Image default
জাপানপর্যটন আকর্ষণ

জাপানি স্বাদের খোঁজে দোতোনবোরির পথে পথে

১৯৮৫ সালে ওসাকার বেসবল দল ‘হানশিন টাইগার্স’ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পর, উচ্ছ্বসিত ভক্তরা দোতোনবরী খালের পাশের কেএফসি থেকে কার্নেল স্যান্ডার্সের একটি মূর্তি পানিতে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। এরপর থেকে দলটির পারফরম্যান্স রহস্যজনকভাবে খারাপ হতে থাকলে, লোকেরা একে ‘কার্নেল স্যান্ডার্সের অভিশাপ’ বলতে শুরু করে! অবশেষে দীর্ঘ ২৪ বছর পর, ২০০৯ সালে খালের কাদা থেকে মূর্তিটি উদ্ধার করা হয়, যা তখন পুরো জাপানে খবরের শিরোনাম হয়েছিল। 

জাপানের ওসাকা শহরের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন স্পট হলো ‘দোতোনবোরি’ । এটি মূলত একটি খাল এবং তার দু’পাশের জমজমাট রাস্তা নিয়ে গঠিত। নিয়ন আলোর ঝলকানি, রাস্তার ধারের সুস্বাদু খাবার আর হাজারো পর্যটকের কোলাহলে জায়গাটি সারাক্ষণই জীবন্ত থাকে। ওসাকায় এসে দোতোনবোরি না ঘুরলে জাপান ভ্রমণই যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। জাপানের শান্ত ও স্নিগ্ধ রূপের ঠিক বিপরীত এক উদ্দাম ও প্রাণবন্ত রূপের দেখা মেলে এখানে।

দোতোনবোরি – Image Source:en.wikipedia.org

দোতোনবোরি খালের নামকরণ করা হয়েছে ‘ইয়াসুই দোতোন’ নামের একজন ব্যবসায়ীর নামানুসারে, যিনি ১৬১২ সালে নিজের টাকায় এই খাল খননের কাজ শুরু করেছিলেন। জাপানি ভাষায় ‘বোরি’ শব্দের অর্থ হলো খাল।

দোতোনবোরির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এখানকার বিশাল আকারের সব থ্রিডি বিলবোর্ড এবং নিয়ন সাইন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো ‘গ্লিকো রানিং ম্যান’-এর বিশাল সাইনবোর্ডটি, যা পুরো ওসাকা শহরের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। এর পাশাপাশি ‘কানি দোরাকু’ রেস্তোরাঁর বিশাল আকৃতির নড়াচড়া করা যান্ত্রিক কাঁকড়ার সাইনবোর্ডটিও পর্যটকদের দারুণভাবে আকর্ষণ করে। মানুষ এখানে এসে খালের ওপর থাকা এবিসু ব্রিজে দাঁড়িয়ে এসব আইকনিক সাইনের সামনে ছবি তুলতে ভালোবাসে।

‘গ্লিকো ম্যান’ সাইনবোর্ডটি প্রথম স্থাপন করা হয় ১৯৩৫ সালে। বর্তমানের সাইনটি এর ষষ্ঠ সংস্করণ, যা ২০১৪ সালে ১ লক্ষ ৪০ হাজার এলইডি লাইট দিয়ে নতুন করে সাজানো হয়েছে।

গ্লিকো ম্যান সাইনবোর্ড – Image Source:www.happyjappy.com

ওসাকাকে বলা হয় জাপানের রান্নাঘর, আর দোতোনবোরি হলো সেই রান্নাঘরের প্রধান ডাইনিং টেবিল! এখানকার স্ট্রিট ফুডের কোনো তুলনা হয় না। তাকোয়াকি (অক্টোপাস বল), ওকোনোমিয়াকি (জাপানি প্যানকেক) এবং কুশিকাতসু (ডিপ ফ্রায়েড মিট ও সবজি)-এর মতো ঐতিহ্যবাহী সব খাবারের গন্ধে এখানকার বাতাস ম-ম করে। রাস্তার দু’ধারে সারি সারি খাবারের দোকান পর্যটকদের রসনা তৃপ্ত করার জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকে।

দোতোনবোরির এই বিশাল ফুড কালচার বোঝাতে জাপানিরা ‘কুইদাওরে’ শব্দটি ব্যবহার করে, যার আক্ষরিক অর্থ হলো- “খেতে খেতে ফতুর হয়ে যাওয়া” বা “Eat till you drop”!

সন্ধ্যার পর দোতোনবোরি এক মায়াবী রূপ ধারণ করে। খালের পানিতে দু’পাশের রঙিন নিয়ন আলো যখন প্রতিফলিত হয়, তখন এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। পর্যটকরা চাইলে ‘তোম্বোরি রিভার ক্রুজ’ -এ চড়ে নৌকায় বসে খালের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। এছাড়াও খালের দু’ধারে তৈরি করা হাঁটার রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়ে ওসাকার নাইটলাইফের আসল স্বাদ নেওয়া যায়। এখানকার পাব, বার আর ক্যাফেগুলোতে সবসময় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে।

দোতোনবোরি – Image Source:blog.gaijinpot.com

এদো যুগে দোতোনবোরি ছিল জাপানের অন্যতম প্রধান থিয়েটার জেলা। সেসময় এখানে ৬টি বিখ্যাত কাবুকি থিয়েটার এবং ৫টি বুনরাকু ( ঐতিহ্যবাহী পুতুল নাচ) থিয়েটার ছিল।

শপিং করা, মজার খাবার খাওয়া আর বন্ধুদের সাথে প্রাণবন্ত সময় কাটানোর জন্য দোতোনবোরির কোনো বিকল্প নেই। এখানকার শিনসাইবাশি শপিং আর্কেডটি দোতোনবোরির সাথেই যুক্ত, যেখানে শত শত ফ্যাশন ব্র্যান্ড এবং কসমেটিকসের দোকান রয়েছে। ওসাকার মানুষের উষ্ণ আতিথেয়তা এবং এই এলাকার অদ্ভুত এনার্জি যে কাউকেই মুগ্ধ করবে।

দোতোনবোরির আরেকটি আইকনিক চরিত্র হলো ‘কুইদাওরে তারো’ ড্রাম হাতে দাঁড়িয়ে থাকা লাল-সাদা ডোরাকাটা পোশাক পরা একটি মেকানিক্যাল সং বা ক্লাউন, যাকে ১৯৫০-এর দশক থেকে দোতোনবোরির অবিচ্ছেদ্য অংশ ধরা হয়!

কুইদাওরে তারো– Image Source:japantravel.navitime.com

যারা রাত জেগে শহরের কোলাহল উপভোগ করতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য দোতোনবরী আদর্শ জায়গা। এখানে গভীর রাত পর্যন্ত দোকানপাট এবং রেস্তোরাঁগুলো খোলা থাকে। পাশেই রয়েছে জাপানের অন্যতম দীর্ঘ শপিং আর্কেড শিনসাইবাশি  এবং বিখ্যাত ডিসকাউন্ট স্টোর ডন কিহোতে যার প্রবেশদ্বারে বিশাল এক হলুদ রঙের ফেরিস হুইল আছে।

দোতোনবরী শুধু একটি জায়গা নয়, এটি একটি উৎসব। জাপানের ঐতিহ্যবাহী শান্ত পরিবেশের ঠিক বিপরীত এক উদ্দাম, রঙিন এবং প্রাণবন্ত জীবনের স্বাদ পেতে হলে দোতোনবরী ভ্রমণ আপনার জন্য একটি দারুণ অভিজ্ঞতা হবে।

Reference: 

 

Related posts

হেরাত দুর্গ: সাম্রাজ্যের কবরস্থানের নীরব সাক্ষী

চেরাটিং সমুদ্রসৈকত: শান্ত প্রকৃতি ও সমুদ্রের অপূর্ব মিলন

নিসের ওল্ড টাউন: ইতিহাস, খাবার ও ইউরোপীয় গোলকধাঁধার শহর

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More