ম্যাচ খেলার যাতায়াতের খরচ জোগাতে ব্রেমার ছোটবেলায় রাস্তায় রাস্তায় আইসক্রিম বেচতেন, আর আজ তিনি ইউরোপের বাঘা বাঘা স্ট্রাইকারদের মাঠেই ‘আইসক্রিম’ বানিয়ে ছেড়ে দেন!
গ্লিসন ব্রেমার! যার শারীরিক শক্তির সামনে টিকতে পারে না বিশ্বের বাঘা বাঘা স্ট্রাইকার, যার এরিয়াল ডমিনেন্সের কাছে পরাস্ত হয় প্রতিপক্ষের ডিফেন্স তিনিই এখন ইতালিয়ান জায়ান্ট জুভেন্টাস এবং সেলেসাওদের ডিফেন্সের মূল ভরসা। ব্রাজিলের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে কীভাবে তিনি আজ ইউরোপিয়ান ফুটবলের অন্যতম সেরা ‘দেয়াল’ হয়ে উঠলেন? চলুন জেনে নেওয়া যাক।
গ্লিসন ব্রেমার- এর ব্যক্তিগত তথ্য:
|
নাম |
গ্লিসন ব্রেমার সিলভা নাসিমেন্টো |
|
জন্ম |
১৮ মার্চ ১৯৯৭ (বয়স ২৯) |
|
জন্মস্থান |
ইটাপিটাঙ্গা , ব্রাজিল |
|
উচ্চতা |
১.৮৮ মিটার (৬ ফুট ২ ইঞ্চি) |
|
পজিশন |
সেন্টার-ব্যাক |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
অ্যাটলেটিকো মিনেরো,তুরিন এবং বর্তমানে জুভেন্টাস ক্লাবের হয়ে খেলছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০২২– ব্রাজিল |

গ্লিসন ব্রেমার ১৯৯৭ সালের ১৮ মার্চ ব্রাজিলের ইতাপিতোঙ্গায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই ফুটবলের প্রতি তার ছিল তীব্র আকর্ষণ। ব্রাজিলের অন্যান্য ফুটবলারের মতো তিনিও প্রথাগত আক্রমণাত্মক ফুটবলার হতে চাননি, বরং তার নজর ছিল রক্ষণভাগের দিকে।
ব্রেমারের যুব ক্যারিয়ার শুরু হয় দেস্পোর্তিভো ব্রাজিল ক্লাবের মাধ্যমে। সেখানে ভালো পারফর্ম করার পর তিনি ব্রাজিলের অন্যতম শীর্ষ ক্লাব সাও পাওলোর অনূর্ধ্ব-২০ দলে ধারে যোগ দেন। তবে তার পেশাদার ক্যারিয়ারের মূল মোড় ঘোরে যখন তিনি ২০১৭ সালে আতলেতিকো মিনেইরো ক্লাবে যোগ দেন। ২০১৭ সালের জুনে পেশাদার লিগে তার অভিষেক হয়। আতলেতিকো মিনেইরোর হয়ে তিনি ব্রাজিলের শীর্ষ স্তরের ফুটবল লিগে এবং কোপা লিবার্তোদোরেসের মতো মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্টে খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এই ক্লাবে থাকাকালীনই তার শারীরিক গঠন ও রক্ষণাত্মক বুদ্ধিমত্তা ইউরোপের স্কাউটদের নজর কাড়ে।
২০১৮ সালের জুলাইয়ে গ্লিসন ব্রেমার মাত্র ৫.৮ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে ইতালির সিরি এ-র ক্লাব তোরিনোতে যোগ দেন। ইতালিয়ান ফুটবল ডিফেন্ডারদের জন্য একটি আদর্শ পাঠশালা হিসেবে পরিচিত, এবং ব্রেমার সেখানে নিজেকে প্রমাণ করতে বেশি সময় নেননি।
প্রথম মৌসুমে তোরিনোর হয়ে তিনি মাত্র ৫টি ম্যাচ খেলার সুযোগ পান। তবে ২০১৯-২০ মৌসুমে তিনি দলের মূল একাদশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেন এবং সেই মৌসুমে ২৭টি ম্যাচে মাঠে নামেন।
২০২০-২১ মৌসুমে তোরিনোর রক্ষণভাগকে একাই টেনে নিয়ে যান গ্লিসন ব্রেমার, যেখানে একজন ডিফেন্ডার হওয়া সত্ত্বেও তিনি ৫টি গোল করেন। তবে ২০২১-২২ মৌসুমটি ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অধ্যায়। সেই মৌসুমে তিনি সিরি এ-র ৩৩টি ম্যাচ খেলেন এবং লিগের সেরা সেরা স্ট্রাইকারদের পকেটে পুরে রাখেন।

২০২১-২২ মৌসুমে তার দুর্দান্ত ইন্টারসেপশন, ট্যাকলিং এবং এরিয়াল সক্ষমতার কারণে তাকে সিরি এ-র সেরা ডিফেন্ডার নির্বাচিত করা হয়। তোরিনোর মতো মধ্যসারির ক্লাবে থেকে এই খেতাব জেতা ছিল তার অসাধারণ প্রতিভার প্রমাণ।
তোরিনোতে সেরা ডিফেন্ডার নির্বাচিত হওয়ার পর ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলো তাকে দলে ভেড়াতে মরিয়া হয়ে ওঠে। অবশেষে ২০২২ সালের জুলাইয়ে প্রায় ৪১ মিলিয়ন ইউরো ট্রান্সফার ফির বিনিময়ে তোরিনোর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব জুভেন্টাসে যোগ দেন গ্লিসন ব্রেমার। জুভেন্টাসের কিংবদন্তি ডিফেন্ডার জর্জিও কিয়েলিনির বিদায়ের পর তার ৩ নম্বর জার্সিটি ব্রেমারকে দেওয়া হয়, যা তার ওপর ক্লাবের আস্থার প্রতীক ছিল।
জুভেন্টাসে আসার পর ব্রেমার দ্রুতই দলের রক্ষণভাগের নেতা হয়ে ওঠেন। ২০২৩-২৪ মৌসুমে জুভেন্টাসের হয়ে তিনি কোপা ইতালিয়া শিরোপা জয় করেন, যা তার ইউরোপীয় ক্যারিয়ারের প্রথম বড় দলীয় ট্রফি। বর্তমানে চলমান ২০২৫-২৬ মৌসুমে জুভেন্টাসের হয়ে তিনি অত্যন্ত দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন। এই মৌসুমে ২৬টি লিগ ম্যাচে ৪টি গোল এবং ৩টি অ্যাসিস্ট করে তিনি প্রমাণ করেছেন যে সেট-পিস থেকে তিনি কতটা বিপজ্জনক হতে পারেন।
ইতালিতে দুর্দান্ত পারফর্ম করলেও ব্রাজিল জাতীয় দলে ডাক পেতে গ্লিসন ব্রেমারকে বেশ দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। কারণ ব্রাজিলের রক্ষণভাগে তখন মারকুইনহোস, থিয়াগো সিলভা এবং এদের মিলিতাওয়ের মতো বিশ্বমানের ডিফেন্ডাররা ছিলেন।
অবশেষে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ঘানার বিরুদ্ধে একটি প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিলের হয়ে তার আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়। তার পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়ে তৎকালীন কোচ তিতে তাকে ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপ স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত করেন।

গত ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ব্রেমার দলে থাকলেও থিয়াগো সিলভা ও মারকুইনহোসের উপস্থিতির কারণে বেশিরভাগ সময় তাকে সাইডবেঞ্চে কাটাতে হয়েছিল। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। থিয়াগো সিলভার বিদায়ের পর ব্রাজিলের রক্ষণভাগে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণে প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছেন গ্লিসন ব্রেমার। জুভেন্টাসের হয়ে চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে তার দুর্দান্ত ফর্ম তাকে ব্রাজিলের মূল একাদশে এদের মিলিতাও বা মারকুইনহোসের পাশে অবধারিত জুটি হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
বিশ্বকাপের ঠিক আগমুহূর্তে ইউরোপিয়ান ট্রান্সফার মার্কেটে বায়ার্ন মিউনিখসহ একাধিক বড় ক্লাব ব্রেমারকে দলে নিতে উঠেপড়ে লেগেছে। এই দলবদল গুঞ্জনের বিপুল চাপ মাথায় নিয়ে ব্রেমার বিশ্বকাপে মাঠে নামছেন। গ্লিসন ব্রেমারই এখন কোটি কোটি ব্রাজিল ভক্তের হেক্সা জয়ের স্বপ্ন কাঁধে নিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের মাঠে নামছেন। সেলেসাওদের ডিফেন্সে তিনি কতটা শক্ত ‘দেয়াল’ হয়ে দাঁড়াতে পারেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়!
- Reference:
https://en.wikipedia.org/wiki/Gleison_Bremer
https://www.juventus.com/en/teams/first-team-men/squad/gleison-bremer
https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%97%E0%A7%8D%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%87%E0%A6%B8%E0%A6%A8_%E0%A6%AC%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%B0
https://www.vietnam.vn/bn/5-ung-vien-thay-the-ibrahima-konate-tai-liverpool-tu-gleison-bremer-den-maxence-lacroix

