকাই
শিনসেকাই শব্দের অর্থ হলো “নতুন বিশ্ব”। ১৯১২ সালে যখন এই এলাকাটি গড়ে তোলা হয়, তখন এটি ছিল ওসাকার সবচেয়ে আধুনিক এবং জাঁকজমকপূর্ণ বিনোদন কেন্দ্র। যদিও সময়ের পরিক্রমায় সেই ‘নতুন বিশ্ব’ আজ ওসাকার পুরোনো দিনের নস্টালজিয়ায় পরিণত হয়েছে, তবে এর আকর্ষণ একটুও কমেনি!
বর্তমানে শিনসেকাই হলো এমন এক জাদুকরী জায়গা, যেখানে পা রাখলে মনে হবে আপনি যেন টাইম মেশিনে করে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের জাপানে ফিরে গেছেন। রাস্তার দুই ধারে বড় বড় নিয়ন সাইনবোর্ড, কাগজের রঙিন লণ্ঠন, গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট রেস্তোরাঁর ভিড় আর বাতাসে ভেসে থাকা সুস্বাদু ভাজাভুজির ঘ্রাণ সব মিলিয়ে এখানকার পরিবেশ অত্যন্ত প্রাণবন্ত এবং রেট্রো ধাঁচের। আধুনিক ওসাকার আকাশচুম্বী দালানকোঠার ভিড়ে শিনসেকাই যেন পুরোনো জাপানের এক অমলিন স্মৃতি হয়ে আজও বেঁচে আছে।
শিনসেকাইয়ের রাস্তা বা দোকানে ঘুরলে আপনি একটি অদ্ভুত চেহারার হাস্যোজ্জ্বল মূর্তির দেখা পাবেন, যার নাম ‘বিলিকেন’। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই জাপানি সৌভাগ্যের দেবতার জন্ম কিন্তু জাপানে নয়, বরং আমেরিকায়! ১৯০৮ সালে ফ্লোরেন্স প্রিৎজ নামের এক মার্কিন শিল্পীর স্বপ্নে দেখা চরিত্র থেকে এটি তৈরি। স্থানীয়দের গভীর বিশ্বাস, বিলিকেনের প্রসারিত পায়ের পাতায় হাত বুলিয়ে দিলে জীবনে সৌভাগ্য বয়ে আসে।

উমেদা স্কাই বিল্ডিং
ওসাকার আকাশরেখায় সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা আধুনিক স্থাপত্যের এক অনন্য মাস্টারপিস হলো উমেদা স্কাই বিল্ডিং। ১৭৩ মিটার উঁচু ৪০ তলা বিশিষ্ট দুটি সমান্তরাল টাওয়ার উপরের দিকে গিয়ে একটি ছাদের মাধ্যমে একে অপরের সাথে যুক্ত হয়েছে, যা দূর থেকে দেখলে এক সুবিশাল তোরণের মতো মনে হয়।
এই ভবনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর একদম চূড়ায় থাকা ‘ফ্লোটিং গার্ডেন অবজারভেটরি’ বা ভাসমান উদ্যান। উন্মুক্ত এই ছাদ থেকে পুরো ওসাকা শহরের ৩৬০ ডিগ্রি প্যানোরামিক ভিউ দেখা যায়। বিশেষ করে সূর্যাস্ত এবং রাতের বেলা যখন পুরো শহর নিয়ন আলোয় সেজে ওঠে, তখন উন্মুক্ত আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে ওপর থেকে সেই ঝলমলে দৃশ্য উপভোগ করাটা এক জাদুকরী অভিজ্ঞতা।
এক টাওয়ার থেকে অন্য টাওয়ারে যাওয়ার জন্য একদম ওপরের দিকে রয়েছে কাচে ঘেরা এক জোড়া এস্কেলেটর বা চলন্ত সিঁড়ি। মাটি থেকে প্রায় ৪০ তলা ওপরে কেবল একটি কাচের টিউবের ভেতর দিয়ে শূন্যে ভেসে থাকার এই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা আপনাকে অন্য গ্রহে বা মহাকাশে ভ্রমণের অনুভূতি দেবে। উচ্চতাভীতি থাকলে নিচে তাকানো বারণ!
সুমিয়োশি তাইশা
আধুনিক ওসাকার কর্মব্যস্ততা এবং কংক্রিটের জঙ্গলের ঠিক মাঝখানেই যেন থমকে আছে কয়েক হাজার বছরের পুরোনো এক আধ্যাত্মিক প্রশান্তির জগৎ, যার নাম ‘সুমিয়োশি তাইশা’। তৃতীয় শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত এই পবিত্র শিন্টো মন্দিরটি জাপানের অন্যতম প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থানগুলোর একটি।
মন্দির প্রাঙ্গণে পা রাখলেই চারপাশের বিশাল সিডার গাছ, শান্ত পরিবেশ এবং আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য আপনার মনকে মুহূর্তেই স্নিগ্ধ করে তুলবে। ওসাকার মতো একটি প্রাণবন্ত ও কোলাহলপূর্ণ শহরের বুকে এমন এক টুকরো প্রাচীন ও শান্ত নিসর্গ যেন এক ঐশ্বরিক আশীর্বাদ। জাপানের মানুষজন, বিশেষ করে নাবিক, জেলে এবং পর্যটকরা যুগ যুগ ধরে সমুদ্রযাত্রায় নিজেদের নিরাপত্তার জন্য এই মন্দিরে এসে প্রার্থনা করে আসছেন। নতুন বছরের শুরুতে এখানে প্রায় ২০ লক্ষেরও বেশি দর্শনার্থী প্রার্থনা করতে জড়ো হন!

কুরোমন ইচিবা মার্কেট
ওসাকায় গিয়েছেন আর এখানকার বিশ্বখ্যাত স্ট্রিট ফুড চেখে দেখেননি, তাহলে আপনার ওসাকা ভ্রমণই অসম্পূর্ণ! আর ওসাকার এই প্রাণবন্ত খাদ্য-সংস্কৃতির একেবারে আসল স্বাদ পেতে হলে আপনাকে যেতে হবে ‘কুরোমন ইচিবা মার্কেট’-এ। প্রায় ৫৮০ মিটার লম্বা এই ছাদযুক্ত বাজারটিতে ১৫০টিরও বেশি ছোট-বড় দোকান ও রেস্তোরাঁ রয়েছে।
যুগ যুগ ধরে এটি স্থানীয় শেফ এবং গৃহিণীদের তাজা সামুদ্রিক মাছ, মাংস ও শাকসবজি কেনার প্রধান জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আর ঠিক এই কারণেই ভালোবেসে এই মার্কেটটিকে “ওসাকার রান্নাঘর” বলা হয়। তবে বর্তমানে এটি কেবল একটি কাঁচাবাজার নয়, বরং পর্যটকদের জন্য এক বিশাল স্ট্রিট ফুড ফেস্টিভ্যালে পরিণত হয়েছে। গ্রিল করা সামুদ্রিক খাবার, রসালো কোবে বিফ বা সুমিষ্ট তাজা ফলের সুবাসে পুরো মার্কেট সবসময় ম-ম করতে থাকে!
শিতেননোজি মন্দির
আধুনিক ওসাকা শহরের কংক্রিটের ভিড়ে যেন এক টুকরো প্রাচীন ইতিহাস সযত্নে লালন করে চলেছে ‘শিতেননোজি মন্দির’। ৫৯৩ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত এই মন্দিরটি শুধু ওসাকার নয়, বরং পুরো জাপানের প্রাচীনতম এবং প্রথম সরকারিভাবে পরিচালিত বৌদ্ধ মন্দির। রাজকুমার শোতোকুর হাত ধরে যখন জাপানে বৌদ্ধধর্মের প্রসার ঘটছিল, তখন এই মন্দিরটি ছিল সেই নতুন আধ্যাত্মিক জাগরণের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
মন্দিরের বিশাল তোরণ পার হয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেই এক অন্যরকম প্রশান্তি মন ছুঁয়ে যায়। বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণ, আকাশচুম্বী প্যাগোডা, ধূপের গন্ধ আর চারপাশের শান্ত পরিবেশ আপনাকে মুহূর্তেই নিয়ে যাবে আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগের প্রাচীন জাপানে। ওসাকার মতো কোলাহলপূর্ণ শহরের বুকে এমন এক ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক আশ্রয়স্থল সত্যিই এক বিস্ময়।

শিতেননোজি নামের অর্থ হলো “চার স্বর্গীয় রাজার মন্দির”। বৌদ্ধধর্মের বিরোধীদের বিরুদ্ধে এক ভীষণ যুদ্ধে যাওয়ার আগে রাজকুমার শোতোকু বৌদ্ধধর্মের চার রক্ষাকর্তা বা ‘স্বর্গীয় রাজা’-র কাছে প্রার্থনা করেছিলেন। তিনি মানত করেছিলেন যে যুদ্ধে জিতলে তাদের সম্মানে একটি মন্দির বানাবেন। যুদ্ধে জয়লাভ করার পর তিনি সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থেই এই বিশাল মন্দিরটি নির্মাণ করেন।
অর্থনীতি
আধুনিক জাপানের অর্থনীতির এক অদম্য চালিকাশক্তি হলো ওসাকা। ইলেকট্রনিক্স, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মতো বৃহৎ শিল্পে ওসাকার দাপট বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। বিশ্ববিখ্যাত প্রযুক্তি জায়ান্ট ‘প্যানাসনিক’ এবং ‘শার্প’-এর মতো গ্লোবাল ব্র্যান্ডগুলোর আঁতুড়ঘরও কিন্তু এই শহরটিই!
এডো যুগে (১৬০৩-১৮৬৭) ওসাকার অর্থনৈতিক আধিপত্য এতোটাই প্রবল ছিল যে, একে জাপানের “তেঙ্কা নো দাইদোকোরো” বা ‘পুরো দেশের রান্নাঘর’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল। কারণ সেই যুগে পুরো জাপানের চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় যাবতীয় পণ্যের বিশাল বাজার ও বাণিজ্য এককভাবে এই ওসাকা থেকেই নিয়ন্ত্রিত হতো!
বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব
ওসাকা জন্ম দিয়েছে বহু নোবেল বিজয়ী, স্থপতি ও ক্রীড়াবিদের। প্রখ্যাত জাপানি লেখক ও নোবেল বিজয়ী ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা এবং বিশ্ববিখ্যাত স্থপতি তাদাও আন্দো-এর বেড়ে ওঠা এই শহরেই। বিশ্ববিখ্যাত গ্র্যান্ড স্লাম জয়ী টেনিস তারকা ‘নাওমি ওসাকা’ এই শহরেই জন্মগ্রহণ করেছেন! শহরের নামের সাথে তার পারিবারিক পদবীর এই চমৎকার মিলটি কাকতালীয় হলেও বেশ দারুণ।

খাবার
ওসাকাকে বলা হয় জাপানের স্ট্রিট ফুডের অঘোষিত রাজধানী। আপনি যদি ভোজনরসিক হয়ে থাকেন, তবে এই শহরটি আপনার কাছে এক বিশাল স্বর্গরাজ্য! এখানকার জিভে জল আনা ‘তোকোয়াকি’ (গরম গরম অক্টোপাস বল), ‘ওকোনোমিয়াকি’ (সুস্বাদু জাপানি স্যাভরি প্যানকেক) এবং ‘কুশিকাতসু’ (মচমচে ডিপ-ফ্রাইড মিট ও সবজির স্কিউয়ার) আজ শুধু জাপানেই নয়, বরং বিশ্বজুড়েই তুমুল জনপ্রিয়।
ওসাকার মানুষদের জীবনযাত্রার সবচেয়ে বড় প্রতীক হলো তাদের একটি বিখ্যাত প্রবাদ “কুইদাওরে”, যার অর্থ হলো “খাবারের পেছনে টাকা খরচ করতে করতে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া!” এখানকার মানুষেরা ভালো খাবার খেতে এতটাই ভালোবাসেন যে, পেটভরে সুস্বাদু খাবার খাওয়া তাদের কাছে শুধু শখ বা প্রয়োজন নয়, বরং জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ও পরম উদযাপন।
ওসাকার মানুষদের কাছে ‘তোকোয়াকি’ এতটাই প্রিয় যে, এখানকার প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই তোকোয়াকি বানানোর জন্য একটি বিশেষ গোল ছাঁচযুক্ত প্যান বা কড়াই থাকে। পরিবার ও বন্ধুদের সাথে আড্ডায় গরম গরম তোকোয়াকি বানানো এখানকার সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
উৎসব
ওসাকার মানুষজন স্বভাবতই বেশ প্রাণোচ্ছল এবং উৎসবমুখর। বছরজুড়েই এখানে কোনো না কোনো উৎসব বা ‘মাতসুরি’ লেগেই থাকে। এখানকার সবচেয়ে বড় ও বিখ্যাত উৎসব হলো ‘তেনজিন মাতসুরি’, যা প্রতি বছর জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত হয়। এটি কিয়োটোর ‘গিওন মাতসুরি’ এবং টোকিওর ‘কান্দা মাতসুরি’-এর পাশাপাশি জাপানের শীর্ষ তিনটি উৎসবের একটি হিসেবে বিবেচিত।
কিশিওয়াদা দানজিরি মাতসুরি ওসাকার সবচেয়ে শ্বাসরুদ্ধকর এবং রোমাঞ্চকর উৎসব। প্রতি বছর সেপ্টেম্বরে আয়োজিত এই উৎসবে বিশাল আকৃতির এবং ভারী সব কাঠের তৈরি রথ বা ‘দানজিরি’ শত শত মানুষ একসাথে দড়ি দিয়ে টেনে নিয়ে শহরের রাস্তায় তীব্র গতিতে ছুটে চলেন।

তেনজিন মাতসুরি উৎসবটি প্রায় ১০০০ বছরেরও বেশি পুরোনো! এই উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর দ্বিতীয় রাতের আয়োজন। ওসাকার ওকাওয়া নদীতে শত শত আলোকিত নৌকার বিশাল প্যারেড হয়। সাথে থাকে রাতের আকাশকে বর্ণিল করে তোলা চোখ-ধাঁধানো আতশবাজি, যা নদীর বুকে এক মায়াবী ও জাদুকরী পরিবেশ তৈরি করে।
তোকা এবিসু উৎসবে কান পাতলেই আপনি একটি স্লোগান শুনতে পাবেন “বাণিজ্য সফল হোক, বাঁশের ডাল নিয়ে যাও!”। ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার প্রসারের আশায় সৌভাগ্যবয়ে আনা এই পবিত্র বাঁশের ডাল কিনে নিজেদের দোকান বা অফিসে সাজিয়ে রাখেন।
কেন আপনার ওসাকা ভ্রমণ করা উচিত?
ওসাকা কেবল জাপানের একটি শহর নয়, এটি একটি জীবন্ত অভিজ্ঞতা! জাপানিদের একটি প্রবাদ আছে “টোকিও যদি হয় জাপানের মস্তিষ্ক, তবে ওসাকা হলো এর হৃদয় ও পাকস্থলী।” আপনি যদি এমন একটি গন্তব্য খুঁজছেন যেখানে প্রাচীন ইতিহাস, চোখধাঁধানো আধুনিকতা, রোমাঞ্চকর বিনোদন এবং বিশ্বের সেরা স্ট্রিট ফুডের দেখা মিলবে, তবে ওসাকা আপনার জন্য নিখুঁত পছন্দ।
ভোজনরসিকদের স্বর্গরাজ্য
ওসাকাকে বলা হয় “জাপানের রান্নাঘর”। এখানকার ‘কুইদাওরে’ (খেয়ে দেউলিয়া হওয়া) সংস্কৃতিই বলে দেয় খাবার এখানকার মানুষের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। দোতোনবোওরি (Dotonbori)-র ঝলমলে নিয়ন আলোয় হেঁটে গরম গরম তোকোয়াকি, ওকোনোমিয়াকি বা কুশিকাতসু খাওয়ার অভিজ্ঞতা বিশ্বের আর কোথাও পাবেন না। এছাড়া তাজা সামুদ্রিক খাবারের জন্য ‘কুরোমন মার্কেট’ তো রয়েছেই!
ইতিহাস ও ভবিষ্যতের নিখুঁত মেলবন্ধন
একদিকে যেমন রয়েছে জাপানের প্রাচীনতম বৌদ্ধ মঠ ‘শিতেননোজি মন্দির’ এবং রাজকীয় ‘ওসাকা ক্যাসেল’, অন্যদিকে রয়েছে ‘উমেদা স্কাই বিল্ডিং’-এর মতো মাধ্যাকর্ষণকে হার মানানো আধুনিক স্থাপত্য। ইতিহাসপ্রেমী ও আধুনিকতার পূজারী উভয়ের জন্যই ওসাকা এক দারুণ প্যাকেজ।
বিনোদন ও থিম পার্কের রোমাঞ্চ
যারা পপ-কালচার, অ্যানিমে বা মুভি ভালোবাসেন, তাদের জন্য এখানে রয়েছে ‘ইউনিভার্সাল স্টুডিওস জাপান’ । এর ‘সুপার নিন্টেন্ডো ওয়ার্ল্ড’ বা ‘হ্যারি পটার’-এর জাদুকরী দুনিয়া আপনাকে মুহূর্তেই শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। এছাড়া নস্টালজিক ‘শিনসেকাই’ এলাকায় ঘুরে জাপানের রেট্রো বা পুরোনো দিনের ভাইব উপভোগ করতে পারবেন।
প্রাণোচ্ছল ও বন্ধুসুলভ মানুষ
টোকিওর মানুষেরা যেখানে বেশ চুপচাপ এবং নিয়মতান্ত্রিক, ওসাকার মানুষেরা সেখানে ভীষণ উষ্ণ, রসিক এবং আড্ডাপ্রিয়। এখানকার কমেডি সংস্কৃতি পুরো জাপানে বিখ্যাত। স্থানীয়দের সাথে মিশে যাওয়ার জন্য ওসাকার চেয়ে আদর্শ শহর জাপানে দ্বিতীয়টি নেই।
উৎসবের নগরী
নদীর বুকে জাদুকরী ‘তেনজিন মাতসুরি’ হোক বা রথ টেনে নিয়ে ছোটার রোমাঞ্চকর ‘দানজিরি মাতসুরি’ওসাকার উৎসবগুলো আপনাকে জাপানি সংস্কৃতির একেবারে গভীরে নিয়ে যাবে।
ওসাকা এমন একটি শহর যা আপনাকে হাসাবে, রোমাঞ্চিত করবে এবং তৃপ্ত করবে।
Reference:

