Image default
ক্রীড়াবিদজীবনীফুটবল

দেজিরে দুয়ে: এক ভিন্নধর্মী ফুটবল যাত্রা

রেনে ক্লাবের দুই ভাই দেজিরে আর গুয়েলা দুয়ে যেন একই মায়ের দুই পিঠ একজন খেলেন ফ্রান্সের নীল জার্সিতে, তো অন্যজন আইভরি কোস্টের আফ্রিকান কমলায়! 

দেজিরে দুয়ের ফুটবল যাত্রাটি কেবল একক প্রতিভার নয়, এটি একটি পারিবারিক মেলবন্ধনেরও গল্প। তাঁর বড় ভাই গুয়েলা দুয়ের সাথে রেনের মূল দলে একসাথে খেলা ফরাসি ফুটবলের অন্যতম সুন্দর এক দৃশ্য ছিল। তবে মজার বিষয় হলো, একই সাথে বড় হলেও আন্তর্জাতিক ফুটবলে দুই ভাই বেছে নিয়েছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি পথ। দেজিরে যেখানে ফ্রান্সের নীল জার্সি গায়ে জড়িয়েছেন, সেখানে তাঁর ভাই গুয়েলা খেলেন আইভরি কোস্টের হয়ে। দুই ভাইয়ের এই বৈচিত্র্যময় আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার দেজিরের ফুটবল লাইফস্টাইলকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে। 

দেজিরে দুয়ে’র ব্যক্তিগত তথ্য:

নাম

দেজিরে ননকা-মাহো দুয়ে

জন্ম

৩ জুন ২০০৫ (বয়স ২১)

জন্মস্থান

আঁজের , মেইন-এট-লোয়ার, ফ্রান্স

উচ্চতা

১.৮১ মিটার (৫ ফুট ১১ ইঞ্চি)

পজিশন

আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার / উইঙ্গার

ক্লাব ক্যারিয়ার

রেনেস II, রেনেস এবং বর্তমানে পিএসজি ক্লাবের হয়ে খেলছেন।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

২০২৫– ফ্রান্স

দেজিরে দুয়ে এবং তার ভাই গুয়েলা– Image Source: pictures.tribuna.com

রেনে ক্লাবের দুই ভাই দেজিরে আর গুয়েলা দুয়ে যেন একই মায়ের দুই পিঠ একজন খেলেন ফ্রান্সের নীল জার্সিতে, তো অন্যজন আইভরি কোস্টের আফ্রিকান কমলায়!

২০০৫ সালের ৩ জুন ফ্রান্সের অ্যাঙ্গার্স শহরে দেজিরে দুয়ের জন্ম। তাঁর পরিবারে ফুটবল যেন রক্তের সাথে মিশে ছিল। খুব ছোটবেলা থেকেই দেজিরে এবং তাঁর বড় ভাই গুয়েলা দুয়ে একসাথে বল পায়ে বড় হয়েছেন।

মজার বিষয় হলো, দুই ভাইয়ের ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা এবং প্রতিভা দেখে তাঁদের পরিবার খুব দ্রুতই তাঁদের রেনে ক্লাবের একাডেমিতে ভর্তি করিয়ে দেয়। দেজিরের বড় ভাই গুয়েলা একজন দুর্দান্ত রাইট-ব্যাক। দুই ভাই একসাথে রেনের মূল দলে খেলেছেন, যা ফরাসি ফুটবলে বেশ দারুণ এক পারিবারিক মেলবন্ধন তৈরি করেছিল। 

ফরাসি ফুটবল ক্লাব রেনে বিশ্ব ফুটবলে পরিচিত তাঁদের বিশ্বমানের যুব একাডেমির জন্য। উসমান দেম্বেলে, এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গা এবং মাথিস তেলের মতো বিশ্বখ্যাত তারকাদের জন্ম দিয়েছে এই একাডেমি। আর এই কারখানারই অন্যতম সেরা আবিষ্কার হলেন দেজিরে দুয়ে।

রেনেস এর জার্সিতে দেজিরে দুয়ে- Image Source: cloudfront-eu-central-1.images.arcpublishing.com

মাত্র পাঁচ বছর বয়সে ২০১০ সালে দুয়ে রেনের যুব একাডেমিতে যোগ দেন। একাডেমির প্রতিটি স্তরে তিনি তাঁর অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং এবং ফুটবল বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কোচদের মুগ্ধ করেছিলেন। ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি রেনের সাথে তাঁর প্রথম পেশাদার চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

রেনের হয়ে দুই মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৭৬টি ম্যাচ খেলেন দুয়ে, যার মধ্যে তিনি ৮টি গোল এবং ৭টি অ্যাসিস্ট করেন। 

২০২৪ সালের গ্রীষ্মকালীন ট্রান্সফার উইন্ডোটি ছিল দেজিরে দুয়ের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট। কিলিয়ান এমবাপ্পে রিয়াল মাদ্রিদে চলে যাওয়ার পর পিএসজি এমন এক ঝাঁক তরুণ প্রতিভাকে খুঁজছিল যারা ক্লাবের ভবিষ্যৎ প্রজেক্টের হাল ধরতে পারবে। দুয়ের ওপর নজর ছিল বায়ার্ন মিউনিখ, চেলসি এবং রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাবের। কিন্তু দুয়ে জার্মানি বা ইংল্যান্ডে না গিয়ে নিজের দেশের সেরা ক্লাব পিএসজিকে বেছে নেন।

পিএসজি প্রায় ৫০ মিলিয়ন ইউরোর বিশাল অঙ্কের বিনিময়ে এই ১৯ বছর বয়সী ফরাসি মিডফিল্ডারকে ৫ বছরের চুক্তিতে পার্ক দেস প্রিন্সেসে নিয়ে আসে। পিএসজি ম্যানেজার লুইস এনরিকে তরুণ খেলোয়াড়দের নিয়ে কাজ করার জন্য বিশ্বখ্যাত। এনরিকের অধীনে দুয়ে দ্রুতই পিএসজির মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হয়ে ওঠেন। ওসমানে দেম্বেলে, ব্র্যাডলি বারকোলা এবং ওয়ারেন জাইর-এমেরির মতো তরুণ ফরাসি তারকাদের সাথে দুয়ের জুটিকে পিএসজির নতুন যুগের সূচনা বলা হচ্ছে।

ফ্রান্সের যুব দলে দেজিরে দুয়ে সবসময়ই একজন নিয়মিত মুখ ছিলেন। ২০২২ সালে তিনি ফ্রান্স অনুর্ধ্ব-১৭ দলের হয়ে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জেতেন। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি সবচেয়ে বড় আলো ছড়ান ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকে।

২০২৪ এর প্যারিস অলিম্পিকে দেজিরে দুয়ে- Image Source: getfootballnewsgermany.com

কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরির অধীনে ফ্রান্স অলিম্পিক দলের অন্যতম প্রধান সদস্য ছিলেন দুয়ে। ঘরের মাঠে অলিম্পিকে তাঁর জাদুকরী পারফরম্যান্স ফ্রান্সকে ফাইনালে তুলতে সাহায্য করে এবং তিনি রৌপ্য পদক জয় করেন। অলিম্পিকের এই সাফল্যের পর ফ্রান্সের মূল জাতীয় দলের কোচ দিদিয়ের দেশম রাডারে চলে আসেন তিনি এবং ফ্রান্সের মধ্যমাঠের ভবিষ্যৎ কাণ্ডারি হিসেবে তাঁকে বিবেচনা করা হচ্ছে।

২০২৬ ওয়ার্ল্ড কাপের বাঁশি বাজবে, তখন দুয়ে পরিবারের অবস্থা ভাবুন! এক ভাই আমেরিকার কোনো স্টেডিয়ামে ফ্রান্সের ব্লু জার্সি গায়ে এমবাপ্পের সাথে হাই-ফাইভ দিচ্ছেন, আর অন্য ভাই হয়তো অন্য কোনো ভেন্যুতে আইভরি কোস্টের হয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স চুরমার করছেন। মা-বাবার অবস্থা হবে সবচেয়ে কঠিন একই সাথে দুই মহাদেশের টিকিট কাটতে গিয়ে পকেট ফাঁকা, নাকি লটারির মতো টস করে ঠিক করবেন কে কার ম্যাচে যাবেন?

একই সাথে রেনের অ্যাকাডেমিতে বড় হওয়া, আর এখন বিশ্বমঞ্চে দুই ভিন্ন দেশের প্রতিনিধিত্ব করা দুয়ে ভাইদের এই গল্প ফুটবলকে আসলেই এক অদ্ভুত সুন্দর এবং মজার মোড় এনে দিয়েছে। মাঠের লড়াই যাই হোক, দিনশেষে কিন্তু মায়ের হাতের রান্নাই তাদের এক টেবিলে বসাবে! 

Reference:

Related posts

মালো গুস্তো: চেলসির রাইট উইংয়ের বুলেট ট্রেন

সাম্বার ছন্দে ব্রাজিলীয় ফুটবলের এক কালজয়ী নায়ক বেবেতো

আশা রহমান

দ্য রাইজিং স্টার ওয়েসলি ফ্রাঙ্কা

আশা রহমান

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More