Image default
ইরাকধর্মীয় স্থাপনাপর্যটন আকর্ষণ

আবু হানিফা মসজিদ: বাগদাদের ঐতিহাসিক ইসলামী স্থাপত্য

বাগদাদের আদহামিয়া এলাকায় অবস্থিত আবু হানিফা মসজিদ বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক একটি মসজিদ। এটি ‘আল-ইমাম আল-আজম মসজিদ’ নামেও বহুল পরিচিত। হানাফি ফিকহের প্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত ইসলামিক পণ্ডিত ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর নামানুসারে এই মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছে। শতাব্দী ধরে এটি বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের জন্য এক পবিত্র জিয়ারতগাহ এবং জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। আবু হানিফা মসজিদটি যে এলাকায় অবস্থিত, সেই পুরো এলাকাটিই এই মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা ইমামের নামানুসারে ‘আদহামিয়া’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে।

আবু হানিফা মসজিদ– Image Source:wikidata.org

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ছিলেন ইসলামিক আইনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত এবং হানাফি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি অষ্টম শতাব্দীতে বাগদাদে বসবাস করতেন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর তাঁকে তৎকালীন বাগদাদের বিখ্যাত ‘খাইজুরান’ কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরবর্তীতে তাঁর সমাধির ওপর একটি সুন্দর গম্বুজ তৈরি করা হয় এবং সমাধির পাশেই এই ঐতিহাসিক আবু হানিফা মসজিদটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়।

আবু হানিফা মসজিদটির প্রথম বড় আকারের ভবন ও মাদরাসা তৈরি হয় সেলজুক সাম্রাজ্যের আমলে। ১০৬৬ খ্রিস্টাব্দে সেলজুক উজির আবু সা’দ আল-মুস্তাওফি ইমাম আবু হানিফার সমাধির ওপর এক চমৎকার গম্বুজ ও পাশে একটি বিশাল মাদরাসা নির্মাণ করেন। এই মাদরাসাটি পরবর্তীতে ইসলামিক আইন ও হাদিস চর্চার জন্য বিশ্বজুড়ে খ্যাতি লাভ করে। সেলজুক আমলে নির্মিত এই মসজিদের মাদরাসাটি তৎকালীন সময়ের শ্রেষ্ঠ ও বৃহত্তম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হিসেবে গণ্য হতো।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আবু হানিফা মসজিদটি বহু কঠিন সময় পার করেছে। ১২৫৮ সালে তাতার বা মোঙ্গলদের বাগদাদ আক্রমণের সময় এই মসজিদটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে ১৬৩৮ সালে উসমানীয় সুলতান মুরাদ চতুর্থ বাগদাদ জয় করার পর মসজিদটি আবার নতুন করে সাজিয়ে তোলেন। বারবার ধ্বংস ও যুদ্ধের পরেও মসজিদটি প্রতিটি যুগে নতুন রূপ নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।

উসমানীয় সুলতান মুরাদ চতুর্থ– Image Source:dailysabah.com

উসমানীয় সুলতান মুরাদ চতুর্থ এই মসজিদটি এতটাই ভালোবাসতেন যে তিনি নিজ তত্ত্বাবধানে অটোমান স্থাপত্যশৈলীতে এটি পুনরায় নির্মাণ করিয়েছিলেন।

আবু হানিফা মসজিদের বর্তমান স্থাপত্যে রাজকীয় উসমানীয় বা অটোমান ছোঁয়া স্পষ্ট দেখা যায়। মসজিদের বিশালাকার সাদা ও নীল রঙের গম্বুজ এবং সুউচ্চ মিনারটি দূর থেকেই মানুষের চোখ জুড়িয়ে দেয়। মসজিদের ভেতরের মার্বেল পাথরের তৈরি বিশাল স্তম্ভ, রঙিন কাঁচের জানালা এবং দেয়ালের কারুকার্য সত্যিই অপূর্ব। দিনের আলোতে মার্বেল পাথরের মেঝে চমৎকারভাবে আলো প্রতিফলিত করে।

মসজিদের প্রধান প্রার্থনা কক্ষের ভেতরের দেয়াল এবং গম্বুজের নিচে অত্যন্ত সুন্দর ও নিখুঁত আরবি ক্যালিগ্রাফি খোদাই করা রয়েছে। পবিত্র কোরআনের নানা আয়াত অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নান্দনিকভাবে সেখানে আঁকা হয়েছে। উসমানীয় আমলের বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফারদের হাতের জাদু আজও এই মসজিদে স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত আছে। রঙিন সিরামিক টাইলস এবং ধাতব নকশা এই ক্যালিগ্রাফিগুলোকে আরও দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছে।

আবু হানিফা মসজিদের ভেতরের কারুকার্য– Image Source:facebook.com

মসজিদটির ভেতরের প্রাঙ্গণ বা আঙ্গিনাটি বেশ খোলামেলা ও বিশাল। প্রায় হাজার হাজার মানুষ একসাথে এখানে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতে পারেন। প্রাঙ্গণের মাঝামাঝি জায়গায় ঐতিহ্যবাহী নকশার এক সুন্দর অজুখানা এবং পানির ফোয়ারা রয়েছে। চারপাশে সবুজ গাছপালা এবং ফোয়ারার টলটলে পানি পুরো পরিবেশকে খুব শান্ত ও পবিত্র করে রাখে।

আবু হানিফা মসজিদটি যুগে যুগে ইসলামিক জ্ঞান ও গবেষণার মূল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। মসজিদের অভ্যন্তরে একটি সমৃদ্ধ ও প্রাচীন লাইব্রেরি রয়েছে। এই লাইব্রেরিতে শত শত বছরের পুরোনো দুর্লভ ইসলামিক পাণ্ডুলিপি, কোরআনের হাতে লেখা কপি এবং ইতিহাসের নানা বই সংরক্ষিত আছে। গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য এটি এক অমূল্য জ্ঞানের ভান্ডার। এই লাইব্রেরিতে এমন কিছু প্রাচীন পাণ্ডুলিপি আছে যা বিশ্বের আর কোনো লাইব্রেরি বা জাদুঘরে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

ইরাকের যেকোনো ধর্মীয় উৎসবে আবু হানিফা মসজিদ প্রাঙ্গণ লোকারণ্যে পরিণত হয়। বিশেষ করে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সঃ), শবে কদর এবং ঈদের দিনে এখানে লাখো মানুষের সমাগম ঘটে। রাতজুড়ে বিশেষ প্রার্থনা, কোরআন তেলাওয়াত এবং জিকিরের আয়োজন করা হয়। উৎসবের সময় পুরো মসজিদটি নানারকম রঙিন আলোয় সাজানো হয়, যা দেখতে দারুণ লাগে।

ঈদে মিলাদুন্নবীর রাতে পুরো আদহামিয়া এলাকা ও এই মসজিদ প্রাঙ্গণে বিনামূল্যে মিষ্টি ও ঐতিহ্যবাহী খাবার বিতরণ করার এক বিশেষ প্রথা রয়েছে।

ঈদে মিলাদুন্নবীর রাতে পুরো আদহামিয়া এলাকা– Image Source:mangobaaz.com

ইতিহাসের বহু ঝড়ঝাপটা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেলেও আবু হানিফা মসজিদ সব সময় ইরাকের মানুষের কাছে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করেছে। সকল ভেদাভেদ ভুলে বিভিন্ন মাযহাব ও চিন্তাধারার মানুষ এই মসজিদে একসাথে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন। বাগদাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সাথে এই মসজিদটি গভীরভাবে মিশে আছে।

২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের সময় এই মসজিদটির বেশ কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তবে পরবর্তীতে স্থানীয় জনগণ ও সরকারের যৌথ প্রচেষ্টায় এটিকে পুনরায় আগের রূপে ফিরিয়ে আনা হয়।

Reference:

Related posts

বাগদাদ: গোলাকার শহর থেকে আধুনিক ইরাকের হৃৎপিণ্ড

আবু সালেহ পিয়ার

ফরাসি শিল্প ও সংস্কৃতির গৌরব পালে গার্নিয়ে

আশা রহমান

বসফরাস প্রণালী: ইউরোপ ও এশিয়ার সেতুবন্ধন

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More