Image default
এশিয়াজাদুঘরজাপানপর্যটন আকর্ষণ

নুডলস প্রেমীদের মক্কা-মদিনা: কাপ নুডলস মিউজিয়াম!

বউয়ের রান্নাঘরে তেম্পুরা ভাজার তেল চপচপে কড়াই থেকেই যে দুনিয়া কাঁপানো ৩ মিনিটের নুডলসের আইডিয়া আসবে, সেটা বোধহয় মোমোফুকু আন্দো নিজেও ভাবেননি; আর এভাবেই স্ত্রীর রান্নার ক্রেডিট নিজের নামে চালিয়ে দিয়ে তিনি পুরো বিশ্বকে বানিয়ে দিলেন রাতদুপুরের নুডলসখোর!xa0

মাঝরাতের তীব্র ক্ষুধা, হোস্টেল লাইফের টানাপোড়েন কিংবা অলস দুপুরের চটজলদি সমাধান আমাদের জীবনের এই কঠিন মুহূর্তগুলোকে যে জিনিসটি সবচেয়ে সহজ করে দিয়েছে, তার নাম ‘ইনস্ট্যান্ট নুডলস’। গরম পানি ঢেলে মাত্র ৩ মিনিটের এই ম্যাজিকের পেছনে যে কতটা রোমাঞ্চকর ইতিহাস, ত্যাগ আর এক অবিশ্বাস্য উদ্ভাবনের গল্প লুকিয়ে আছে, তা জাপানের ‘কাপ নুডলস মিউজিয়াম’-এ না গেলে বিশ্বাস করা কঠিন। একটি ভাঙা কাঠের ঘর থেকে শুরু হওয়া আইডিয়া কীভাবে আজ মহাকাশ জয় করে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের থালায় জায়গা করে নিল চলুন আজ ঘুরে আসা যাক নুডলস রাজ্যের সেই জাদুকরী দুনিয়ায়।xa0

এক নজরে কাপ নুডলস মিউজিয়াম

তথ্য বিবরণ
অবস্থান ইয়োকোহামা এবং ওসাকা (ইকেদা), জাপান
প্রতিষ্ঠাতা নিশিন ফুডস (মোমোফুকু আন্দোর স্মরণে)
প্রধান আকর্ষণ মাই কাপ নুডলস ফ্যাক্টরি, হিস্ট্রি কিউব, চিকেন রামেন ফ্যাক্টরি
বিশেষত্ব নিজের কাস্টমাইজড নুডলস তৈরি করার সুযোগ
কাদের জন্য সেরা পরিবার, শিশু, কাপল এবং যেকোনো ট্রাভেল ও ফুড লাভার
কাপ নুডলস মিউজিয়াম
মোমোফুকু আন্দো- Image Source: biography.com

কাপ নুডলস মিউজিয়ামের মূল ভিত্তি যার ওপর দাঁড়িয়ে, তিনি হলেন মোমোফুকু আন্দো যাকে বলা হয় ‘ইনস্ট্যান্ট নুডলসের জনক’ এবং নিশিন ফুডস -এর প্রতিষ্ঠাতা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানে তখন চরম খাদ্য সংকট। ১৯৫৭ সালের এক শীতের রাতে আন্দো সাহেব রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় দেখলেন, এক বাটি গরম রামেন (জাপানি নুডলস) খাওয়ার জন্য কনকনে শীতের মধ্যে একদল মানুষ লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। এই দৃশ্যটি তার মনে গভীরভাবে দাগ কাটে। তিনি ভাবলেন, এমন কোনো নুডলস কি তৈরি করা সম্ভব নয়, যা ঘরে বসেই খুব সহজে এবং কম সময়ে তৈরি করে খাওয়া যাবে?

কাপ নুডলস মিউজিয়াম
কাপ নুডলস মিউজিয়াম ওসাকা ইকেদা – Image Source: cdn.gaijinpot.com

এই এক ভাবনা থেকেই তিনি তার বাড়ির পেছনের একটি ছোট্ট কাঠের ঘরে দিন-রাত গবেষণা শুরু করেন। টানা এক বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং শত শত ব্যর্থ চেষ্টার পর ১৯৫৮ সালে তিনি আবিষ্কার করেন পৃথিবীর প্রথম ইনস্ট্যান্ট নুডলস ‘চিকেন রামেন’। এরপর ১৯৭১ সালে তিনি কাপের ভেতরেই নুডলস, মসলা এবং শুকনা সবজি একসাথে প্যাক করে তৈরি করেন বিখ্যাত ‘কাপ নুডলস’ , যা পুরো বিশ্বের খাদ্য সংস্কৃতিকে বদলে দেয়।

ইয়োকোহামার কাপ নুডলস মিউজিয়ামের আধুনিক ভবনে পা রাখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। এর ভেতরে নানা রকম ইন্টারঅ্যাক্টিভ প্রদর্শনী এবং গ্যালারি রয়েছে, যা ছোট থেকে বড় সবাইকে মুগ্ধ করে।

কাপ নুডলস মিউজিয়াম
মিউজিয়ামের অন্যতম আকর্ষণীয় ঘর এটি – Image Source: planmyjapan.com

কাপ নুডলস মিউজিয়ামের অন্যতম আকর্ষণীয় ঘর এটি। এখানে ১৯৫৮ সালের প্রথম ‘চিকেন রামেন’ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া হাজার হাজার রকমের নুডলসের প্যাকেট দিয়ে দেয়াল সাজানো হয়েছে। ৩,০০০-এরও বেশি প্যাকেটের এই বিশাল সংগ্রহ দেখলে বোঝা যায়, কীভাবে একটি ছোট্ট আইডিয়া আজ বিশ্বজুড়ে এক বিশাল শিল্পে পরিণত হয়েছে।

আন্দো সাহেব যে কাঠের ঘরে বসে প্রথম ইনস্ট্যান্ট নুডলস আবিষ্কার করেছিলেন, ঠিক সেই ঘরটির একটি হুবহু প্রতিরূপ এখানে তৈরি করা হয়েছে। ভেতরের সাধারণ কড়াই, সাইকেল এবং রান্নার সরঞ্জামগুলো দেখলে অনুপ্রাণিত হতে হয় যে বড় কোনো আবিষ্কারের জন্য বিলাসবহুল ল্যাবরেটরির প্রয়োজন হয় না, শুধু অদম্য ইচ্ছাশক্তিই যথেষ্ট।

এখানে একটি বড় থিয়েটার এবং অ্যানিমেশনের মাধ্যমে মোমোফুকু আন্দোর পুরো জীবন, তার সংগ্রাম এবং কীভাবে তিনি ৯৬ বছর বয়সেও ২০০৫ সালে মহাকাশচারীদের জন্য ‘স্পেস রামেন’ তৈরি করেছিলেন, সেই গল্পটি খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

এই মিউজিয়ামের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং রোমাঞ্চকর অংশ হলো ‘মাই কাপনুডলস ফ্যাক্টরি ’। এখানে পর্যটকরা কেবল দর্শক নন, তারা নিজেরাই একেকজন শেফ বা ডিজাইনার হয়ে ওঠেন! এখানে আপনি নিজেই নিজের পছন্দের কাপ নুডলস তৈরি করতে পারবেন।

প্রথমে আপনাকে একটি খালি সাদা কাপ দেওয়া হবে। রঙিন মার্কার পেন দিয়ে আপনি সেই কাপের গায়ে নিজের পছন্দমতো ছবি আঁকতে বা নাম লিখতে পারবেন।এরপর একটি চাকা ঘুরিয়ে কাপের ভেতরে নুডলসের ব্লকটি সেট করতে হবে।

এখানে ৪ রকমের স্যুপের বেস (যেমন: রেগুলার, সী-ফুড, কারি, বা চিলি টমেটো) এবং ১২ রকমের ভিন্ন টপিংস (যেমন: চিংড়ি, মাংসের কিমা, ডিম, পনির, বা কিউট প্যান্ডা-কার্টুন আকৃতির ফিশ কেক) থেকে নিজের পছন্দমতো ৪টি উপাদান বেছে নেওয়া যায়। এর মাধ্যমে প্রায় ৫,৪৬০টি ভিন্ন স্বাদের কম্বিনেশন তৈরি করা সম্ভব! সবশেষে কাপটি মেশিনের মাধ্যমে সিলগালা করে একটি এয়ার-পাম্প ব্যাগে ভরে দেওয়া হয়, যা দেখতে দারুণ লাগে এবং আপনি এটি স্যুভেনির হিসেবে বাড়িতে নিয়ে আসতে পারবেন।

কাপ নুডলস মিউজিয়াম
নিজের পছন্দমতো নুডলস – Image Source: facebook.com

কাপ নুডলস মিউজিয়াম ঘুরতে ঘুরতে খিদে পেয়ে যাওয়া খুব স্বাভাবিক। আর সেই ক্ষুধার সমাধান করতে তৈরি করা হয়েছে ‘নুডলস বাজার – ওয়ার্ল্ড নুডলস রোড’।

এই রেস্তোরাঁ অঞ্চলটি এশিয়ার একটি ঐতিহ্যবাহী নাইট মার্কেটের আদলে তৈরি করা হয়েছে। মোমোফুকু আন্দো বিশ্বজুড়ে ভ্রমণের সময় যেসব দেশের নুডলস দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন, এখানকার মেন্যুতে সেসব দেশের বিখ্যাত ৮টি নুডলস রাখা হয়েছে। অত্যন্ত সস্তা মূল্যে আপনি ইতালির পাস্তা, থাইল্যান্ডের প্যাড থাই, মালয়েশিয়ার লাকসা, ইন্দোনেশিয়ার মি গোরিং কিংবা কোরিয়ার কোল্ড নুডলসের স্বাদ নিতে পারবেন একই ছাদের নিচে।

ছোট বাচ্চাদের জন্য মিউজিয়ামের ভেতরে রয়েছে একটি চমৎকার ইনডোর খেলার মাঠ, যার নাম ‘কাপ নুডলস পার্ক ’। এটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে একটি শিশু নিজেকে একটি ‘নুডলস কণা’ হিসেবে কল্পনা করতে পারে। নুডলস যেভাবে তৈরি হয়—অর্থাৎ প্যাকিং, ফ্রাইং এবং নেটওয়ার্কিংয়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া বাচ্চারা ঠিক সেই প্রসেসটাই বিভিন্ন রাইড ও জালের মধ্য দিয়ে খেলে খেলে অনুভব করতে পারে।

আপনি যদি স্রেফ একজন ভোজনরসিক হন, কিংবা একজন সৃষ্টিশীল মানুষ যিনি নতুন আইডিয়ার খোঁজ করছেন এই মিউজিয়াম আপনাকে নিরাশ করবে না। নিজের হাতে বানানো একটি কাস্টমাইজড নুডলসের কাপ হাতে নিয়ে যখন আপনি এই মিউজিয়াম থেকে বের হবেন, তখন আপনার মুখে এক চিলতে হাসির পাশাপাশি মনের ভেতরেও এক অদ্ভুত অনুপ্রেরণা জেগে থাকবে।

ইনস্ট্যান্ট নুডলসের এই জাদুকরী দুনিয়া এবং এর জনক মোমোফুকু আন্দোকে নিয়ে কিছু অদ্ভুত ও মজার তথ্য

১. মোমোফুকু আন্দো শুধু পৃথিবীবাসীর ক্ষুধার কথাই ভাবেননি, তিনি মহাকাশচারীদের কথাও ভেবেছেন। ২০০৫ সালে, ৯৬ বছর বয়সে আন্দো সাহেব আবিষ্কার করেন ‘স্পেস রামেন’ বা মহাকাশের নুডলস। শূন্য মাধ্যাকর্ষণেও যাতে স্যুপ ভেসে না বেড়ায় এবং নভোচারীরা সহজে খেতে পারেন, সেজন্য বিশেষ থিকনার বা ঘন ঝোল দিয়ে এই নুডলস তৈরি করা হয়েছিল। জাপানি নভোচারী সোইচি নোগুচি স্পেস শাটল ‘ডিসকভারি’-তে করে এটি মহাকাশে নিয়ে গিয়ে আনন্দের সাথে খেয়েছিলেন।

 

মহাকাশে কাপ নুডলসের স্বাদ – Image Source: arabnews.jp

২. আজকে পকেট ফাঁকা থাকলে বা সস্তায় পেট ভরাতে আমরা যে নুডলস খাই, ১৯৫৮ সালে তার চিত্রটা একদম উল্টো ছিল। যখন প্রথম ‘চিকেন রামেন’ বাজারে আসে, তখন জাপানের সাধারণ মুদি দোকানের তাজা নুডলসের চেয়ে এর দাম ছিল প্রায় ৬ গুণ বেশি!xa0

৩. মোমোফুকু আন্দো যখন নুডলসকে দ্রুত শুকানোর উপায় খুঁজছিলেন, তখন কিছুতেই সফল হচ্ছিলেন না। একদিন তার স্ত্রী রান্নাঘরে বিকেলের নাস্তার জন্য তেলের মধ্যে চিংড়ি মাছের চপ বা ‘তেম্পুরা’ ভাজছিলেন। আন্দো সাহেব খেয়াল করলেন, তেলে ছাড়ার সাথে সাথেই চপের ভেতরের পানি বাষ্প হয়ে বের হয়ে যাচ্ছে এবং ওপরটা মুচমুচে হচ্ছে। ব্যস! মাথায় আইডিয়া চলে এলো। তিনি নুডলসকেও একইভাবে গরম তেলে হালকা ফ্রাই করে শুকানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করলেন, যা আজ বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হয়।

৪. মিউজিয়ামের সবচেয়ে জনপ্রিয় অংশ ‘মাই কাপ নুডলস ফ্যাক্টরি’-তে যে কেউ নিজের পছন্দের নুডলস কাস্টমাইজ করতে পারেন। সেখানে থাকা ৪টি ভিন্ন ফ্লেভারের স্যুপের বেস এবং ১২টি ভিন্ন টপিংসের মধ্য থেকে ৪টি বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে। গণিতবিদদের মতে, এর মাধ্যমে একজন মানুষ চাইলে প্রায় ৫,৪৬০টি ভিন্ন কম্বিনেশনের ইউনিক কাপ নুডলস তৈরি করতে পারবেন!

Reference:

Related posts

প্রাচীন জাপানের প্রবেশদ্বার সেনসো-জি মন্দির

আশা রহমান

অ্যানিমের শহর- টোকিও

প্রমিজ ল্যান্ড ইসরায়েল

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More