Image default
ক্রীড়াবিদজীবনীফুটবল

হুয়ান মুসো: গোলবারের নিচে আর্জেন্টিনার এক বিশ্বস্ত প্রাচীর

প্রেমিকার রোমান্টিক সারপ্রাইজের ছবি পোস্ট করতে গিয়ে অসাবধানতাবশত আয়নায় নিজের ‘পোশাকহীন রূপ’ ফাঁস করে নেট দুনিয়া কাঁপিয়েছিলেন মুসো! 

হুয়ান মুসো আর্জেন্টিনার সোনালী প্রজন্মের এক গর্বিত সদস্য। জাতীয় দলের হয়ে কোপা আমেরিকা এবং আতালান্তার হয়ে ইউরোপা লিগ জয়ের ঐতিহাসিক কীর্তি রয়েছে তাঁর। গোলবারের নিচে ক্ষিপ্রতা আর ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামলানোর দারুণ ক্ষমতা তাঁকে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা শট-স্টপারে পরিণত করেছে।

হুয়ান মুসো- এর ব্যক্তিগত তথ্য:

নাম

হুয়ান অগাস্টিন মুসো

জন্ম

৬ মে ১৯৯৪ (বয়স ৩২)

জন্মস্থান

সান নিকোলাস , আর্জেন্টিনা

উচ্চতা

১.৯৩ মিটার (৬ ফুট ৪ ইঞ্চি)

পজিশন

গোলকিপার

ক্লাব ক্যারিয়ার

রেসিং ক্লাব,উদিনেস,আটালান্টা এবং বর্তমানে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ ক্লাবের হয়ে খেলেছেন।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

২০১৯– আর্জেন্টিনা

হুয়ান অগাস্টিন মুসো- Image Source: afa.com.ar

হুয়ান অগাস্টিন মুসো ১৯৯৪ সালের ৬ মে আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেস প্রদেশের সান নিকোলাস দে লোস আরোইস শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি তার ছিল এক সহজাত টান। তবে অন্যান্য সাধারণ আর্জেন্টাইন শিশুর মতো স্ট্রাইকার বা মিডফিল্ডার হওয়ার স্বপ্ন নয়, মুসোর পছন্দ ছিল গোলবারের নিচে দাঁড়িয়ে দলের দুর্গ রক্ষা করা।

তার শারীরিক গঠন এবং দুর্দান্ত উচ্চতা প্রায় ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি,যা তাকে শৈশবেই একজন আদর্শ গোলরক্ষক হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। স্থানীয় ক্লাবে কিছুদিন খেলার পর, আর্জেন্টিনার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এবং সফল ক্লাব রেসিং ক্লাবের স্কাউটদের নজরে আসেন তিনি। এরপরই তার পেশাদার ফুটবলার হওয়ার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।

২০১২ সালে হুয়ান মুসো রেসিং ক্লাবের যুব একাডেমিতে যোগ দেন। সেখানে কঠোর পরিশ্রম এবং প্রতিভার জোরে দ্রুতই ক্লাবের বয়সভিত্তিক দলগুলোর গণ্ডি পেরিয়ে মূল দলে জায়গা করে নেন।

হুয়ান মুসো রেসিং ক্লাবের যুব একাডেমিতে- Image Source: instagram.com

২০১৪ সালে রেসিং ক্লাবের মূল স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত হলেও, শুরুর দিকে তাকে মূলত ব্যাক-আপ গোলরক্ষক হিসেবে বেঞ্চে বসে থাকতে হয়েছিল। সেই সময় ক্লাবের এক নম্বর গোলরক্ষক ছিলেন অভিজ্ঞ সেবাস্তিয়ান সাহা। অভিজ্ঞদের কাছ থেকে শেখার এই সময়টাকে মুসো নিজের অনুশীলনে কাজে লাগান।

২০১৭ সালের মে মাসে সান লোরেনজোর বিপক্ষে ম্যাচে রেসিং ক্লাবের হয়ে তার পেশাদার অভিষেক ঘটে। এরপরের ২০১৭-১৮ মৌসুমে তিনি ক্লাবের প্রধান গোলরক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। সেই মৌসুমে লিগে ও কোপা লিবার্তোদোরেসে তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স লাতিন আমেরিকার ফুটবল বিশেষজ্ঞদের নজর কাড়ে। পোস্টের নিচে তার লম্বা শরীর এবং ক্ষিপ্রতা দেখে ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলো তার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাতে শুরু করে।

২০১৮ সালের গ্রীষ্মকালীন দলবদলে হুয়ান মুসো আর্জেন্টিনার গণ্ডি পেরিয়ে ইউরোপের ফুটবলে পা রাখেন। ইতালিয়ান সিরি এ-র ক্লাব উদিনেস তাকে চার বছরের চুক্তিতে দলে ভেড়ায়।

উদিনেসের হয়ে প্রথম মৌসুমেই তিনি দলের এক নম্বর গোলরক্ষকের জায়গা পাকা করেন। সিরি এ-র স্ট্রাইকারদের শক্তিশালী শট ও ক্রস চমৎকারভাবে প্রতিহত করে তিনি ইতালির লিগে অন্যতম সেরা শট-স্টপার হিসেবে পরিচিতি পান। 

২০১৯-২০ এবং ২০২০-২১ মৌসুমে ইন্টার মিলান, জুভেন্টাস এবং এসি মিলানের মতো বড় দলগুলোর বিপক্ষে তার পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। উদিনেসের হয়ে তিন মৌসুমে ১০০-র বেশি ম্যাচ খেলে তিনি প্রায় ৩০টি ক্লিন শিট রাখেন, যা একটি মাঝারি সারির ক্লাবের জন্য অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

উদিনেসের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে ২০২১ সালে প্রায় ২০ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে ইতালির আরেক শীর্ষ ক্লাব আতালান্তাতে যোগ দেন হুয়ান মুসো। 

আতালান্তায় যোগ দেওয়ার পর মুসো উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার স্বপ্ন পূরণ করেন। ইউরোপের সেরা সেরা স্ট্রাইকারদের মুখোমুখি হয়ে তিনি নিজের স্নায়ুচাপ ধরে রাখার ক্ষমতা প্রদর্শন করেন।

ইউরোপা লিগ ফাইনালে লেভারকুসেনের বিপক্ষে মুসো- Image Source: ole.com.ar

আতালান্তার হয়ে হুয়ান মুসোর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মুহূর্ত আসে ২০২৩-২৪ মৌসুমে। ২০২৪ সালের উয়েফা ইউরোপা লিগের ফাইনালে বায়ার লেভারকুসেনকে হারিয়ে আতালান্তার ঐতিহাসিক শিরোপা জয়ের পেছনে মুসোর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই গোলবারের নিচে তিনি ছিলেন এক শান্ত ও দৃঢ় প্রাচীর।

২০২৪ সালের আগস্টে হুয়ান মুসো তার ক্যারিয়ারে এক নতুন মোড় নেন। ইতালির অধ্যায় চুকিয়ে তিনি লোনে যোগ দেন স্প্যানিশ জায়ান্ট আতলেতিকো মাদ্রিদে।

ফুটবল বিশ্বে আতলেতিকো মাদ্রিদের কোচ দিয়াগো সিমেওনে তার কঠোর রক্ষণাত্মক কৌশলের জন্য পরিচিত। এমন একজন কোচের অধীনে এবং বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক ইয়ান অবলাকের উপস্থিতিতে মুসোকে ব্যাক-আপ হিসেবে দলে নেওয়া হয়। তবে যখনই তিনি মাঠে নামার সুযোগ পেয়েছেন, নিজের অভিজ্ঞতা এবং বিশ্বস্ততার প্রমাণ দিয়েছেন। ২০২৫-২৬ মৌসুমেও আতলেতিকোর ড্রেসিংরুমে এবং স্প্যানিশ লা লিগার বিভিন্ন ম্যাচে তার উপস্থিতি দলের রক্ষণভাগকে বাড়তি স্বস্তি জুগিয়েছে।

আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে খেলা যেকোনো ফুটবলারের জন্যই সর্বোচ্চ আবেগের জায়গা। হুয়ান মুসো অনূর্ধ্ব-২০ দল থেকেই আর্জেন্টিনার প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন। ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ মরক্কোর বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনার মূল জাতীয় দলের হয়ে হুয়ান মুসোর অভিষেক হয়। তৎকালীন ও বর্তমান কোচ লিওনেল স্কালোনি মুসোর প্রতিভার ওপর সবসময়ই আস্থা রেখেছেন।

২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ী গোলরক্ষকদের মধ্যে মুসো- Image Source: ole.com.ar

২০২১ সালে ব্রাজিলের মাটিতে আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক কোপা আমেরিকা জয়ী স্কোয়াডের অন্যতম সদস্য ছিলেন হুয়ান মুসো। যদিও টুর্নামেন্টে এমিলিয়ানো মার্তিনেস মূল গোলরক্ষক হিসেবে খেলেন, কিন্তু পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে মুসো এবং ফ্রাঙ্কো আরমানির মতো ব্যাক-আপদের অনুশীলন ও সমর্থন দলের ভেতর এক চমৎকার পরিবেশ তৈরি করেছিল। দীর্ঘ ২৮ বছর পর আর্জেন্টিনার সেই ট্রফি জয়ে তিনিও ছিলেন এক গর্বিত অংশীদার।

২০২৬ বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব এবং মূল স্কোয়াডের আলোচনাতেও হুয়ান মুসো সবসময়ই কোচ স্কালোনির বিবেচনায় থেকেছেন। আর্জেন্টিনার গোলকিপিং পজিশনে মার্তিনেস এক নম্বর হলেও, মুসো এবং হেরোনিমো রুলির মতো অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত গোলরক্ষকদের উপস্থিতি আর্জেন্টিনাকে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী বেঞ্চের অধিকারী করেছে।

হুয়ান মুসোর ব্যক্তিগত জীবন মাঠের মতোই গোছানো, তবে সেখানেও মাঝে মাঝে এমন কিছু ‘টুইস্ট’ আসে যা রীতিমতো নেট দুনিয়া কাঁপিয়ে দেয়! মুসোর ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে বড় ‘হাতিয়ার’ বা ‘শত্রু’ যাই বলুন না কেন, তা হলো আয়না! ২০২২ সালে প্রেমিকা অ্যানা আরিয়াউডোর দেওয়া রোমান্টিক সারপ্রাইজের ছবি পোস্ট করতে গিয়ে আয়নায় নিজের কাপড় ছাড়া ছবি আপলোড করে দিয়েছিলেন। নেট দুনিয়ায় ট্রোলড হওয়ার পর মুসো এখন যেকোনো ছবি তোলার আগে নাকি অন্তত তিনবার চেক করেন রুমে কোনো আয়না বা কাচ আছে কি না!

তবে তাঁর দীর্ঘদিনের সঙ্গী ও মডেল অ্যানা আরিয়াউডোর সাথে তাঁর কেমিস্ট্রি দারুণ। ২০২২ সালের শেষের দিকে তাঁদের জীবনে আসে একমাত্র ছেলে আলেসান্দ্রো। ছেলে হওয়ার পর মুসোর ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল এখন রোমান্টিক কাপল ছবির চেয়ে ‘ডায়াপার ডিউটি’ আর বাচ্চার সাথে দুষ্টুমির ছবিতে বেশি ভরপুর।

Reference:

Related posts

মার্কোস আকুনা: কেন সবাই তাকে “ডিম” বলে ডাকে?

কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে মন্ত্রিত্ব: কে এই আসিফ মাহমুদ?

সার্জিও আগুয়েরো: ম্যারাডোনার রেকর্ড ভাঙা কিংবদন্তি স্ট্রাইকার

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More