ক্যারিয়ারের শুরুতে মিডফিল্ডার হিসেবে বল বানাতেন, আর এখন ডিফেন্সে এসে প্রতিপক্ষের স্ট্রাইকারদের ‘পা-পাপোশ’ বানিয়ে ছেড়ে দেন!
রজার ইবানেজ একজন পেশাদার ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার, যিনি মূলত সেন্টার-ব্যাক হিসেবে খেলেন। বর্তমানে তিনি সৌদি প্রফেশনাল লীগের ক্লাব আল-আহলি এবং ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দলের হয়ে রক্ষণভাগ সামলাচ্ছেন। মাঠে তার চমৎকার ট্যাকেলিং, গতি এবং এরিয়াল অ্যাবিলিটির জন্য তিনি পরিচিত।
রজার ইবানেজ দা সিলভা- এর ব্যক্তিগত তথ্য:
|
নাম |
রজার ইবানেজ দা সিলভা |
|
জন্ম |
২৩ নভেম্বর ১৯৯৮ (বয়স ২৭) |
|
জন্মস্থান |
ক্যানেলা , ব্রাজিল |
|
উচ্চতা |
১.৮৫ মিটার (৬ ফুট ১ ইঞ্চি) |
|
পজিশন |
সেন্টার-ব্যাক / ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
পিআরএস,ফ্লুমিনেন্স,আটালান্টা,রোমা এবং বর্তমানে আল-আহলি ক্লাবের হয়ে খেলছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০২২– ব্রাজিল |

রজার ইবানেজ দা সিলভা ১৯৯৮ সালের ২৩ নভেম্বর ব্রাজিলের রিও গ্রান্দে দো সুল-এর ক্যানেলা অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্ম ব্রাজিলে হলেও তার মায়ের বংশোদ্ভূত সূত্র ছিল উরুগুয়ের সাথে, যার কারণে তার মধ্যে উরুগুয়ের ফুটবলের সেই চিরাচরিত আগ্রাসী মনোভাব বা ‘গাররা চাররুয়া’-এর একটি ছোঁয়া পাওয়া যায়।
অনেকেরই অজানা যে, রজার ইবানেজ তার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে প্রথাগত ডিফেন্ডার ছিলেন না। তিনি মূলত একজন মিডফিল্ডার হিসেবে ফুটবল খেলা শুরু করেছিলেন।
ইবানেজের পেশাদার ফুটবল যাত্রা কিছুটা দেরিতে শুরু হয়। ২০১৬ সালে তিনি পিআরএস ফুটবল ক্লাবের হয়ে যুব ক্যারিয়ার শুরু করেন। সেখানে একজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে খেললেও তার ট্যাকলিং এবং বল উইনিং ক্ষমতা দেখে কোচরা তাকে রক্ষণভাগে নামিয়ে দেন।
২০১৭ সালে ব্রাজিলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ফ্লুমিনেন্সে ধারে যোগ দেন ইবানেজ। প্রথমে অনুর্ধ্ব-২০ দলে খেললেও তার পারফরম্যান্স সিনিয়র দলের কোচদের মুগ্ধ করে। ২০১৮ সালে ফ্লুমিনেন্সে তাকে স্থায়ীভাবে চুক্তিভুক্ত করে এবং ব্রাজিলের শীর্ষ স্তরের লিগ ‘সিরি এ’-তে তার অভিষেক ঘটে। ফ্লুমিনেন্সের হয়ে খেলা ৩৭টি ম্যাচে তিনি তার গতি এবং এরিয়াল সক্ষমতার (আকাশে ভাসমান বল নিয়ন্ত্রণে নেওয়া) প্রদর্শন করে ইউরোপের স্কাউটদের রাডারে চলে আসেন।

ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডারদের জন্য ইতালিকে অন্যতম সেরা পাঠশালা মনে করা হয়। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ইতালিয়ান সিরি এ-র ক্লাব আতালান্তা চার বছরের চুক্তিতে রজার ইবানেজকে দলে ভেড়ায়। তবে দলে অভিজ্ঞ ডিফেন্ডারদের ভিড়ে তরুণ ইবানেজের জন্য মূল একাদশে সুযোগ পাওয়া কঠিন ছিল। ২০১৯ সালে তিনি আতালান্তার হয়ে মাত্র কয়েকটি ম্যাচ খেলার সুযোগ পান, যার মধ্যে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে শাখতার দোনেৎস্কের বিরুদ্ধে ম্যাচটি ছিল অন্যতম।
ইবানেজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সোনালী এবং টার্নিং পয়েন্ট অধ্যায়টি শুরু হয় ২০২০ সালের জানুয়ারিতে, যখন তিনি ধারে আরেক ইতালিয়ান জায়ান্ট ক্লাব এএস রোমাতে যোগ দেন। পরবর্তীতে ২০২১ সালে রোমা তাকে স্থায়ীভাবে কিনে নেয়।
রোমায় যোগ দেওয়ার পরপরই রজার ইবানেজ তার জাত চেনাতে শুরু করেন। তিনজনের ডিফেন্সে তিনি লেফট-সেন্টার ব্যাক বা রাইট-সেন্টার ব্যাক হিসেবে অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স করতে থাকেন।
২০২১ সালে বিশ্বখ্যাত কোচ হোসে মরিনহো এএস রোমার দায়িত্ব নেওয়ার পর রজার ইবানেজ দলের রক্ষণভাগের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেন। মরিনহোর রক্ষণাত্মক ও কাউন্টার-অ্যাটাকিং কৌশলে ইবানেজের গতি এবং ওয়ান-অন-ওয়ান ডিফেন্ডিং ক্ষমতা ছিল মূল চাবিকাঠি। মরিনহো ইবানেজকে একজন ‘গ্ল্যাডিয়েটর’ হিসেবে গড়ে তোলেন, যিনি মাঠের প্রতিটা বলের জন্য নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে লড়াই করতেন।
এএস রোমার হয়ে রজার ইবানেজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় দলীয় সাফল্য আসে ২০২১-২২ মৌসুমে। রোমা সে বছর ইতিহাসের প্রথম উয়েফা ইউরোপা কনফারেন্স লিগ শিরোপা জয় করে। পুরো টুর্নামেন্টে ইবানেজ ছিলেন রোমার রক্ষণের মূল স্তম্ভ। ফাইনাল ম্যাচে ডাচ ক্লাব ফেইনুর্ডের বিরুদ্ধে তার নিরেট ডিফেন্ডিং রোমাকে ক্লিনশিট রাখতে এবং ট্রফি জিততে সাহায্য করে।
২০২২-২৩ মৌসুমেও রজার ইবানেজ রোমাকে উয়েফা ইউরোপা লিগের ফাইনালে তুলতে বড় ভূমিকা পালন করেন। যদিও ফাইনালে সেভিয়ার কাছে পেনাল্টি শুটআউটে রোমা হেরে যায়, তবে পুরো ইউরোপে ইবানেজের নাম ততদিনে ডিফেন্ডারদের শীর্ষ তালিকায় চলে আসে। রোমার হয়ে তিনি সব মিলিয়ে ১৪৯টি ম্যাচ খেলেন এবং একজন ডিফেন্ডার হয়েও ৯টি গুরুত্বপূর্ণ গোল করেন।
২০২৩ সালের আগস্টে, ইউরোপীয় ফুটবলের দলবদল বাজারে চমক সৃষ্টি করে সৌদি প্রো লিগের ক্লাব আল-আহলি। প্রায় ৩০ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে রজার ইবানেজকে দলে ভেড়ায়। রবার্তো ফিরমিনো, রিয়াদ মাহরেজ এবং এদুয়ার্দ মেন্দির মতো বিশ্বমানের তারকাদের সাথে ইবানেজও সৌদির ফুটবলে যোগ দেন।

সৌদি প্রো লিগে আল-আহলির হয়ে রজার ইবানেজ এশিয়ার ফুটবলেও নিজের আধিপত্য বজায় রেখেছেন। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, আলেকজান্ডার মিত্রোভিচ বা করিম বেনজেমার মতো বিশ্বসেরা স্ট্রাইকারদের আটকে দিয়ে তিনি সৌদি লিগের অন্যতম সেরা এবং দামি ডিফেন্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
রজার ইবানেজের মা উরুগুয়ের হওয়ায় তার সামনে উরুগুয়ে জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ ছিল। তবে ইবানেজ সবসময়ই সেলেসাওদের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখতেন।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে তিউনিসিয়ার বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে ইবানেজের অভিষেক হয়। তৎকালীন কোচ তিতে তার পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়ে তাকে দলে ডাকেন। যদিও ২০২২ বিশ্বকাপের চূড়ান্ত স্কোয়াডে ডিফেন্সে অভিজ্ঞতার আধিক্যের কারণে তিনি সুযোগ পাননি। তবে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের রক্ষণভাগের অন্যতম বড় বাজি হতে যাচ্ছেন রজার ইবানেজ।

রজার ইবানেজের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে ব্রাজিলের মূল একাদশে নিজের জায়গা পাকা করা। গ্যাব্রিয়েল মাগালায়েস বা এদের মিলিতাওর সাথে জুটি বেঁধে সেন্ট্রাল ডিফেন্সে তিনি কতটা মানিয়ে নিতে পারেন, তার ওপর নির্ভর করবে ব্রাজিলের হেক্সা জয়ের মিশন। তবে কোচ যখনই তাকে মাঠে নামাবেন, ইবানেজের আগ্রাসী ডিফেন্ডিং এবং বল নিয়ে নিচ থেকে ওপরে ওঠার ক্ষমতা ব্রাজিলের কাউন্টার-অ্যাটাকিং গেমপ্লে-কে আরও ধারালো করবে।
রজার ইবানেজ এমন একজন মডার্ন ডিফেন্ডার যিনি যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে পারেন। ২০২৬ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা, এবং ব্রাজিলের রক্ষণভাগকে বিশ্বসেরা প্রমাণ করার সবচেয়ে বড় সুযোগ।
Reference:
- https://en.wikipedia.org/wiki/Roger_Iba%C3%B1ez
- https://www.transfermarkt.us/roger-ibanez/profil/spieler/524481
- https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%B0%E0%A6%9C%E0%A7%87%E0%A6%B0_%E0%A6%87%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%AF%E0%A6%BC%E0%A7%87%E0%A6%9C
- https://www.transfermarkt.com/roger-ibanez/profil/spieler/524481

