রক্তে ক্যারিবীয় মশলা, জন্মে দক্ষিণ আমেরিকান টান, বেড়ে ওঠায় ফরাসি স্টাইল সব মিলিয়ে মাইক ম্যাগনান যেন ফুটবলের এক ইন্টারকন্টিনেন্টাল কম্বো প্যাক!xa0
ফুটবল বিশ্বে গোলরক্ষকদের ভূমিকা এখন আর কেবল গোললাইনের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক ফুটবলে একজন গোলরক্ষককে একই সাথে দুর্ভেদ্য দেয়াল এবং আক্রমণভাগের প্রথম উৎস হতে হয়। এই ধারণাকে যারা বাস্তবে রূপ দিয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নাম মাইক ম্যাগনান। ভক্তদের কাছে যিনি “ম্যাজিক মাইক” নামে পরিচিত। পিএসজির একাডেমি থেকে উঠে এসে লিল এবং এসি মিলানের হয়ে ইতিহাস গড়া এই ফরাসি তারকা বর্তমানে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা এবং কমপ্লিট গোলকিপার।xa0
মাইক ম্যাগনান- এর ব্যক্তিগত তথ্য:
|
নামxa0 |
মাইক পিটারসন ম্যাগনান |
| জন্ম xa0 |
৩ জুলাই ১৯৯৫ (বয়স ৩০) |
|
জন্মস্থানxa0 |
ক্যায়েন, ফরাসি গায়ানা, ফ্রান্স |
|
উচ্চতাxa0 |
১.৯১ মিটার (৬ ফুট ৩ ইঞ্চি) |
|
পজিশনxa0 |
গোলকিপার |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
পিএসজি, লিলে ও বর্তমানে এসি মিলান ক্লাবের হয়ে খেলছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০২০– ফ্রান্স |

মাইক ম্যাগনান ১৯৯৫ সালের ৩ জুলাই ফ্রেঞ্চ গায়ানার ক্যায়েন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার মা ছিলেন হাইতিয়ান এবং বাবা গুয়াদেলুপিয়ান। তবে ম্যাগনানের শৈশব কেটেছে প্যারিসের উত্তর শহরতলি ভিলিয়ার্স-লে-বেলে ।
শৈশবে ম্যাগনানের ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নটা একটু ভিন্ন ছিল। তিনি মূলত একজন আউটফিল্ড খেলোয়াড় বা মিডফিল্ডার হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পিএসজির যুব একাডেমিতে যোগ দেওয়ার পর কোচরা তার শারীরিক গঠন, উচ্চতা এবং ক্ষিপ্রতা দেখে তাকে গোলরক্ষক হওয়ার পরামর্শ দেন। ম্যাগনান প্রথমে কিছুটা অনিচ্ছুক হলেও পরবর্তীতে এই পজিশনটিকেই নিজের করে নেন। পিএসজির যুব দলগুলোর হয়ে খেলার সময় থেকেই তার ভেতরের নেতৃত্বগুণ এবং শট ঠেকানোর অসাধারণ ক্ষমতা প্রকাশ পেতে শুরু করে।
২০১৩ সালে পিএসজির মূল দলে ডাক পান ম্যাগনান। তবে সেই সময় ক্লাবের এক নম্বর গোলরক্ষক সালভাতোরে সিরিগু এবং নিকোলাস দুশের উপস্থিতির কারণে মূল দলের হয়ে মাঠে নামার সুযোগ পাননি তিনি। কিন্তু ম্যাগনান দমে যাননি, বরং অনুশীলনে নিজেকে আরও ক্ষুরধার করতে থাকেন। অবশেষে নিয়মিত খেলার সুযোগ পাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি ২০১৫ সালে মাত্র ১ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে ফ্রেঞ্চ ক্লাব লিলেতে যোগ দেন।

লিলে-তে যোগ দেওয়ার পর প্রথম দিকে ম্যাগনান ছিলেন ভিনসেন্ট এনিয়ামার ব্যাকআপ গোলরক্ষক। তবে ২০১৭ সালে মার্সেলো বিয়েলসা লিলের প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ম্যাগনানকে প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক বানান। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।
ম্যাগনান পুরো ২০১৮-১৯ মৌসুমজুড়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করেন। তার অসাধারণ সব সেভের ওপর ভর করে লিলে লিগ টেবিলে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে এবং ম্যাগনান জিতে নেন “লিগ ওয়ান গোলকিপার অব দ্য ইয়ার” পুরস্কার।
২০২০-২১ মৌসুমটি লিলের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। পিএসজির মতো পরাশক্তিকে পেছনে ফেলে লিলের লিগ ওয়ান শিরোপা জেতার পেছনে ম্যাগনান ছিলেন মূল কারিগর। পুরো মৌসুমে ৩৮টি ম্যাচের মধ্যে ২১টি ম্যাচে তিনি ক্লিন শিট বজায় রাখেন, যা ইউরোপের শীর্ষ ৫ লিগের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল। এই পারফরম্যান্স তাকে বিশ্বমঞ্চে একজন বিশ্বমানের গোলরক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
২০২১ সালের গ্রীষ্মে এসি মিলান কর্তৃপক্ষ মাত্র ১৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে লিলের কাছ থেকে মাইক ম্যাগনানকে দলে ভেড়ায়। সান সিরোতে এসেই নিজের প্রথম মৌসুমে ম্যাগনান অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স উপহার দেন। ইতালিয়ান সিরি এ-তে ৩২ ম্যাচে ১৭টি ক্লিন শিট রেখে এসি মিলানকে দীর্ঘ ১১ বছর পর ঐতিহাসিক “স্কুদেত্তো” জেতাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন। ফলস্বরূপ তিনি ২০২১-২২ মৌসুমের “সিরি এ সেরা গোলরক্ষক” নির্বাচিত হন।

চলতি ২০২৩ থেকে ২০২৬ মৌসুমগুলোতেও ম্যাগনান তার ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন। ২০২৫-২৬ মৌসুমেও মিলানের রক্ষণভাগকে নেতৃত্ব দিয়ে ১৩টিরও বেশি ক্লিন শিট অর্জন করেছেন তিনি। ২০২৩ সালের পর থেকে দলের অন্যতম সিনিয়র ও প্রভাবশালী খেলোয়াড় হিসেবে তিনি মিলানের অধিনায়কের আর্মব্যান্ডও পরেছেন।
ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-১৬ থেকে অনূর্ধ্ব-২১ পর্যন্ত প্রতিটি যুব দলে খেলেছেন ম্যাগনান। ২০২০ সালের অক্টোবরে ইউক্রেনের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে ফ্রান্সের মূল দলের হয়ে তার অভিষেক হয়। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি কিংবদন্তি গোলরক্ষক হুগো লরিসের ব্যাকআপ হিসেবে কাজ করেছেন। ইউরো ২০২০ এবং ২০২১ উয়েফা নেশনস লিগ জয়ী ফরাসি স্কোয়াডের অংশ ছিলেন তিনি।
২০২২ বিশ্বকাপের পর হুগো লরিস আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিলে ম্যাগনান ফ্রান্সের অফিশিয়াল ১ নম্বর গোলরক্ষক হন। ইউরো ২০২৪-এ ফ্রান্সের গোলপোস্টের নিচে তিনি ছিলেন চীনের প্রাচীর। পুরো টুর্নামেন্টে তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে তিনি “ইউরো ২০২৪ টিম অব দ্য টুর্নামেন্ট”-এ জায়গা করে নেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বেও ফ্রান্স দলের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ম্যাগনান।
যদি ম্যাগনান সম্পূর্ণ ইনজুরি-মুক্ত থাকেন, তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে গোল্ডেন গ্লাভস জয়ের দৌড়ে তিনি থাকবেন সবার চেয়ে এগিয়ে। ফ্রান্সকে আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করতে হলে পোস্টের নিচে মাইক ম্যাগনানকে অতিমানবীয় কিছু করতেই হবে!xa0
Reference:

