৩০০ জন স্ট্রাইকারের জ্যাম দেখে কাসেমিরো ভাবলেন “ভাইরে ভাই, লাইনে খাড়ায়ে গোল দেওয়ার চেয়ে ফাঁকা লাইনে খাড়ায়ে গোল আটকানোই বুদ্ধিমানের কাজ!
কাসেমিরো নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ফুটবল মাঠের এক ছায়া অধিনায়কের ছবি, যিনি নিভৃতে প্রতিপক্ষের সব আক্রমণ ধ্বংস করতে ওস্তাদ। ৫টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ী এই ব্রাজিলিয়ান তারকা যেকোনো কোচের জন্যই মাঝমাঠের সবচেয়ে বিশ্বস্ত দাবার ঘুঁটি। শৈশবের এক চমৎকার তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত কীভাবে তাকে স্ট্রাইকার থেকে বিশ্বসেরা হোল্ডিং মিডফিল্ডার বানিয়ে দিল, চলুন জেনে নেওয়া যাক সেই রোমাঞ্চকর গল্প।
কার্লোস হেনরিক কাসেমিরো- এর ব্যক্তিগত তথ্য:
|
নাম |
কার্লোস হেনরিক কাসেমিরো |
|
জন্ম |
২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ (বয়স ৩৪) |
|
জন্মস্থান |
সাও হোসে ডস ক্যাম্পোস , ব্রাজিল |
|
উচ্চতা |
১.৮৫ মিটার (৬ ফুট ১ ইঞ্চি) |
|
পজিশন |
রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
সাও পাওলো,রিয়াল মাদ্রিদ কাস্তিয়া,রিয়াল মাদ্রিদ,পোর্তো এবং বর্তমানে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ক্লাবের হয়ে খেলছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০১১– ব্রাজিল |

কার্লোস হেনরিক কাসেমিরোর জন্ম ১৯৯২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ব্রাজিলের সাও পাওলোর একটি অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে। তার শৈশব মোটেও সহজ ছিল না। বাবা খুব ছোটবেলাতেই পরিবার ছেড়ে চলে যান, ফলে মা ভেনিল্ডা কাসেমিরো অত্যন্ত কষ্ট করে কাসেমিরো এবং তার দুই ভাইকে বড় করেন।
অর্থের অভাবে অনেক সময় তাদের ঠিকমতো খাওয়ার জুটেত না। কাসেমিরো এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ছোটবেলায় তিনি এমন একটি ঘরে থাকতেন যেখানে রাতে ঘুমানোর মতো পর্যাপ্ত জায়গা ছিল না। তবে এই চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও ফুটবল ছিল তার একমাত্র সঙ্গী।
মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি সাও পাওলো এফসির যুব একাডেমিতে যোগ দেন। সেখানে তিনি শুরুতে ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ট্রায়ালে প্রচুর ফরোয়ার্ড দেখে বাদ পড়ার ভয়ে তিনি নিজেকে মিডফিল্ডার হিসেবে পরিচয় দেন। আর এই সিদ্ধান্তই তার জীবন বদলে দেয়।
২০১০ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে সাও পাওলোর মূল দলে তার অভিষেক হয়। সেখানে তিনি দ্রুত নিজের জাত চিনিয়ে ইউরোপের বড় বড় ক্লাবের নজরে আসেন।

২০১৩ সালের জানুয়ারিতে কাসেমিরো লোনে রিয়াল মাদ্রিদের ‘বি’ দল কাস্তিয়াতে যোগ দেন। একই বছরের এপ্রিলে মূল দলের হয়ে তার অভিষেক হয় এবং পরে রিয়াল মাদ্রিদ তাকে স্থায়ীভাবে কিনে নেয়।
২০১৪-১৫ মৌসুমে কাসেমিরোকে পর্তুগিজ ক্লাব এফসি পোর্তোতে লোনে পাঠানো হয়। পোর্তোর হয়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করে তিনি প্রমাণ করেন যে তিনি ইউরোপের শীর্ষ স্তরের জন্য প্রস্তুত। তার এই পারফরম্যান্স দেখে রিয়াল মাদ্রিদ তাকে আবার সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ফিরিয়ে আনে।
রিয়াল মাদ্রিদে কাসেমিরোর ক্যারিয়ারের স্বর্ণযুগ শুরু হয় জিনেদিন জিদানের অধীনে। জিদান বুঝতে পেরেছিলেন, টনি ক্রুস এবং লুকা মদ্রিচের মতো আক্রমণাত্মক ও সৃজনশীল মিডফিল্ডারদের স্বাধীনতা দিতে হলে পেছনে একজন “পাহাড়ের” মতো ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার দরকার। এই ৩ জন মিলে গড়ে তোলেন আধুনিক ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা মিডফিল্ড ত্রয়ী, যা “MCK” নামে পরিচিত।
রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে কাসেমিরো মোট ১৮টি বড় ট্রফি জিতেছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
- ৫টি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ
- ৩টি লা লিগা
- ৩টি ক্লাব বিশ্বকাপ
- ১টি কোপা দেল রে
২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে জুভেন্টাসের বিরুদ্ধে কাসেমিরোর করা দূরপাল্লার সেই গোলটি রিয়াল ভক্তরা কোনোদিন ভুলবে না, যা দলকে লিড এনে দিয়েছিল।
২০২২ সালের আগস্টে কাসেমিরো সবাইকে চমকে দিয়ে রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দেন। প্রায় ৭০ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে তিনি ওল্ড ট্রাফোর্ডে আসেন। অনেকে ভেবেছিলেন ক্যারিয়ারের শেষ সময়ে এসে শুধু টাকার জন্য তিনি ইংল্যান্ডে এসেছেন, কিন্তু কাসেমিরো প্রথম মৌসুমেই সবাইকে ভুল প্রমাণ করেন।

২০২২-২৩ প্রথম মৌসুমে ইউনাইটেডে যোগ দিয়েই তিনি দলের ভঙ্গুর মিডফিল্ডকে একাই টেনে তোলেন। তার নেতৃত্বগুণ এবং দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের ওপর ভর করে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কারাবাও কাপ জেতে, যা ছিল ক্লাবটির দীর্ঘ ৬ বছরের ট্রফির খরা কাটানোর প্রথম ধাপ। এছাড়া দল প্রিমিয়ার লিগে শীর্ষ চারে থেকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে কোয়ালিফাই করে।
পরবর্তী মৌসুমে ইনজুরি এবং ফর্মের কিছুটা ঘাটতির কারণে তাকে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হলেও, কাসেমিরোর অভিজ্ঞতা এবং বড় ম্যাচের পারফরম্যান্স সবসময়ই দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
২০১১ সালে ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে কাসেমিরোর অভিষেক হয়। তবে দলে নিয়মিত হতে তার কিছুটা সময় লেগেছিল। নেইমার যদি ব্রাজিলের আক্রমণের প্রাণ হন, তবে কাসেমিরো ছিলেন দলের রক্ষণের মূল ভিত্তি। কাসেমিরোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সাফল্য ২০১৯ সালের কোপা আমেরিকা জয়। ব্রাজিলের মাটিতে অনুষ্ঠিত এই টুর্নামেন্টে তিনি পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে মাঝমাঠ আগলে রেখেছিলেন।
কাসেমিরো ২০১৮ এবং ২০২২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে খেলেন। ২০২২ বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে তার করা দুর্দান্ত ভলি গোলটি ব্রাজিলকে নকআউট পর্বে নিয়ে গিয়েছিল।
কাসেমিরোকে বলা হয় একজন ক্লাসিক ‘নাম্বার ৬’ বা হোল্ডিং মিডফিল্ডার। ফুটবলে সাধারণত ফরোয়ার্ড বা গোলদাতারা সব আলো কেড়ে নেন। কিন্তু কাসেমিরো প্রমাণ করেছেন যে, গোল না করেও একজন খেলোয়াড় কীভাবে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারেন। তাকে বলা হতো রিয়াল মাদ্রিদের “নিরাপত্তা কর্মী”। ক্রুস ও মদ্রিচ যখন ওপরে উঠে খেলতেন, কাসেমিরো পেছনের দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। তার এই নিঃস্বার্থ খেলার মানসিকতাই তাকে অনন্য করে তুলেছে।

২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল এখন দরজায় কড়া নাড়ছে, আর এই মেগা ইভেন্টকে সামনে রেখে ব্রাজিলিয়ান ভক্তদের মনে একটি নাম নিয়ে বেশ গুঞ্জন কাজ করছে তিনি হলেন মাঝমাঠের জেনারেল কাসেমিরো। ক্যারিয়ারের গোধূলি লগ্নে দাঁড়িয়ে থাকা কাসেমিরোর জন্য ২০২৬ বিশ্বকাপটি হতে পারে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ এবং সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা।
কাসেমিরোর ট্রফি ক্যাবিনেটে ক্লাব ফুটবলের সম্ভাব্য সব বড় ট্রফি থাকলেও এখনো একটি সোনালী ট্রফির অভাব রয়েছে সেটি হলো ‘ফিফা বিশ্বকাপ’। ২০০২ সালের পর ব্রাজিল আর বিশ্বকাপের স্বাদ পায়নি। ২০২৬ সালের এই টুর্নামেন্টটি কাসেমিরোর জন্য ব্রাজিলের হেক্সা মিশন সফল করার এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলকে রাজকীয়ভাবে বিদায় জানানোর শেষ সুযোগ।
২০২৬ বিশ্বকাপে কাসেমিরো হয়তো আগের মতো ৯০ মিনিট জুড়ে মাঠ কাঁপাতে পারবেন না, তবে ট্যাকটিক্যাল ফাউল, নিখুঁত টাইমিং আর লিডারশিপ দিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার “কাসেমিতো ম্যাজিক” দেখার জন্য সেলেসাও ভক্তরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
Reference:

