মাঠে নামলে ওনাকে দেখে মনে হয় ফুটবল খেলতে নামেননি, হাইওয়েতে বুলডোজার চালাচ্ছেন! ৬ ফুট ২ ইঞ্চির এই দানব যখন বল পায়ে দৌড় শুরু করেন, প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা বল কেড়ে নেওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে আগে নিজেদের জীবন বাঁচাতে সাইড কেটে চলে যান। আমরা কথা বলছি অ্যাস্টন ভিলার ‘নতুন ত্রাস’ মরগান রজার্সকে নিয়ে। ম্যানচেস্টার সিটির রিজেক্টেড মাল থেকে আজ প্রিমিয়ার লিগের সবচেয়ে ডিমান্ডিং আইটেম হয়ে ওঠার গল্পটা আসলেই মারাত্মক!
মরগান রজার্স- এর ব্যক্তিগত তথ্য:
|
নাম |
মরগান এলিয়ট রজার্স |
|
জন্ম |
২৬ জুলাই ২০০২ (বয়স ২৩) |
|
জন্মস্থান |
হেলসোয়েন , ইংল্যান্ড |
|
উচ্চতা |
৬ ফুট ২ ইঞ্চি (১.৮৭ মিটার) |
|
পজিশন |
এট্যাকিং মিডফিল্ডার / উইঙ্গার |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
ওয়েস্ট ব্রোমউইচ অ্যালবিয়ন, ম্যানচেস্টার সিটি, লিংকন সিটি, বোর্নমাউথ, ব্ল্যাকপুল, মিডলসব্রো এবং বর্তমানে অ্যাস্টন ভিলা ক্লাবের হয়ে খেলছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০২৪– ইংল্যান্ড |

২০০২ সালের ২৬শে জুলাই ইংল্যান্ডের হ্যালিসোয়েনে জন্মগ্রহণ করেন মরগান রজার্স । ছোটবেলা থেকেই তাঁর শারীরিক গঠন এবং ফুটবল প্রতিভা সমবয়সীদের চেয়ে আলাদা ছিল। মাত্র ৯ বছর বয়সে তিনি ওয়েস্ট ব্রমউইচ অ্যালবিয়নের বিখ্যাত একাডেমিতে যোগ দেন। একাডেমিতে তাঁর চোখধাঁধানো পারফরম্যান্সের কারণে ২০১৯ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে ইংলিশ জায়ান্ট ম্যানচেস্টার সিটি তাঁকে দলে নেওয়ার জন্য বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করে।

পেপ গার্দিওলার সিটিতে দলে জায়গা পাওয়া যেকোনো তরুণের জন্যই প্রায় অসম্ভব। রজার্সকেও তাই নিজের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য বিভিন্ন ক্লাবে ধারে খেলতে পাঠানো হয়। তিনি লিনকন সিটি, বোর্নমাউথ এবং ব্ল্যাকপুলের হয়ে খেলেন। এই ধারের দিনগুলো তাঁর জন্য সহজ ছিল না, কিন্তু ইএফএল-এর লোয়ার লিগগুলোর শারীরিক ফুটবল রজার্সকে মানসিকভাবে আরও শক্ত করে তোলে, যা পরবর্তীতে প্রিমিয়ার লিগে তাঁর দারুণ কাজে লেগেছে।
২০২৩ সালের গ্রীষ্মে মরগান রজার্স স্থায়ীভাবে যোগ দেন চ্যাম্পিয়নশিপের ক্লাব মিডলসব্রায়। সেখানে মাইকেল ক্যারিকের অধীনে মাত্র ছয় মাসেই তিনি নিজের প্রতিভার পুরোটা মেলে ধরেন। বিশেষ করে কারাবাও কাপে তাঁর পারফরম্যান্স সবার নজর কাড়ে।

২০২৪ সালের জানুয়ারি ট্রান্সফার উইন্ডোতে অ্যাস্টন ভিলার স্প্যানিশ ম্যানেজার উনাই ইমেরি রজার্সের ভেতরের সুপ্ত ক্ষমতাটি দেখতে পান। প্রায় ১৫ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে রজার্সকে ভিলা পার্কে নিয়ে আসেন তিনি। ইমেরি তাঁকে উইং ছেড়ে মাঠের মাঝখান দিয়ে আক্রমণ করার দায়িত্ব দেন। এই একটি ট্যাকটিক্যাল পরিবর্তন রজার্সের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ২০২৪-২৫ এবং বর্তমান ২০২৫-২৬ মৌসুমে রজার্স হয়ে ওঠেন উনাই ইমেরির রণকৌশলের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সেনা।
অ্যাস্টন ভিলার উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মঞ্চে প্রত্যাবর্তন এবং ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলোকে স্তব্ধ করে দেওয়ার পেছনে মরগান রজার্সের অবদান আকাশচুম্বী। ২০২৪-২৫ মৌসুমে বায়ার্ন মিউনিখ, জুভেন্টাস কিংবা আর্সেনালের মতো বিশ্বসেরা ডিফেন্সের বিপক্ষে রজার্স যেভাবে মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে একাই প্রতিপক্ষের বক্স চিরে দিয়েছেন, তা দেখে ফুটবল বিশেষজ্ঞরা স্তব্ধ হয়ে যান।

ইংল্যান্ডের হয়ে বয়সভিত্তিক অনূর্ধ্ব-১৫ থেকে শুরু করে অনূর্ধ্ব-২১ পর্যন্ত প্রতিটি দলেই খেলেছেন রজার্স। তবে ২০২৪ সালের শেষের দিকে ইংল্যান্ডের জাতীয় দলে তাঁর প্রথম অভিষেক ঘটে। বর্তমান ইংল্যান্ড কোচ থমাস টুখেল দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই রজার্সকে থ্রি-লায়ন্সদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ করে নেন।
চলমান ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে জুড বেলিংহ্যাম, কোল পালমার এবং ফিল ফোডেনের মতো বিশ্বমানের তারকাদের পাশে মরগান রজার্স ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগের অন্যতম প্রধান অস্ত্র। টুখেলের সিস্টেমে তিনি প্রতিপক্ষের ক্লান্ত ডিফেন্সকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করার জন্য পারফেক্ট ‘ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

মাঠে মরগান রজার্স যতটা বিধ্বংসী আর মারদাঙ্গা, মাঠের বাইরে কিন্তু তিনি ঠিক ততটাই শান্ত। রজার্সের ফুটবলার হয়ে ওঠার পেছনে তাঁর মধ্যবিত্ত পরিবারের অবদান এবং ত্যাগ অনস্বীকার্য। ম্যানচেস্টার সিটিতে থাকার সময় যখন তিনি মূল দলে সুযোগ না পেয়ে একের পর এক ক্লাবে ধারে ঘুরছিলেন, তখন রজার্স মানসিকভাবে কিছুটা ভেঙে পড়েছিলেন। সেই কঠিন দিনগুলোতে তাঁর পরিবারই তাকে পরম আদরে আগলে রেখেছিলেন।।
ফুটবল পাড়ার তরুণ তারকাদের নিয়ে যেখানে প্রতিদিন নিত্যনতুন প্রেমের গুঞ্জন ও গসিপ ডালপালা মেলে, সেখানে রজার্স একেবারেই ব্যতিক্রম। তাই ভিলা পার্কের সমর্থকেরা মজা করে বলেন, মরগান রজার্স মাঠের ভেতর ডিফেন্ডারদের সাথে যেভাবে ‘রুড’ আচরণ করেন, মাঠের বাইরে প্রেমের পিচে তিনি নাকি ঠিক ততটাই লাজুক ও সোজা-সাপ্টা ছেলে!
Reference:

