Image default
ইউরোপপর্যটন আকর্ষণফ্রান্স

প্লেস মাসেনা: নিস শহরের রঙিন হৃদপিণ্ড ও স্থাপত্যের বিস্ময়

প্লেস মাসেনাকে নিসের ‘কিলোমিটার জিরো’ বলা হয় কারণ এখান থেকে একদিকে শপিংয়ের জন্য মানিব্যাগ খালি করা, অন্যদিকে ওল্ড টাউনের ইতিহাসে হারানো আর এক দৌড়ে নীল সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়া সবই আপনার হাতের নাগালে!xa0

নিস শহরের যেকোনো প্রান্তে আপনি থাকুন না কেন, আপনার পথ কোনো না কোনোভাবে এসে মিশবে প্লেস মাসেনা-তে। একদিকে ওল্ড টাউনের প্রাচীন গলি আর অন্যদিকে আধুনিক শপিং ডিস্ট্রিক্ট এই দুইয়ের মেলবন্ধন ঘটিয়েছে এই রাজকীয় চত্বরটি। এর লাল রঙের ইতালীয় ধাঁচের দালান, চেকারবোর্ড মেঝে এবং আধুনিক ভাস্কর্য নিসকে এক অনন্য পরিচয় দিয়েছে।

নিস শহর– Image Source:www.tourazur.com

ইতিহাসের পটভূমিxa0

প্লেস মাসেনার ইতিহাস শুরু হয় ১৮৩০-এর দশকে। এই চত্বরটির নামকরণ করা হয়েছে নিসে জন্মগ্রহণকারী ফরাসি সামরিক কমান্ডার আন্দ্রে মাসেনা-এর নামে, যিনি নেপোলিয়নের যুদ্ধের সময় একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ জেনারেল ছিলেন। ১৮৪০ সালে এটি তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিল শহরের দুটি অংশকে সংযুক্ত করা। সময়ের সাথে সাথে এটি রাজকীয় সব অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে এবং বর্তমানে এটি নিসের সবচেয়ে বড় ও প্রধান চত্বর।

স্থাপত্যশৈলী

প্লেস মাসেনায় পা রাখলে প্রথমেই আপনার চোখ ধাঁধিয়ে যাবে এখানকার রঙের বৈচিত্র্যে। চত্বরটির চারপাশের ভবনগুলো উজ্জ্বল লাল রঙে রাঙানো। এই স্থাপত্যশৈলীটি মূলত প্রতিবেশী দেশ ইতালির জেনোয়া শহর থেকে অনুপ্রাণিত। ভবনের খিলানযুক্ত নিচের অংশগুলোতে রয়েছে অসংখ্য ক্যাফে এবং বিলাসবহুল দোকান।

পুরো চত্বরের মেঝেটি সাদা এবং কালো পাথরের টাইলস দিয়ে তৈরি, যা দেখতে অনেকটা বিশাল এক দাবা বোর্ডের মতো। এটি চত্বরটিকে একটি অত্যন্ত আধুনিক এবং শৈল্পিক রূপ দিয়েছে, যা ফটোগ্রাফারদের জন্য স্বর্গ।

প্লেস মাসেনা নিস শহরের স্থাপত্যশৈলী – Image Source:dreamstime.com

ফাউন্টেন অফ দ্য সানxa0

প্লেস মাসেনার দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত এই বিশাল ফোয়ারাটি পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ। এই ফোয়ারার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে গ্রিক দেবতা অ্যাপোলোর একটি সাত মিটার উঁচু মার্বেল মূর্তি।মজার ব্যাপার হলো, ১৯৫৬ সালে যখন এই মূর্তিটি বসানো হয়েছিল, তখন অনেক স্থানীয় মানুষ অ্যাপোলোর নগ্ন মূর্তিকে ‘অশালীন’ মনে করে প্রতিবাদ করেছিলেন। এক সময় মূর্তিটি সরিয়ে একটি স্টেডিয়ামের কাছে রাখা হয়েছিল, কিন্তু ২০১১ সালে এটি আবারও তার পুরনো মহিমায় প্লেস মাসেনায় ফিরিয়ে আনা হয়। এখন এটি নিসের একটি আইকনিক ল্যান্ডমার্ক।

ফাউন্টেন অফ দ্য সান– Image Source:dreamstime.com

আধুনিক সৃজনশীল শিল্পxa0

প্লেস মাসেনাকে আধুনিক রূপ দিয়েছে স্প্যানিশ শিল্পী জোমে প্লেনসার তৈরি করা সাতটি বিশেষ ভাস্কর্য। এগুলো উঁচু খুঁটির ওপর বসানো সাতটি স্বচ্ছ মূর্তি, যারা হাঁটু গেড়ে বসে একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। এই সাতটি মূর্তি বিশ্বের সাতটি মহাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করে। এটি মানুষের মধ্যে যোগাযোগ এবং বিশ্বজনীন শান্তির প্রতীক।

রাতের বেলা এই মূর্তিগুলো এক বিশেষ আলোয় আলোকিত হয়। পর্যায়ক্রমে এদের রঙ নীল থেকে লাল বা সবুজ থেকে হলুদ হয়ে বদলে যায়। স্থানীয়রা মনে করেন, এই মূর্তিগুলো একে অপরের সাথে নিঃশব্দে কথা বলছে। রাতের প্লেস মাসেনাকে এই আলো এক রূপকথার জগতে পরিণত করে।

আধুনিক সৃজনশীল শিল্প– Image Source: dreamstime.com

যোগাযোগ ও দৈনন্দিন জীবনxa0

প্লেস মাসেনা নিসের ট্রাফিক-ফ্রি জোন বা পথচারী-বান্ধব এলাকা। চত্বরটির মাঝখান দিয়ে নিসের আধুনিক ট্রাম লাইন চলে গেছে। ট্রামগুলো যখন এই চত্বরে প্রবেশ করে, তখন তারা তাদের যান্ত্রিক তার বা ক্যাবল সরিয়ে ব্যাটারি পাওয়ারে চলে, যাতে চত্বরের আকাশ ও সৌন্দর্য তারের জঞ্জালে ঢেকে না যায়।

এখান থেকে সরাসরি চলে যাওয়া যায় ‘অ্যাভিনিউ জিন মেদসিন’-এ, যা নিসের প্রধান শপিং স্ট্রিট। চত্বরের ক্যাফেগুলোতে বসে এক কাপ কফি আর ফরাসি প্যাস্ট্রি খেতে খেতে মানুষের আসা-যাওয়া দেখা এক চমৎকার অভিজ্ঞতা।

পরিসমাপ্তিxa0

প্লেস মাসেনা কেবল একটি ইটের দালান বা পাথরের চত্বর নয়; এটি একটি জীবন্ত ইতিহাস। যেখানে ইতালীয় ঐতিহ্য আর আধুনিক ফরাসি জীবনধারা একে অপরের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আপনি যদি নিস শহরকে সত্যিকার অর্থে অনুভব করতে চান, তবে আপনাকে প্লেস মাসেনার চেকারবোর্ড মেঝেতে অন্তত কয়েক মিনিট বসতে হবে, অ্যাপোলোর ফোয়ারার শব্দ শুনতে হবে এবং আকাশের সেই সাত ঋষির আলোর খেলা দেখতে হবে। নিস ভ্রমণের ডায়েরিতে প্লেস মাসেনা থাকবে এক উজ্জ্বল রঙিন পাতা হয়ে।

প্লেস মাসেনা সম্পর্কে কিছু চমকপ্রদ তথ্যxa0

  • তারবিহীন ট্রামলাইন: প্লেস মাসেনার ওপর দিয়ে যখন ট্রাম যায়, তখন লক্ষ্য করলে দেখবেন সেখানে মাথার ওপরে কোনো বৈদ্যুতিক তার নেই। চত্বরের সৌন্দর্য আর আকাশের ভিউ ঠিক রাখতে ট্রামগুলো এখানে আসার ঠিক আগে তাদের প্যান্টোগ্রাফ নামিয়ে ফেলে এবং ব্যাটারি পাওয়ার ব্যবহার করে চত্বরটি পার হয়।
  • অ্যাপোলোর ‘নির্বাসন’ দণ্ড: চত্বরের মাঝখানে থাকা সূর্যদেবতা অ্যাপোলোর বিশাল মার্বেল মূর্তিটি একসময় শহর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল! ১৯৫৬ সালে এটি বসানোর পর স্থানীয়রা এর ‘নগ্নতা’ নিয়ে আপত্তি তোলেন। ফলে ১৯৭০-এর দশকে মূর্তিটি সরিয়ে শহরের এক কোণে একটি স্টেডিয়ামের সামনে ফেলে রাখা হয়েছিল। ২০১১ সালে দীর্ঘ ‘নির্বাসন’ শেষে এটি আবার তার পুরনো জায়গায় ফিরে আসে।
  • সাতটি মূর্তি ও সাতটি মহাদেশ: আকাশের ওপর খুঁটিতে বসে থাকা সাতটি মূর্তি আসলে সাতটি মহাদেশের প্রতীক। স্প্যানিশ শিল্পী জোমে প্লেনসা এটি তৈরি করেছেন মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক যোগাযোগ ও বিশ্বজনীন সম্প্রীতির বার্তা দিতে। রাতের বেলা এই মূর্তিগুলো যখন রঙ বদলায়, তখন মনে হয় যেন তারা একে অপরের সাথে মনের ভাষায় কথা বলছে।
  • দাবার বোর্ডের মতো মেঝে: চত্বরের মেঝেটি সাদা এবং কালো টাইলস দিয়ে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যা দেখতে হুবহু একটি বিশাল চেকারবোর্ড বা দাবার বোর্ডের মতো। এটি নিসের সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘সেলফি স্পট’ এবং আধুনিক স্ট্রিট ফটোগ্রাফির জন্য এক আদর্শ জায়গা।
  • সব পথের মিলনস্থল: প্লেস মাসেনাকে বলা হয় নিসের কিলোমিটার জিরো। এখান থেকে একদিকে ওল্ড টাউন, অন্যদিকে শপিং ডিস্ট্রিক্ট, উত্তরে আল্পস পর্বতমালা আর দক্ষিণে সমুদ্র সৈকত সবই পায়ে হাঁটা দূরত্বে।

Reference:

Related posts

আল হামরা টাওয়ার: প্রকৌশলবিদ্যার এক জাদুকরী বিস্ময়

আশা রহমান

তুরষ্ক – ইউরোপ নাকি এশিয়ার দেশ?

ফাবিহা বিনতে হক

ফরাসি শিল্প ও সংস্কৃতির গৌরব পালে গার্নিয়ে

আশা রহমান

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More