Image default
ক্রীড়াবিদজীবনীফুটবল

মার্কুইনহোস: ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্সের অতন্দ্র প্রহরী

যেখানে অন্য ফুটবলাররা পার্টি আর গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ড নিয়ে ব্যস্ত, সেখানে মার্কুইনহোস রিয়েলিটি শো-র গায়িকাকে দেখেই একেবারে ‘প্রথম নজরেই কাত’ হয়ে সোজা ছাদনাতলায় বসে গেছেন! মাঠের বাঘা বাঘা স্ট্রাইকারদের থমকে দেওয়া এই ক্যাপ্টেন ঘরের পিচে ক্যারলের প্রেমে এমন ক্লিন বোল্ড হয়েছেন যে, এখন তিন সন্তান নিয়ে দিব্যি শান্তশিষ্ট লক্ষ্মী জামাই সেজে দিন কাটাচ্ছেন!xa0

সাও পাওলোর গলি থেকে উঠে এসে আজ যিনি প্যারিসের ফুটবল সাম্রাজ্যের মুকুটহীন সম্রাট! থিয়াগো সিলভার ছায়ায় বড় হয়ে আজ নিজেই হয়ে উঠেছেন তরুণদের মেন্টর। ক্লাবের প্রতি অগাধ বিশ্বস্ততা আর দেশের জার্সিতে জান প্রাণ উজাড় করে দেওয়া এক লড়াকু সৈনিক চলুন আজ উন্মোচন করি ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্সের অতন্দ্র প্রহরী মার্কুইনহোসের মহাকাব্য!xa0

মার্কুইনহোসের ব্যক্তিগত তথ্য:

নামxa0

মার্কোস আওস কোরেয়া

ডাকনামxa0

মার্কুইনহোস

জন্ম xa0

১৪ মে ১৯৯৪ (বয়স ৩২)

জন্মস্থানxa0

সাও পাওলো , ব্রাজিল

উচ্চতাxa0

১.৮৩ মিটার (৬ ফুট ০ ইঞ্চি)

পজিশনxa0

সেন্টার-ব্যাক

ক্লাব ক্যারিয়ার

করিন্থীয়দের,রোমা,রোমা এবং বর্তমানে পিএসজি ক্লাবের হয়ে খেলেছেন।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

২০১৩– ব্রাজিল

ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্সের অতন্দ্র প্রহরী মার্কুইনহোস – Image Source:band.com.br

১৯৯৪ সালের ১৪ মে ব্রাজিলের ফুটবল সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্রস্থল সাও পাওলো শহরে জন্মগ্রহণ করেন মার্কুইনহোস। ব্রাজিলের আর দশটা সাধারণ ছেলের মতোই তাঁর শৈশব কেটেছে ফুটবলের সাথে। তবে তাঁর বড় ভাই লুয়ানও ফুটবল খেলতেন, যা মার্কুইনহোসকে ছোটবেলা থেকেই পেশাদার ফুটবলার হওয়ার প্রেরণা জোগায়।

মাত্র আট বছর বয়সে ২০০২ সালে তিনি ব্রাজিলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ক্লাব করিন্থিয়ান্স -এর যুব একাডেমিতে যোগ দেন। শুরুতে তিনি অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার বা সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে খেলতেন। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাঁর কোচেরা বুঝতে পারেন, মার্কুইনহোসের আসল ক্ষমতা প্রতিপক্ষের আক্রমণ অনুমান করার মধ্যে। ফলে তাঁকে রক্ষণভাগে ডিফেন্ডার হিসেবে সেট করা হয়। ২০১২ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে করিন্থিয়ান্সের সিনিয়র দলে তাঁর অভিষেক হয়। ওই বছরই ক্লাবটির হয়ে ঐতিহাসিক কোপা লিবার্তোদোরেস শিরোপা জেতেন তিনি, যা ইউরোপের স্কাউটদের নজর তাঁর দিকে ঘুরিয়ে দেয়।

করিন্থিয়ান্সে মার্কুইনহোস – Image Source:goal.com

২০১২ সালের জুলাই মাসে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ইতালিয়ান সিরি এ-র বিখ্যাত ক্লাব এএস রোমা মার্কুইনহোসকে লোনে দলে ভেড়ায়। ইউরোপের ডিফেন্সিভ এবং ট্যাকটিকাল ফুটবলের সাথে মানিয়ে নেওয়া যেকোনো তরুণ লাতিন ডিফেন্ডারের জন্যই কঠিন চ্যালেঞ্জ। কিন্তু মার্কুইনহোস প্রথম ম্যাচ থেকেই সবাইকে চমকে দেন।

রোমার তৎকালীন ডিফেন্সে তিনি এত দ্রুত মানিয়ে নেন যে, ক্লাবটি মাত্র কয়েক মাসের মাথায় তাঁর লোন চুক্তিকে স্থায়ী চুক্তিতে রূপান্তর করে। রোমার হয়ে তিনি মাত্র ৩০টি ম্যাচ খেলেছিলেন, কিন্তু সেই এক মৌসুমেই তিনি নিজেকে ইতালির অন্যতম সেরা উদীয়মান ডিফেন্ডার হিসেবে প্রমাণ করেন।xa0

ইতালির অন্যতম সেরা উদীয়মান ডিফেন্ডার – Image Source:skysports.com

২০১৩ সালের জুলাই মাসে ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেন্ট-জার্মেই মাত্র ১৯ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডারের জন্য তৎকালীন রেকর্ড ৩১.৪ মিলিয়ন ইউরো খরচ করে। অনেকেই এত অল্প বয়সী একজন ডিফেন্ডারের পেছনে এত টাকা ঢালাকে জুয়া মনে করেছিলেন, কিন্তু আজ এক দশকেরও বেশি সময় পর মার্কুইনহোস প্রমাণ করেছেন যে, সেটি ছিল পিএসজির ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিনিয়োগ।

পিএসজিতে যোগ দেওয়ার পর মার্কুইনহোস মেন্টর হিসেবে পান তাঁরই স্বদেশী কিংবদন্তি ডিফেন্ডার থিয়াগো সিলভাকে। সিলভা এবং ডেভিড লুইজের উপস্থিতির কারণে শুরুতে অনেক সময় মার্কুইনহোসকে রাইট-ব্যাক বা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবেও খেলতে হয়েছে। লরেন্ট ব্লাঙ্ক এবং উনাই এমরির অধীনে তিনি দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেন এবং একের পর এক লিগ ওয়ান শিরোপা জিততে থাকেন।

পিএসজিতে মার্কুইনহোস – Image Source: assets.goal.com

২০২০ সালে থিয়াগো সিলভা ক্লাব ছাড়ার পর মার্কুইনহোসের কাঁধে তুলে দেওয়া হয় পিএসজির অফিশিয়াল অধিনায়কের আর্মব্যান্ড। নেইমার, কিলিয়ান এমবাপ্পে বা লিওনেল মেসির মতো মহাতারকাদের মেলা বসা প্যারিসের ড্রেসিংরুমকে শান্ত রাখা এবং মাঠে নেতৃত্ব দেওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু মার্কুইনহোস তাঁর ব্যক্তিত্ব ও পারফরম্যান্স দিয়ে পুরো দলকে এক সুতোয় বেঁধে রাখেন।

২০২৪-২৫ এবং চলমান ২০২৫-২৬ মৌসুমেও তিনি পিএসজির রক্ষণভাগের মূল স্তম্ভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পিএসজির হয়ে ৫০০-রও বেশি ম্যাচে মাঠে নেমে ক্লাবটির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়দের তালিকায় তিনি শীর্ষস্থানে পৌঁছে গেছেন।

২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে মাত্র ১৯ বছর বয়সে হন্ডুরাসের বিপক্ষে ম্যাচে ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে মার্কুইনহোসের অভিষেক হয়। এরপর থেকে প্রতিটি বড় টুর্নামেন্টে তিনি ব্রাজিলের ব্যাকলাইনের মূল ভরসা।

২০১৬ সালে নিজের দেশের মাটিতে রিয়াল মাদ্রিদের নেইমারের সাথে কাঁধ মিলিয়ে রিও অলিম্পিকে ঐতিহাসিক সোনা জেতেন মার্কুইনহোস। পুরো টুর্নামেন্টে ব্রাজিলের ডিফেন্স ছিল অভেদ্য। এরপর ২০১৯ সালে ব্রাজিলের মাটিতে অনুষ্ঠিত কোপা আমেরিকায় তিনি পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলে ব্রাজিলকে চ্যাম্পিয়ন করতে বড় ভূমিকা রাখেন।

২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ডিফেন্সের অন্যতম সেরা পারফর্মার হওয়া সত্ত্বেও কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে ব্রাজিলের বিদায় মার্কুইনহোসের ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় আক্ষেপ। বিশেষ করে ২০২২ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে তাঁর শটটি পোস্টে লেগে ফিরে আসার দৃশ্যটি ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

ব্রাজিলের ডিফেন্সের অন্যতম সেরা পারফর্মার – Image Source:psgtalk.com

বর্তমানে ২০২৬ বিশ্বকাপের মূল মঞ্চেxa0 ব্রাজিলের হেড কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত স্কোয়াডে অধিনায়ক হিসেবে ডাক পেয়েছেন ৩২ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডার। আর্সেনালের গ্যাব্রিয়েল মাগালায়েসের সাথে তাঁর রক্ষণভাগের জুটি এবার ব্রাজিলকে হেক্সা বা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ এনে দেওয়ার মূল চাবিকাঠি।

২০২৬ বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে মার্কুইনহোস – Image Source:en.parisfans.fr

ফুটবলারদের বিলাসী ও বৈচিত্র্যময় জীবনের ভিড়ে মার্কুইনহোস সম্পূর্ণ আলাদা। ২০১৬ সালে তিনি ব্রাজিলের বিখ্যাত গায়িকা ও ইনফ্লুয়েন্সার ক্যারল ক্যাব্রিনোকে বিয়ে করেন। তাঁদের সুখী দাম্পত্য জীবন এবং তিন সন্তান নিয়ে মার্কুইনহোসের পারিবারিক ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায়ই প্রশংসিত হয়। মাঠের বাইরের শান্ত ও সুশৃঙ্খল জীবনই মাঠে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী ও ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের অন্যতম বড় রহস্য।

Reference:

Related posts

থালাপতি বিজয়: পর্দার নায়ক থেকে বাস্তবের অনুপ্রেরণা

রায়হান রাফি – বাংলা চলচ্চিত্রের তরুণ নির্মাতা

ইতিহাসের আলোকে নবী মুহাম্মদ (সা.) এর জীবন

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More