Image default
পর্যটন আকর্ষণফ্রান্স

ভিও লিয়ন: ফ্রান্সের বুকে রেনেসাঁস যুগের এক জীবন্ত জাদুঘর

ভিও লিয়নের প্রাচীন পাথুরে রাস্তাগুলোকে ফরাসিরা আদর করে ডাকে ‘বিড়ালের মাথা’। এর কারণ হলো, এখানকার প্রাচীন রাস্তা তৈরিতে ব্যবহৃত গোল গোল পাথরগুলো দেখতে অবিকল ছোট ছোট বিড়ালের মাথার মতো!

পুরনো লিয়ন – Image Source:images.trvl-media.com

ফ্রান্সের লিয়ন শহরের অন্যতম প্রাচীন এবং আকর্ষণীয় অংশ হলো ভিও লিয়ন বা ‘পুরনো লিয়ন’। সোন নদীর পশ্চিম তীরে এবং ফোরভিয়ার পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই এলাকাটি যেন রেনেসাঁস যুগের এক জীবন্ত জাদুঘর। ইতালির ভেনিসের পর এটিই ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ সংরক্ষিত রেনেসাঁস এলাকা। এর পাথুরে রাস্তা, লাল ছাদওয়ালা পুরনো দালান এবং ঐতিহাসিক গাম্ভীর্য পর্যটকদের নিমেষেই কয়েক শতাব্দী পেছনে নিয়ে যায়। লিয়নের সমৃদ্ধশালী অতীত এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি হলো এই ভিও লিয়ন।

১৯৯৮ সালে ইউনেস্কো ভিও লিয়নকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট বা বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করে। এই স্বীকৃতি লিয়নকে ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ভৌগোলিক এবং ঐতিহাসিকভাবে ভিও লিয়নকে তিনটি প্রধান ভাগে বা ‘কোয়ার্টারে’ ভাগ করা হয়েছে: সেন্ট-পল, সেন্ট-জিন এবং সেন্ট-জর্জেস। সেন্ট-পল ছিল মূলত ধনী ব্যবসায়ী এবং ব্যাংকারদের কেন্দ্র। সেন্ট-জিন ছিল রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় কেন্দ্র, যেখানে বিখ্যাত সেন্ট-জিন ক্যাথিড্রাল অবস্থিত। আর সেন্ট-জর্জেস এলাকাটি ছিল মূলত কারুশিল্পী এবং প্রথম দিককার সিল্ক বা রেশম শ্রমিকদের বাসস্থান। প্রতিটি এলাকারই রয়েছে নিজস্ব স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব।

এই তিনটি এলাকার মধ্যে সেন্ট-জিন হলো পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় এবং ভিড়বহুল এলাকা, অন্যদিকে সেন্ট-জর্জেস তুলনামূলকভাবে শান্ত এবং নীরব, যা কোলাহল এড়িয়ে একাকী হাঁটার জন্য একদম উপযুক্ত।

ভিও লিয়নের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং রহস্যময় বৈশিষ্ট্য হলো এর ত্রাবুল। এগুলো হলো ভবনের ভেতর দিয়ে তৈরি করা কিছু গোপন বা ঢাকা পথ, যা একটি রাস্তাকে অন্য একটি রাস্তার সাথে সংযুক্ত করেছে। রেনেসাঁস যুগে রেশম শ্রমিকরা তাদের মূল্যবান রেশম কাপড় বৃষ্টি বা রোদের হাত থেকে বাঁচিয়ে নিরাপদে নদীর তীরে পৌঁছানোর জন্য এই পথগুলো তৈরি করেছিল। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে সাধারণ কোনো ভবনের দরজা, কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যাবে সরু গলি, পেঁচানো সিঁড়ি এবং ইতালীয় ধাঁচের সুন্দর উঠোন।

ত্রাবুল – Image Source:cybele-lyon.fr

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন নাৎসি বাহিনী লিয়ন দখল করেছিল, তখন ফরাসি প্রতিরোধ যোদ্ধারা এই গোপন ত্রাবুলগুলো ব্যবহার করে শত্রুদের চোখে ধুলো দিয়ে নিরাপদে যাতায়াত ও গোপন বৈঠক করত।

পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে যখন লিয়নে সিল্ক ব্যবসা এবং ব্যাংকিং শিল্পের চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়, তখন বহু ধনী ইতালীয় ব্যবসায়ী এখানে এসে বসবাস শুরু করেন। তাদের হাত ধরেই ভিও লিয়নের স্থাপত্যে ইতালীয় রেনেসাঁস রীতির ব্যাপক প্রভাব পড়ে। এখানকার ভবনগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো প্যাস্টেল রঙের দেয়াল, ফ্লোরেনটাইন স্টাইলের গ্যালারি, পাথর খোদাই করা সুন্দর তোরণ এবং সর্পিল সিঁড়ি। লিয়নের এই অংশটি দিয়ে হাঁটলে আপনার মনে হবে যেন ইতালির ফ্লোরেন্স বা ভেনিসের কোনো পুরনো গলিতে এসে পড়েছেন।

এখানকার অনেক পুরনো ভবনের জানালায় কোনো কাচ ছিল না, বরং তেলের প্রলেপ দেওয়া বিশেষ কাগজ বা পার্চমেন্ট ব্যবহার করা হতো, কারণ সেই যুগে কাচ ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং দুর্লভ একটি জিনিস!

ফ্রান্সকে যদি বিশ্ব গ্যাস্ট্রোনমির রাজধানী বলা হয়, তবে লিয়ন হলো ফ্রান্সের গ্যাস্ট্রোনমিক রাজধানী। আর লিয়নের ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ নেওয়ার সেরা জায়গা হলো ভিও লিয়নের বুশঁ নামক ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁগুলো। এই বুশঁগুলোতে অত্যন্ত ঘরোয়া পরিবেশে স্থানীয় এবং ঐতিহ্যবাহী ফরাসি খাবার পরিবেশন করা হয়। এখানকার হাঁসের মাংস, সসেজ, কুইনেল এবং স্থানীয় ওয়াইন ভোজনরসিকদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। লাল-সাদা চেককাটা টেবিলক্লথ এবং তামার হাঁড়ি-পাতিল দিয়ে সাজানো এই রেস্তোরাঁগুলো লিয়নের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বুশঁ – Image Source:media.lyon-france.com

বুশঁগুলোর উৎপত্তি হয়েছিল লিয়নের মায়েদের’হাত ধরে। উনিশ শতকে যখন ধনী পরিবারের বাবুর্চি মহিলারা চাকরি ছেড়ে নিজেদের স্বাধীন রেস্তোরাঁ খুলতে শুরু করেন, তখন থেকেই এই ঐতিহ্যবাহী বুশঁ কালচারের শুরু।

ভিও লিয়নে শুধু রেস্তোরাঁ বা স্থাপত্যই নয়, রয়েছে চমৎকার সব জাদুঘর। এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত জাদুঘরটি হলো মুজে গাদাগনে । একটি বিশাল রেনেসাঁস প্রাসাদের ভেতর অবস্থিত এই জাদুঘরটির দুটি অংশ রয়েছে একটি লিয়ন শহরের ইতিহাসের জাদুঘর এবং অন্যটি বিশ্ব পুতুল জাদুঘর। লিয়নের সংস্কৃতির সাথে পুতুল নাচের এক গভীর সম্পর্ক রয়েছে, বিশেষ করে ‘গিনিয়ল’ নামক বিখ্যাত ফরাসি পুতুল চরিত্রের জন্ম এই লিয়নেই।

গিনিয়ল পুতুলটি ১৮০৮ সালে লিয়নের একজন সিল্ক শ্রমিক তৈরি করেছিলেন, যা মূলত লিয়নের সাধারণ শ্রমিক শ্রেণীর হাসি-কান্না, প্রতিবাদ এবং ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ তুলে ধরার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

আজ আমরা ভিও লিয়নের যে জাদুকরী রূপ দেখতে পাই, তা কিন্তু প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এখানকার ভবনগুলো চরম অবহেলার শিকার হয় এবং সরকার আধুনিকায়নের নামে এগুলো ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা করে। কিন্তু ১৯৬৪ সালে ফ্রান্সের তৎকালীন সংস্কৃতি মন্ত্রী আন্দ্রে মালরোর হস্তক্ষেপে একটি বিশেষ আইনের মাধ্যমে ভিও লিয়নকে ফ্রান্সের প্রথম সংরক্ষিত ঐতিহাসিক এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যার ফলে এই অমূল্য রত্নটি চিরতরে রক্ষা পায়।

 

Reference:

Related posts

ভার্সাই প্রাসাদ: ফ্রান্সের রাজকীয় ইতিহাস, স্থাপত্য ও গৌরবময় ঐতিহ্য

প্লেস বেলেক্যুর: রাজা চতুর্দশ লুই থেকে লিটল প্রিন্সের স্মৃতিবিজড়িত চত্বর

আশা রহমান

ওসাকা ক্যাসেল: জাপানের এক অজেয় দুর্গ

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More