আঙ্কারা শহরের পুরোনো অংশে অবস্থিত আসলানহানে মসজিদ একটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক মসজিদ। এটি সেলজুক সাম্রাজ্যের আমলের তৈরি। হাজার বছর ধরে এই মসজিদটি তুরস্কের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এর ভেতরের শান্ত ও স্নিগ্ধ পরিবেশ যেকোনো মানুষের মন ছুঁয়ে যায়। সাধারণ পর্যটক থেকে শুরু করে ইতিহাসপ্রেমী মানুষ সবাই এই চমৎকার মসজিদটি দেখতে এখানে আসেন।

‘আসলানহানে’ তুর্কি শব্দটির অর্থ হলো ‘সিংহের ঘর’। এই নামের পেছনের কারণ জানতে হলে আমাদের এর ইতিহাসের ভেতরে প্রবেশ করতে হবে। বহু বছর আগে যখন এই এলাকাটি তৈরি হচ্ছিল, তখন মসজিদের ঠিক কাছাকাছি জায়গায় একটি প্রাচীন রোমান যুগের পাথরের সিংহের মূর্তি পড়ে ছিল। স্থানীয় লোকজন জায়গাটিকে ওই সিংহের নামানুসারেই চিনত। সময়ের সাথে সাথে সেই পুরোনো সিংহের নাম থেকেই পুরো মসজিদের নামকরণ করা হয় ‘আসলানহানে মসজিদ’। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আজও সেই পুরোনো সিংহের মূর্তিটি এই মসজিদের ঠিক বাইরে সযত্নে সংরক্ষিত আছে।
মসজিদের দেয়াল ও আঙিনায় ভালোভাবে খুঁজলে রোমান আমলের সেই পাথুরে সিংহ মূর্তিটির দেখা আজও মেলে।
ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে, তৎকালীন অন্যতম প্রধান বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র আঙ্কারায় সেলজুক সুলতান তৃতীয় আলাউদ্দিন কেকায়াদের আমলে আসলানহানে মসজিদটি নির্মিত হয়। শত শত বছরের যুদ্ধবিগ্রহ, ভূমিকম্প ও নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রতিকূলতা জয় করে আজও এটি তার প্রাচীন গৌরব নিয়ে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে।

মজার তথ্য হলো, এই প্রাচীন মসজিদটি প্রায় ৮০০ বছরেরও বেশি পুরোনো, যা তেরো শতকের সেলজুক স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে আজও টিকে আছে।
আসলানহানে মসজিদের ভেতরে পা রাখলেই সবার আগে নজর কাড়ে এর বিশালাকার কাঠের স্তম্ভগুলো। মসজিদের বিশাল ছাদটিকে সযত্নে ধরে রেখেছে ২৪টি মজবুত কাঠের খুঁটি। প্রতিটি খুঁটির ওপরের বা মাথার অংশে রয়েছে গাছ ও লতাপাতার দৃষ্টিনন্দন নিখুঁত খোদাই করা নকশা। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, হাজার বছর ধরে এই কাঠের পিলারগুলো বিশাল ছাদটির ভার অত্যন্ত শক্তভাবে বহন করে চলেছে।
মজার তথ্য হলো, এই ২৪টি প্রাচীন কাঠের পিলারের প্রতিটি কিন্তু একই আকৃতির নয়, বরং পুরোনো আমলের ভিন্ন ভিন্ন গাছের গুঁড়ি কেটে নিখুঁতহাতে এগুলো তৈরি করা হয়েছিল।
আসলানহানে মসজিদের সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো এর ছাদ তৈরির প্রাচীন পদ্ধতি। সেলজুক আমলের কারিগররা এই বিশাল ছাদটি তৈরি করার সময় কোনো ধরনের লোহা বা পেরেক ব্যবহার করেননি। প্রাচীন ‘কুন্দেকারি’ নামের এক বিশেষ পদ্ধতিতে কাঠের টুকরো নিখুঁতভাবে খাঁজে খাঁজে আটকে এই ছাদ বানানো হয়েছে। শত শত বছর পেরিয়ে গেলেও এই কাঠের ছাদটি আজও একটুও নড়েনি বা নষ্ট হয়নি। তৎকালীন কারিগরদের এমন নিখুঁত বুদ্ধি দেখে আজও সবাই অবাক হন।

পেরেক ব্যবহার না করে শুধু কাঠের জোড় লাগানোর এই বিশেষ প্রাচীন কৌশলটি সেলজুক আমলের স্থপতিদের অত্যন্ত গোপনীয় ও উন্নত প্রযুক্তির অংশ ছিল।
মসজিদের ভেতরে ইমাম সাহেব যে দিকে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ান, সেই মিহরাবটি দেখার মতো। সাধারণত পাথরের মিহরাব দেখা গেলেও এই মসজিদের মিহরাবটি তৈরি হয়েছে কাঠ দিয়ে। কাঠের ওপর খুব সূক্ষ্ম ও নিখুঁত সব কারুকাজ করা হয়েছে। কাঠের ওপর কোরআনের নানা আয়াত এবং জ্যামিতিক নকশা খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এর রঙের ঔজ্জ্বল্য এবং প্রাচীন কারুকাজ দেখলে যেকোনো শিল্পপ্রেমী মানুষের মন ভরে যাবে।
বাইরে থেকে দেখলে এই মসজিদটিকে খুব সাধারণ একটি ভবন বলে মনে হতে পারে। এর বাইরের দেয়ালগুলো মূলত লাল ইট এবং পুরোনো পাথর দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। কোনো অতিরিক্ত জাঁকজমক বা চাকচিক্য এখানে নেই। সেলজুক আমলের স্থাপত্যের মূল বৈশিষ্ট্যই ছিল সরলতা ও দৃঢ়তা। চারপাশের সাদামাটা পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিয়েই এটি তৈরি করা হয়েছে। তবে এর ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখের সামনে এক অন্যরকম শিল্পসৌন্দর্য ভেসে ওঠে।
বাইরের সাধারণ ইটের দেয়ালগুলো বিশেষভাবে এমন পুরু করে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে শীতের ঠান্ডা বাতাস এবং গ্রীষ্মের তীব্র রোদ ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।
মসজিদের বাইরে রয়েছে একটি ছোট এবং খুব সুন্দর উঠান। উঠানের চারপাশের পরিবেশ সবসময় একদম শান্ত ও কোলাহলমুক্ত থাকে। এখানে বসার জন্য ছোট জায়গা আছে। চারপাশের পুরোনো গাছপালা এই জায়গার সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যস্ত আঙ্কারা শহরের মাঝে ক্লান্তিকর ঘোরাঘুরির পর এই উঠানে কিছুক্ষণ দাঁড়ালে অদ্ভুত এক মানসিক শান্তি পাওয়া যায়। স্থানীয় মুসল্লিরা নামাজের আগে এখানে এসে একটু জিরিয়ে নেন।
এই শান্ত উঠানের এক কোণে পুরোনো দিনের কিছু সমাধি বা মাজার রয়েছে, যা এই প্রাচীন মসজিদের পবিত্রতা এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
আসলানহানে মসজিদটি আঙ্কারার এক ঐতিহাসিক এলাকায় অবস্থিত। এখানে গেলে পুরোনো তুরস্ককে খুব কাছ থেকে দেখা যায়। এর চারপাশে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী পুরোনো তুর্কি বাড়ি ও ছোট ছোট দোকান। আঙ্কারা দুর্গ এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থান এর খুব কাছেই। দুর্গ দেখার পর পর্যটকরা সহজেই হেঁটে এখানে আসতে পারেন। পুরোনো আঙ্কারার অলিগলি ঘোরার সময় এটি দারুণ এক অভিজ্ঞতা দেয়। এখানকার পাথরে বাঁধানো রাস্তায় হাঁটলে মনে হবে আপনি শত বছর আগের অতীতে হারিয়ে গেছেন।
Reference:

