“আমি বিকাশ থেকে নাহিদ বলছি! প্রয়োজনীয় তথ্য গুলো দিন, না হলে অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে!”
বিকাশের ব্যবহারকারীদের সচেতন করতে বিকাশের এই ভিন্নধর্মী প্রচারণা নিশ্চয় দেখেছেন বা শুনেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে কেন বিকাশকে এমন প্রচারণা চালাতে হয়েছে? কারণ, কেও যেন আপনার সাথে প্রতারণা করতে না পারে। বর্তমানে প্রতারকদের ফাঁদে পড়া এতটাই সহজ হয়ে গেছে যে, একটু বেখেয়ালে হলেই সব শেষ।
এখন আপনি প্রশ্ন করতেই পারেন, প্রতারণা কি কেবল আধুনিক যুগেরই সমস্যা? প্রতারণার এই ইতিহাস কোথা থেকে শুরু হলো? কবে থেকে মানুষ একে অপরকে ঠকানোর জন্য নানা ফন্দি এঁটে চলেছে? চলুন, ফিরে যাই সেই প্রাচীন কালে, গিয়ে দেখি কিভাবে মানুষ প্রতারক হয়ে উঠেছে যুগে যুগে, আর কেমন করেই বা আধুনিক যুগে এসে তা এত বিপজ্জনক হয়ে উঠেলো!
প্রতারণা কি?
প্রতারণা, শব্দটি শুনলে কী মনে হয়? ধোঁকা? কিংবা এমন কিছু যা মানুষের বিশ্বাস ভেঙে দেয়? হ্যাঁ, সেটাই। প্রতারণা বা জালিয়াতি এমন এক প্রক্রিয়া যেখানে এক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অন্যকে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ঠকায় বা তার ক্ষতি করে। বেশিরভাগ প্রতারণাই আর্থিক লাভের জন্য হয়ে থাকে। তবে, এর সামাজিক এবং মানসিক ক্ষতির দিকটাও একেবারে উপেক্ষা করা যায় না।xa0

প্রতারণার ঘটনাকে প্রতারণা হিসেবে চিহ্নিত করতে দুটি শর্ত পূরণ করতে হয়। প্রথমত, প্রতারককে জানতে হবে যে তার বক্তব্য বা দাবিটি মিথ্যা বা পরিবর্তিত। দ্বিতীয়ত, প্রতারণার উদ্দেশ্য হতে হবে আর্থিক বা সামাজিক লাভ অর্জন করা। অর্থাৎ, মিথ্যা বলার পেছনে আর্থিক বা সামাজিক প্রলোভন থাকতেই হবে।
বিভিন্ন বিজ্ঞানী এবং গবেষকরা প্রতারণা প্রবণতার কারণ নিয়ে নানান তত্ত্ব দিয়েছেন। বিখ্যাত অপরাধ বিজ্ঞানী ডোনাল্ড আর. ক্রেসি বলেছেন, একজন মানুষ যখন প্রতারণা করে, তখন সেটার পেছনে প্রায়ই তিনটি মূল উপাদান কাজ করে। প্রথমত, প্রতারণা করার পর্যাপ্ত অনুপ্রেরণা, দ্বিতীয়ত, সুযোগ সৃষ্টি করা, এবং তৃতীয়ত, সেই কাজকে সঠিক মনে করার মতো পর্যাপ্ত কারণ থাকা।xa0

এই বিষয়ে প্রখ্যাত মনস্তত্ত্ববিদ সিগমুন্ড ফ্রয়েড xa0বলেছিলেন,xa0
“মানুষের অবচেতন মন, তাকে অনেক সময় মিথ্যা বলতে উদ্বুদ্ধ করে,xa0
কারণ সে যা চায়, তা হয়তো সে সহজে পাবে না।”xa0
প্রতারণার প্রভাব
প্রতারণার পেছনে লুকিয়ে থাকে মানসিক এবং আবেগের জটিল ধাঁধা। এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রতারণা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ভাবনাকে খারাপ ভাবে প্রভাবিত করে। যারা বারবার প্রতারিত হয়, তাদের আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং অনেক সময় তাদের সমাজের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, প্রতারণার সময় মস্তিষ্কের কিছু নির্দিষ্ট অংশ সক্রিয় হয়ে ওঠে। নিউরোসায়েন্টিস্টরা বলেছেন যে, যখন কেউ মিথ্যা বলে বা ধোঁকা দেয়, তখন তার মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স এবং অ্যামিগডালা অংশ বিশেষভাবে সক্রিয় থাকে।xa0
অর্থাৎ মিথ্যা বলার জন্য মস্তিষ্ককে একধরনের প্রশিক্ষণ মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। এতে বোঝা যায় যে, প্রতারণা শুধুমাত্র মিথ্যা বলার বিষয় নয়; এটি এক ধরনের মানসিক প্রক্রিয়া যেখানে নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করানোর জন্য নানান বাহানা তৈরি করতে হয়।
প্রাচীন যুগের প্রতারণা: গ্রীস, মিশর ও রোমের কৌশল
গ্রিসে প্রতারণার কৌশল

প্রতারণা নিয়ে গ্রীক দার্শনিক অ্যারিস্টটল একটি ঘটনার উল্লেখ করেন। ঘটনাটি খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দীর একটি বিখ্যাত প্রতারণার ঘটনা। সেই সময় গ্রীসের মহান নেতা সোলন, ‘সিসাকথেয়া’ নামক একটি আইন চালু করেন। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল গ্রিকদের ঋণের দাসত্ব থেকে মুক্তি দেওয়া। কিন্তু এই আইন কার্যকর হওয়ার পরই আইনকে ঘিরে শুরু হয় প্রতারণা। অনেকেই ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পেতে ভুল তথ্য দিতে থাকে। এইসবের ফলে রাষ্ট্রের বিশাল আর্থিক ক্ষতি হয়।
গ্রীসের আরেকটি প্রতারণার ঘটনা হল ‘শিপিং ইন্স্যুরেন্স প্রতারণা।’ সেই সময় সমুদ্রযাত্রায় একপ্রকার শিপিং ইন্স্যুরেন্স চালু ছিল, যাকে বলা হত ‘বটমরি’। তো, হেজেস্ট্রাটোস নামক এক জাহাহের ক্যাপ্টেন তার জাহাজের কিল (তলদেশ) এবং হালের ওপর ঋণ সংগ্রহ করেছিল। একবার সে ইচ্ছাকৃতভাবে জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কারণ, জাহাজ ডুবে গেলে তাকে ঋণ ফেরত দেয়া লাগবে না। এই ঘটনাকে অনেকেই প্রথম লিপিবদ্ধ প্রতারণা হিসেবে দেখে থাকে।
মিশরে প্রতারণার কৌশল

প্রাচীন মিশরেও এই ধরনের প্রতারণার ঘটনা ছিল অনেক। প্রায় ৫২৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত মিশর একটি অর্থহীন অর্থনীতি বজায় রেখেছিল। সেখানে কর আদায়ের জন্য নানা রকম পণ্য বা শ্রমকে কর আকারে নির্ধারণ করা হত। এই কর আদায়কালে সংগ্রাহকরা প্রায়ই বিভিন্ন চালাকির আশ্রয় নিতেন। তারা পণ্য মাপার জন্য সঠিক পরিমাপের ব্যবহার করতেন না। এইভাবে তারা প্রজাদের থেকে অতিরিক্ত কর আদায় করত, আর সেটা তারা নিজেদের কাছে রেখে দিত।xa0
এছাড়াও মিশরের কিছু সিলমোহর নির্মাতা ফারাওদের জাল সিলমোহর বানাত। ঐ সময় সিলমোহর ছিল প্রামাণিকতার প্রতীক। এই প্রতীক বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহার করা হত। এই জাল সিলমোহর ব্যবহার করে প্রতারকরা নিজেদের সুবিধামত সব আইনকানুন বানানোর চেষ্টা করেছিল। এমন প্রতারণাপূর্ণ সমাজে ফারাওদের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ধরে রাখা খুব কঠিন হয়ে পড়েছিলো। আর তাই মিশরে প্রতারকদের ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
রোমে প্রতারণার কৌশল

রোমান যুগেও প্রতারণা ঘটনা ছিল অনেক। রোমের এক বিখ্যাত প্রতারণার ঘটনা ছিল ভারেসxa0 নামক শাসকের বিরুদ্ধে। সিসিলিতে কর আদায়ের নামে তিনি একাধিক প্রতারণা করেন। বিখ্যাত দার্শনিক সিসেরোর লেখা “ভেরিন অরেশনস”-এ এইসব ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে ১৯৩ খ্রিস্টাব্দে। এই সময় এক প্রিটোরিয়ান গার্ড রোমান সিংহাসনের মালিকানা ২৫,০০০ সেস্টার্সেস এর বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়।xa0
শিল্পের জগতে অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিরা প্রতারণার আশ্রয় নেন। উদাহরণস্বরূপ, বিখ্যাত শিল্পী মাইকেলেঞ্জেলো ২০ বছর বয়সে এক প্রাচীন ভাস্কর্যের নকল তৈরি করেন। এক ক্যাথলিক কার্ডিনালের কাছে তিনি এই জাল ভাস্কর্য বিক্রির চেষ্টাও করেন।
এইসব কাহিনী শুনে বোঝা যায় যে, প্রাচীন মানুষের প্রতারণার চিন্তাধারা আজও আধুনিক সমাজকে ভাবিয়ে তোলে। প্রাচীন যুগে প্রতারণা কেবল পণ্য বা অর্থ নিয়ে ছিল না, বরং রাজনীতি, শাসন এবং শিল্প ক্ষেত্রেও বিভিন্ন প্রতারণা হয়ে থাকতো। প্রাচীন মানুষদের এই প্রতারণা আজও আধুনিক সমাজকে ভাবিয়ে তোলে।
শিল্প বিপ্লব: প্রতারণা যখন বৈশ্বিক

সপ্তদশ শতাব্দী যেন মানুষের সম্ভাবনার নতুন এক চেহারা এঁকে দিচ্ছিল! কলকারখানার চিমনি থেকে বের হওয়া ধোঁয়া যেন আধুনিকতার আগমনী বার্তা দিচ্ছিল। এই সময়েই স্যার আইজ্যাক নিউটন তার বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ প্রিন্সিপিয়া ম্যাথেম্যাটিকা (১৬৮৭) প্রকাশ করেন। এই গ্রন্থ আধুনিক বিজ্ঞান, গণিত এবং অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন করে।
কিন্তু এই যুগের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল আমেরিকার উপনিবেশায়নের মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রসার। ঠিক এই সময় একইসাথে প্রতারকদের জন্য নতুন সুযোগের দরজা খুলে যায়। আগের সব ছক ভেঙে প্রতারণা এক বৈশ্বিক কৌশলে পরিণত হওয়া শুরু হয়।
প্রতারণার স্বীকার আইজ্যাক নিউটন
স্যার আইজ্যাক নিউটন ১৬৯৯ সালে রয়েল মিন্টের দায়িত্ব নেন। এই সময় তার অন্যতম কাজ ছিল জাল মুদ্রা নির্মাতাদের প্রতিহত করা। উইলিয়াম চালোনারxa0 ছিলেন এই সময়ের এক অন্যতম প্রতারক। তিনি প্রায় £৩০,০০০ সমমূল্যের জাল মুদ্রা তৈরি করেন। চালোনারকে ধরে শাস্তি দিতে নিউটনের প্রায় দুই বছর সময় লেগে যায়।

নিউটন নিজেও জীবনের শেষ দিকে প্রতারণার শিকার হন। ১৭২০ সালে “দ্য সাউথ সি বাবল”-এর উপর বিনিয়োগ করেন। এই সাউথ সি বাবল ছিল অর্থনৈতিক জালিয়াতির এক বিরাট উদাহরণ। ধারনা করা হয়, নিউটন সেখানে বর্তমান সময়ের প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার এর সমতুল্য সম্পদ হারিয়েছিলেন। এটা কে ইতিহাসের অন্যতম বড় জালিয়াতি হিসেবে ধরা হয়।xa0
জন ল এর প্রতারণা স্কিম
স্কটিশ অর্থনীতিবিদ জন ল’ও, “মিসিসিপি বাবল” নামে একটি স্কিম তৈরি করেন। জন ল’ সবাইকে বলেন ফ্রান্সের উত্তর আমেরিকার মিসিসিপি ভ্যালির অঞ্চলগুলোতে প্রচুর পরিমাণে সোনা, রূপা, ও অন্যান্য সম্পদ রয়েছে। লাভের আশায় মানুষ বিপুল পরিমাণে তার কোম্পানির শেয়ার কিনতে শুরু করে। এই সময় শেয়ারের মূল্য দ্রুত আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে।xa0xa0

জন ল’ এর এই পরিকল্পনায় ফ্রান্সের সরকার মিসিসিপি কোম্পানিকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিল। সরকারওxa0 ফ্রান্সের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য এর ওপর অনেকটা নির্ভর করেছিল। কিন্তু যখন সবাই আসল ঘটনা জানতে পারে তখন জনগণের মধ্যে ক্ষোভ জমতে থাকে। দেশটির সরকার জন ল’ কে নির্বাসনে পাঠান। এই ঘটনার ফলে ফ্রান্সের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। মিসিসিপি বাবলকে ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম কারণ হিসেবে অনেকেই মনে করেন।
পোইয়াসের কাজিকের অভিনব প্রতারণা

পোইয়াসের কাজিকের আসল নাম ছিল গ্রেগর ম্যাকগ্রেগর। তিনি নিজেকে “পোইয়াস রাজ্যের রাজা” বলে দাবি করতেন। এটি ছিল মূলত একটা কাল্পনিক রাষ্ট্র। তিনি জনগণের কাছে এক ধরনের স্বপ্নের রাজ্য হিসেবে এই ভূয়া রাষ্ট্রের প্রচারণা করেছিলেন। এছাড়াও, তিনি সবাইকে অভিবাসনের প্রলোভন দিতেন। ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ তার কথায় বিশ্বাস করে, তাকে বিশাল পরিমাণ টাকা প্রদান করতেন। পরবর্তীতে, এটা একটা জালিয়াতি হিসেবে সামনে আসে।
শিল্প বিপ্লবের সময়ে প্রতারণা এক নতুন অধ্যায়ের শুরু করেছিল। যেখানে জালিয়াতি একটি বৈশ্বিকxa0 আকার ধারন করে। যা আমরা বর্তমান সময়েও দেখতে পায়।
ডিজিটাল যুগের প্রতারণা ও সাইবার ক্রাইম

তথ্যের যুগে বাস করছি আমরা। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার আমাদের জীবনকে করেছে আরও সহজ ও গতিশীল। এর সাথে প্রতারণার ধরণও হয়েছে আধুনিক। এখনকার প্রতারকরা হলেন ডিজিটাল যোদ্ধা। এদের টার্গেট শুধু টাকা নয়, সাথে ব্যক্তিগত তথ্যও চুরি করা। সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, আপনি হয়তো জানতেও পারবেন না কখন, কোথায় এবং কীভাবে আপনি তাদের ফাঁদে পড়ছেন।
একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী সাইবার ক্রাইমের কারণে প্রতি বছর প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হচ্ছে! এই পরিমাণ অর্থxa0 দিয়ে অনেক দেশের বার্ষিক বাজেটও সম্পূর্ণ করে ফেলা সম্ভব! বর্তমানে সাইবার অপরাধীরা নানা রকম স্ক্যাম বা প্রতারণা পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে। আসুন, কিছু সাধারণ প্রতারণার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করি:
ফিশিং (Phishing)xa0

ফিশিং শব্দটার সঙ্গে হয়তো অনেকেই পরিচিত। ফিশিং হল একটি প্রকারের প্রতারণা যেখানে অপরাধীরা ভুয়া ওয়েবসাইট বা ইমেইল ব্যবহার করে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য, যেমন পাসওয়ার্ড, ক্রেডিট কার্ড নম্বর, বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ডিটেইলস চুরি করে।xa0
ধরুন, আপনি আপনার ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে চাচ্ছেন। কিন্তু সেখানে একটি ‘ফিশিং’ লিংক বানানো আছে। এই লিংক দেখে আপনি মনে করতে পারেন সেটি আসল। আপনি সেখানে তথ্য দিলেন মানেই ফাঁসলেন। আপনার সব টাকা তারা চুরি করে নিবে। এমন ঘটনা কখনও ঘটতে পারে না—এমনটা ভাবছেন? গুগল ডক্স স্ক্যাম এর মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষ ফিশিংয়ের শিকার হয়েছিলেন।
নাইজেরিয়ান প্রিন্স স্ক্যামxa0

“অত্যন্ত জরুরি এক মেসেজ!” এমন কিছু লেখা ইমেইল যদি আপনি পান, আপনি কি বিশ্বাস করবেন? যদি বলা হয়, আপনি একটি লটারিতে জিতেছেন বা কোনো ‘নাইজেরিয়ান প্রিন্স’ আপনাকে তাঁর সম্পদের কিছু অংশ দিয়ে সাহায্য করতে চায়? তখন নিশ্চয়ই আপনি একটু সতর্ক হবেন। এই স্ক্যাম এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল, যে এটিকে ‘নাইজেরিয়ান প্রিন্স স্ক্যাম’ নামে ডাকা হত। এটি পুরনো হলেও এখনও অনেক মানুষ এর শিকার হয়। আর সত্যি বলতে মানুষের অসতর্কতার কারণে এখনও এই প্রতারণাxa0 অনেকটাই কার্যকর।
স্পুফিং (Spoofing)xa0

স্পুফিং এর মাধ্যমে প্রতারকরা আসলকে নকল করে ফেলে। যেমন ধরুন, আপনার বন্ধু বা পরিবারের কোনো সদস্যের ইমেইল বা ফোন নম্বর দিয়ে আপনার কাছে জরুরি বার্তা পাঠানো হলো। বার্তাটি হতে পারে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সমস্যা বা জরুরি কোন কারণে অর্থ পাঠানোর জন্য অনুরোধ। বছরখানেক আগে, একটি খবরে উঠে এসেছিল যে, সাইবার অপরাধীরা মেক্সিকো সরকারের বিরুদ্ধে এক স্পুফিং কেলেঙ্কারি চালিয়েছিল।
রu200d্যানসামওয়্যার (Ransomware)

আরেকটি প্রচলিত সাইবার অপরাধ হল রu200d্যানসামওয়্যার। এর মাধ্যমে, প্রতারক আপনার কম্পিউটারের বা ফোনের সমস্ত ডেটা লক করে দেয়। একদম সহজ ভাষায় বললে, আপনার ডেটা প্রতারকদের কাছে জিম্মি হয়ে যায়। সেই ডেটা ফিরে পেতে হলে আপনাকে অর্থ দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, “ওয়ানাক্রাই” (WannaCry) রu200d্যানসামওয়্যার আক্রমণটি বিশ্বব্যাপী প্রায় দুই লক্ষ্য কম্পিউটার সিস্টেমকে আক্রমণ করেছিল। এর মধ্যে ছিল বড় বড় কোম্পানি, সরকারি সংস্থা এমনকি হাসপাতালও।xa0
এই সাইবার ক্রাইমের পরিণতি কী? এর ফলে কি শুধুমাত্র আর্থিক ক্ষতি হয়? ডিজিটাল দুনিয়ায় প্রতারণা এক ভয়াবহ ক্রাইম হয়ে উঠেছে। একটু সচেতনতা ও সতর্কতা অবলম্বন করলে, অনেকটাই এসব আক্রমণ থেকে বাঁচা সম্ভব। তাই আপনার পরিচিতি, অর্থ, তথ্য—সব কিছু সুরক্ষিত রাখুন।
ইতিহাসের কিছু বিখ্যাত প্রতারকেরা
প্রতারণার গল্প শুনতে কার না ভালো লাগে! এমন মানুষরা নিজেদের চালাকি আর বুদ্ধি দিয়ে বহু মানুষকে বোকা বানিয়ে গেছেন, এবং তাদের কৌশলের গল্প আজও চমক সৃষ্টি করে। এবার আমরা চারজন বিখ্যাত প্রতারকের রোমাঞ্চকর কাহিনী নিয়ে হাজির হয়েছি।
মেরি কার্লেটন

প্রতারণা কি শুধুই পুরুষদেরই কাজ? ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় নারীরাও কখনো কখনো প্রতারণায় পুরুষদের ছাড়িয়ে গেছেন! মেরি কার্লেটন তেমনই একজন নারী।xa0 তিনি লন্ডনে এসে নিজেকে জার্মান রাজকুমারী হিসেবে পরিচয় দিতেন। বিলাসবহুল পোশাক, গয়না এবং ইংরেজি বলার ধরন, সব মিলিয়ে তিনি যেন সত্যিকারের রাজকুমারী! আর এসব দেখে ইংল্যান্ডের ধনী পুরুষরা তার প্রেমে পড়ে গেলেন। এমনকি বিয়ের আশায় প্রচুর উপহারও দিলেন। কিন্তু, এই ‘রাজকুমারী’ পরিচয় বেশিদিন থাকল না। একসময় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। তাকে নিয়ে বেশ কিছু নাটক এবং লেখালেখি হয়েছে। তার মধ্যে “The Diary of John Evelyn” উল্লেখযোগ্য।xa0
কাউন্ট আলেসান্দ্রো দি ক্যাগ্লিওস্ট্রোxa0
ইতালির এই ধূর্ত প্রতারকের গল্প শুনলে মনে হবে কোনো প্রাচীন যাদুকরের কাহিনী! ক্যাগ্লিওস্ট্রো দাবী করতেন, তার কাছে অমরত্বের রহস্য লুকানো আছে। তিনি ইউরোপজুড়ে রাজা-রাণীদের কাছে যেতেন। তাদের অমরত্বের মন্ত্র শেখানোর কথা বলে তাদের থেকে বিপুল অর্থ আদায় করতেন। ফ্রান্সে এসে একবার তিনি দাবি করলেন, তিনি মৃত আত্মাদের সাথে কথা বলতে পারেন। তার এই কথায় অনেকেই তার শিষ্য হয়ে গেলেন। তার কর্মকাণ্ড রহস্যময় হলেও একসময় তার সত্য প্রকাশিত হয়।xa0

এই রহস্যময় প্রতারকের জীবন নিয়ে অনেক লেখা এবং থিয়েটারের নাটক হয়েছে। বিশেষভাবে তার জীবন নিয়ে “Cagliostro: The Splendid Impostor” বইটি অন্যতম। এছাড়াও জনপ্রিয় ফরাসি সিনেমা “Black Magic” (1949) তার জীবনের উপর বানানো হয়। আলকেমি, জাদুবিদ্যা, এবং প্রতারণার মিশেলে এই সিনেমাটি বেশ জনপ্রিয় হয়।
নটবরলাল (Natwarlal)

ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় প্রতারকদের একজন, নটবরলাল! তিনি তাজমহল থেকে শুরু করে দিল্লির লাল কেল্লা, এমনকি সংসদ ভবনও বিক্রি করে দিয়ে ছিলেন! স্থানীয় প্রশাসন বারবার তাকে ধরার চেষ্টা করছে। তার বিরুদ্ধে ১০০টিরও বেশি মামলা ছিল। তার জাদুর মতো প্রতারণা এবং তার রহস্যময় জীবন তাকে ইতিহাসে এক অমর প্রতারক বানিয়ে রেখেছে। প্রতিবার যখন মনে হতো তাকে ধরেই ফেলা হবে, তখনই সে নতুন কৌশলে পালিয়ে যেত।xa0
এই কিংবদন্তি প্রতারককেxa0 নিয়ে বলিউডেও কিছু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। “Mr. Natwarlal” নামে ১৯৭৯ সালে একটি জনপ্রিয় সিনেমা। যেখানে অমিতাভ বচ্চন xa0অভিনয় করেছিলেন। তার নামে এবং কিছু ঘটনার অনুপ্রেরণায় এই সিনেমাটি বানানো হয়। নটবরলালের প্রতারণা এমনই আকর্ষণীয় যে তার কৌশল আজও মানুষকে ভাবিয়ে তুলে।
ফ্র্যাঙ্ক অ্যাবাগনেল (Frank Abagnale)
কিশোর বয়সেই প্রতারণার কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন ফ্র্যাঙ্ক অ্যাবাগনেল। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি নিজেকে পাইলট হিসেবে পরিচয় দিতেন। এভাবে সে বিমানে বিনামূল্যে ভ্রমণ করতে থাকেন। এরপর ডাক্তার, আইনজীবী, এমনকি শিক্ষকের ভূমিকায়ও অবতীর্ণ হন। শুধু মিথ্যে পরিচয়ে নয়, তিনি চেক জালিয়াতি করেও প্রচুর অর্থ সংগ্রহ করেন। তার জীবনের উপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছে ‘Catch Me If You Can’ সিনেমাটি। যেখানে তার অবিশ্বাস্য কৌশলের কাহিনী দেখানো হয়েছে। ফ্র্যাঙ্কের এই বুদ্ধিদীপ্ত প্রতারণা তাকে আজও স্মরণীয় করে রেখেছে।xa0

উপসংহার
প্রতারণার ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো।xa0 যুগে যুগে তা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। সাথে সাথে মানুষকে বোকা বানানোর ফন্দিগুলোও পাল্টেছে। প্রখ্যাত লেখক মার্ক টোয়েন মজা করেই বলেছিলেন,xa0
“সততার কোনো স্মরণীয় ঘটনা নেই, তবে মিথ্যার অনেক রঙিন ইতিহাস আছে।”xa0
এই কথাতেই প্রতারণার সুদীর্ঘ ইতিহাসের রঙিন চিত্র ফুটে ওঠে। প্রতারণা নিয়ে আরও কিছু রসিকতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় সচেতন থাকার প্রয়োজনীয়তা। যেমন- এই জনপ্রিয় কৌতুকটি:
প্রশ্ন: কোন ধরনের মানুষ কখনো প্রতারণা করে না?
উত্তর: ঘুমন্ত মানুষ!
এই রসিকতাটি আমাদের সতর্ক থাকার এক সরল ইঙ্গিত দেয়। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে আমাদেরও আরও সতর্ক হতে হবে, যেন প্রতারকরা আর সফল হতে না পারে!
রেফারেন্স লিঙ্ক
- https://www.irisidentityprotection.com/blog/the-evolution-of-scamsxa0
- https://www.alloy.com/blog/a-brief-history-of-the-evolution-of-fraud-technologyxa0
- https://www.trulioo.com/blog/fraud-prevention/history-fraudxa0
- https://www.fraud.com/post/the-history-and-evolution-of-fraud
- https://www.britannica.com/list/8-of-historys-most-famous-charlatans-con-artists-and-trickstersxa0
- https://royalsocietypublishing.org/doi/10.1098/rsnr.2018.0018xa0

