কোকাটেপে মসজিদ তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারা শহরের একটি অন্যতম সুন্দর এবং বিশাল মসজিদ। শহরের ঠিক মাঝখানে একটি উঁচু জায়গায় এটি তৈরি করা হয়েছে। এই কারণে আঙ্কারা শহরের প্রায় যেকোনো জায়গা থেকে মসজিদটি খুব সহজেই চোখে পড়ে। প্রতিদিন দেশ-বিদেশের হাজার হাজার মানুষ এখানে নামাজ পড়তে আসেন। পর্যটকরাও এর অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে এখানে ভিড় করেন। এর বিশাল আকার এবং সুন্দর নকশা সবার মন নিমিষেই কেড়ে নেয়। আঙ্কারা ভ্রমণের সময় এই চমৎকার মসজিদটি না দেখলে ভ্রমণ যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
কোকাটেপে মসজিদটি এতই বড় এবং উঁচু জায়গায় অবস্থিত যে, রাতের বেলা আলো জ্বললে পুরো আঙ্কারা শহর থেকে একে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো মনে হয়।

নির্মাণের দীর্ঘ ইতিহাস
এই চমৎকার মসজিদটি তৈরি করতে অনেক সময় এবং শ্রম লেগেছিল। ১৯৪৪ সালে এটি বানানোর কথা প্রথম চিন্তা করা হয়। তবে এর মূল নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৯৬৭ সালে। আর পুরো কাজ শেষ হতে বেজে যায় ১৯৮৭ সাল। অর্থাৎ, এটি সম্পূর্ণ তৈরি হতে প্রায় ২০ বছর সময় লেগেছিল। প্রথমে এর নকশা ছিল একদম আধুনিক ঘরানার। কিন্তু পরে সেই নকশা বাতিল করা হয়। এরপর পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী অটোমান নকশায় এটি নতুন করে তৈরি করা হয়। অনেক স্থপতি ও কারিগর মিলে অত্যন্ত যত্ন নিয়ে এই মসজিদটি বানিয়েছেন।
শুরুতে বিখ্যাত স্থপতি ভেদাত দালোকে এই মসজিদের একটি আধুনিক নকশা করেছিলেন। পরে সেটি এখানে বাতিল হলেও, সেই একই নকশায় পাকিস্তানের ইসলামাবাদে বিখ্যাত ‘ফয়সাল মসজিদ’ তৈরি করা হয়!

ঐতিহ্যবাহী অপরূপ স্থাপত্য
কোকাটেপে মসজিদের বাইরের নকশা দেখতে দারুণ সুন্দর ও রাজকীয়। এটি পুরোনো উসমানীয় বা অটোমান স্থাপত্য শৈলীতে তৈরি করা হয়েছে। ইস্তাম্বুলের বিখ্যাত ব্লু মস্ক বা নীল মসজিদের সাথে এর অনেক মিল রয়েছে। মসজিদটির চার কোণায় আকাশচুম্বী চারটি অনেক উঁচু মিনার আছে। এর ঠিক মাঝখানে একটি বিশাল বড় গম্বুজ রয়েছে। মূল গম্বুজের চারপাশে আরও কয়েকটি ছোট ছোট গম্বুজ আছে। সাদা পাথরের তৈরি এই গম্বুজগুলো রোদের আলোয় দারুণভাবে চকচক করে।
এই মসজিদের চারটি মিনারের উচ্চতা প্রায় ৮৮ মিটার। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, মিনারগুলোর একেবারে ওপরে ওঠার জন্য ভেতরে আধুনিক লিফটের ব্যবস্থা রয়েছে।
ভেতরের মুগ্ধকর সৌন্দর্য
মসজিদের ভেতরে ঢুকলে এর অপরূপ সৌন্দর্য দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। ভেতরের দেওয়াল এবং ছাদে চমৎকার ক্যালিগ্রাফিতে কোরআনের আয়াত লেখা আছে। সুন্দর রঙিন টাইলস, মার্বেল পাথর এবং কাঁচ দিয়ে ভেতরের অংশ সাজানো হয়েছে। রঙিন কাঁচের জানালা দিয়ে সূর্যের আলো ভেতরে ঢুকে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে। ছাদের ঠিক মাঝখান থেকে একটি বিশাল ও সুন্দর ঝাড়বাতি ঝুলছে। মেঝেতে বিছানো আছে দারুণ সুন্দর লাল রঙের নরম কার্পেট। সব মিলিয়ে ভেতরের পরিবেশ খুব শান্ত, স্নিগ্ধ এবং মনোরম।
মসজিদের ভেতরের বিশাল গম্বুজটির ঠিক মাঝখানে যে সুন্দর ও গোলাকার ঝাড়বাতিটি ঝুলছে, তার ওজন প্রায় সাড়ে ৭ টন! এটি দেখতে একদম একটি আলোকিত গোলকের মতো।

ধারণক্ষমতা ও গুরুত্ব
আকারে বিশাল হওয়ার কারণে এখানে একসাথে অনেক মানুষ নামাজ আদায় করতে পারেন। এই বিশাল মসজিদে একসাথে প্রায় ২৪ হাজার মানুষের নামাজ পড়ার জায়গা আছে। ঈদের দিন, জুমার নামাজ বা রমজান মাসে মসজিদটি মুসল্লিদের ভিড়ে কানায় কানায় পূর্ণ থাকে। তবে এত মানুষের ভিড় থাকা সত্ত্বেও মসজিদের ভেতরে সবসময় পিনপতন নীরবতা ও শান্তি বজায় থাকে। শুধু ইবাদতের জন্যই নয়, তুরস্কের ইসলামী সংস্কৃতির একটি বড় প্রতীক হিসেবেও এর অনেক গুরুত্ব রয়েছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে এই মসজিদের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন।
এই মসজিদটি ১৯৮৭ সালে তৈরি হলেও, এর ভেতরে ঢুকলে ১৬ শতকের প্রাচীন অটোমান সাম্রাজ্যের রাজকীয় পরিবেশ খুব গভীরভাবে অনুভব করা যায়।
আধুনিক সুবিধার এক দারুণ মেলবন্ধন
কোকাটেপে মসজিদের একটি দারুণ এবং ভিন্ন রকম ব্যাপার হলো এর নিচের অংশ। মসজিদের বিশাল ভবনের ঠিক নিচে একটি অনেক বড় আধুনিক সুপারমার্কেট বা শপিং মল রয়েছে। এছাড়াও নিচে গাড়ি পার্কিং করার জন্য বিশাল জায়গা তৈরি করা আছে। মানুষ নিচ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে সরাসরি ওপরে মসজিদে যেতে পারেন। একটি প্রাচীন রীতির ধর্মীয় স্থানের সাথে আধুনিক জীবনের এমন সুবিধার মিল সত্যিই খুব বিরল। এটি ধর্ম এবং আধুনিক প্রাত্যহিক জীবনের এক চমৎকার মেলবন্ধন।
Reference:
- https://en.wikipedia.org/wiki/Kocatepe_Mosque
- https://commons.wikimedia.org/wiki/File:ANKARA_KOCATEPE_CAM%C4%B0%C4%B0.jpg
- https://www.advantour.com/turkey/ankara/kocatepe-mosque.htm
- https://tatinta.com/en/diem-den/nha-tho-hoi-giao-kocatepe/3893
- https://www.barcelo.com/guia-turismo/en/turkey/ankara/things-to-do/kocatepe-mosque/

