Image default
ক্রীড়াবিদজীবনীফুটবল

আলেক্স সান্দ্রো: ইউরোপে ব্রাজিলের নীরব রাজা

সান্দ্রো বেচারা যেন সেই দুর্ভাগ্যবান হিরো, যে বিশ্বের যেকোনো দেশে রাজত্ব করতে পারত, কিন্তু ব্রাজিলে এসে মার্সেলো আর ফিলিপে লুইসের মতো দুই ‘ডাইনোসর’-এর প্রাইম টাইমের গ্যাঁড়াকলে পড়ে ক্যারিয়ারের অর্ধেকটা সময়ই বেঞ্চের কাঠ গরম করে কাটিয়ে দিল!

লাতিন ফুটবলাররা মানেই চোখধাঁধানো ড্রিবলিং আর গ্ল্যামার। কিন্তু আলেক্স সান্দ্রো এই সংজ্ঞার বাইরে। তিনি প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকা সেই নিঃশব্দ কারিগর, যিনি ফুটবল মাঠের বাম প্রান্তটাকে নিজের সম্পত্তি বানিয়ে নিয়েছেন। ব্রাজিল জাতীয় দলে মার্সেলো এবং ফিলিপে লুইসের মতো দুই কিংবদন্তির প্রাইম টাইমের কারণে দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ব্যাক-আপ হিসেবে থাকতে হলেও, ক্লাব ফুটবলে তিনি দেখিয়েছেন তাঁর আসল রূপ। সান্তোসে লাতিন আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব জয় থেকে শুরু করে জুভেন্টাসের হয়ে ইতালিতে টানা ৫টি লিগ শিরোপার রাজত্ব সান্দ্রো প্রমাণ করেছেন যে ধারাবাহিকতাই একজন ডিফেন্ডারের সবচেয়ে বড় শক্তি।

অ্যালেক্স সান্দ্রো- এর ব্যক্তিগত তথ্য

নাম

অ্যালেক্স সান্দ্রো লোবো দা সিলভা

জন্ম

২৬ জানুয়ারী ১৯৯১

জন্মস্থান

কাতান্ডুভা , সাও পাওলো , ব্রাজিল

উচ্চতা

১.৮০ মিটার (৫ ফুট ১১ ইঞ্চি)

পজিশন

লেফট-ব্যাক

ক্লাব ক্যারিয়ার

অ্যাটলেটিকো পারানায়েন্সে,দেপোর্তিভো মালদোনাদো,সান্তোস,পোর্তো,জুভেন্টাস এবং বর্তমানে ফ্লামেঙ্গো ক্লাবের হয়ে খেলছেন।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

২০১১– ব্রাজিল

আলেক্স সান্দ্রো লোবো সিলভা ১৯৯১ সালের ২৬শে জানুয়ারি ব্রাজিলের সাও পাওলোর ক্যাটানডুভা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি তাঁর ছিল তীব্র ঝোঁক। ব্রাজিলের আর দশটা সাধারণ ছেলের মতোই গলির ফুটবল থেকে তাঁর যাত্রা শুরু হলেও, খুব দ্রুতই তাঁর প্রতিভা পেশাদার ক্লাবগুলোর নজরে আসে।

২০০৬ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি ব্রাজিলের বিখ্যাত ক্লাব অ্যাটলেটিকো পারানায়েন্সে-এর যুব একাডেমিতে যোগ দেন। সেখানে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের শারীরিক ও টেকনিক্যাল দক্ষতার উন্নতি ঘটান তিনি। ২০০৮ সালে অ্যাটলেটিকো পারানায়েন্সের মূল দলে তাঁর পেশাদার অভিষেক হয়। ক্লাবের হয়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করার পর ২০১০ সালে তিনি ব্রাজিলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ক্লাব সান্তোস-এ ধারে যোগ দেন।

 আলেক্স সান্দ্রো
অ্যালেক্স সান্দ্রো তাঁর শৈশবে– Image Source: s2-ge.glbimg.com

সান্তোসে কাটানো সময়টি ছিল আলেক্স সান্দ্রোর ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই সময়ে সান্তোস দলে খেলতেন ফুটবল বিশ্বের আগামী দিনের মহাতারকা নেইমার জুনিয়র এবং দানিলো। সান্দ্রো এবং নেইমারের এই বাম-প্রান্তের জুটিতে সান্তোস ২০১১ সালে লাতিন আমেরিকার ফুটবলের সর্বোচ্চ গৌরব কোপা লিবের্তাদোরেস জয় করে। এই সাফল্যের পরই ইউরোপের বড় বড় ক্লাবের স্কাউটরা সান্দ্রোকে দলে নেওয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে।

আলেক্স সান্দ্রো
শৈশবে ফুল-ব্যাক অ্যালেক্স স্যান্ড্রো ও তার ভাই ফ্লাভিও– Image Source: s2-ge.glbimg.com

২০১১ সালের ২৩শে জুলাই পর্তুগিজ জায়ান্ট এফসি পোর্তো ৯.৬ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে আলেক্স সান্দ্রোকে দলে ভেড়ায়। ইউরোপীয় ফুটবলের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য পোর্তোকে সবসময়ই লাতিন খেলোয়াড়দের জন্য সেরা ল্যাবরেটরি মনে করা হয়, আর সান্দ্রোর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

পোর্তোর হয়ে তিনি টানা দুটি পর্তুগিজ লিগ শিরোপা জয় করেন। পোর্তোতে চার মৌসুমে প্রায় ১৩৭টি ম্যাচ খেলে তিনি নিজেকে ইউরোপের অন্যতম সেরা লেফট-ব্যাক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

আলেক্স সান্দ্রো
ক্লাব অ্যাটলেটিকো পারানায়েন্সে হয়ে অ্যালেক্স স্যান্ড্রো– Image Source: www.correiodopovo.com.br

২০১৫ সালের আগস্টে ইতালির সবচেয়ে সফল ক্লাব জুভেন্টাস ২৬ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে আলেক্স সান্দ্রোকে তুরিনে নিয়ে আসে। ইতালিয়ান ফুটবল মূলত রক্ষণাত্মক কৌশল এবং ট্যাকটিক্সের জন্য পরিচিত।

জুভেন্টাসে সান্দ্রোর ক্যারিয়ার ছিল সাফল্যে মোড়ানো। তিনি ক্লাবের হয়ে টানা ৫টি সিরি-আ শিরোপা জিতেন। ২০১৭ সালে জুভেন্টাস যখন উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে ওঠে, তখন সান্দ্রো ছিলেন সেই দলের রক্ষণভাগের অন্যতম মূল স্তম্ভ।

আলেক্স সান্দ্রো
জুভেন্টাসের মৌসুমের সেরা অ্যালেক্স স্যান্ড্রো– Image Source: juventus.com

জুভেন্টাসের ইতিহাসে তিনি অন্যতম দীর্ঘ মেয়াদী বিদেশী খেলোয়াড়। জুভেন্টাসের হয়ে ৩০০-এর বেশি ম্যাচ খেলার অনন্য কীর্তি রয়েছে তাঁর ঝুলিতে, যা পাভেল নেদভেদ বা ডেভিড ত্রেজেগের মতো কিংবদন্তিদের পাশে তাঁর নামকে বসিয়ে দেয়। বছরের পর বছর ধরে কখনো লেফট-ব্যাক, কখনো উইং-ব্যাক, আবার কখনো থ্রি-ম্যান ডিফেন্সে লেফট সেন্টার-ব্যাক হিসেবে খেলে তিনি দলের প্রতি তাঁর নিবেদন প্রমাণ করেছেন।

ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে আলেক্স সান্দ্রোর যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে। তবে জাতীয় দলে তাঁর নিয়মিত সুযোগ পাওয়াটা বেশ কঠিন ছিল, কারণ সেই সময়ে ব্রাজিলের লেফট-ব্যাক পজিশনে খেলতেন মার্সেলো এবং ফিলিপে লুইসের মতো দুই বিশ্বমানের তারকা। তা সত্ত্বেও, নিজের ধারাবাহিকতার কারণে সান্দ্রো সবসময়ই জাতীয় দলের রাডারে ছিলেন। মার্সেলোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষের দিকে এলে সান্দ্রো ব্রাজিলের রক্ষণভাগের নিয়মিত মুখ হয়ে ওঠেন।

 আলেক্স সান্দ্রো
ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে আলেক্স সান্দ্রোর যাত্রা – Image Source: lncimg.lance.com.br

২০১৯ সালে ব্রাজিলের মাটিতে অনুষ্ঠিত কোপা আমেরিকায় আলেক্স সান্দ্রো ছিলেন তিতের দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত ডিফেন্ডিং করে তিনি ব্রাজিলকে চ্যাম্পিয়ন করতে বড় ভূমিকা রাখেন। এছাড়া ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপে তিনি ব্রাজিলের মূল স্কোয়াডে ছিলেন এবং মাঠে নিজের অভিজ্ঞতার প্রমাণ দিয়েছেন।

২০২৪ সালের আগস্টে ইতালিয়ান জায়ান্ট জুভেন্টাসের সাথে দীর্ঘ ১০ বছরের ঐতিহাসিক অধ্যায় শেষ করে আলেক্স সান্দ্রো ফ্রি ট্রান্সফারে নিজ দেশ ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ফ্লামেঙ্গোতে যোগ দেন। ২০২৬ সালের এই বর্তমান সময়েও তিনি ফ্লামেঙ্গোর রক্ষণভাগের অন্যতম মূল ভরসা হিসেবে খেলছেন।

২০২৬ বিশ্বকাপের ব্রাজিল স্কোয়াডে আলেক্স সান্দ্রোর অন্তর্ভুক্তি যেন সেলেসাও ভক্তদের মনে এক পিস ভরসা এনে দিয়েছে! লাতিন ফুটবলের এই মহাযজ্ঞে তরুণদের পাশাপাশি রক্ষণের বাম প্রান্তে অভিজ্ঞতার হাল ধরতে কোচ তাঁর ওপরেই চোখ বন্ধ করে আস্থা রেখেছেন।

সহজ কথায়, ২০২৬ সালের ব্রাজিল দলে আলেক্স সান্দ্রোর নাম থাকা মানে হেডলাইনের সব আলো হয়তো তরুণ স্ট্রাইকাররা কেড়ে নিচ্ছে, কিন্তু ব্রাজিলের হেক্সা জয়ের মিশনের পেছনে ব্যাক-স্টেজের মূল দায়িত্বটা সামলাচ্ছেন এই বিশ্বস্ত লাতিন প্রহরী!

Reference:

Related posts

গ্যাব্রিয়েল মাগালাইস: ব্রাজিলের রক্ষণদুর্গ থেকে আর্সেনালের তারকা ডিফেন্ডার

আশা রহমান

মুসলিম ঐক্যের দিশারি সাইয়্যেদ জামাল উদ্দিন আফগানি

গোলপোস্টের রকেট লঞ্চার এদেরসন মোরায়েস!

আশা রহমান

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More