Image default
জাপানধর্মীয় স্থাপনাপর্যটন আকর্ষণ

সুমিয়োশি তাইশা: ওসাকার বুকে প্রাচীন জাপানি আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া

জাপানের ওসাকা শহরের দক্ষিণে অবস্থিত ‘সুমিয়োশি তাইশা’ জাপানের প্রাচীনতম এবং সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ শিন্তো উপাসনালয়গুলোর একটি। জাপানে বৌদ্ধ ধর্ম প্রবেশ করার অনেক আগে, তৃতীয় শতাব্দীতে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পুরো জাপান জুড়ে প্রায় ২,০০০-এর বেশি সুমিয়োশি উপাসনালয় রয়েছে, এবং ওসাকার এই মন্দিরটি হলো সেই সবগুলোর প্রধান। ওসাকার ব্যস্ত শহুরে জীবনের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত এই মন্দিরটি তার শান্ত ও আধ্যাত্মিক পরিবেশের জন্য পর্যটক এবং স্থানীয়দের কাছে দারুণ জনপ্রিয়।

সুমিয়োশি তাইশা – Image Source:www.tripadvisor.com

প্রাচীন ইতিহাস অনুযায়ী, জাপানের কিংবদন্তি সম্রাজ্ঞী ‘জিংগু’ ২১‌১ খ্রিস্টাব্দে এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা এটিকে জাপানের সবচেয়ে পুরনো স্থাপনাগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

এই উপাসনালয়টির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর অনন্য স্থাপত্যশৈলী, যা “সুমিয়োশি-জুকুরি” নামে পরিচিত। জাপানের বেশিরভাগ মন্দিরের নকশায় চীন বা এশিয়ার অন্যান্য দেশের প্রভাব দেখা যায়, কিন্তু সুমিয়োশি তাইশার নকশা সম্পূর্ণভাবে জাপানি নিজস্ব স্টাইলের। এই স্থাপত্যে কোনো বাঁকানো ছাদ থাকে না, বরং ছাদগুলো একদম সোজা হয় এবং প্রবেশদ্বার থাকে ছাদের ঢালু অংশের ঠিক নিচে। জাপানের মূল এবং আদি স্থাপত্য বুঝতে হলে এই মন্দিরটি এক অনন্য নিদর্শন।

মন্দিরগুলোর ছাদ ঐতিহ্যবাহী সাইপ্রেস গাছের বাকল দিয়ে তৈরি করা হয় এবং মূল ভবনের বেড়াগুলোতে লাল রঙের বদলে কালো ও সাদা রঙের ব্যবহার একে অন্যান্য মন্দির থেকে আলাদা করেছে।

সুমিয়োশি তাইশা মূলত সমুদ্র, নৌযাত্রা এবং কৃষিকাজের দেবতা বা ‘কামি’কে উৎসর্গ করে তৈরি। প্রাচীনকালে জাপানের নাবিক, জেলে এবং ব্যবসায়ীরা সমুদ্রে যাত্রা করার আগে নিরাপদ যাত্রার জন্য এখানে এসে প্রার্থনা করতেন। বর্তমানে শুধু সমুদ্রযাত্রীরাই নন, বরং সাধারণ মানুষও জীবনের নিরাপত্তা, ব্যবসায়িক সাফল্য এবং সমৃদ্ধির জন্য এই মন্দিরে ভিড় জমান।

এই উপাসনালয় চত্বরে আসলে চারটি আলাদা মূল ভবন রয়েছে। প্রথম তিনটি ভবন সমুদ্রের তিন দেবতার জন্য এবং চতুর্থটি স্বয়ং সম্রাজ্ঞী জিংগুর জন্য নিবেদিত। মজার ব্যাপার হলো, ভবনগুলো এমনভাবে সাজানো যেন মনে হয় সমুদ্রে একদল নৌবহর যাত্রা করছে।

সুমিয়োশি তাইশা – Image Source:jw-webmagazine.com

মন্দিরের মূল চত্বরে প্রবেশ করার ঠিক আগেই একটি অসাধারণ সুন্দর লাল রঙের কাঠের সেতু চোখে পড়ে, যার নাম “সোরিহাশি ব্রিজ” বা টাইকো-বাশি। ধনুকের মতো প্রবলভাবে বাঁকানো এই সেতুটি সুমিয়োশি তাইশার সবচেয়ে আইকনিক প্রতীক। নিচের শান্ত পুকুরের পানিতে লাল সেতুর প্রতিফলন এক মায়াবী দৃশ্যের জন্ম দেয়। শিন্তো বিশ্বাস অনুযায়ী, পবিত্র মন্দির চত্বরে প্রবেশ করার আগে এই সেতু পার হওয়ার অর্থ হলো নিজের আত্মা ও মনকে পরিশুদ্ধ করা।

লাল রঙের কাঠের সেতু – Image Source:en.wikipedia.org

এই লাল রঙের সুন্দর সেতুটির সর্বোচ্চ ঢাল প্রায় ৪৮ ডিগ্রি! এটি এতই খাড়া যে, পার হওয়ার সময় মনে হয় যেন আপনি কোনো সিঁড়ি বা মই বেয়ে উঠছেন। রাতে যখন সেতুটিতে আলো জ্বালানো হয়, তখন জাপানের সেরা রাতের দৃশ্যগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হয়।

সুমিয়োশি তাইশার ভেতরে দর্শনার্থীদের জন্য সবচেয়ে মজার আকর্ষণগুলোর একটি হলো “ওমোকারু ইশি” বা ভাগ্যগণনার পাথর। এখানে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ছোট ছোট কয়েকটি পাথর রাখা আছে। দর্শনার্থীরা প্রথমে মনে মনে তাদের কোনো ইচ্ছা বা মনস্কামনার কথা ভাবেন এবং তারপর একটি পাথর দুই হাত দিয়ে তোলেন। পাথরের ওজন যদি আপনার কল্পনার চেয়ে হালকা মনে হয়, তবে বিশ্বাস করা হয় যে আপনার ইচ্ছা খুব দ্রুত পূরণ হবে।

ওমোকারু ইশি” বা ভাগ্যগণনার পাথর – Image Source:en.hoteltheflag.jp

অন্যদিকে, পাথরটি তুলতে গিয়ে যদি আপনার মনে হয় যে এটি কল্পনার চেয়ে বেশি ভারী, তবে এর অর্থ হলো আপনার ইচ্ছা পূরণ হতে বেশ সময় লাগবে অথবা আপনাকে এর জন্য অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হবে!

জাপানের নববর্ষ উদযাপনের সময় এই মন্দিরটি সবচেয়ে বেশি উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। ওসাকা অঞ্চলের মানুষ বছরের প্রথম প্রার্থনা করার জন্য এই মন্দিরকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়। নববর্ষের দিনগুলোতে মন্দিরের আশেপাশে অসংখ্য খাবারের দোকান বসে এবং ঐতিহ্যবাহী জাপানি পোশাক কিমোনো পরে হাজার হাজার মানুষ এখানে ভিড় জমায়। নতুন বছরের সৌভাগ্য কামনার জন্য এটি ওসাকার সবচেয়ে প্রাণবন্ত স্থান।

নববর্ষের প্রথম তিন দিনে শুধুমাত্র এই একটি মন্দিরেই ২০ লক্ষেরও বেশি মানুষ প্রার্থনা করতে আসেন, যা জাপানের সবচেয়ে বড় জমায়েতগুলোর মধ্যে একটি!

Reference: 

Related posts

প্রাচীন জাপানের প্রবেশদ্বার সেনসো-জি মন্দির

আশা রহমান

প্লেস মাসেনা: নিস শহরের রঙিন হৃদপিণ্ড ও স্থাপত্যের বিস্ময়

কুয়েতের অদ্ভুত সুন্দর ‘মিরর হাউস’ ও এক ইতালীয় শিল্পীর গল্প

আশা রহমান

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More