Image default
ক্রীড়াবিদজীবনীফুটবল

লিও পেরেইরা: প্রেমের শক্তিতেই কি এখন বিশ্বের সেরা ডিফেন্ডার?

রিয়াল মাদ্রিদের মিলিতাও-এর এক্স-গার্লফ্রেন্ড করোলিনের প্রেমে পড়েই লিও পেরেইরার ডিফেন্সের ধার যেন রকেট গতিতে বেড়ে গেছে! তা দেখে ফ্ল্যামেঙ্গো ভক্তদের দাবি এই ‘লেডি লাক’-এর চক্করেই লিও এখন প্রেমের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে দুনিয়ার সেরা ডিফেন্ডার বনে গেছেন!

ব্রাজিলের মাটিতে শুধু জাদুকরী ফরোয়ার্ড আর ড্রিবলাররাই জন্মায় না, সেখানে এমন কিছু ডিফেন্ডারও আছেন যারা প্রতিপক্ষের জন্য আস্ত একটা লোহার প্রাচীর! বল পায়ে মেসির মতো শান্ত অথচ ডিফেন্সে ডেভিড লুইজের মতো আগ্রাসী তিনি হলেন লাতিন আমেরিকার বর্তমান ফুটবল কাঁপানো ফ্ল্যামেঙ্গোর মহাতারকা লিও পেরেইরা!

লিও পেরেইরা- এর ব্যক্তিগত তথ্য:

নাম

লিওনার্দো পেরেইরা

জন্ম

৩১ জানুয়ারী ১৯৯৬ (বয়স ৩০)

জন্মস্থান

কুরিটিবা , ব্রাজিল

উচ্চতা

১.৮৯ মিটার (৬ ফুট ২ ইঞ্চি)

পজিশন

সেন্টার ব্যাক

ক্লাব ক্যারিয়ার

অ্যাটলেটিকো পারানায়েন্সে,গুয়ারাটিংগুয়েটা,নাউতিকো,অরল্যান্ডো সিটি বি,অরল্যান্ডো সিটি এবং বর্তমানে ফ্লামেঙ্গো ক্লাবের হয়ে খেলছেন।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

২০২৬– ব্রাজিল

ফ্ল্যামেঙ্গোর মহাতারকা লিও পেরেইরা – Image Source:band.com.br

১৯৯৬ সালের ৩১ জানুয়ারি ব্রাজিলের পারানা প্রদেশের কুরিতিবা শহরে জন্মগ্রহণ করেন লিওনার্দো পেরেইরা, যিনি ফুটবল বিশ্বে ‘লিও পেরেইরা’ নামে পরিচিত। ব্রাজিলের আর দশটা শিশুর মতো লিওর শৈশবটাও কেটেছে গলির ফুটবলে। তবে অন্য সবাই যখন ফরোয়ার্ড লাইনে খেলে গোল করার নেশায় মত্ত থাকত, লিওর ঝোঁক ছিল প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখে দেওয়ার দিকে। তার শারীরিক গঠন এবং চমৎকার উচ্চতা শৈশবেই তাকে একজন ডিফেন্ডার হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে।

লিও পেরেইরা – Image Source:365scores.com

কুরিতিবা শহরের স্থানীয় ক্লাব অ্যাথলেটিকো পারানাআনসের স্কাউটদের নজরে আসেন তিনি ২০১০ সালে, যখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। ক্লাবের যুব একাডেমিতে যোগ দেওয়ার পর পেরেইরার ফুটবল প্রতিভার দ্রুত বিকাশ ঘটে। একাডেমির কোচরা তার ট্যাকলিংয়ের টাইমিং এবং বাঁ-পায়ের নিখুঁত পাসিং দেখে মুগ্ধ হন।

২০১৩ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে অ্যাথলেটিকো পারানাআনসের সিনিয়র দলে ডাক পান লিও পেরেইরা। ২০১৩ সালের অ্যাথলেটিকো পারানাআনসের রাজ্য লিগে তার পেশাদার অভিষেক হয়। তবে তরুণ বয়সে মূল দলে নিয়মিত জায়গা পাওয়াটা যেকোনো ডিফেন্ডারের জন্যই কঠিন, বিশেষ করে ব্রাজিলের মতো তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ ফুটবল কাঠামোতে।

অ্যাথলেটিকো পারানাআনসের লিও পেরেইরা – Image Source:images.mlssoccer.com

নিজেকে আরও পরিপক্ব করতে এবং নিয়মিত খেলার সুযোগ পেতে লিও বেশ কয়েকটি ক্লাবে লোনে খেলেন। এর মধ্যে রয়েছে গুয়ারানি এবং পর্তুগালের ক্লাব ওলহানেনসে। ২০১৭ সালে তিনি আমেরিকার মেজর লিগ সকারের ক্লাব অরেল্যান্ডো সিটি-র বি দলেও কিছুদিন খেলেন। এই লোন স্পেলগুলো লিওর ক্যারিয়ারের জন্য টার্নিং পয়েন্ট ছিল। ভিন্ন দেশের, ভিন্ন সংস্কৃতির এবং শারীরিক ফুটবলের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ফলে তার মেন্টাল টাফনেস বা মানসিক শক্তি বহুগুণ বেড়ে যায়।

২০১৮ সালে লোন শেষ করে যখন লিও পারানাআনসেতে ফিরে আসেন, তখন তিনি আর সেই কাঁচা ডিফেন্ডার ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন অভিজ্ঞ এবং আত্মবিশ্বাসী যোদ্ধা। ২০১৮ মৌসুমে তিনি ক্লাবের মূল একাদশের নিয়মিত মুখ হয়ে ওঠেন।

তিনি ছিলেন একজন অভিজ্ঞ এবং আত্মবিশ্বাসী যোদ্ধা – Image Source: espn.com.br

ওই বছরই তিনি তার ক্যারিয়ারের প্রথম বড় শিরোপা জিতেন। অ্যাথলেটিকো পারানাআনসের হয়ে তিনি কোপা সুদামেরিকানা জয় করেন, যা লাতিন আমেরিকার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ ক্লাব টুর্নামেন্ট। ২০১৯ সালে তিনি ক্লাবের হয়ে ‘কোপা দো ব্রাজিল’ শিরোপাও উঁচিয়ে ধরেন। পারানাআনসের হয়ে ১২৪ ম্যাচে মাঠে নেমে তিনি ৮টি গোলও করেন, যা একজন ডিফেন্ডারের জন্য বেশ ভালো রেকর্ড।

২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে ব্রাজিলের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সফল ক্লাব ফ্ল্যামেঙ্গো লিও পেরেইরাকে দলে ভেড়ানোর ঘোষণা দেয়। প্রায় ৪.৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে চার বছরের চুক্তিতে তিনি রিও ডি জেনিরোর এই ঐতিহাসিক ক্লাবে যোগ দেন।

সফল ক্লাব ফ্ল্যামেঙ্গো লিও পেরেইরা – Image Source:band.com.br

ফ্ল্যামেঙ্গোর বিখ্যাত ‘মারাকানা স্টেডিয়াম’ এবং কোটি কোটি ভক্তের চাপ সামলানো যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্যই এক অগ্নিপরীক্ষা। ২০২০ ও ২০২১ সালে ফ্যানদের সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছিল তাকে কিছু ছোটখাটো ভুলের জন্য। কিন্তু লিও পেরেইরা দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না।

২০২২ মৌসুমটি ছিল লিও পেরেইরার ক্যারিয়ারের শ্রেষ্ঠ সময়। কোচ দরিভাল জুনিয়রের অধীনে লিও নিজের খেলার স্টাইল বদলে ফেলেন। ডেভিড লুইজের মতো অভিজ্ঞ ডিফেন্ডারের সাথে জুটি বেঁধে লিও ফ্ল্যামেঙ্গোর ডিফেন্সকে এক দুর্ভেদ্য প্রাচীরে পরিণত করেন।

লিও পেরেইরা ব্রাজিলের অনূর্ধ্ব-১৭ এবং অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন। ২০১৫ সালের ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে তিনি ব্রাজিল দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন, যেখানে ব্রাজিল রানার্স-আপ হয়েছিল।

ব্রাজিলের অনূর্ধ্ব-১৭ এবং অনূর্ধ্ব-২০ দলে খেলেছেন- Image Source:goal.com

তবে ব্রাজিলের জাতীয় দলের রক্ষণভাগে মারকুইনহোস, এদের মিলিতাও, গ্যাব্রিয়েল মাগালায়েস এবং ব্রেমারের মতো ইউরোপ কাঁপানো ডিফেন্ডাররা থাকায় লিওর এখনো দলে জায়গা পাকা করা হয়ে ওঠেনি। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের কোয়ালিফায়ার ম্যাচ এবং কোপা আমেরিকার রাডারে তিনি সবসময়ই ব্রাজিলের কোচদের বিবেচনায় থাকেন।

মাঠের ভেতর লিও যেমন শান্ত ও আগ্রাসী, মাঠের বাইরে তিনি ততটাই আমুদে এবং পারিবারিক মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার বিপুল ফলোয়ার রয়েছে। ২০২৪ সালের দিকে ব্রাজিলের বিখ্যাত ইনফ্লুয়েন্সার করোলিন লিমার সাথে তার সম্পর্ক নিয়ে ব্রাজিলের মিডিয়াতে ব্যাপক চর্চা হয়। করোলিন লিমার সাথে সম্পর্কের পর লিওর মাঠের পারফরম্যান্স আরও উন্নত হয়, যা নিয়ে ফ্ল্যামেঙ্গো ভক্তরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচুর ট্রোল এবং মজার মিম তৈরি করেছিল, যা লিওর জনপ্রিয়তা সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে আরও বাড়িয়ে দেয়।

করোলিন লিমার সাথে লিও – Image Source:lance.com.br

করোলিন লিমার সেই বিখ্যাত ‘লেডি লাক’ আর ভক্তদের দেওয়া ‘লিওনিল’ উপাধি সাথে নিয়ে লিও পেরেইরা এবার ২০২৬ বিশ্বকাপের মিশন শুরু করতে রেডি! মাঠের বাইরে মিমের ঝড় আর মাঠের ভেতর তার বুলেট গতির লং পাস সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ডিফেন্সে এবার এক্সট্রা এন্টারটেইনমেন্ট আর সলিড পারফরম্যান্স দুটোই বোনাস হিসেবে পাওয়া যাবে!

Reference:

Related posts

আহমদ শাহ দুররানি: আফগান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা

আবু সালেহ পিয়ার

আলিসন বেকার: ড্রেসিংরুমের রকস্টার, মাঠের সুপারহিরো

আর্জেন্টিনার আড়ালে থাকা এক হিরো লাউতারো আকোস্তা

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More