মেক্সিকোর বিপক্ষে প্রথমার্ধের মেসির সেই জাদুকরী শটটি যখন জালের ঠিকানা খুঁজে পেল, ডাগআউটে বসা শৈশবের গুরু পাবলো আইমারের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুবিন্দু যেন পুরো আর্জেন্টিনার কান্নারোধ করে এক পরম স্বস্তির মহাকাব্য লিখে দিল!
সর্বকালের সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসিকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, কার খেলা দেখে তিনি বড় হয়েছেন বা কার মতো হতে চেয়েছেন? মেসি সবসময় একটি নামই নেন পাবলো আইমার। ইনজুরির অভিশাপ যার ক্যারিয়ারের ডানা দুটি বারবার ভেঙে না দিলে হয়তো ইতিহাসের সেরা মিডফিল্ডারদের তালিকাটা অন্যভাবে লিখতে হতো। পরিসংখ্যান হয়তো তার শ্রেষ্ঠত্বের পুরোটা প্রকাশ করতে পারবে না, কিন্তু ফুটবল রোমান্টিকদের হৃদয়ে তার জায়গা চিরকাল অম্লান।xa0
পাবলো আইমার- এর ব্যক্তিগত তথ্য:
| নামxa0 |
পাবলো সিজার আইমার |
|
জন্ম xa0 |
৩ নভেম্বর ১৯৭৯ (বয়স ৪৬) |
|
জন্মস্থানxa0 |
রিও কুয়ার্তো , আর্জেন্টিনা |
|
উচ্চতাxa0 |
১.৭০ মিটার (৫ ফুট ৭ ইঞ্চি) |
|
পজিশনxa0 |
আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
রিভার প্লেট,ভ্যালেন্সিয়া,জারাগোজা,বেনফিকা,জোহর দারুল তা’জিম এবং এস্তুদিয়ান্তেস রিও কুয়ার্তো ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
১৯৯৯–২০০৯ আর্জেন্টিনা |

১৯৭৯ সালের ৩ নভেম্বর আর্জেন্টিনার রিও কুয়ার্তোতে জন্মগ্রহণ করেন পাবলো সিজার আইমার। মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা আইমারের ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা ছিল জন্মগত। তবে তার বাবা চাইতেন ছেলে ফুটবলের পাশাপাশি পড়াশোনাটাও ঠিকঠাক করুক। আইমার একটা সময় চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করার স্বপ্নও দেখতেন। কিন্তু ফুটবলের বিধাতা তার পায়ে স্টেথোস্কোপের বদলে বল তুলে দিয়েছিলেন।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে আর্জেন্টিনার অন্যতম সফল ক্লাব রিভার প্লেট-এর যুব একাডেমির ট্রায়ালে যান আইমার। তার পায়ের কাজ এবং অবিশ্বাস্য ফুটবল বুদ্ধি দেখে রিভার প্লেটের তৎকালীন যুব কোচ এবং কিংবদন্তি দানিয়েল পাসারেলা তাকে ক্লাবে নেওয়ার জন্য এক মুহূর্তও ভাবেননি। ১৯৯৬ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে রিভার প্লেটের মূল দলের হয়ে আর্জেন্টিনার প্রথম বিভাগে তার অভিষেক ঘটে।

১৯৯৭ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত রিভার প্লেটের মাঝমাঠের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন আইমার। ক্লাবের হয়ে তিনি ৮২ ম্যাচে ২১টি গোল করেন এবং মোট ৫টি লিগ শিরোপা জিতেন। তৎকালীন সময়ে হ্যাভিয়ের সাভিওলা, হুয়ান রোমান রিকুয়েলমে এবং পাবলো আইমার এই তরুণ ত্রয়ী আর্জেন্টাইন ফুটবলকে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন রূপ দিয়েছিলেন।
২০০১ সালের জানুয়ারি মাসে তৎকালীন রেকর্ড ২৪ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে স্প্যানিশ ক্লাব ভ্যালেন্সিয়াতে যোগ দেন পাবলো আইমার। স্পেনে পা রেখেই তিনি তার জাদুকরী পারফরম্যান্স দেখাতে শুরু করেন। ম্যানেজার হেক্টর কুপারের অধীনে তিনি দ্রুতই দলের প্রধান ‘প্লে-মেকার’ বা নাম্বার টেন পজিশনটি নিজের করে নেন।
ভ্যালেন্সিয়াতে যোগ দেওয়ার প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই আইমার ক্লাবটিকে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে নিয়ে যান। যদিও ২০০১ সালের সেই ফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখের কাছে টাইব্রেকারে হেরে রানার্স-আপ হতে হয় ভ্যালেন্সিয়াকে।
তবে আসল রূপকথা তৈরি হয় ম্যানেজার রাফায়েল বেনিতেজের অধীনে। আইমারের সৃজনশীল ফুটবল বুদ্ধির ওপর ভর করে ভ্যালেন্সিয়া দীর্ঘ ৩১ বছর পর ২০০১-০২ মৌসুমে লা লিগা চ্যাম্পিয়ন হয়। এরপর ২০০৩-০৪ মৌসুমে তারা মেসতালোয়া স্টেডিয়ামে আবারও লা লিগা জয় করে এবং একই সাথে মার্সেইকে হারিয়ে উয়েফা কাপ ও পোর্তোকে হারিয়ে উয়েফা সুপার কাপ ঘরে তোলে।

২০০৬ সালে রাফা বেনিতেজ ভ্যালেন্সিয়া ছাড়ার পর এবং ক্লাবের নতুন ম্যানেজমেন্টের সাথে কিছু দূরত্বের কারণে আইমার আরেক স্প্যানিশ ক্লাব রিয়াল সারাগোসাতে যোগ দেন। সারাগোসাতে প্রথম মৌসুমে ভালো খেললেও দ্বিতীয় মৌসুমে ক্লাবটি রেলিগেশনের শিকার হয়। এরপর থেকেই মূলত আইমারের ক্যারিয়ারে ইনজুরির কালো ছায়া স্থায়ীভাবে আসন গেড়ে বসে।
২০০৮ সালে ৭.৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে পর্তুগিজ জায়ান্ট বেনফিকাতে যোগ দেন আইমার। পর্তুগালে গিয়ে তিনি তার হারিয়ে যাওয়া ফর্ম কিছুটা ফিরে পান। সেখানে তার পুরনো বন্ধু হ্যাভিয়ের সাভিওলার সাথে আবার জুটি বাঁধেন। বেনফিকার হয়ে তিনি ৫টি সফল মৌসুম কাটান, যেখানে তিনি একটি প্রাইমেরা লিগা শিরোপা এবং চারটি পর্তুগিজ লিগ কাপ জিতেন। বেনফিকার সমর্থকরা আজও আইমারকে তাদের ক্লাবের ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিদেশি খেলোয়াড় হিসেবে সম্মান করে।
আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সিতে পাবলো আইমারের ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল দারুণভাবে। ১৯৯৭ সালে আর্জেন্টিনার অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে তিনি ফিফা যুব বিশ্বকাপ জিতেন। সিনিয়র দলের হয়ে তার অভিষেক হয় ১৯৯৯ সালে।

জাতীয় দলের হয়ে আইমার ২০০২ এবং ২০০৬ সালের দুটি ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নেন। ২০০২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। তবে ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে জোসে পেকারম্যানের অধীনে আর্জেন্টিনা দলে হুয়ান রোমান রিকুয়েলমে এবং পাবলো আইমার দুজন বিশ্বসেরা প্লে-মেকার ছিলেন। চোটের কারণে আইমার সেই বিশ্বকাপে বেশিরভাগ ম্যাচেই বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামতেন। আর্জেন্টিনার জার্সিতে তিনি মোট ৫২টি ম্যাচ খেলে ৮টি গোল করেছেন এবং ২০০৫ কনফেডারেশন্স কাপ ও ২০০৭ কোপা আমেরিকার ফাইনালে রানার্স-আপ মেডেল পেয়েছেন।
ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় লিওনেল মেসিকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, কার খেলা দেখে তিনি বড় হয়েছেন বা কার মতো হতে চেয়েছেন? মেসি সবসময় একটি নামই নেন পাবলো আইমার।

মেসি যখন বার্সেলোনার যুব দলে খেলতেন, তখন তিনি আইমারের খেলার স্টাইল নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। ২০০৪ সালে এক ম্যাচে বার্সেলোনার বিপক্ষে ভ্যালেন্সিয়ার হয়ে খেলেছিলেন আইমার। ম্যাচ শেষে ১৭ বছর বয়সী মেসি লাজুক পায়ে আইমারের কাছে গিয়ে তার জার্সিটি চেয়েছিলেন। আইমার সানন্দে নিজের জার্সি মেসিকে উপহার দেন। মেসি পরবর্তীতে বহু সাক্ষাৎকারে বলেছেন:
“ফুটবলে আমার একমাত্র হিরো পাবলো আইমার। উনি যখন মাঠে বল নিয়ে দৌড়াতেন, আমার মনে হতো উনি ভাসছেন। ওনার খেলা দেখাটা ছিল এক জাদুকরী অনুভূতি।”
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে পাবলো আইমার যখন আর্জেন্টিনার সহকারী কোচ হিসেবে ডাগআউটে ছিলেন, তখন মেসি গোল করার পর আইমারের আবেগঘন কান্নার দৃশ্য পুরো ফুটবল বিশ্বকে কাঁদিয়েছিল। প্রিয় শিষ্যের হাত ধরে নিজের অধরা বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন এই গুরু।

২০১৩ সালে বেনফিকা ছাড়ার পর আইমার মালয়েশিয়ান ক্লাব জোহর দারুল তা’জিম-এ যোগ দেন। কিন্তু ইনজুরি তার পিছু ছাড়েনি। ২০১৫ সালে তিনি নিজের শৈশবের ক্লাব রিভার প্লেটে ফিরে আসেন এবং ঘরের মাঠে সমর্থকদের সামনে বিদায়ী ম্যাচ খেলার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু ডান পায়ের গোড়ালির তীব্র চোটের কারণে তিনি মাত্র ১টি ম্যাচ খেলে ২০১৫ সালের জুলাই মাসে পেশাদার ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। ২০১৮ সালে তিনি তার শৈশবের স্থানীয় ক্লাব এস্তুদিয়ান্তেস ডি রিও কুয়ার্তোর হয়ে একটি অফিশিয়াল কাপ ম্যাচে শেষবারের মতো মাঠে নেমেছিলেন, যেখানে তার ভাই আন্দ্রেস আইমারও একসাথে খেলেছিলেন।
পাবলো আইমারের ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে হয়তো ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো বা লিওনেল মেসির মতো পাহাড়সম পরিসংখ্যান কিংবা শত শত গোল দেখা যাবে না। কিন্তু ফুটবল কেবল সংখ্যা বা পরিসংখ্যানের খেলা নয়। ফুটবল হলো আবেগের, শিল্পের।
পাবলো আইমার ছিলেন সেই শিল্পের নিখুঁত কারিগর। ইনজুরি যদি তার ক্যারিয়ারের ডানা দুটি বারবার ভেঙে না দিত, তবে হয়তো ইতিহাসের সেরা মিডফিল্ডারদের তালিকায় তিনি আরও ওপরে থাকতেন। কিন্তু তাতে ফুটবল প্রেমীদের বিন্দুমাত্র আক্ষেপ নেই। কারণ, যিনি সর্বকালের সেরা লিওনেল মেসির ফুটবল জীবনের অনুপ্রেরণা হতে পারেন, তার শ্রেষ্ঠত্ব পরিমাপ করার জন্য কোনো ব্যালন ডি’অর বা গোল্ডেন বুটের প্রয়োজন পড়ে না। পাবলো আইমার চিরকাল ফুটবলের এক রোমান্টিক রাজপুত্র এবং মাঠের চিরসবুজ জাদুকর হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
পাবলো আইমারকে নিয়ে বেশ কিছু দারুণ তথ্য
লিওনেল মেসির একমাত্র ফুটবল “হিরো”
লিওনেল মেসির কোনো ফুটবল আইডল বা হিরো নেই, কেবল একজন বাদে তিনি পাবলো আইমার। ২০০৪ সালে এক ম্যাচ শেষে বার্সেলোনার তরুণ মেসি লাজুক মুখে ভ্যালেন্সিয়ার আইমারের কাছে গিয়ে তার জার্সিটি চেয়েছিলেন, যা মেসির জীবনের অন্যতম সেরা স্মৃতি।
ডাকনাম
মাঠে বল পায়ে আইমারের উপস্থিতি মানেই ছিল নিখাদ আনন্দ আর বিনোদন। তার গতির পরিবর্তন, কোঁকড়ানো চুল আর জাদুকরী পাসিংয়ের স্টাইলের কারণে তাকে ডাকা হতো “El Payaso” যার অর্থ জোকার বা ক্লাউন। তবে এই নাম ব্যঙ্গ করে নয়, বরং মাঠে তার খেলা দিয়ে দর্শকদের মুখে হাসি ফোটানোর সহজাত ক্ষমতার জন্য ভালোবেসে দেওয়া হয়েছিল।
ম্যারাডোনার টিকিট কাটার একমাত্র কারণ!
স্বয়ং ফুটবল ঈশ্বর দিয়েগো ম্যারাডোনা ছিলেন পাবলো আইমারের খেলার অন্ধ ভক্ত। আইমারের খেলা দেখে মুগ্ধ হয়ে ম্যারাডোনা একবার বলেছিলেন—
“আর্জেন্টিনায় এই মুহূর্তে পাবলো আইমারই একমাত্র ফুটবলার, যার মাঠের খেলা লাইভ দেখার জন্য আমি নিজের পকেটের টাকা খরচ করে স্টেডিয়ামের টিকিট কাটতে রাজি আছি।”
ফুটবলার না হলে হতেন ডাক্তার!
আইমারের পরিবারে পড়াশোনার বেশ কড়া চল ছিল। নিজেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতি দারুণ আকর্ষিত ছিলেন। ফুটবলার হিসেবে পুরোপুরি ক্যারিয়ার গড়ার আগে তিনি সিরিয়াসলি মেডিসিন বা ডাক্তারি পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন!
মেসির গোল এবং আইমারের কান্না
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে পাবলো আইমার ছিলেন আর্জেন্টিনা দলের প্রধান সহকারী কোচ। গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে মেক্সিকোর বিপক্ষে প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা যখন গোল না পেয়ে তীব্র চাপে ভুগছিল, তখন দ্বিতীয়ার্ধে মেসির এক জাদুকরী গোলে লিড নেয় দল। সেই মুহূর্তে ডাগআউটে বসা পাবলো আইমারের তীব্র মানসিক চাপ ও আবেগে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ার দৃশ্যটি কাতার বিশ্বকাপের অন্যতম আইকনিক মুহূর্ত হয়ে আছে।
Reference:xa0

