দক্ষিণ ফ্রান্সের নীল জলরাশি আর লাল ছাদের শহর নিসকে যদি একটি ফ্রেমে বন্দি করতে হয়, তবে আপনাকে অবশ্যই দাঁড়াতে হবে ক্যাসেল হিল বা কলিন ডু শাতো-এর চূড়ায়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৯২ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এই পাহাড়টি কেবল নিসের সর্বোচ্চ বিন্দু নয়, বরং এটি এই শহরের জন্মস্থান, প্রতিরক্ষা দুর্গ এবং আধুনিক পর্যটনের কেন্দ্রবিন্দু।xa0
ঐতিহ্যের ইতিহাস
ক্যাসেল হিলের ইতিহাস মানেই হলো নিস শহরের আদি ইতিহাস। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিক নাবিকরা যখন এখানে প্রথম পা রাখেন, তারা এই পাহাড়টিকেই তাদের বসতি স্থাপনের জন্য বেছে নিয়েছিলেন। তারা এর নাম দিয়েছিলেন ‘নিকাইয়া’, যা গ্রিক বিজয়ের দেবী ‘নাইকি’র নাম থেকে এসেছে।
মধ্যযুগে এই পাহাড়টি একটি অভেদ্য দুর্গে পরিণত হয়। পাহাড়ের চারপাশে গড়ে ওঠে ক্যাথেড্রাল, রাজপ্রাসাদ এবং সাধারণ মানুষের বসতি। নিস শহরটি তখন মূলত এই পাহাড়ের ওপরেই সীমাবদ্ধ ছিল। কয়েক শতাব্দী ধরে এটি সামরিক কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।xa0

তবে ১৭০৬ সালে ফরাসি রাজা চতুর্দশ লুইয়ের নির্দেশে এক দীর্ঘ অবরোধের পর এই বিশাল দুর্গটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়। রাজার উদ্দেশ্য ছিল নিস যেন আর কখনোই সামরিকভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। সেই ধ্বংসযজ্ঞের পর পাহাড়টি দীর্ঘকাল পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। পরবর্তীতে ১৮৩০-এর দশকে রাজা চার্লস ফেলিক্স এই পাহাড়টিকে একটি পাবলিক পার্কে রূপান্তরিত করার নির্দেশ দেন, যা আজ আমরা দেখতে পাই।
নয়নাভিরাম দৃশ্যxa0
ক্যাসেল হিলে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো এর অবিশ্বাস্য ভিউ। পশ্চিম দিকে দেখা যায় নিসের বিখ্যাত প্রমেনাড ডেস অ্যাঙ্গলেস এবং ‘বে অফ অ্যাঞ্জেলস’ সমুদ্রের সেই গাঢ় নীল জলরাশি আর সৈকতের সাদা বাঁকানো রেখা দেখলে মনে হয় কোনো দক্ষ শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবি।
উত্তর-পশ্চিমে: আপনার পায়ের নিচে দেখা যাবে নিসের ওল্ড টাউন । ওপর থেকে ওল্ড টাউনের সরু গলি আর লাল টালির ছাদগুলোকে অনেকটা ছোটখাটো লেগো সেটের মতো মনে হয়।
পূর্ব দিক থেকে দেখা যায় পোর্ট লিম্পিয়া বা নিস বন্দর। সমুদ্রের বুকে ভাসমান সারি সারি বিলাসবহুল সাদা ইয়ট এবং ঐতিহ্যবাহী রঙিন নৌকাগুলোর দৃশ্য এখান থেকে সবচেয়ে পরিষ্কার বোঝা যায়।
কৃত্রিম ঝরনা
ক্যাসেল হিলের অন্যতম আকর্ষণ হলো এর বিশাল ঝরনাটি । ১৮৮৫ সালে এটি নির্মিত হয়েছিল মূলত পাহাড়ের ওপরের বাগানগুলোতে পানি সরবরাহের জন্য। এটি একটি কৃত্রিম ঝরনা হলেও এর নির্মাণশৈলী এতটাই প্রাকৃতিক যে দেখে বোঝার উপায় নেই। পাথর বেয়ে নেমে আসা জলের ধারা পাহাড়ের পরিবেশে এক ধরণের স্নিগ্ধতা নিয়ে আসে। বিশেষ করে গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে ঝরনার পাশের শীতল বাতাস পর্যটকদের পরম শান্তি দেয়। এই ঝরনার সামনের ব্যালকনিটি পর্যটকদের ছবি তোলার জন্য সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও উদ্যান
ক্যাসেল হিল এখন কেবল ইতিহাস নয়, এটি নিসের ফুসফুস হিসেবে পরিচিত। পাহাড়ের বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে পাইন, জলপাই এবং আরও অনেক ধরণের ভূমধ্যসাগরীয় গাছপালা। পুরো এলাকাটি একটি শান্ত উদ্যানের মতো। এখানে অনেকগুলো হাঁটার পথ বা ট্রেইল রয়েছে। যারা একটু নির্জনে সময় কাটাতে চান, তারা পাহাড়ের পেছনের দিকের পথগুলো বেছে নিতে পারেন। শিশুদের জন্য এখানে রয়েছে বিশাল খেলার মাঠ এবং ক্যাফে, যেখানে পরিবার নিয়ে চমৎকার সময় কাটানো যায়।

প্রাচীন শিল্প ঐতিহ্য ও স্থাপত্যxa0
পাহাড়ের ওপরে হাঁটতে হাঁটতে আপনার চোখে পড়বে অসাধারণ কিছু মোজাইক আর্ট। গ্রিক পুরাণের বিভিন্ন কাহিনী এবং জ্যামিতিক নকশা দিয়ে সাজানো এই মোজাইকগুলো পাহাড়ের আদি গ্রিক ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দেয়। এছাড়া পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে এখনো প্রাচীন ক্যাথেড্রালের ভিত্তি এবং দুর্গের দেওয়ালের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের প্রতি যাদের আগ্রহ আছে, তারা এখানে প্রাচীন নিসের কাঠামো সম্পর্কে ধারণা পাবেন।
নিসের অদ্ভুত সেই তোপধ্বনি
ক্যাসেল হিলের সাথে জড়িয়ে আছে নিসের সেই বিখ্যাত দুপুর ১২টার তোপধ্বনির ঐতিহ্য। পাহাড়ের একটি নির্দিষ্ট পয়েন্ট থেকেই প্রতিদিন ঠিক দুপুর ১২টায় এই আওয়াজ করা হয়। একজন ব্রিটিশ ভদ্রলোক তাঁর স্ত্রীর লাঞ্চের সময়ের কথা মনে করিয়ে দিতে যে প্রথা শুরু করেছিলেন, তা আজ নিসের অবিচ্ছেদ্য সংস্কৃতি। আপনি যদি ঠিক দুপুরে পাহাড়ের ওপরে থাকেন, তবে এই বিকট কিন্তু মজার আওয়াজটি খুব কাছ থেকে শুনতে পাবেন।
ক্যাসেল হিলে যাওয়ার উপায়
আপনি যদি শারীরিক কসরত পছন্দ করেন এবং ধীরে ধীরে দৃশ্য উপভোগ করতে চান, তবে ওল্ড টাউনের পাশ দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে পারেন। প্রায় ২১৪টি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার সময় প্রতিটি ধাপে নিস শহর নতুন নতুন রূপে আপনার সামনে ধরা দেবে।
যারা কম পরিশ্রমে ওপরে উঠতে চান, তাদের জন্য রয়েছে ঐতিহাসিক এক লিফট। ১৯ শতকের একটি আর্ট-ডেকো স্টাইলের এই লিফটটি সমুদ্রের পাড় থেকে সরাসরি আপনাকে পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে দেবে। এটি ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। নিস শহরের পর্যটন ট্রেনের মাধ্যমেও ক্যাসেল হিলে যাওয়া যায়। এটি সাধারণত শিশুদের এবং বয়স্কদের জন্য বেশি আরামদায়ক।

ভ্রমণের জন্য টিপস ও সেরা সময়
- সেরা সময়: ক্যাসেল হিল ভ্রমণের সেরা সময় হলো সূর্যাস্তের ঠিক আগে। যখন সূর্য ভূমধ্যসাগরের দিগন্তে ডুবে যায় এবং শহরের বাতিগুলো একে একে জ্বলে ওঠে, তখন পাহাড় থেকে এক অপার্থিব সৌন্দর্য তৈরি হয়।
- পোশাক ও জুতো: যেহেতু অনেকটা পথ হাঁটতে হবে, তাই আরামদায়ক জুতো (Sneakers) পরা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
- পিকনিক: অনেক পর্যটক স্থানীয় মার্কেট থেকে সোক্কা বা পনির কিনে নিয়ে পাহাড়ের ওপর পিকনিক করেন। শান্ত পরিবেশে খাবারের স্বাদ নেওয়ার জন্য এটি একটি দারুণ আইডিয়া।
চূড়ান্ত মন্তব্য
ক্যাসেল হিল বা কলিন ডু শাতো কেবল একটি পাহাড় নয়, এটি নিস শহরের আত্মা। যেখানে ইতিহাস আর প্রকৃতি হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে। আপনি যদি নিসে এসে ক্যাসেল হিলে না ওঠেন, তবে আপনার নিস ভ্রমণ অপূর্ণ থেকে যাবে। ক্যাসেল হিল হলো সেই জায়গা যা আপনাকে বারবার মনে করিয়ে দেবে জীবন সুন্দর এবং প্রকৃতির দান অতুলনীয়।
ক্যাসেল হিল সম্পর্কে কিছু চমকপ্রদ তথ্য
- xa0দুর্গ আছে কিন্তু দুর্গ নেই!: এই পাহাড়ের নাম ‘ক্যাসেল হিল’ বা ‘দুর্গের পাহাড়’ হলেও বাস্তবে সেখানে কোনো দুর্গের অস্তিত্ব নেই। ১৭১ বছর আগে ফরাসি রাজা চতুর্দশ লুই-এর আদেশে এই পাহাড়ের বিশাল প্রতিরক্ষা দুর্গটি পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। আজ সেখানে কেবল কিছু প্রাচীন দেওয়ালের ধ্বংসাবশেষ টিকে আছে।
- একটি কৃত্রিম বিস্ময়: পাহাড়ের চূড়ায় যে মনোরম জলপ্রপাত বা ঝরনাটি দেখা যায়, তা কিন্তু প্রাকৃতিক নয়! ১৮৮৫ সালে এটি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছিল। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল পাহাড়ের ওপরের নতুন বাগানগুলোতে পানি সরবরাহ করা এবং শহরের আভিজাত্য প্রদর্শন করা।
- লিফটের গোপন রহস্য: ক্যাসেল হিলে ওঠার জন্য যে জনপ্রিয় ফ্রি লিফটটি ব্যবহার করা হয়, সেটি আসলে একটি বিশাল পুরানো কূপের ভেতর বসানো হয়েছে। প্রকৌশলীরা একটি পরিত্যক্ত কূপকে সংস্কার করে এই আধুনিক লিফটটি তৈরি করেন।
- প্রাচীন শহরের জন্মস্থান: নিস শহরের বর্তমান ওল্ড টাউন কিন্তু একসময় পাহাড়ের নিচে ছিল না। মধ্যযুগ পর্যন্ত নিস শহরের পুরো বসতি ছিল এই পাহাড়ের ওপরেই। পরবর্তীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষ পাহাড়ের নিচে ওল্ড টাউনের দিকে বসতি গড়তে শুরু করে।
- একটি রাজকীয় উপহার: পাহাড়টি একসময় ন্যাড়া ও জনশূন্য হয়ে পড়েছিল। ১৮৩০ সালে সার্ডিনিয়ার রাজা চার্লস ফেলিক্স এটিকে একটি বিশাল উদ্যান বা পার্কে রূপান্তরের আদেশ দেন। আজকের এই সবুজে ঘেরা ক্যাসেল হিল মূলত তাঁরই দূরদর্শী চিন্তার ফসল।
- গ্রিক পুরাণের মোজাইক: ক্যাসেল হিলের মেঝের কিছু অংশে অসাধারণ পাথরের মোজাইক আর্ট দেখা যায়। এগুলো গ্রিক পুরাণের দেবী ‘ওডিসি’-র গল্পের স্মরণে তৈরি করা হয়েছে, যা এই পাহাড়ের গ্রিক শেকড়কে মনে করিয়ে দেয়।
- ১২টার তোপধ্বনির ‘কন্ট্রোল রুম’: নিস শহরের সেই বিখ্যাত দুপুর ১২টার তোপধ্বনি বা কামানের আওয়াজ কিন্তু এই ক্যাসেল হিল থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আপনি যদি ঠিক দুপুরে পাহাড়ের দক্ষিণ পাশে থাকেন, তবে এই ঐতিহ্যের সাক্ষী হতে পারবেন।
Reference:

