Image default
ক্রীড়াবিদজীবনীফুটবল

আলবার্তো আকোস্তা: আর্জেন্টিনার নীরব হিরোর গল্প

আলবার্তো আকোস্তা ভাই তো ২০০৩ সালে বুট জোড়া তুলে রেখে xa0আরামসে এসি রুমে কোচিং করা শুরু করলেন, কিন্তু ২০০৭ সালে ‘আতলেতিকো ফেনিক্স’-এর ডাগআউটে বসে ছেলেদের খেলা দেখে তার ভেতরের গোলমেশিন এমন খিলখিলিয়ে উঠল যে “ধুর তোদের কোচিং!” বলে কোচের স্যুট প্যান্ট খুলে হাফপ্যান্ট পরে নিজেই মাঠে নেমে গেলেন!xa0

আলবার্তো আকোস্তা আর্জেন্টাইন ফুটবলের ইতিহাসের এক ক্ষুরধার এবং লড়াকু গোলমেশিন। নব্বইয়ের দশকে ডি-বক্সের ভেতর প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের জন্য তিনি ছিলেন এক মূর্তিমান আতঙ্ক। ভক্তদের কাছে “এল বেতো” নামে পরিচিত এই স্ট্রাইকার সান লোরেনজো, ইউনিভার্সিদাদ কাতোলিকা এবং স্পোর্টিং লিসবনের হয়ে ক্যারিয়ারের সোনালী সময় কাটিয়েছেন। ১৯৯৩ সালের কোপা আমেরিকা জয়ী আর্জেন্টিনা দলের এই তারকা ফুটবলারকে ল্যাটিন আমেরিকার ক্লাব ফুটবলের অন্যতম সেরা ‘নাম্বার নাইন’ হিসেবে গণ্য করা হয়।xa0

আলবার্তো আকোস্তার- এর ব্যক্তিগত তথ্য:

নামxa0

আলবার্তো ফেদেরিকো আকোস্তা তাবিজি

ডাকনাম

এল বেতো

জন্ম xa0

২৩ আগস্ট ১৯৬৬ (বয়স ৫৯)

জন্মস্থানxa0

আরোসেনা, আর্জেন্টিনা

উচ্চতাxa0

১.৮৬ মিটার (৬ ফুট ১ ইঞ্চি)

পজিশনxa0

গোলরক্ষক

ক্লাব ক্যারিয়ার

ইউনিয়ন সান্তা ফে,সান লরেঞ্জো,টুলুজ,সান লরেঞ্জো,বোকা জুনিয়র্স,ইউনিভার্সিদাদ কাতোলিকা,ইয়োকোহামা মারিনোস,ইউনিভার্সিদাদ কাতোলিকা,সান লরেঞ্জো,স্পোর্টিং সিপি,সান লরেঞ্জো ও ফিনিক্স এর হয়ে খেলেছেন।xa0

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

১৯৯২–১৯৯৫ আর্জেন্টিনা

আলবার্তো আকোস্তা
আলবার্তো আকোস্তা- Image Source: prensafutbol.cl

১৯৬৬ সালের ২৩ আগস্ট আর্জেন্টিনার সান্তা ফে প্রদেশের অ্যারোযো সেকো শহরে জন্মগ্রহণ করেন আলবার্তো আকোস্তা। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি তীব্র ঝোঁক থাকা আকোস্তা স্ট্রাইকার পজিশনকেই নিজের আপন করে নেন।xa0

১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনার ক্লাব ইউনিয়ন দে সান্তা ফে-এর হয়ে তার পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু হয়। তরুণ আকোস্তা প্রথম মৌসুম থেকেই তার শারীরিক শক্তি, বাতাসে ভাসানো বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং ডি-বক্সের ভেতর চিতা বাঘের মতো ক্ষিপ্রতার প্রমাণ দিতে শুরু করেন। ইউনিয়ন দে সান্তা ফে-র হয়ে দুই বছরে ৭১ ম্যাচে ৩৪ গোল করে তিনি জানান দেন, আর্জেন্টিনার ফুটবল এক নতুন ‘নাম্বার নাইন’ পেতে যাচ্ছে।

১৯৮৮ সালে আর্জেন্টিনার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এবং বড় ক্লাব সান লোরেনজো আকোস্তাকে দলে টানে। সান লোরেনজোতে যোগ দিয়েই তিনি ক্লাবের সমর্থকদের চোখের মণি হয়ে ওঠেন। তার অসাধারণ গোল করার ক্ষমতা এবং মাঠের লড়াকু মানসিকতার কারণে ভক্তরা তাকে ভালোবেসে “এল বেতো” নামে ডাকতে শুরু করে।

আলবার্তো আকোস্তা
১৯৮৮ সালে আর্জেন্টিনার ক্লাব সান লোরেনজো আকোস্তাকে দলে টানে- Image Source: vavel.com

সান লোরেনজোতে আকোস্তা চার দফায় খেলেছেন। যখনই ক্লাব সংকটে পড়েছে কিংবা ভালো একজন স্ট্রাইকারের অভাব বোধ করেছে, আকোস্তা ফিরে এসেছেন। ক্লাবটির হয়ে তিনি আক্ষরিক অর্থেই গোলবন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৯২ সালের আপারতুরা লিগে তিনি সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। পরবর্তীতে ২০০১ সালে সান লোরেনজোকে লাতিন আমেরিকার মর্যাদাপূর্ণ ট্রফি কোপা মারকোসুর এবং ২০০২ সালে কোপা সুডামেরিকানা জেতাতে তিনি প্রধান ভূমিকা পালন করেন। সান লোরেনজোর ইতিহাসে তিনি অন্যতম শীর্ষ গোলদাতা হিসেবে নিজের নাম অমর করে রেখেছেন।

আলবার্তো আকোস্তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা এবং স্বর্ণযুগ কেটেছে চিলির বিখ্যাত ক্লাব ইউনিভার্সিদাদ কাতোলিকাতে। ১৯৯৪ সালে তিনি যখন এই ক্লাবে যোগ দেন, তখন তার সাথে ছিলেন আরেক আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার এবং তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু নেস্টর গরসিতো । এই আকোস্তা-গরসিতো জুঁটি চিলির ফুটবল ইতিহাসে অন্যতম সেরা ও ভয়ংকর আক্রমণাত্মক জুটি হিসেবে পরিচিত।xa0

আলবার্তো আকোস্তা
ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা এবং স্বর্ণযুগ ক্লাব ইউনিভার্সিদাদ কাতোলিকাতে- Image Source: redgol.cl

দক্ষিণ আমেরিকায় নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার পর আকোস্তা ইউরোপের ফুটবলের স্বাদ নিতে পাড়ি জমান ফ্রান্সে। ১৯৯০-৯১ মৌসুমে তিনি ফরাসি ক্লাব তুলুজ-এ যোগ দেন। সেখানে এক মৌসুমে ৩১ ম্যাচে ৭টি গোল করেন। ইউরোপের ফুটবল শৈলীর সাথে মানিয়ে নিলেও ল্যাটিন আমেরিকার ফুটবলের টান তিনি এড়াতে পারেননি, ফলে দ্রুতই আবার সান লোরেনজোতে ফিরে আসেন।

পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে তিনি এশিয়ার ফুটবলেও নিজের ছাপ রেখে যান। জাপানের জে-লিগের ক্লাব ইয়োকোহামা মারিনোস-এর হয়ে এক মৌসুম খেলেন তিনি। জাপানে ২১ ম্যাচে ২০ গোল করে তিনি প্রমাণ করেন যে, ভৌগোলিক অবস্থান বদলালেও তার গোলের ক্ষুধা বিন্দুমাত্র কমেনি।

আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে আলবার্তো আকোস্তা ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত খেলেছেন। সে সময় আর্জেন্টিনা দলে গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার মতো বিশ্বসেরা স্ট্রাইকার থাকায় আকোস্তাকে অনেক ম্যাচেই বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামতে হতো। তা সত্ত্বেও দেশের হয়ে ১৯টি ম্যাচে অংশ নিয়ে তিনি ৫টি গুরুত্বপূর্ণ গোল করেন।

আলবার্তো আকোস্তা
১৯৯৩ সালের কোপা আমেরিকা জয়ী- Image Source: dobleamarilla.com.ar

আকোস্তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল আর্জেন্টিনার হয়ে ১৯৯৩ সালের কোপা আমেরিকা জয়। ইকুয়েডরে অনুষ্ঠিত সেই টুর্নামেন্টে আলফিও বাসিলের কোচিংয়ে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হয়। ফাইনালে মেক্সিকোর বিপক্ষে এবং পুরো টুর্নামেন্টে বাতিস্তুতার সাথে ব্যাকআপ স্ট্রাইকার হিসেবে আকোস্তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য। এর আগে ১৯৯২ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে তিনি ফিফা কনফেডারেশন্স কাপও জিতেছিলেন।

২০০১ সালে ৩৫ বছর বয়সে আকোস্তা তার প্রিয় ক্লাব সান লোরেনজোতে চতুর্থবারের মতো ফিরে আসেন। অনেকে ভেবেছিলেন এই বয়সে তিনি হয়তো কেবলই সাইডবেঞ্চ গরম করবেন। কিন্তু “এল বেতো” সবাইকে চমকে দিয়ে সান লোরেনজোর হয়ে গোল করা চালিয়ে যান। এই দফায় তিনি ক্লাবকে কোপা সুডামেরিকানা জেতান এবং ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ পর্যন্ত গোল খরা কী জিনিস তা বুঝতে দেননি।

আলবার্তো আকোস্তা
প্রিয় ক্লাব সান লোরেনজোতে চতুর্থবারের মতো ফিরে আসেন- Image Source: 442.perfil.com

২০০৩ সালে ৩৭ বছর বয়সে সান লোরেনজোর জার্সিতেই তিনি পেশাদার ফুটবলকে বিদায় জানান। বিদায়বেলায় তার পেশাদার ক্যারিয়ারের মোট গোল সংখ্যা ছিল ৩০০-এর ওপর, যা একজন স্ট্রাইকারের জন্য অত্যন্ত গৌরবজনক।

ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার পর আকোস্তা ফুটবলের সাথেই জড়িয়ে থাকেন। তিনি বিভিন্ন সময় ফুটবল বিশ্লেষক ও ধারাভাষ্যকার হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়া সান লোরেনজো এবং ইউনিভার্সিদাদ কাতোলিকার বিভিন্ন ক্লাব কার্যক্রমে এবং যুব উন্নয়ন প্রকল্পে তিনি এখনো একজন সম্মানিত দূত হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। ভক্তদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা আজো এতটুকু কমেনি।

আলবার্তো আকোস্তা সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্যxa0

১. ফুটবলাররা সাধারণত এক বা দুইবার পুরনো ক্লাবে ফিরে আসেন। কিন্তু আকোস্তার সাথে আর্জেন্টিনার বিখ্যাত ক্লাব সান লোরেনজো-এর ভালোবাসা ছিল এতটাই গভীর যে, তিনি তার ক্যারিয়ারে মোট চারটি আলাদা মেয়াদে এই ক্লাবে খেলেছেন। বিদায়টাও নিয়েছেন এই ক্লাবের জার্সি গায়েই।

২. ইউরোপের ফুটবলে পর্তুগালের জায়ান্ট ক্লাব স্পোর্টিং লিসবন যখন দীর্ঘ ১৮ বছর কোনো লিগ শিরোপা জিততে পারছিল না, তখন ১৯৯৯-২০০০ মৌসুমে ৩৩ বছর বয়সী আকোস্তা তাদের ত্রাণকর্তা হয়ে আসেন। সেই মৌসুমে তিনি একাই ২২টি গোল করে স্পোর্টিং লিসবনকে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত লিগ শিরোপা এনে দেন এবং ক্লাবের ‘কাল্ট হিরো’ বনে যান।

৩. ১৯৯৩ সালের কোপা আমেরিকায় আর্জেন্টিনা যখন চ্যাম্পিয়ন হয়, তখন মূল স্ট্রাইকার গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার ছায়ায় ঢাকা ছিলেন আকোস্তা। তবে টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনাল এবং সেমিফাইনাল দুটি ম্যাচই টাইব্রেকারে গড়িয়েছিল। দুই ম্যাচেই অত্যন্ত চাপের মুখে দাঁড়িয়ে আকোস্তা নিখুঁত পেনাল্টি শুট করে আর্জেন্টিনার ফাইনালে ওঠার পথ সুগম করেছিলেন।xa0

৪. ২০০৩ সালে অবসরের পর তিনি কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করেন। তবে ২০০৭ সালে আর্জেন্টিনার ফোর্থ ডিভিশনের ক্লাব ‘আতলেতিকো ফেনিক্স’-এর কোচিং স্টাফে যোগ দেওয়ার পর ফুটবলের প্রতি টান সামলাতে না পেরে কয়েক মাসের জন্য অবসর ভেঙে আবার খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন এবং ম্যাচ খেলেছিলেন!

Reference:

Related posts

মুসলিম ঐক্যের দিশারি সাইয়্যেদ জামাল উদ্দিন আফগানি

মাইক ম্যাগনান: ফুটবলের ‘ম্যাজিক মাইক’-এর উত্থানের গল্প

admin

আলিসন বেকার: ড্রেসিংরুমের রকস্টার, মাঠের সুপারহিরো

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More