Image default
এশিয়াজাপানপর্যটন আকর্ষণ

টোকিও উপসাগরের রানি ইয়ামাশিতা পার্ক!

একটা শহর ভূমিকম্পে ছারখার হয়ে যাওয়ার পর সেই ধ্বংসস্তূপের ওপরই জাপানিরা রোমান্টিক ডেটিং স্পট আর গোলাপ বাগান বানিয়ে ফেলে, সেটাই হলো ইয়ামাশিতা পার্ক!xa0

জাপানের কানাগাওয়া প্রিফেকচারের কানামাতো ও ইয়োকোহামা শহরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো ইয়ামাশিতা পার্ক। প্রায় ৭৫০ মিটার দীর্ঘ এবং ৭০,০০০ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই পার্কটি কেবল একটি সাধারণ বিনোদন কেন্দ্র নয়, এটি জাপানের পুনর্জন্ম, ইতিহাস এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব প্রতীক।xa0

টোকিও উপসাগরের রানি ইয়ামাশিতা পার্ক – Image Source: static.gltjp.com

ইয়ামাশিতা পার্কের পেছনের ইতিহাসটি বেশ আবেগঘন এবং অনুপ্রেরণাদায়ক। ১৯২৩ সালের ১লা সেপ্টেম্বর জাপানের কান্তো অঞ্চলে একটি ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানে, যা ‘গ্রেট কান্তো আর্থকুয়েক’ নামে পরিচিত। এই ভূমিকম্প এবং এর ফলে সৃষ্ট আগুনে ইয়োকোহামা শহরের একটি বড় অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

শহরের সেই কোটি কোটি টন ধ্বংসাবশেষ, পোড়া ইট ও পাথর কোথায় ফেলা হবে তা নিয়ে কর্তৃপক্ষ চিন্তায় পড়ে। পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, এই ধ্বংসাবশেষগুলো দিয়ে সমুদ্রের উপকূলবর্তী একটি অংশ ভরাট করা হবে। দীর্ঘ চার বছর ধরে সমুদ্রের বুক ভরাট করার পর, ১৯২৭ সালে সেখানে পার্ক তৈরির কাজ শুরু হয় এবং ১৯৩০ সালের মার্চ মাসে এটি সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, যে ধ্বংসস্তূপ একদিন পুরো শহরকে কাঁদিয়েছিল, আজ তা-ই জাপানের অন্যতম সুন্দর এক উদ্যানে রূপান্তরিত হয়েছে।xa0

পার্কের ভেতর হেঁটে বেড়ানোর সময় বেশ কিছু ঐতিহাসিক এবং আকর্ষণীয় নিদর্শন চোখে পড়ে, যা পার্কটির সৌন্দর্য ও গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পার্কের ঘাটে স্থায়ীভাবে নোঙর করে রাখা একটি বিশাল এবং রাজকীয় জাহাজ হলো ‘হিকাওয়া মারু’।

রানি ইয়ামাশিতা পার্ক – Image Source: tripadvisor.com

১৯৩০ সালে নির্মিত এই জাপানি যাত্রীবাহী জাহাজটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হাসপাতাল জাহাজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। জাহাজটি তার বিলাসবহুল ইন্টেরিয়রের জন্য বিখ্যাত ছিল, এমনকি চার্লি চ্যাপলিনও একবার এই জাহাজে ভ্রমণ করেছিলেন। ১৯৬১ সাল থেকে এটিকে একটি ভাসমান মিউজিয়াম হিসেবে পার্কের পাশে রাখা হয়েছে।xa0

পার্কের ঠিক পাশেই আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইয়োকোহামা মেরিন টাওয়ার। ১০৬ মিটার উঁচু এই টাওয়ারটি ১৯৬১ সালে তৈরি করা হয়েছিল। এর ওপরের অবজারভেটরি ডেক থেকে পুরো ইয়ামাশিতা পার্ক, ইয়োকোহামা বন্দর এবং পরিষ্কার আবহাওয়ায় দূরের মাউন্ট ফুজি পর্যন্ত দেখা যায়। রাতের বেলা যখন এই টাওয়ারটি রঙিন আলোয় সেজে ওঠে, তখন পার্ক থেকে এর দৃশ্য রূপকথার মতো দেখায়।

ইয়োকোহামা মেরিন টাওয়ার – Image Source: onb-cdn.b-cdn.net

ইয়ামাশিতা পার্কের আন্তর্জাতিক বন্ধুত্বের বেশ কিছু চমৎকার স্মারক রয়েছে। দ্য গার্ডিয়ান অব ওয়াটার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়েগো শহরের পক্ষ থেকে ইয়োকোহামাকে উপহার দেওয়া একটি সুন্দর ফোয়ারা ও ভাস্কর্য। এছাড়াও জাপানের একটি বিখ্যাত নার্সারি রাইমের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এক ছোট্ট মেয়ের ব্রোঞ্জ মূর্তি, যা পর্যটকদের ভীষণ টানে।

পার্কের ঠিক মাঝখানের অংশটি একটি বিশাল গোলাপ বাগান বা ‘রোজ গার্ডেন’ দিয়ে সাজানো। বসন্ত ও শরৎকালে এখানে শত শত প্রজাতির রঙিন গোলাপ ফোটে। সমুদ্রের নোনা বাতাস আর গোলাপের সুবাস মিলে পার্কের পরিবেশকে এক জাদুকরী রূপ দেয়।

ইয়ামাশিতা পার্ক – Image Source: yokohamajapan.com

ইয়ামাশিতা পার্ক বছরের যেকোনো সময়ই ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত, তবে বসন্তকাল (মার্চ থেকে মে) এবং শরৎকাল (সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর) এখানে আসার সেরা সময়। বসন্তে পার্কের চারপাশ ফুলে ফুলে ভরে ওঠে, আর শরতে আবহাওয়া থাকে ভীষণ মনোরম। পার্কে প্রবেশের জন্য কোনো টিকিটের প্রয়োজন নেই, এটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত তবে হিকাওয়া মারু জাহাজ ও মেরিন টাওয়ারের ভেতরে ঢোকার জন্য আলাদা এন্ট্রি ফি দিতে হয়।

টোকিও থেকে ট্রেনে করে খুব সহজেই এখানে আসা যায়। মিনাতোমিরাই লাইনের ‘মটমাচি-চুকানাই’ স্টেশন থেকে পায়ে হেঁটে মাত্র ৩ মিনিটে এই পার্কে পৌঁছানো সম্ভব।

Reference:

Related posts

আইফেল টাওয়ার: প্যারিসের গর্ব ও সৌন্দর্যের প্রতীক

আশা রহমান

কান্দাহারের ঐতিহাসিক গর্ব আহমদ শাহ দুররানির সমাধি

সহী হাবীব

কুয়েতের ‘ফাইলাকা দ্বীপ’: যেখানে কোনো মানুষ থাকে না

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More