Image default
ক্রীড়াবিদজীবনীফুটবল

আর্জেন্টিনার আড়ালে থাকা এক হিরো লাউতারো আকোস্তা

নাম লাউতারো আকোস্তা হলেও মাঠের সবাই তাকে চেনে ‘লাউচা’ নামে। স্প্যানিশ এই শব্দের আসল মানে হলো ‘পুঁচকে ইঁদুর’!xa0

লাউতারো আকোস্তা আর্জেন্টাইন ফুটবলের এমন এক আড়ালে থাকা হিরো, যার ক্যারিয়ারে যেমন আছে মেসি-আগুয়েরোদের সাথে বিশ্বজয়ের গৌরব, তেমনই আছে ইউরোপিয়ান ফুটবলে ইনজুরির এক ট্র্যাজিক অধ্যায়। মাঠের ক্ষিপ্র গতির কারণে ‘এল লাউচা’ নামে পরিচিত এই উইঙ্গারকে বলা হয় আর্জেন্টিনার ক্লাব ‘লানুস’-এর ইতিহাসের অন্যতম সেরা জীবন্ত কিংবদন্তি।xa0

লাউতারো আকোস্তা- এর ব্যক্তিগত তথ্য:

নামxa0

লাউতারো জার্মান আকোস্তাxa0

ডাকনামxa0

এল লাউচা (পুঁচকে ইঁদুর)

জন্ম xa0

১৪ মার্চ ১৯৮৮ (বয়স ৩৮)

জন্মস্থানxa0

গ্লিউ , আর্জেন্টিনা

উচ্চতাxa0

১.৬৯ মিটার (৫ ফুট ৭ ইঞ্চি)

পজিশনxa0

উইঙ্গার

ক্লাব ক্যারিয়ার

সেভিয়া,রেসিং স্যান্টান্ডার,বোকা জুনিয়র্স এবং বর্তমানে লানুস ক্লাবের হয়ে খেলেছেন।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

২০১৭- আর্জেন্টিনা

লাউতারো আকোস্তা
লাউতারো আকোস্তা আর্জেন্টিনার ক্লাব ‘লানুস’ এর জার্সিতে- Image Source: clublanus.com

১৯৮৮ সালের ১৪ মার্চ আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসের গ্লিউ শহরে জন্মগ্রহণ করেন লাউতারো আকোস্তা। শৈশব থেকেই ফুটবলের প্রতি তার ছিল তীব্র টান। ২০০১ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব লানুস-এর যুব একাডেমিতে যোগ দেন।

যুব দলে দুর্দান্ত পারফর্ম করে খুব দ্রুতই তিনি মূল দলে নিজের জায়গা করে নেন। ২০০৬ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে লানুসের মূল দলের হয়ে তার পেশাদার ক্যারিয়ারের অভিষেক ঘটে। উইঙ্গার বা ফরোয়ার্ড উভয় পজিশনেই তার ক্ষিপ্র গতি এবং বল কন্ট্রোল প্রথম মৌসুমেই আর্জেন্টিনার ফুটবল বোদ্ধাদের নজর কেড়েছিল।

আকোস্তা যখন লানুসের মূল দলে খেলা শুরু করেন, তখন ক্লাবটি আর্জেন্টিনার ফুটবলে মাঝারি সারির দল হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সেই মৌসুমে লানুস তাদের ক্লাবের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আর্জেন্টিনার প্রিমেরা ডিভিশন শিরোপা জয় করে। মাত্র ১৯ বছর বয়সে আকোস্তা সেই ঐতিহাসিক দলের অন্যতম প্রধান আক্রমণাত্মক অস্ত্র ছিলেন। তার উইং ধরে নিখুঁত ক্রস আর প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে ফেলার ক্ষমতা লানুসকে চ্যাম্পিয়ন করতে বড় ভূমিকা রাখে।

লাউতারো আকোস্তা
লাউতারো আকোস্তা – Image Source: pbs.twimg.com

লানুসের হয়ে লিগ জেতার পর ইউরোপের একাধিক ক্লাবের নজর পড়ে এই তরুণ উইঙ্গারের ওপর। ২০০৮ সালের মে মাসে স্প্যানিশ লা লিগার শক্তিশালী ক্লাব সেভিয়া প্রায় ৭ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে তাকে দলে ভেড়ায়। ৫ বছরের চুক্তিতে স্পেনে গেলেও সেখানে আকোস্তার সময়টা মোটেও ভালো কাটেনি।

ইউরোপের ফুটবলে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় একের পর এক ইনজুরি। সেভিয়ায় যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি মারাত্মক গোড়ালির ইনজুরিতে পড়েন, যা তাকে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে ছিটকে দেয়। সেভিয়ার হয়ে তিনি ২০১০ সালে ‘কোপা দেল রে’ জিতলেও ইনজুরির কারণে বেশিরভাগ ম্যাচেই মাঠে নামতে পারেননি। ২০১১-১২ মৌসুমে তাকে ধারে লা লিগার আরেক ক্লাব রেসিং সান্তান্দার -এ পাঠানো হয়, কিন্তু সেখানেও ইনজুরি তার পিছু ছাড়েনি।

লাউতারো আকোস্তা
লা লিগার ক্লাব রেসিং সান্তান্দের জার্সিতে লাউতারো আকোস্তা- Image Source: marca.com

ইউরোপের দুঃস্বপ্ন ভুলে নিজের চেনা ছন্দ ফিরে পেতে ২০১২ সালে তিনি আর্জেন্টিনায় ফিরে আসেন এবং দেশের অন্যতম সফল ক্লাব বোকা জুনিয়র্স-এ যোগ দেন। বোকায় এক বছর কাটানোর পর, ২০১৩ সালে তিনি আবারও ফিরে আসেন তার নাড়ির টান, তার আপন ঘর লানুস-এ। আর এই ঘরে ফেরাই ছিল তার ক্যারিয়ারের পুনর্জন্ম।

লানুসে দ্বিতীয় দফায় যোগ দেওয়ার পর লাউতারো আকোস্তা কেবল একজন খেলোয়াড় নন, বরং ক্লাবের প্রতীক ও নেতায় পরিণত হন। লানুসে ফিরেই তিনি ক্লাবকে লাতিন আমেরিকার মর্যাদাপূর্ণ ট্রফি ‘কোপা সুডামেরিকানা’ জেতাতে অনন্য অবদান রাখেন।

২০১৭ সালে আকোস্তার জাদুকরী পারফরম্যান্সে লানুস তাদের ইতিহাসের প্রথমবারের মতো লাতিন আমেরিকার ‘চ্যাম্পিয়ন্স লিগ’ খ্যাত কোপা লিবের্তাদোরেস-এর ফাইনালে ওঠে। যদিও ফাইনালে তারা ব্রাজিলের গ্রেমিওর কাছে হেরে যায়, কিন্তু অধিনায়ক হিসেবে আকোস্তার লড়াই ফুটবল বিশ্বে দারুণ প্রশংসিত হয়।

লাউতারো আকোস্তা
২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিক – Image Source: x.com

আর্জেন্টিনার যুব দলে লাউতারো আকোস্তা ছিলেন অত্যন্ত সফল একজন মুখ। ২০০৭ সালে কানাডায় অনুষ্ঠিত ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জয়ী আর্জেন্টিনা দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি, যেখানে তার সতীর্থ ছিলেন সার্জিও আগুয়েরো ও আনহেল দি মারিয়াসদৃশ তারকারা।

আকোস্তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় গৌরবময় অধ্যায় হলো ২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিক। লিওনেল মেসি, হুয়ান রোমান রিকুয়েলমে, হাভিয়ের মাশ্চেরানো এবং সার্জিও আগুয়েরোদের নিয়ে গড়া সেই অবিশ্বাস্য আর্জেন্টিনা অলিম্পিক দলে ডাক পান আকোস্তা। টুর্নামেন্টে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নামলেও কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনালে তার অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ফাইনালে নাইজেরিয়াকে হারিয়ে আর্জেন্টিনার সেই অলিম্পিক স্বর্ণপদক জয়ী দলের গর্বিত অংশ ছিলেন “লাউচা”।

পরবর্তীতে ২০১৭ সালে লানুসের হয়ে ঘরোয়া ফুটবলে দুর্দান্ত খেলার সুবাদে তৎকালীন আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের কোচ হোর্হে সাম্পাওলি তাকে মূল জাতীয় দলে ডাকেন। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভেনিজুয়েলার বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে আলবিসেলেস্তেদের সিনিয়র জার্সিতে তার অভিষেক হয়।

লাউতারো আকোস্তা আধুনিক ফুটবলের প্রথাগত উইঙ্গারদের মতো উইং ধরে শুধু দৌড়াতেন না, বরং তার খেলার স্টাইল ছিল বেশ বৈচিত্র্যময়। তার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ক্লোজ কন্ট্রোল ড্রিবলিং। খুব ছোট জায়গায় ৩-৪ জন ডিফেন্ডারকে ড্রিবল করে বেরিয়ে যাওয়ার এক সহজাত ক্ষমতা ছিল তার।

লাউতারো আকোস্তা
লাউতারো আকোস্তা আধুনিক ফুটবলের প্রথাগত উইঙ্গার – Image Source: espn.com.ar

আজকের আধুনিক ফুটবলে যেখানে সামান্য বেশি টাকার অফার পেলেই খেলোয়াড়রা ক্লাব পরিবর্তন করেন, সেখানে লাউতারো আকোস্তা লানুসের প্রতি দেখিয়েছেন অগাধ আনুগত্য। ইউরোপের লিগ বা ল্যাটিন আমেরিকার অন্য বড় ক্লাবগুলো থেকে বড় অংকের প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও তিনি লানুস ছাড়েননি। তিনি লানুসের হয়ে ৩৫০-এর ওপর ম্যাচ খেলেছেন এবং ক্লাবের ইতিহাসের অন্যতম সেরা আইকন হিসেবে ভক্তদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। লানুস শহরের মানুষের কাছে তিনি কেবল একজন ফুটবলার নন, ঘরের ছেলে।

Reference:

Related posts

রায়হান রাফি – বাংলা চলচ্চিত্রের তরুণ নির্মাতা

মার্কোস আকুনা: কেন সবাই তাকে “ডিম” বলে ডাকে?

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস: নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদের জীবন ও অর্জন

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More